WhatsApp Book A Free Trial
القائمة

🕋 تفسير سورة هود

(Hud) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ الر ۚ كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ

📘 আলিফ লা-ম রা। এ (কুরআন) এমন গ্রন্থ যার আয়াতগুলি মজবুত (সুবিন্যস্ত) করা হয়েছে,[১] অতঃপর বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে[২] প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞাতা (আল্লাহ)র পক্ষ হতে। [৩] [১] অর্থাৎ, তা এত পাকাপোক্ত যে, তার শব্দবিন্যাস ও অর্থ বিবৃতিতে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। অথবা তার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা ও জটিলতা নেই। অথবা তা পরিবর্তন ও রহিত হওয়ার নয়। [২] তারপর তাতে আহকাম ও শরয়ী বিধি-বিধান, নসীহত ও কাহিনী, আক্বায়েদ ও ঈমানসংক্রান্ত বিষয় এবং চরিত্র ও ব্যবহার নীতি-নৈতিকতার বিষয়গুলোকে যেভাবে পরিষ্কার ও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, পূর্ব কিতাবসমূহে তার দৃষ্টান্ত মিলে না। [৩] অর্থাৎ, আপন বাণীতে তিনি প্রজ্ঞাময়, ফলে তাঁর পক্ষ থেকে অবতীর্ণকৃত বাণী হিকমত থেকে খালি নয়। তিনি মহাজ্ঞাতাও অর্থাৎ, তিনি সমস্ত বিষয় ও তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে অবগত আছেন। ফলে তাঁর কথার উপর আমল করার মাধ্যমেই মানুষ অমঙ্গল থেকে বাঁচতে পারবে।

وَلَئِنْ أَذَقْنَاهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّئَاتُ عَنِّي ۚ إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ

📘 আর যদি তার উপর আপতিত কোন কষ্টের পর তাকে কোন নিয়ামত আস্বাদন করাই, তাহলে সে বলতে শুরু করে, ‘আমার সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে গেল’; [১] (আর তখন) সে উৎফুল্ল অহংকারী হয়ে যায়। [২] [১] অর্থাৎ, ভাবে যে আমার কষ্টের সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। আমার আর কোন কষ্ট আসবে না। [২] অর্থাৎ, তার নিকট যা কিছু থাকে, তা নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং অন্যদের উপর অহংকার করে। অবশ্য এই মন্দ গুণ থেকে মু'মিন ও সৎকর্মশীলগণ স্বতন্ত্র, যেমন পরের আয়াতে এই কথা পরিষ্কার বুঝা যায়।

ذَٰلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَىٰ نَقُصُّهُ عَلَيْكَ ۖ مِنْهَا قَائِمٌ وَحَصِيدٌ

📘 এটা ছিল সেই জনপদসমূহের কতিপয় অবস্থা যা আমি তোমার নিকট বর্ণনা করছি, ওগুলির মধ্যে কোন কোন জনপদ তো বিদ্যমান রয়েছে এবং কোন কোনটি নির্মূল হয়ে গেছে।[১] [১] قائم (বিদ্যমান) দ্বারা ঐ সকল শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যার ধংসাবশেষ এখনও ছাদসহ বিদ্যমান রয়েছে। আর حصيد ,محصود এর অর্থে; সেই শহর বা জনপদকে বুঝানো হয়েছে, যা কাটা ফসলের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অর্থাৎ পূর্ববর্তী যুগের যে কতিপয় শহর ও জনপদের কাহিনী আমি বর্ণনা করছি, তার মধ্যে কোন কোন শহরের ধংসাবশেষ এখনও বর্তমান আছে, যা শিক্ষামূলক স্মৃতি। আর কোন কোন জনপদকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, যা একেবারে দুনিয়া থেকে মিটে গেছে এবং শুধু ইতিহাসের পাতায় তা বাকি রয়ে গেছে।

وَمَا ظَلَمْنَاهُمْ وَلَٰكِنْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ۖ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ آلِهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَمَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَتْبِيبٍ

📘 আমি তাদের প্রতি অত্যাচার করিনি,[১] কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে।[২] বস্তুতঃ যখন তোমার প্রতিপালকের হুকুম এসে পৌঁছল, তখন তাদের সেই উপাস্যগুলি, আল্লাহকে ছেড়ে ওরা যাদের উপাসনা করত, তারা ওদের কোন কাজে লাগল না। উল্টো তারা তাদের ধ্বংসই বৃদ্ধি করল। [৩] [১] অর্থাৎ, তাদেরকে শাস্তি দিয়ে ও ধ্বংস করে। [২] (বরং তারাই) কুফরী ও অবাধ্যতা করে (নিজেদের উপর অত্যাচার করেছে।) [৩] অথচ তাদের বিশ্বাস এই ছিল যে, এরা তাদেরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে এবং মঙ্গল এনে দেবে। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব উপস্থিত হল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের উক্ত বিশ্বাস ভ্রান্ত ছিল এবং এ কথা প্রমাণ হয়ে গেল যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ কারোর মঙ্গল বা অমঙ্গল করার ক্ষমতা রাখে না।

وَكَذَٰلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَىٰ وَهِيَ ظَالِمَةٌ ۚ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ

📘 আর এরূপই তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও; যখন তিনি কোন অত্যাচারী জনপদের অধিবাসীদেরকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যাতনাদায়ক, কঠিন। [১] [১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যেমন পূর্ববর্তী জনপদসমূহকে ধ্বংস করেছেন, অনুরূপ ভবিষ্যতেও তিনি অত্যাচারীদেরকে পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা অবশ্যই অত্যাচারীদেরকে ঢিল দেন। কিন্তু যখন তাদেরকে পাকড়াও করেন, তখন কোন সুযোগ দেন না।" অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত পাঠ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম)

إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لِمَنْ خَافَ عَذَابَ الْآخِرَةِ ۚ ذَٰلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَٰلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ

📘 নিশ্চয় এতে[১] সে ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে, যে ব্যক্তি পরকালের শাস্তিকে ভয় করে। ওটা এমন একটা দিন হবে, যেদিন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে এবং ওটা হবে সকলের উপস্থিতির দিন। [২] [১] অর্থাৎ, আল্লাহর ধর-পাকড়ে অথবা এই ঘটনাবলীতে, যা নসীহত ও শিক্ষার জন্য বর্ণনা করা হয়েছে (তাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে)। [২] অর্থাৎ, হিসাব ও প্রতিদানের জন্য।

وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ

📘 আর আমি ওটা নির্দিষ্ট একটি কালের জন্যই বিলম্বিত করছি। [১] [১] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়াতে দেরী হওয়ার একমাত্র কারণ হল যে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতঃপর যখন সেই নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তের জন্যও বিলম্ব করা হবে না।

يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ

📘 যখন সেদিন আসবে, তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না।[১] সুতরাং তাদের মধ্যে কেউ হবে দুর্ভাগ্যবান এবং কেউ হবে সৌভাগ্যবান। [১] 'কথাও বলতে পারবে না' কথাটির অর্থ হল, আল্লাহ তাআলার সামনে কারোর কোন কথা বলার বা সুপারিশ করার হিম্মত ও সাহস হবে না। তবে যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। সুপারিশ সম্পর্কিত লম্বা হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "সেই দিন আম্বিয়াগণ ছাড়া কারোর কথা বলার হিম্মত ও সাহস হবে না। আর আম্বিয়াগণের মুখে সেদিন একমাত্র এই কথা হবে, 'হে আল্লাহ! আমাকে পরিত্রাণ দাও, আমাকে পরিত্রাণ দাও।" (বুখারী)

فَأَمَّا الَّذِينَ شَقُوا فَفِي النَّارِ لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَشَهِيقٌ

📘 অতএব যারা দুর্ভাগ্যবান তারা তো হবে দোযখে; তাতে তাদের চীৎকারও আর্তনাদ হতে থাকবে।

خَالِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ ۚ إِنَّ رَبَّكَ فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ

📘 তারা অনন্তকাল সেখানে থাকবে, যতকাল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে;[১] যদি না তোমার প্রতিপালকের অন্য ইচ্ছা হয়।[২] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তা সম্পাদনে সুনিপুণ। [১] এই বাক্য দ্বারা কিছু মানুষ এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে যে, জাহান্নামের আযাব কাফেরদের জন্যও চিরস্থায়ী নয়; বরং সাময়িক। অর্থাৎ, ততদিন থাকবে, যতদিন আকাশ ও পৃথিবী থাকবে। (তারপর শেষ হয়ে যাবে।) কিন্তু এই কথা ঠিক নয়। কারণ এখানে مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالأرضُ কথাটি আরববাসীদের দৈনন্দিন কথাবার্তা ও পরিভাষা অনুযায়ী অবতীর্ণ হয়েছে। আরববাসীদের অভ্যাস ছিল যে, যখন তারা কোন বস্তুর চিরস্থায়িতত্ত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্য হত, তখন তারা বলত,(هذا دائمٌ دوام السموات والأرض) "এই বস্তু আকাশ ও পৃথিবীর মত চিরস্থায়ী।" সেই পরিভাষাকে কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ কাফের ও মুশরিকরা চিরকালব্যাপী জাহান্নামে থাকবে, যা কুরআন বিভিন্ন স্থানে, خَالِدِينَ فِيهَآ أَبَدًا শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছে। তার দ্বিতীয় এক অর্থ এও করা হয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী থেকে উদ্দেশ্য হল 'জিনস' (শ্রেণী)। অর্থাৎ, ইহলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী; যা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এ ছাড়া পারলৌকিক আকাশ ও পৃথিবী পৃথক হবে। যেমন কুরআনে তার পরিষ্কার বর্ণনা এসেছে। يوم تبدل الأرض غير الأرض والسموات অর্থাৎ, যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও।" (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৮) আর পারলৌকিক উক্ত আকাশ ও পৃথিবী, জান্নাত ও জাহান্নামের মত চিরস্থায়ী হবে। এই আয়াতে সেই পারলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা বলা হয়েছে, ইহলৌকিক আকাশ-পৃথিবীর কথা নয়, যা ধ্বংস হয়ে যাবে। (ইবনে কাসীর) এই উভয় অর্থের যে কোন অর্থ নেওয়া হলে আয়াতের উদ্দেশ্য পরিষফুটিত হয়ে যাবে এবং উপস্থাপিত সমস্যা দূর হয়ে যাবে। ইমাম শওকানী (রঃ) এর আরো কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন, যা জ্ঞানীরা দেখতে পারেন। (ফাতহুল কাদীর)[২] এই ব্যতিক্রমেরও কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে সব থেকে সঠিক অর্থ এই যে উক্ত ব্যতিক্রম তওহীদবাদী মু'মিন পাপীদের জন্য। এই অর্থ অনুযায়ী এর পূর্ব আয়াতে شقي (দুর্ভাগ্যবান) শব্দটি ব্যাপক ধরতে হবে। অর্থাৎ কাফের ও পাপী মু'মিন উভয়কে বুঝাবে। আর إلا مَا شَاءَ رَبُّكَ দ্বারা পাপী মু'মিনরা ব্যতিক্রম হয়ে যাবে। আর ما شاء তে مَا হরফটি مَن এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।

۞ وَأَمَّا الَّذِينَ سُعِدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ ۖ عَطَاءً غَيْرَ مَجْذُوذٍ

📘 পক্ষান্তরে যারা সৌভাগ্যবান, তারা থাকবে বেহেশ্তে। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে, যতকাল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে; যদি না তোমার প্রতিপালকের অন্য ইচ্ছা হয়।[১] এ হবে অফুরন্ত অনুদান। [২] [১] এই ব্যতিক্রমও পাপী মু'মিনদের জন্য। অর্থাৎ, অন্য মু'মিনদের মত এই গোনাহগার মু'মিনরা প্রথম থেকে শেষ অবধি জান্নাতে থাকবে না। বরং শুরুতে কিছু দিন তাদেরকে জাহান্নামে থাকতে হবে, পরে আল্লাহর ইচ্ছায় আম্বিয়া ও মু'মিনদের সুপারিশে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেমন সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত। [২] غير مجذوذ এর অর্থ হল غير مقطوع অর্থাৎ, এমন অফুরন্ত অনুদান যা শেষ হওয়ার নয়। এই বাক্য দ্বারা এই কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যে সকল পাপী মু'মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বে'র করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তারা ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী হবে এবং সকল জান্নাতীগণ আল্লাহ প্রদত্ত অনুদান ও তাঁর নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে, তা কোন কালে কখনও শেষ হবে না।

فَلَا تَكُ فِي مِرْيَةٍ مِمَّا يَعْبُدُ هَٰؤُلَاءِ ۚ مَا يَعْبُدُونَ إِلَّا كَمَا يَعْبُدُ آبَاؤُهُمْ مِنْ قَبْلُ ۚ وَإِنَّا لَمُوَفُّوهُمْ نَصِيبَهُمْ غَيْرَ مَنْقُوصٍ

📘 সুতরাং এরা যার উপাসনা করে, তার সম্বন্ধে তুমি এতটুকুও সংশয় করো না; তারাও ঠিক সে রূপেই উপাসনা করছে যেরূপে তাদের পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষরা করত এবং নিশ্চয় আমি তাদেরকে তাদের প্রাপ্য পূর্ণভাবে দিয়ে দিব; একটুকুও কম করব না। [১] [১] এর অর্থ সেই আযাব, তারা যার হকদার হবে, তাতে কোন কম করা হবে না।

إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ

📘 কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান। [১] [১] অর্থাৎ, মু'মিনগণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক বা দুঃখ-কষ্টে থাকুক উভয় অবস্থাতেই তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) শপথ করে বলেছেন, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য যে ফায়সালাই করেন, তাদের ভালোর জন্যই করেন। যদি সে সুখ লাভ করে, তাহলে তার উপর সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ হয়)। আর যদি কোন দুঃখ-কষ্ট পায়, তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, আর এটাও তাঁর জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ) হয়। এই বৈশিষ্ট্য একজন মু'মিন ব্যতীত অন্য কারো নয়।" (মুসলিম) অন্য আরো একটি হাদীসে বলেন যে, "একজন মু'মিন যখন কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় এবং কষ্ট পায়, এমনকি তার পায়ে কাঁটা প্রবিষ্ট হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তার কারণে তাঁর গুনাহ মাফ করে দেন।" (আহমাদ ৩/৪) সূরা মাআরিজের ৭০:১৯-২২ নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।)

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ فَاخْتُلِفَ فِيهِ ۚ وَلَوْلَا كَلِمَةٌ سَبَقَتْ مِنْ رَبِّكَ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ ۚ وَإِنَّهُمْ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مُرِيبٍ

📘 আর আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম, অতঃপর ওতে মতভেদ করা হল।[১] যদি একটি উক্তি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে পূর্বেই স্থিরীকৃত হয়ে না থাকত, তাহলে ওদের মাঝে চূড়ান্ত মীমাংসা হয়েই যেত।[২] আর অবশ্যই তারা এ (কুরআন) সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে। [১] অর্থাৎ, কিছু লোক সেই কিতাব মেনে নিল, আর কিছু লোক তা মেনে নিল না। এই কথা বলে নবী (সাঃ)-কে সান্তনা দেওয়া হচ্ছে যে, পূর্ব নবীগণের সাথেও এই ব্যবহার হতে থেকেছে, কিছু সংখ্যক মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান আনত এবং অন্যরা মিথ্যাজ্ঞান করত। অতএব তোমাকে মিথ্যাজ্ঞান করা হলে ঘাবড়ে যাবে না। [২] এর অর্থ এই যে, যদি আল্লাহ তাআলা তাদের শাস্তির জন্য একটি সময় নির্ধারিত করে না রাখতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে অবিলম্বে ধ্বংস করে দিতেন।

وَإِنَّ كُلًّا لَمَّا لَيُوَفِّيَنَّهُمْ رَبُّكَ أَعْمَالَهُمْ ۚ إِنَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

📘 আর নিশ্চিতরূপে তাদের প্রত্যেকের (সময় যখন এসে যাবে, তখন) অবশ্যই তোমার প্রতিপালক তাদেরকে তাদের কর্মফল পূর্ণরূপে প্রদান করবেন; নিশ্চয়ই তিনি তাদের কার্যকলাপের পূর্ণ খবর রাখেন।

فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَنْ تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا ۚ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

📘 অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, সেইভাবে সুদৃঢ় থাক এবং সেই লোকেরাও যারা (কুফরী হতে) তওবা করে তোমার সাথে রয়েছে; আর সীমালংঘন করো না।[১] নিশ্চয় তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করেন। [১] এই আয়াতে প্রথমত নবী (সাঃ) ও মু'মিনগণকে অটল থাকার কথা বলা হচ্ছে, যা শত্রুর মুকাবিলা করার জন্য একটি বড় অস্ত্র। দ্বিতীয়ত طغيان (সীমালঙ্ঘন) করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা মুমিনের চারিত্রিক শক্তি এবং উচ্চমানের মধ্যমপন্থী চরিত্র গঠনের জন্য একান্ত জরুরী। এমনকি উক্ত সীমালঙ্ঘন, শত্রুর সাথে ব্যবহার করার সময়েও বৈধ নয়।

وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ

📘 আর তোমরা যালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, অন্যথা তোমাদেরকে দোযখের আগুন স্পর্শ করবে,[১] আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কেউ সহায় হবে না, অতঃপর তোমাদেরকে কোন সাহায্যও করা হবে না। [১] এর অর্থ হল, যালেমদের সাথে নম্রতা, তোষামোদ (ও সাদৃশ্য অবলম্বন) করে তাদের সাহায্য অর্জন করো না। এতে তারা এ কথা ভাবার সুযোগ পাবে যে, তোমরা তাদের অন্য কথাকেও পছন্দ কর। এইভাবে এটা তোমাদের এক বড় অন্যায় হবে; যা তোমাদেরকে তাদের সাথে জাহান্নামের আগুনের হকদার বানাতে পারে। এতে যালেম শাসকদের সাথে সম্পর্ক রাখার অবৈধতা প্রমাণ হয়। তবে যদি এতে কোন সাধারণ কল্যাণ অথবা দ্বীনী স্বার্থ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে অন্তরে ঘৃণা রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা বৈধ হবে। যেমন কোন কোন হাদীসে এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়।

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ ۚ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ۚ ذَٰلِكَ ذِكْرَىٰ لِلذَّاكِرِينَ

📘 নামায কায়েম কর দিবসের দু’প্রান্তে ও রাত্রির কিছু অংশে;[১] নিঃসন্দেহে পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মুছে ফেলে; [২] এটা হচ্ছে উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ। [১] দু'প্রান্ত থেকে কেউ কেউ ফজর ও মাগরেবের নামায, কেউ কেউ শুধু এশা এবং কেউ কেউ মাগরেব ও এশা উভয় নামাযের সময় উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, সম্ভবতঃ এই আয়াতটি মি'রাজের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়েছে। কারণ তার পূর্বে শুধু দুই নামায ওয়াজিব ছিল, প্রথম সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে এবং দ্বিতীয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে। আর রাতের শেষাংশে তাহাজ্জুদের নামায ছিল। পরে তাহাজ্জুদ নামাযের অপরিহার্যতা উম্মতের জন্য মাফ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকের মতে তাহাজ্জুদ নামাযের অপরিহার্যতা নবী (সাঃ)-এর জন্যও মাফ করে দেওয়া হয়েছিল। (ইবনে কাসীর) আর আল্লাহই ভালো জানেন।[২] যেমন হাদীসসমূহে তা পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। "পাঁচ ওয়াক্তের নামায, এক জুমআহ থেকে অপর জুমআহ পর্যন্ত এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত, তার মধ্যবর্তী পাপসমূহকে মিটিয়ে দেয়; যদি কাবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকা হয় তবে।" (মুসলিম) অন্য আর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "বল দেখি, যদি তোমাদের কারো দরজার সামনে একটি নদী প্রবাহিত হয় এবং সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে তার শরীরে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকবে কি?" সাহাবায়ে-কিরামগণ বললেন, না। তিনি বললেন, "পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এটিই। এই নামাযগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ মুছে ফেলেন।" (বুখারী ও মুসলিম) সালমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর সাথে একটি গাছের নিচে ছিলাম। তিনি আমার সামনে গাছের একটি শুষ্ক ডাল ধরে হিলিয়ে দিলেন। এতে তার সমস্ত পাতা খসে পড়ল। অতঃপর বললেন, "হে সালমান! তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না কি যে, কেন আমি এরূপ করলাম?" আমি বললাম, 'কেন করলেন?' তিনি উত্তরে বললেন, "মুসলিম যখন সুন্দরভাবে ওযু করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, তখন তার পাপরাশি ঠিক ঐভাবেই ঝরে যায়, যেভাবে এই পাতাগুলো ঝরে গেল।" আর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন। (আহমাদ, নাসাঈ, তা বারানী, সহীহ তারগীব ৩৫৬নং) এক ব্যক্তি এক মহিলাকে চুম্বন দিয়ে ফেলে। পরে সে নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বিষয়টি জানায়। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন; "দিনের দুপ্রান্ত সকাল ও সন্ধ্যায় এবং রাতের প্রথম ভাগে নামায কায়েম কর। নিশ্চয়ই পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়।" (সূরা হূদ ১১:১১৪) লোকটি জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রসূল! একি শুধু আমার জন্য?' তিনি বললেন, "না, এ সুযোগ আমার সকল উম্মতের জন্য।" (বুখারী ও মুসলিম)

وَاصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

📘 আর ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের পুণ্যফলকে পন্ড করেন না।

فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِنْ قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّنْ أَنْجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ

📘 যেসব উম্মত তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে, আমি যাদেরকে রক্ষা করেছিলাম তাদের মধ্য হতে অল্প কতক ব্যতীত এমন সজ্জন ছিল না, যারা পৃথিবীতে অশান্তি ঘটাতে বাধা প্রদান করত।[১] যালেমরা যে আরাম-আয়েশে ছিল তার পিছনেই পড়ে রইল। আর তারা ছিল অপরাধী।[২] [১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী জাতির মধ্য থেকে এমন নেক লোক কেউ ছিল না, যারা নোংরা ও ফাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে নোংরা, অশ্লীলতা ও ফাসাদ সৃষ্টি করা হতে বিরত রাখত? তারপর বলেন, এরূপ মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছিল, তাদেরকে আমি সেই সময় আযাব থেকে রক্ষা করেছি। আর অবশিষ্ট লোকদেরকে আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। [২] অর্থাৎ এ যালেমরা, নিজেদের যুলমের উপর অটল ছিল এবং আপন মত্ততায় উন্মত্ত ছিল। পরিশেষে আযাবে তাদেরকে ঘিরে ফেলেছিল।

وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَىٰ بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ

📘 আর তোমার প্রতিপালক এমন নন যে, জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেন, অথচ ওর অধিবাসীরা সদাচারী থাকে।

وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ

📘 তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে তিনি সকল মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তারা সদা মতভেদ করতেই থাকবে।

إِلَّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ ۚ وَلِذَٰلِكَ خَلَقَهُمْ ۗ وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

📘 তবে যাদের প্রতি তোমার প্রতিপালক দয়া করেন তারা নয়, আর এ জন্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন[১] এবং ‘আমি জীন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই’ তোমার প্রতিপালকের এই বাণী পূর্ণ হবেই। [২] [১] ولذلك (এই জন্যই) শব্দে 'এই' বলতে কি বুঝানো হয়েছে? অনেকে 'মতভেদ' এবং অনেকে 'দয়া' বুঝিয়েছেন। উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য এই যে, আমি মানুষ জাতিকে পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছি। যে ব্যক্তি সত্য দ্বীনের বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। আর যে তা বরণ ও গ্রহণ করে নেবে, সে কৃতকার্য এবং আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে। [২] অর্থাৎ, আল্লাহর লিখিত তকদীরে ও ফায়সালাতে এ কথা নির্ধারিত হয়ে আছে যে, কিছু মানুষ জান্নাত ও কিছু মানুষ জাহান্নামের অধিকারী হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামকে মানুষ ও জীন দ্বারা পরিপূর্ণ করা হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "জান্নাত ও জাহান্নাম একদা আপোসে ঝগড়া আরম্ভ করল; জান্নাত বলল, কি ব্যাপার আমার মাঝে কেবল তারাই আসবে, যারা দুর্বল ও সমাজের নিম্নস্তরের লোক? জাহান্নাম বলল, আমার ভিতরে তো বড় বড় পরাক্রমশালী ও অহংকারী মানুষরা থাকবে।" আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বললেন, 'তুমি আমার রহমত, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, রহম করব।' আর জাহান্নামকে বললেন, 'তুমি আমার শাস্তি, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, শাস্তি দেব।' আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়কে পরিপূর্ণ করবেন। জান্নাতে সর্বদা তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া থাকবে। জান্নাত খালি থাকলে পরিশেষে আল্লাহ তাআলা এমন সৃষ্টি সৃজন করবেন যারা জান্নাতের অবশিষ্ট স্থানে বসবাস করবে। আর জাহান্নাম, জাহান্নামীদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও যখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, 'তুমি পরিপূর্ণ হয়েছ কি?' তখন সে 'আরো আছে কি?' বলে আওয়াজ দেবে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাতে নিজ পা রেখে দেবেন, যার ফলে জাহান্নাম 'বাস! বাস! তোমার মর্যাদার কসম!' বলে আওয়াজ দেবে।" (বুখারী)

فَلَعَلَّكَ تَارِكٌ بَعْضَ مَا يُوحَىٰ إِلَيْكَ وَضَائِقٌ بِهِ صَدْرُكَ أَنْ يَقُولُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ كَنْزٌ أَوْ جَاءَ مَعَهُ مَلَكٌ ۚ إِنَّمَا أَنْتَ نَذِيرٌ ۚ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

📘 তোমার নিকট যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়, সম্ভবতঃ তুমি হয়তো তার কিছু অংশ বর্জন করবে এবং ‘তার প্রতি কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয়নি কেন? অথবা তার সাথে কোন ফিরিশতা আসেনি কেন?’ তাদের এই কথায় তোমার মন সঙ্কুচিত হবে। (কিন্তু হে নবী!) তুমি তো শুধুমাত্র একজন সতর্ককারী।[১] আর আল্লাহই হচ্ছেন প্রত্যেক বস্তুর উপর দায়িত্বশীল। [১] মুশরিকরা নবী (সাঃ) সম্পর্কে বলত যে, তাঁর উপর কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করা হয় না কেন? কিংবা তাঁর নিকট কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয় না কেন। (সূরা ফুরক্বান ২৫:৭-৮) অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে "আমি জানি যে, তারা তোমার ব্যাপারে যে কথা বলে, তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়।" (সূরা হিজর ১৫:৯৭) এই আয়াতে ঐ সকল উক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, সম্ভবতঃ তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়, আর কিছু কথা যা তোমার নিকট অহী করা হয়, তা মুশরিকদের উপর কষ্টকর মনে হয়, হতে পারে যে, তুমি তা তাদেরকে শুনাতে পছন্দ করবে না। কিন্তু তোমার কাজ শুধু সতর্ক ও তবলীগ করা, তা তুমি সর্বাবস্থায় চালিয়ে যাও।

وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ ۚ وَجَاءَكَ فِي هَٰذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ

📘 রসূলদের ঐ সব বৃত্তান্ত আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি, এর দ্বারা আমি তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করি। এর মাঝে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং বিশ্বাসীদের জন্য উপদেশ ও স্মরণীয় বস্তু।

وَقُلْ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ اعْمَلُوا عَلَىٰ مَكَانَتِكُمْ إِنَّا عَامِلُونَ

📘 হে নবী! যারা বিশ্বাস করে না তাদেরকে বল, ‘তোমরা যেমন করছ করতে থাক এবং আমরাও আমাদের কাজ করছি।

وَانْتَظِرُوا إِنَّا مُنْتَظِرُونَ

📘 এবং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষা করছি।’ [১] [১] অর্থাৎ, অবিলম্বে তোমরা জানতে পারবে যে, শুভ পরিণামের অধিকারী কে এবং এও জানতে পারবে যে যালেমরা কৃতকার্য হতে পারবে না। সুতরাং আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অবিলম্বে পূর্ণ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে জয়যুক্ত করেছেন এবং পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের অধীনে এসে গেছে।

وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ ۚ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

📘 আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব কিছু প্রত্যাবর্তিত হবে, সুতরাং তুমি তাঁর উপাসনা কর এবং তাঁর উপর নির্ভর কর। আর তোমরা যা কর, সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক উদাসীন নন।

أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

📘 তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজে রচনা করেছে? বল, ‘তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ স্বরচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং (সাহায্যার্থে) আল্লাহ ছাড়া যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ [১] [১] ইমাম ইবনে কাসীর লিখেছেন যে, প্রথমে আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা তোমাদের এই দাবীতে সত্যবাদী হও যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সবরচিত, তাহলে তোমরা তার মত কুরআন রচনা করে দেখাও; তাতে তোমরা যার ইচ্ছা সাহায্য নিতে পার। কিন্তু তোমরা এরূপ কক্ষনো করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, (قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا) অর্থাৎ, বল, যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জীন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।" (সূরা বনী ইস্রাঈল ১৭:৮৮) তারপর আল্লাহ তাআলা এই চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, পূর্ণ কুরআন রচনা করে পেশ করতে না পারলে, দশটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে। পুনরায় তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, একটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন সূরা ইউনুসের ১০:৩৮ নং আয়াতে এবং সূরা বাক্বারার শুরুতে এ কথা বলেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর) এর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ চ্যালেঞ্জ এ হতে পারে যে, অনুরূপ একটি কথাই তৈরী করে পেশ কর। যেমন আল্লাহ বলেন, (فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِين) অর্থাৎ, তারা যদি সত্যবাদী হয়, তাহলে এর সদৃশ কোন কথা উপস্থিত করুক না। (সূরা ত্বুর ৫২:৩৪) কিন্তু অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়ক্রম অনুসারে পর্যায়ক্রম এই চ্যালেঞ্জের সমর্থন পাওয়া যায় না। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

فَإِلَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا أُنْزِلَ بِعِلْمِ اللَّهِ وَأَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَهَلْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ

📘 অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আল্লাহরই জ্ঞান দ্বারা। আর এও যে, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাহলে এখন তোমরা মুসলমান হবে কি? [১] [১] অর্থাৎ, এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম হওয়ার পরেও কি 'কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত কিতাব' এই কথা স্বীকার করার জন্য এবং মুসলমান হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হবে না?

مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ

📘 যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান করে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না।

أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

📘 এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে। [১] [১] উক্ত আয়াত দু'টি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে, তাতে যাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তারা হল রিয়াকারী (লোক দেখানো বা সুনাম নেওয়ার জন্য আমলকারী)। অনেকের নিকট তারা হল ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে দুনিয়াদারদের কথা বলা হয়েছে। কারণ অনেক দুনিয়াদার, যারা নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রাপ্য তাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, আখেরাতে তাদের জন্য শাস্তি ব্যতীত আর কিছুই থাকবে না। উক্ত বিষয়টি কুরআন মাজীদের সূরা বনী ইস্রাঈলের ১৭:১৮ নং আয়াত ও সূরা শূরার ৪২:২০ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।

أَفَمَنْ كَانَ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّهِ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِنْهُ وَمِنْ قَبْلِهِ كِتَابُ مُوسَىٰ إِمَامًا وَرَحْمَةً ۚ أُولَٰئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ ۚ وَمَنْ يَكْفُرْ بِهِ مِنَ الْأَحْزَابِ فَالنَّارُ مَوْعِدُهُ ۚ فَلَا تَكُ فِي مِرْيَةٍ مِنْهُ ۚ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ

📘 যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আগত স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ওর সঙ্গে তাঁর পক্ষ হতে এক সাক্ষীও বিদ্যমান, আর ওর পূর্বে (সাক্ষী) ছিল আদর্শ ও করুণা স্বরূপ মূসার গ্রন্থ; (সে কি তার মত যে অনুরূপ নয়)?[১] এমন লোকেরাই এ (কুরআন)-এর প্রতি বিশ্বাস রাখে।[২] আর সমস্ত দলের মধ্য হতে যে ব্যক্তি এই (কুরআন) অমান্য করবে, তার প্রতিশ্রুত স্থান হবে দোযখ।[৩] অতএব তুমি এ (কুরআন) সম্পর্কে সন্দেহে পড়ো না। নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এটা সত্য (গ্রন্থ); কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ্বাস করে না। [৪] [১] কাফের ও অস্বীকারকারীদের বিপরীত মু'মিন ও দ্বীনদারদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। "প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণ"এর অর্থ হল, সেই 'প্রকৃতি' যার উপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর তা হল এক আল্লাহকে স্বীকার ও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার প্রকৃতি। যেমন নবী (সাঃ) বলেছেন, সকল শিশু প্রকৃতির উপর জন্ম গ্রহণ করে, অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।" (বুখারী) يَتْلُوْهُ এর অর্থ হল, ওর পিছনে বা ওর সঙ্গে। অর্থাৎ, তার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষীও বিদ্যমান। সে সাক্ষী হল কুরআন অথবা মুহাম্মাদ (সাঃ), যিনি সেই সুস্থ মানব-প্রকৃতির দিকে আহবান করেন। আর এর পূর্বে মূসা (আঃ)-এর কিতাব তাওরাতও সাক্ষী; যা পথনির্দেশক ও রহমতের কারণও বটে। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কিতাবও কুরআনের উপর ঈমান আনার জন্য পথ দেখায়। উদ্দেশ্য এই যে, একজন সেই ব্যক্তি, যে অস্বীকারকারী ও কাফের এবং তার বিপরীত অন্য আর এক ব্যক্তি, যে আল্লাহর সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার এক সাক্ষী হল কুরআন বা নবী (সাঃ), অনুরূপ পূর্বে অবতীর্ণ কিতাব তাওরাতেও তার পথনির্দেশনার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং সে বিশ্বাসী। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে? অর্থাৎ, উভয়ে সমান হতে পারে না। কারণ একজন মু'মিন আর দ্বিতীয়জন কাফের। একজন সর্বপ্রকার দলীল দ্বারা সমৃদ্ধ। আর অন্যজন একেবারে দলীলশূন্য।[২] অর্থাৎ, যাদের মাঝে উক্ত গুণ পাওয়া যায়, তারা কুরআন কারীম ও নবী (সাঃ) এর প্রতি ঈমান রাখে।[৩] 'সমস্ত দল' থেকে উদ্দেশ্য হল, সারা পৃথিবীতে যে সকল ধর্ম বা মতবাদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, পারসীক, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজক, পৌত্তলিক ও অবিশ্বাসী ইত্যাদি থেকে যে কেউ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রতি ঈমান না আনবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম। উক্ত বিষয়টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জান আছে! এই উম্মতের যে ইয়াহুদী অথবা খ্রিষ্টান আমার নবুঅত সম্পর্কে শ্রবণ করবে অথচ আমার প্রতি ঈমান আনবে না, সে জাহান্নামে যাবে।" (মুসলিম) এ বিষয়টি এর পূর্বে সূরা বাক্বারার ২:৬২ নং ও সূরা নিসার ৪:১৫০-১৫২ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে।[৪] এ বিষয়টিকে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যেমন (وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তুমি যতই চাও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৩ আয়াত) (وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তাদের সম্বন্ধে ইবলীস তার ধারণা সত্য প্রমাণ করল, ফলে তাদের মধ্যে একটি মু'মিন দল ব্যতীত সবাই তার অনুসরণ করল। (সূরা সাবা' ৩৪:২০ আয়াত)

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا ۚ أُولَٰئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَىٰ رَبِّهِمْ وَيَقُولُ الْأَشْهَادُ هَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَىٰ رَبِّهِمْ ۚ أَلَا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ

📘 আর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে?[১] ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশতা)গণ বলবে, ‘এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।’[২] [১] অর্থাৎ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ইহজগৎ পরিচালনা বা পরজগতে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেননি, তাদের সম্পর্কে বলা যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই ক্ষমতা বা এখতিয়ার দিয়েছেন। [২] এর ব্যাখ্যা হাদীসে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মু'মিন ব্যক্তিকে তার পাপের কথা স্বীকার করাবেন, তিনি বলবেন, তুমি জান, তুমি অমুক অমুক পাপকাজ করেছ? সে ব্যক্তি তা স্বীকার করে বলবে, হ্যাঁ, আমি করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি সেই পাপসমূহকে পৃথিবীতেও প্রকাশ করিনি। যাও আজও তা ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু অন্য লোক বা কাফেরদের ব্যাপার এমন হবে যে তাদেরকে সাক্ষীদের সম্মুখে ডাকা হবে এবং সাক্ষী এই সাক্ষ্য দেবে যে, এরাই ঐ সমস্ত লোক, যারা নিজেদের প্রতিপালকের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল।" (বুখারীঃ তফসীর সূরা হূদ)

الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ

📘 যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে।[১] আর তারাই পরকাল সম্বন্ধেও অবিশ্বাসী। [১] অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখার জন্য তাতে বক্রতা ও দোষ বের করার চেষ্টা করত এবং লোকদেরকে সে ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ করত।

أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ ۚ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ

📘 এই (বলা হয়েছে) যে, আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করো না; আমি (নবী) তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।

أُولَٰئِكَ لَمْ يَكُونُوا مُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ۘ يُضَاعَفُ لَهُمُ الْعَذَابُ ۚ مَا كَانُوا يَسْتَطِيعُونَ السَّمْعَ وَمَا كَانُوا يُبْصِرُونَ

📘 তারা (সমগ্র) ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারত না, আর তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন সাহায্যকারীও ছিল না। ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে। ওরা শুনতে সক্ষম ছিল না এবং দেখতও না। [১] [১] অর্থাৎ, তাদের সত্যকে অস্বীকার ও অপছন্দ করার ব্যাপার এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা তা শুনতে ও দেখতে সক্ষম ছিল না। অথবা এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা তো তাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দিয়েছিলেন; কিন্তু তার দ্বারা তারা হক কথা না শ্রবণ করেছে আর না হক দর্শন করেছে। ঠিক যেন (فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلا أَبْصَارُهُمْ وَلا أَفْئِدَتُهُمْ مِنْ شَيْء) "তাদের কর্ণ, তাদের চক্ষু ও তাদের হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি।" (সূরা আহক্বাফ ৪৬:২৬) কারণ তারা হক শ্রবণে বধির ও হক দর্শনে অন্ধ হয়ে ছিল। যেমন তারা জাহান্নামে প্রবেশ করার সময় (আফসোস) করে বলবে, (لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِير) অর্থাৎ, যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।" (সূরা মুলক ৬৭:১০)

أُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ

📘 ওরা সেই লোক, যারা নিজেরা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আর যেসব (উপাস্য) তারা মিথ্যা কল্পনা করে রেখেছিল, তাদের থেকে তারা সবাই উধাও হয়ে গেছে।

لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْأَخْسَرُونَ

📘 এটা সুনিশ্চিত যে, পরকালে তারাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَخْبَتُوا إِلَىٰ رَبِّهِمْ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

📘 নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করেছে এবং সৎকার্যাবলী সম্পন্ন করেছে, আর নিজেদের প্রতিপালকের কাছে বিনত হয়েছে, তারাই হবে জান্নাতবাসী; তাতে তারা অনন্তকাল থাকবে।

۞ مَثَلُ الْفَرِيقَيْنِ كَالْأَعْمَىٰ وَالْأَصَمِّ وَالْبَصِيرِ وَالسَّمِيعِ ۚ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلًا ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

📘 উভয় দলের দৃষ্টান্ত এরূপ; যেমন এক ব্যক্তি অন্ধ ও বধির এবং আর এক ব্যক্তি দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন।[১] এই দু’ ব্যক্তি কি তুলনায় সমান হবে? (কখনও নয়।) তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? [১] পূর্বের আয়াতে মু'মিন ও কাফের এবং সৌভাগ্যবান ও দুর্ভাগ্যবান লোকদের কথা আলোচিত হয়েছে। এই আয়াতে উভয়ের উদাহরণ বর্ণনা করে উভয়ের আসল রূপ আরো ভালভাবে পরিষ্ফুটিত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, একজন দৃষ্টিহীন ও বধির। আর অন্যজন চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন। কাফের ইহকালে সত্যের সৌন্দর্য দর্শন করা থেকে বঞ্চিত এবং পরকালে পরিত্রাণের পথ লাভে বঞ্চিত। অনুরূপ কাফের সত্যের দলীল শোনা থেকে বঞ্চিত থাকে, ফলে এমন কথাবার্তা থেকে তারা বঞ্চিত থেকে যায়, যা তার জন্য কল্যাণকর। এর বিপরীত একজন মু'মিন বুঝার ক্ষমতা রাখে, সত্য দর্শন ও গ্রহণ করে এবং হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়। সুতরাং সে সত্য ও ভালোর অনুসরণ করে। দলীল-প্রমাণ শ্রবণ করে ও তার দ্বারা মনের সন্দেহ দূর করে এবং বাতিল থেকে দূরে থাকে। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে? অস্বীকৃতিসূচক জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ, উভয়ে সমান হতে পারে না। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন,(لا يَسْتَوِي أَصْحَابُ النَّارِ وَأَصْحَابُ الْجَنَّةِ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمُ الْفَائِزُون) অর্থাৎ, জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়, জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।" (সূরা হাশর ৫৯:২০) অন্য আর এক স্থানে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে "অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়। অন্ধকার ও আলো, রৌদ্র ও ছায়া সমান নয়, জীবিত ও মৃত সমান নয়।" (সূরা ফাত্বির ৩৫:১৯-২০)

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُبِينٌ

📘 আর নিশ্চয় আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছি, (নূহ বলল,) ‘অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্ককারী।

أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ ۖ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ

📘 তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো উপাসনা করো না,[১] আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।[২] [১] এটা সেই তাওহীদের দাওয়াত, যা প্রত্যেক নবী নিজ নিজ সম্প্রদায়কে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, (وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُون) অর্থাৎ, আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রসূল, তাঁর প্রতি এই অহী ব্যতীত প্রেরণ করিনি যে, আমি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মা'বুদ নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।" (সূরা আম্বিয়া ২১:২৫) [২] অর্থাৎ যদি আমার প্রতি ঈমান না আনো এবং এই তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণ না কর, তাহলে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।

فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا نَرَاكَ إِلَّا بَشَرًا مِثْلَنَا وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ وَمَا نَرَىٰ لَكُمْ عَلَيْنَا مِنْ فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَاذِبِينَ

📘 তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যেসব নেতৃস্থানীয় লোক অবিশ্বাসী ছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদেরই মত মানুষ দেখতে পাচ্ছি।[১] আর আমরা দেখছি যে, শুধু ঐ লোকেরাই না বুঝে[২] তোমার অনুসরণ করছে, যারা আমাদের মধ্যে নিতান্তই হীন।[৩] আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না; বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে মনে করছি।’ [১] এটা সেই সন্দেহ, যা এর পূর্বে কয়েক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে, তা হল কাফেরদের নিকট কোন মানুষের নবী ও রসূল হওয়াটা বড় আশ্চর্যের বিষয় ছিল। যেমন বর্তমানে বিদআতীদেরকেও আশ্চর্য লাগে এবং তারা রসূল (সাঃ)-এর মানুষ হওয়ার কথা অস্বীকার করে। [২] সর্বযুগে সত্যের ইতিহাসে এ কথা বিদ্যমান যে, শুরুতে দ্বীনের উপর ঈমান আনয়নকারী সর্বদা তারাই হয়ে থাকে, যাদেরকে সমাজে অসহায় ও হীন মনে করা হয় এবং সম্মানী ও সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরা তা থেকে বঞ্চিত থাকে। এমনকি এটা পয়গম্বরগণের অনুসারীদের পরিচয় বলে গণ্য হয়েছে। সুতরাং যখন রোমের বাদশাহ হিরাকল আবু সুফিয়ানকে নবী (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সময় এ কথাটিও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, "সমাজের সম্মানিত সবল লোকেরা তাঁর আনুগত্য করছে, না দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা?" তখন আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, "দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা।" এ কথা শুনে হিরাকল বলেছিলেন, "রসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে।" (বুখারী) কুরআন কারীমেও বর্ণনা করা হয়েছে যে, সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরাই সর্বপ্রথম পয়গম্বরদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করতে থেকেছে। (যুখরুফঃ ২৩) আর মু'মিনদের পার্থিব অবস্থা এই ছিল বলে কাফেররা তাঁদেরকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করত। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে সত্যের অনুসারীগণই সম্মানী ও মর্যাদাসম্পন্ন, তাতে তাঁরা ধন-সম্পদের দিক থেকে যতই দুর্বল হন। আর সত্য অস্বীকারকারীরাই হীন ও অসম্মানী; যদিও তারা পার্থিব বিষয়ে সমৃদ্ধিশালী হয়। [৩] হকপন্থী মু'মিনগণ যেহেতু আল্লাহ ও রসূলের বিধানের বিপরীত নিজের জ্ঞান ও রায় ব্যবহার করে না, সেহেতু বাতিলপন্থীরা ভাবে যে, এরা বুঝার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে না; বরং আল্লাহর রসূল তাদেরকে যে দিকে ঘুরায় সে দিকেই ঘুরে যায়, যে বস্তু থেকে বিরত থাকতে বলে, তা থেকে বিরত থাকে। অথচ এটাও মু'মিনদের একটি বড় গুণ; বরং ঈমানের অপরিহার্য চাহিদা। কিন্তু কাফের ও বাতিলপন্থীদের নিকট উক্ত গুণও একটি ত্রুটি।

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّي وَآتَانِي رَحْمَةً مِنْ عِنْدِهِ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَارِهُونَ

📘 সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, আমি যদি স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর (প্রতিষ্ঠিত) থাকি এবং তিনি আমাকে নিজ সন্নিধান হতে করুণা (নবুঅত) দান করে থাকেন,[১] অতঃপর ওটা তোমাদের চোখে না পড়ে,[২] তাহলে কি আমি ওটা তোমাদেরকে মেনে নিতে বাধ্য করব, অথচ তোমরা ওটা অপছন্দ কর?[৩] [১] بينة (প্রমাণ) দ্বারা ঈমান ও একীন আর رحمة (করুণা) দ্বারা নবুঅত বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তা নূহ (আঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। [২] অর্থাৎ, তোমরা তা দেখা থেকে অন্ধ হয়ে যাও। সুতরাং না তোমরা তার গুরুত্ব বুঝতে পার, আর না তা মানার জন্য প্রস্ত্তত হও। বরং তা মিথ্যাজ্ঞান করার জন্য ও তাঁর বিরোধিতা করার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠ তাহলে---। [৩] যখন ব্যাপার এই, তখন এই হিদায়াত ও রহমত তোমাদের ভাগে কিভাবে আসতে পারে?

وَيَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ ۚ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا ۚ إِنَّهُمْ مُلَاقُو رَبِّهِمْ وَلَٰكِنِّي أَرَاكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ

📘 আর হে আমার সম্প্রদায়! আমি এতে তোমাদের কাছে কোন ধন-সম্পদ চাচ্ছি না;[১] আমার বিনিময় তো শুধু আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। আর আমি তো বিশ্বাসীদেরকে তাড়িয়ে দিতে পারি না।[২] নিশ্চয় তারা নিজেদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে। পরন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। [৩] [১] যাতে তোমাদের মনে এই সন্দেহ না এসে যায় যে, এই নবুঅতের দাওয়াত দ্বারা আমার উদ্দেশ্য পার্থিব ধন-সম্পদ অর্জন করা। আমি এই কর্ম একমাত্র আল্লাহর আদেশে এবং তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করছি, তিনিই আমাকে এর প্রতিদান দেবেন।[২] এতে বুঝা যাচ্ছে যে, নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের নেতারাও, সমাজে দুর্বল ভাবা হতো এমন মু'মিনদেরকে নূহ (আঃ)-এর মজলিস বা তাঁর নিকট থেকে দূরে রাখার দাবী করেছিল। যেমন মক্কার নেতারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট অনুরূপ দাবী করেছিল, যার ফলে আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমের এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছিলেন, (وَلا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ) অর্থাৎ, আর যে সব লোক সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে আহবান করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে, তাদেরকে তুমি দূরে সরিয়ে দিয়ো না। (সূরা আনআম ৬:৫২) (وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلاَ تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ) অর্থাৎ, তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহবান করে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে, তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না। (সূরা কাহ্ফ ১৮:২৮) [৩] অর্থাৎ, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যকারীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তাদেরকে নবীর নিকট থেকে দূর করার দাবী করাটা তোমাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। তারা তো মাথার উপর বসিয়ে রাখার উপযুক্ত, দূরে ছুঁড়ে ফেলার মত নয়।

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَتَاعًا حَسَنًا إِلَىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ ۖ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ

📘 আরও এই যে, তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট (পাপের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, তিনি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদেরকে সুখ-সম্ভোগ দান করবেন[১] এবং প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে তার যথাযথ মর্যাদা দান করবেন।[২] আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের[৩] শাস্তির আশঙ্কা করি। [১] যে পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকে কুরআন 'ধোঁকার সরঞ্জাম' বলেছে, সেই পার্থিব সুখ-সরঞ্জামকেই এখানে 'উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম' বলে অভিহিত করেছে। এর মর্মার্থ হল এই যে, যে ব্যক্তি আখেরাত থেকে অমনোযোগী হয়ে পার্থিব সরঞ্জাম দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য তা 'ধোঁকার সরঞ্জাম' রূপে গণ্য হবে, কারণ এর পরে তাকে নিকৃষ্ট পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে। আর যে আখেরাতের জন্য প্রস্ত্ততি নেওয়ার সাথে সাথে তার দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য এই কিছু দিনের সরঞ্জাম 'উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম'। কারণ সে তা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করে। [২] (অথবা প্রত্যেক অধিক আমলকারীকে অধিক সওয়াব দান করবেন। অথবা যে পাপ করবে তাকে একটি পাপেরই শাস্তি দেবেন; কিন্তু যে পুণ্য করবে, তাকে ঐ একটির বিনিময়ে ১০টি পুণ্য দান করবেন। আর সে মর্যাদা ও পুণ্য হল, ইহকালে সম্মান এবং পরকালে জান্নাত। -সম্পাদক) [৩] মহাদিন বলতে কিয়ামতের দিন।

وَيَا قَوْمِ مَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ طَرَدْتُهُمْ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

📘 আর হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদেরকে তাড়িয়েই দিই, তবে আল্লাহর (শাস্তি) হতে কে আমাকে রক্ষা করবে? [১] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ কর না? [১] বুঝা যায় যে, এমন লোকদেরকে নিজের কাছ হতে দূর করে দেওয়া, আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির কারণ।

وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكٌ وَلَا أَقُولُ لِلَّذِينَ تَزْدَرِي أَعْيُنُكُمْ لَنْ يُؤْتِيَهُمُ اللَّهُ خَيْرًا ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا فِي أَنْفُسِهِمْ ۖ إِنِّي إِذًا لَمِنَ الظَّالِمِينَ

📘 আর আমি তোমাদেরকে বলছি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে। আমি অদৃশ্যের কথাও জানি না। আর আমি এটাও বলি না যে, আমি ফিরিশতা। আর যারা তোমাদের চোখে হীন, আমি তাদের সম্বন্ধে এটা বলি না যে, আল্লাহ কখনো তাদেরকে কোন মঙ্গল দান করবেন না; [১] তাদের অন্তরে যা কিছু আছে, তা আল্লাহ উত্তমরূপে জানেন। (এরূপ বললে) আমি অবশ্যই যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’[২] [১] বরং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঈমান রূপে বড় উত্তম বস্তু দান করে রেখেছেন এবং তারই ভিত্তিতে তারা আখেরাতে জান্নাতের মত নিয়ামত দ্বারা উপকৃত হবে এবং আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেও বড় মর্যাদাবান হতে পারবে। সুতরাং তাদেরকে তোমাদের হেয় প্রতিপন্ন করা তাদের জন্য কোন ক্ষতির কারণ নয়। অবশ্য তোমরাই আল্লাহ তাআলার নিকট পাপী হবে; কারণ তোমরা আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন কর অথচ আল্লাহর নিকট তারা বড় সম্মানিত। [২] কারণ, যে বস্তুর জ্ঞান আমার নিকট নেই, একমাত্র আল্লাহর নিকট রয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলা যুলুম।

قَالُوا يَا نُوحُ قَدْ جَادَلْتَنَا فَأَكْثَرْتَ جِدَالَنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ

📘 তারা বলল, ‘হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে বিতর্ক করেছ এবং সে বিতর্ক অনেক বেশি করে ফেলেছ।[১] সুতরাং যে সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছ, তা আমাদের সামনে আনয়ন কর; যদি তুমি সত্যবাদী হও।’[২] [১] কিন্তু এর পরেও আমরা ঈমান আনছি না। [২] এটা সেই আহাম্মকি ও বেওকুফী যা ভ্রষ্ট সম্প্রদায় পূর্ব থেকে করে আসছে, তারা আপন পয়গম্বরদের বলত যে, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদের উপর আযাব অবতীর্ণ করিয়ে আমাদেরকে ধ্বংস করে দাও! অথচ যদি তারা জ্ঞানী হত, তাহলে তারা বলত যে, যদি তুমি সত্যবাদী হও এবং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রসূল হও, তাহলে আমাদের জন্যও দু'আ কর, যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন; যাতে আমরা তা গ্রহণ করতে পারি।

قَالَ إِنَّمَا يَأْتِيكُمْ بِهِ اللَّهُ إِنْ شَاءَ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ

📘 সে বলল, ‘ওটা তো আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সামনে আনয়ন করবেন এবং তোমরা তাঁকে ব্যর্থ করতে পারবে না।[১] [১] অর্থাৎ, আযাব আসা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপর, এ নয় যে আমি যখন চাইব, তখনই তোমাদের উপর আযাব চলে আসবে। এর পরেও আল্লাহ তাআলা যখন আযাবের ফায়সালা করে নেবেন বা প্রেরণ করে দেবেন, তখন তাঁকে কেউ ব্যর্থ করতে পারবে না।

وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللَّهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ ۚ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

📘 আর আমি যদি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাই, তবুও আমার উপদেশ তোমাদের কোন উপকারে আসবে না; যদি আল্লাহই তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা রাখেন।[১] তিনিই তোমাদের প্রতিপালক। আর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।’ [২] [১] إِغْوَآءٌ এর অর্থ হল পথভ্রষ্ট করা। অর্থাৎ, তোমাদের কুফরী ও অস্বীকার করা এমন পর্যায়ে পৌছে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা এবং হিদায়াত পাওয়া অসম্ভব। উক্ত অবস্থাকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মোহর লাগিয়ে দেওয়া বলা হয়। যার পরে হিদায়াতের আর কোন আশা করা যায় না। উদ্দেশ্য এই যে, যদি তোমরাও সেই বিপদ সীমায় পৌঁছে গেছ, তাহলে যদিও আমি তোমাদের মঙ্গল কামনা করি; অর্থাৎ সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি, তবুও এই মঙ্গল কামনা ও চেষ্টা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, কারণ তোমরা ভ্রষ্টতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছ। [২] হিদায়াত ও ভ্রষ্টতাও তাঁরই হাতে আছে এবং তাঁরই নিকট সকলকে ফিরে যেতে হবে, যেখানে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমলের প্রতিদান দেবেন। ভাল লোকদেরকে তাদের ভাল আমলের প্রতিদান এবং মন্দ লোকদেরকে তাদের মন্দ আমলের প্রতিফল দেবেন।

أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَعَلَيَّ إِجْرَامِي وَأَنَا بَرِيءٌ مِمَّا تُجْرِمُونَ

📘 তবে কি তারা (অবিশ্বাসীরা) বলে, সে (মুহাম্মাদ) এটা (কুরআন) নিজেই রচনা করেছে? তুমি বলে দাও, ‘যদি আমি তা নিজে রচনা করে থাকি, তবে আমার এই অপরাধ আমার উপর বর্তাবে, আর (অমূলক দাবী করে) তোমরা যে অপরাধ করছ, তা হতে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত।’ [১] [১] কোন কোন তফসীরবিদের নিকটে উক্ত কথোপকথন নূহ ও তাঁর সম্প্রদায়ের মাঝে হয়েছিল। আবার অনেকের ধারণা যে, এটা পূর্বাপর থেকে বিচ্ছিন্ন বাক্য স্বরূপ নবী (সাঃ) এবং মক্কার মুশরিকদের মাঝে হওয়া কথোপকথন। উদ্দ্যেশ্য এই যে, যদি এই কুরআন আমার তৈরী করা হয়, আর আমি আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কিতাব বলাতে মিথ্যুক হই, তবে তা আমার অপরাধ, তার শাস্তি আমিই ভোগ করব। কিন্তু তোমরা যা করছ, আমি তা থেকে মুক্ত। তোমরা তা জান, তার সাজা আমার উপর নয়, তোমাদের উপরেই বর্তাবে, তার চিন্তা-ভাবনা কি তোমাদের কিছু আছে?

وَأُوحِيَ إِلَىٰ نُوحٍ أَنَّهُ لَنْ يُؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ آمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

📘 আর নূহের প্রতি অহী প্রেরিত হল, যারা বিশ্বাস করেছে, তারা ছাড়া তোমার সম্প্রদায় হতে আর কেউই বিশ্বাস করবে না, কাজেই যা তারা করছে, তার জন্য তুমি দুঃখ করো না। [১] [১] যখন নূহ (আঃ) এর সম্প্রদায় আযাব আসার জন্য বলেছিল, তখন এই কথা বলা হয়েছিল এবং নূহ (আঃ) আল্লাহর দরবারে দু'আ করেছিলেন যে, 'হে আমার প্রভু! পৃথিবীতে বসবাসকারী একজন কাফেরকেও জীবিত রেখো না।' আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এখন অতিরিক্ত আর কেউ ঈমান আনবে না, অতএব এ নিয়ে তুমি চিন্তা করো না।'

وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا ۚ إِنَّهُمْ مُغْرَقُونَ

📘 আর তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার অহী (প্রত্যাদেশ) অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর,[১] আর যালেমদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলো না। নিশ্চয়ই তাদেরকে ডুবানো হবে। [২] [১] 'আমার চোখের সামনে' এবং 'আমার তত্ত্বাবধানে' এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার সিফাত 'চক্ষু'র প্রমাণ রয়েছে; (কোন উদাহরণ বা সদৃশ বর্ণনা না করে) যার প্রতি ঈমান রাখা অপরিহার্য। 'আমার অহী অনুযায়ী' এর অর্থ হল তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ইত্যাদিকে যেভাবে আমি বলব, ঠিক সেইভাবেই তৈরী কর। কোন কোন তফসীরবিদ উক্ত স্থানে কিশতীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, তার তলা এবং তাতে কি ধরনের কাঠ ও অন্যান্য আসবাবপত্র লাগানো হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে উক্ত বিষয়টি কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তার পূর্ণ বিবরণের সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটে আছে। [২] অনেকে 'যালেম' বলতে নূহ (আঃ)-এর পুত্র এবং তাঁর স্ত্রীকে বুঝেছেন, তারা মু'মিন ছিল না এবং তারা ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেকে এর দ্বারা ডুবে মরা পুরো জাতিকে বুঝেছেন। উদ্দেশ্য হল, তাদের জন্য অবকাশ বা অব্যাহতি চাইবে না। কারণ এখন তাদের ধ্বংসের সময় এসে গেছে। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, তাদের ধ্বংসের জন্য তাড়াতাড়ি করো না, নির্ধারিত সময়ে তারা ডুবে শেষ হয়ে যাবে। (ফাতহুল কাদীর)

وَيَصْنَعُ الْفُلْكَ وَكُلَّمَا مَرَّ عَلَيْهِ مَلَأٌ مِنْ قَوْمِهِ سَخِرُوا مِنْهُ ۚ قَالَ إِنْ تَسْخَرُوا مِنَّا فَإِنَّا نَسْخَرُ مِنْكُمْ كَمَا تَسْخَرُونَ

📘 সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল। আর যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানদিগের কোন দল তার নিকট দিয়ে গমন করল, তখনই তার সাথে উপহাস করতে লাগল।[১] সে বলল, ‘যদি তোমরা আমাদেরকে উপহাস কর, তাহলে আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা আমাদেরকে উপহাস করছ। [১] যেমন বলতে লাগল, 'ওহে নূহ! তুমি কি নবী হতে হতে ছুতোর হয়ে গেলে? অথবা হে নূহ! কিশতী কি ডাঙ্গায় চলবে নাকি?' ইত্যাদি।

فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ مَنْ يَأْتِيهِ عَذَابٌ يُخْزِيهِ وَيَحِلُّ عَلَيْهِ عَذَابٌ مُقِيمٌ

📘 সুতরাং সত্বরই তোমরা জানতে পারবে যে, সে কোন্ ব্যক্তি যার উপর এমন শাস্তি আসবে, যা তাকে লাঞ্ছিত করে দেবে এবং তার উপর চিরস্থায়ী শাস্তি আপতিত হবে।’ [১] [১] এর অর্থ হল, জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি, যা তাদের জন্য পার্থিব আযাবের পর প্রস্তুত আছে।

إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

📘 আল্লাহরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।

حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ قُلْنَا احْمِلْ فِيهَا مِنْ كُلٍّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَنْ سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ وَمَنْ آمَنَ ۚ وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ

📘 অবশেষে যখন আমার নির্দেশ এসে পৌঁছল এবং ভূ-পৃষ্ঠ (চুলা) হতে পানি উথলিয়ে উঠতে লাগল[১] তখন আমি বললাম, ‘প্রত্যেক যুগল (প্রাণীর) জোড়া জোড়া তাতে (নৌকাতে) উঠিয়ে নাও[২] এবং নিজ পরিবারবর্গকেও; তবে তাকে নয় যার সম্বন্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়ে আছে।[৩] আর যে বিশ্বাস করেছে তাকেও (উঠিয়ে নাও)।’[৪] বস্তুতঃ অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউই তার প্রতি বিশ্বাস করেনি। [৫] [১] تنور এর অর্থ অনেকে রুটি পাকানোর তন্দুর চুলো, অনেকে 'আইনুল অরদাহ' নামক বিশেষ স্থান এবং কেউ কেউ ভূ-পৃষ্ঠ করেছেন। হাফেয ইবনে কাসীর (রঃ) এই শেষের অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠের সকল স্থান হতেই ঝরনার মত পানি উঠেছিল, তুফান আনার অবশিষ্ট কমতি উপর থেকে আকাশের মুষলধারা বৃষ্টি পূরণ করেছিল। [২]( অর্থাৎ, নর ও মাদী। এরূপ সকল সৃষ্ট জীবের জোড়া জোড়া কিশতীতে রেখে নেওয়া হয়েছিল। আর অনেকে বলেন, যে গাছপালাও রাখা হয়েছিল। আর আল্লাহই ভালো জানেন। (যুগল জীবের এক এক জোড়া বলতে যেসব প্রাণী স্ত্রী-পুরুষের মিলনে বংশ বিস্তার করে এবং পানির মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে না কেবল তাদেরকেই জাহাজে উঠানো হয়েছিল। -সম্পাদক) [৩] অর্থাৎ, যাদের ডুবে মরা আল্লাহর তকদীরে নির্ধারিত আছে। উদ্দেশ্য সমস্ত কাফের, অথবা এই استثناء (বিয়োজন) 'পরিবারবর্গ' শব্দ থেকে করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিজ পরিবারবর্গকে কিশতীতে আরোহণ করিয়ে নাও, সে ব্যতীত যার সম্বন্ধে পূর্ব-সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ, একঃ পুত্র কিন্আন বা য়্যাম এবং দুইঃ নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী ওয়াইলা, এরা উভয়ে কাফের ছিল, তাদেরকে কিশ্তীতে আরোহণকারীদের জামাআত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। [৪] অর্থাৎ সমস্ত ঈমানদারগণকে কিশতীতে তুলে নাও। [৫] কেউ কেউ (কিশতীতে আরোহীদের) সর্বমোট (নারী ও পুরুষ মিলে) সংখ্যা ৮০ জন এবং কেউ কেউ তার থেকেও কম বলেছেন। যাদের মধ্যে নূহ (আঃ)-এর তিন পুত্র সাম, হাম, ইয়াফেস ও তাঁদের স্ত্রীগণও ছিলেন, কারণ তাঁরা মুসলমান ছিলেন। এদের মধ্যে য়্যামের স্ত্রীও ছিলেন। য়্যাম ছিল কাফের; কিন্তু তার স্ত্রী মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁকে কিশতীতে উঠানো হয়েছিল। (ইবনে কাসীর)

۞ وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَحِيمٌ

📘 সে বলল, ‘তোমরা এতে আরোহণ কর, এর গতি ও স্থিতি আল্লাহরই নামে;[১] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াবান।’ [১] উক্ত বাক্য দ্বারা ঈমানদারগণকে সান্তনা ও সাহস দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল যে, নির্ভয়ে ও নিঃশঙ্ক চিত্তে কিশ্তীতে আরোহণ কর, আল্লাহ তাআলাই এই কিশ্তীর সংরক্ষক, তা তারই আদেশে চলবে ও তারই আদেশে থামবে। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানে বলেন, (فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنْتَ وَمَنْ مَعَكَ عَلَى الْفُلْكِ فَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي نَجَّانَا مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ، وَقُلْ رَبِّ أَنْزِلْنِي مُنْزَلًا مُبَارَكًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ) অর্থাৎ, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা কিশ্তীতে আরোহণ করবে, তখন বল, আল্লাহর যাবতীয় প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে উদ্ধার করেছেন। আরও বল, পালনকর্তা! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও, যা হবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী।" (সূরা মু'মিনুন ২৩:২৮-২৯) কোন কোন উলামা কিশ্তী বা সওয়ারীতে আরোহণ করার সময় بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا পড়া মুস্তাহাব বলেছেন। কিন্তু (سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ) আয়াত পড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

وَهِيَ تَجْرِي بِهِمْ فِي مَوْجٍ كَالْجِبَالِ وَنَادَىٰ نُوحٌ ابْنَهُ وَكَانَ فِي مَعْزِلٍ يَا بُنَيَّ ارْكَبْ مَعَنَا وَلَا تَكُنْ مَعَ الْكَافِرِينَ

📘 আর সেই নৌকাটিই তাদেরকে নিয়ে পর্বততুল্য তরঙ্গের মধ্যে চলতে লাগল।[১] নূহ স্বীয় পুত্রকে ডাকতে লাগল -- এবং সে ছিল ভিন্ন স্থানে -- (বলল), ‘হে আমার পুত্র! আমাদের সাথে সওয়ার হয়ে যাও এবং অবিশ্বাসীদের সঙ্গী হয়ো না।’ [২] [১] অর্থাৎ, যখন ভূপৃষ্ঠের উপর পানি ছিল, এমনকি পাহাড়-পর্বতও পানিতে ডুবে ছিল, আর কিশ্তী নূহ (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীদেরকে নিজের বুকে নিয়ে আল্লাহর আদেশে এবং তাঁর হিফাযতে পর্বত-সদৃশ তরঙ্গের মত চলমান ছিল। তাছাড়া এমন তুফানী পানিতে কিশ্তীর মূল্যই বা কি? এই জন্য অন্যত্র আল্লাহ তাআলা তা অনুগ্রহ রূপে বর্ণনা করেছেন। (إِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَاءُ حَمَلْنَاكُمْ فِي الْجَارِيَةِ * لِنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذْكِرَةً وَتَعِيَهَا أُذُنٌ وَاعِيَة) অর্থাৎ, যখন পানি উথলে উঠেছিল, তখন আমি তোমাদেরকে আরোহণ করিয়েছিলাম নৌযানে। আমি এটা করেছিলাম তোমাদের শিক্ষার জন্য এবং যাতে স্মৃতিধর কর্ণ এটা স্মরণ রাখে। (সূরা হা-ক্কাহ ৬৯:১১-১২) (وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ * تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِمَنْ كَانَ كُفِرَ) অর্থাৎ, তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক নৌযানে। যা চলল আমার চোখের সামনে, এ ছিল অবিশ্বাসীদের প্রতিফল। (সূরা ক্বামার ৫৪:১৩-১৪) [২] এটা নূহ (আঃ) এর চতুর্থ পুত্র ছিল,যার উপাধি ছিল কিনআন এবং নাম ছিল য়্যাম। নূহ (আঃ) তাকে এই বলে দাওয়াত দিলেন যে, তুমি মুসলমান হয়ে যাও এবং কাফেরদের সাথে থেকে -- যারা ডুবে মরবে, তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।

قَالَ سَآوِي إِلَىٰ جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ ۚ قَالَ لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِلَّا مَنْ رَحِمَ ۚ وَحَالَ بَيْنَهُمَا الْمَوْجُ فَكَانَ مِنَ الْمُغْرَقِينَ

📘 সে বলল, ‘আমি এমন কোন পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে।’[১] সে বলল, ‘আজ আল্লাহর শাস্তি হতে কেউই রক্ষাকারী নেই। তবে তিনি যার প্রতি দয়া করবেন, সে (রক্ষা পাবে)।’ ইতিমধ্যে তাদের উভয়ের মাঝে একটি তরঙ্গ অন্তরাল হয়ে পড়ল। অতঃপর সে ডুবে যাওয়া লোকেদের অন্তর্ভুক্ত হল।[২] [১] তার ধারণা ছিল যে, কোন উঁচু পর্বতের চূড়ায় চড়ে আমি পরিত্রাণ পেয়ে যাব, সেখানে পানি কিভাবে পৌঁছবে? [২] পিতা-পুত্রের মাঝে এই সব কথোপকথন চলছিল, এমন সময় এক উত্তাল তরঙ্গ এসে তাকে ডুবিয়ে দিল।

وَقِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ ۖ وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

📘 আর বলা হল, ‘হে ভূমি! তুমি নিজ পানি শুষে নাও[১] এবং হে আকাশ! তুমি ক্ষান্ত হও।’ তখন পানি কমে গেল ও নির্ধারিত কার্য সম্পন্ন হল।[২] নৌকা জুদী (পাহাড়) [৩]-এর উপর এসে থামল। আর বলা হল, ‘অন্যায়কারীরা আল্লাহর করুণা হতে দূর হোক।’ [৪] [১] ابلعي 'গিলে ফেলা' শব্দটির ব্যবহার জীবের জন্য হয়ে থাকে। কারণ তারা নিজের মুখের খাবার গিলে ফেলে। এখানে পানি শুষে নেওয়াকে গিলে ফেলা বলাতে এই হিকমত পরিলক্ষিত হয় যে, পানি ধীরে ধীরে শুকায়নি; বরং আল্লাহর আদেশে যমীন সমস্ত পানি একসাথে সেই রূপ গিলে ফেলেছিল যেরূপ জন্তু খাবার গিলে ফেলে। [২] অর্থাৎ সমস্ত কাফেরকে পানিতে ডুবিয়ে মারা হল। [৩] 'জুদী' একটি পাহাড়ের নাম। যা অনেকের মতে (ইরাকের) 'মাওসেল' নামক শহরের নিকটে অবস্থিত। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ও সেই পাহাড়ের নিকট বসবাস করত। [৪] بعدٌ (দূর) শব্দটি ধ্বংস এবং আল্লাহর অভিশাপ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কুরআন কারীমে বিশেষভাবে আল্লাহর ক্রোধভাজন সম্প্রদায়সমূহের জন্য কয়েক স্থানে ঐ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

وَنَادَىٰ نُوحٌ رَبَّهُ فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنْتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ

📘 আর নূহ নিজ প্রতিপালককে ডেকে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার এই পুত্রটি আমারই পরিবারভুক্ত। আর তোমার প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তুমি সমস্ত বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক।’ [১] [১] নূহ (আঃ) পিতৃ-বাৎসল্যের আবেগে পড়ে আল্লাহর দরবারে উক্ত দু'আ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি ভেবে ছিলেন যে, সম্ভবতঃ সে মুসলমান হয়ে যাবে, যার জন্য তার সম্পর্কে উক্ত আবেদন করেছিলেন।

قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ ۖ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ ۖ فَلَا تَسْأَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۖ إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ

📘 তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে নূহ! এই ব্যক্তি তোমার পরিবারভুক্ত নয়,[১] সে অসৎকর্মপরায়ণ।[২] অতএব তুমি আমার কাছে সে বিষয়ে আবেদন করো না, যে বিষয়ে তোমার কোনই জ্ঞান নেই।[৩] আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি অজ্ঞ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’[৪] [১] নূহ (আঃ) বংশীয় সম্পর্ক অনুযায়ী তাকে আপন পুত্র বলেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঈমানের কারণে দ্বীনী সম্পর্কের দিক থেকে তাঁর সেই কথা নাকচ করে বলেছিলেন যে, সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ একজন নবীর প্রকৃত পরিবারভুক্ত তারা, যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, তাতে সে যেই হোক না কেন। আর যদি কোন ব্যক্তি তাঁর প্রতি ঈমান না আনে, যদিও সে নবীর পিতা, পুত্র বা স্ত্রীও হয়, তবুও সে নবীর পরিবারভুক্ত নয়। [২] এই কথা দ্বারা পরিবারভুক্ত না হওয়ার কারণ বর্ণনা করে দিয়েছেন। এতে জানা গেল যে, যার ঈমান ও নেক আমল নেই, তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে আল্লাহর নবীগণও বাঁচাতে পারবেন না। বর্তমানে মানুষ পীর-ফকীর ও বুযুর্গদের সাথে সম্পর্ককেই পরিত্রাণের জন্য যথেষ্ট মনে করে এবং (সহীহ আকীদাহ ও) নেক আমলের কোন প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করে না। অথচ (সহীহ আকীদাহ ও) নেক আমল ছাড়া নবীর সাথে বংশীয় আত্মীয়তাও কোন কাজে আসবে না। তাহলে অনবীদের সাথে এরূপ সম্পর্ক আর কি কাজে আসবে? [৩] এর দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী 'আ-লিমুল গায়ব' হন না। তাঁরা ততটুকু জানেন যতটুকু অহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে ইলম দান করেন। নূহ (আঃ) যদি পূর্ব থেকে জানতেন যে, তাঁর আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, তাহলে অবশ্যই তিনি তা থেকে বিরত থাকতেন। [৪] এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নূহ (আঃ)-কে কৃত নসীহত। যার উদ্দেশ্য হল, তাঁকে সেই উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করা, যা আমলকারী বিজ্ঞ লোকদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে।

قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ ۖ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ

📘 সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার নিকট এমন বিষয়ে আবেদন করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, আর তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না কর এবং আমার প্রতি দয়া না কর, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হয়ে যাব।’ [১] [১] যখন নূহ (আঃ) অবগত হলেন যে, তাঁর প্রার্থনা ঠিক হয়নি, তখন অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করে নিলেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর দয়া ও ক্ষমার প্রার্থী হলেন।

قِيلَ يَا نُوحُ اهْبِطْ بِسَلَامٍ مِنَّا وَبَرَكَاتٍ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ أُمَمٍ مِمَّنْ مَعَكَ ۚ وَأُمَمٌ سَنُمَتِّعُهُمْ ثُمَّ يَمَسُّهُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيمٌ

📘 বলা হল, ‘হে নূহ! অবতরণ কর[১] আমার পক্ষ হতে শান্তিসহ এবং তোমার ও তোমার সাথে যে জাতিসকল[২] রয়েছে তাদের প্রতি কল্যাণসমূহ নিয়ে। আর অনেক জাতি এরূপও হবে যাদেরকে আমি কিছুকাল (দুনিয়ার) সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান করব। তারপর তাদেরকে স্পর্শ করবে আমার পক্ষ হতে কঠিন শাস্তি।[৩] [১] এই অবতরণ কিশতী থেকে ছিল অথবা সেই পর্বত থেকে ছিল, যেখানে কিশতী গিয়ে থেমেছিল। [২] এর উদ্দেশ্য হয় সেই জাতি হবে, যারা নূহ (আঃ)-এর কিশতীতে সওয়ার ছিল, নতুবা ভবিষ্যতে আগমনকারী সেই জাতি উদ্দেশ্য, যারা পরবর্তীতে তাঁদের বংশ থেকে জন্ম নেবে। পরবর্তী বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্বিতীয় অর্থই অধিক সঠিক। [৩] এরা সেই (অবিশ্বাসী) জাতি, যারা কিশ্তীতে পরিত্রাণপ্রাপ্তদের বংশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আসতে থাকবে। উদ্দেশ্য হল যে, সেই কাফেরদেরকে পার্থিব জীবন যাত্রার জন্য আমি ভোগ-সম্ভার অবশ্যই দেব। কিন্তু শেষে তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।

تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ ۖ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هَٰذَا ۖ فَاصْبِرْ ۖ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ

📘 এটা হচ্ছে অদৃশ্য সংবাদসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা আমি তোমার কাছে অহী (প্রত্যাদেশ) মারফত পৌঁছিয়ে দিচ্ছি, ইতিপূর্বে এটা না তুমি জানতে, আর না তোমার সম্প্রদায় জানত।[১] সুতরাং তুমি ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম সংযমশীলদের জন্যই। [২] [১] এ কথা নবী (সাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে এবং তিনি যে ইল্মে গায়ব জানতেন না, তা স্পষ্ট করা হচ্ছে এই বলে যে, এ সব গায়বের খবর, যা আমি তোমাকে অবগত করিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া তুমি ও তোমার সম্প্রদায় এ থেকে বেখবর ছিলে।[২] অর্থাৎ, তোমার সম্প্রদায় তোমাকে যে মিথ্যাজ্ঞান করছে এবং তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তাতে ধৈর্য্য ধারণ কর। কারণ আমি তোমার সাহায্যকারী এবং কল্যাণকর পরিণাম তোমার ও তোমার অনুগামীদের জন্যই রয়েছে; যারা তাকওয়ার মত গুণে গুণান্বিত। عاقبة ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শুভ পরিণামকে বলা হয়। এখানে মুত্তাকী, পরহেযগার তথা সংযমশীলদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। তাদেরকে শুরুতে যতই কষ্ট ভোগ করতে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য ও শুভ পরিণামের অধিকারী তারাই হবে। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন, (إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ) অর্থাৎ, নিশ্চয় আমি আমার রসূলদেরকে ও মু'মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে। (সূরা মু'মিন ৪০:৫১) (وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ * إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنْصُورُونَ * وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ) অর্থাৎ, আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।" (সূরা স্বা-ফফাত ৩৭:১৭১-১৭৩)

أَلَا إِنَّهُمْ يَثْنُونَ صُدُورَهُمْ لِيَسْتَخْفُوا مِنْهُ ۚ أَلَا حِينَ يَسْتَغْشُونَ ثِيَابَهُمْ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ

📘 জেনে রাখ, তারা নিজ নিজ বুক কুঞ্চিত করে, যাতে তাঁর দৃষ্টি হতে লুকাতে পারে।[১] জেনে রাখ, তারা যখন নিজেদের কাপড় (দেহে) জড়ায়, তিনি তখনও সব জানেন যা কিছু তারা গোপন করে এবং যা কিছু প্রকাশ করে। তিনি তো মনের ভিতরের কথাও জানেন। [১] এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে তফসীরবিদগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, ফলে তার উদ্দেশ্য কি তাতেও মদভেদ আছে। এর পরেও সহীহ বুখারীতে (সূরা হূদের তফসীরে) বর্ণনাকৃত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ দ্বারা বুঝা যায় যে, উক্ত আয়াতটি সেই সকল মুসলিমদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা লজ্জার খাতিরে পেশাব-পায়খানার সময় এবং স্ত্রী-সহবাসের সময় উলঙ্গ হওয়াকে অপছন্দ করত; এই ভেবে যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দেখছেন। ফলে তারা এই সময় লজ্জাস্থান আবৃত করার নিমিত্তে নিজেদের বক্ষদেশকে ঘুরিয়ে দিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, রাত্রের অন্ধকারে যখন তারা বিছানাতে নিজেদেরকে কাপড় দ্বারা আচ্ছাদিত করে, তখনও তিনি তাদেরকে দেখেন এবং তাদের চুপে চুপে ও প্রকাশ্যে আলাপনকেও তিনি জানেন। উদ্দেশ্য হল যে, লজ্জা-শরম আপন জায়গায় ঠিক আছে, কিন্তু তাতে এত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। কারণ যে সত্তার কারণে তারা এরূপ করে, তাঁর নিকট তা গুপ্ত নয়। তবে এরূপ কষ্ট করায় লাভ কি?

وَإِلَىٰ عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا ۚ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا مُفْتَرُونَ

📘 আর আ’দ (জাতি)এর প্রতি তাদের ভাই[১] হূদকে (নবীরূপে) প্রেরণ করলাম; সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তোমরা শুধু মিথ্যা রচনাকারী। [২] [১] তাদের ভাই বলে তাদেরই সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। [২] অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করে তোমরা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করছ।

يَا قَوْمِ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

📘 হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক শুধু তাঁরই দায়িত্বে রয়েছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন; তবুও কি তোমরা বুঝ না? [১] [১] এটা কি বুঝ না যে, যে ব্যক্তি (তোমাদের নিকট থেকে) কোন পারিশ্রমিক ও লোভ ছাড়াই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিচ্ছে, সে আসলে তোমাদের মঙ্গলকামী? আয়াতে 'হে আমার সম্প্রদায়!' শব্দ দ্বারা দাওয়াতের একটি সুন্দর পদ্ধতি বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ, 'হে কাফেরদল!' বা 'হে মুশরিকদল!' শব্দ ব্যবহার না করে 'হে আমার সম্প্রদায়' বলে স্নেহের সাথে সম্বোধন করা হয়েছে।

وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَىٰ قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ

📘 হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (তোমাদের পাপের জন্য) তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি আরো বৃদ্ধি করবেন।[১] আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিও না।’ [২] [১] হূদ (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে তওবা ও ইস্তিগফার করার নির্দেশ দিলেন এবং সেই সমস্ত কল্যাণের কথাও বললেন, যা তওবা ইস্তিগফারকারী সম্প্রদায় লাভ করে থাকে। যেমন কুরআন কারীমের আরো অনেক স্থানে এ সব কল্যাণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (সূরা নূহের ৭১:১০-১২নং আয়াত দ্রষ্টব্য) [২] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে যে দাওয়াত দিচ্ছি, তা অস্বীকার করো না এবং নিজেদের কুফরীর উপর অটল থেকো না। এরূপ করলে আল্লাহর দরবারে অপরাধী ও পাপী হয়ে উপস্থিত হবে।

قَالُوا يَا هُودُ مَا جِئْتَنَا بِبَيِّنَةٍ وَمَا نَحْنُ بِتَارِكِي آلِهَتِنَا عَنْ قَوْلِكَ وَمَا نَحْنُ لَكَ بِمُؤْمِنِينَ

📘 তারা বলল, ‘হে হূদ! তুমি তো আমাদের সামনে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করনি। আর তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদেরকে বর্জন করব না এবং আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী নই।[১] [১] একজন নবী সর্বপ্রকার দলীল ও প্রমাণ পেশ করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চামচিকা-চোখোদের তা নজরে আসে না। হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ও ধৃষ্টতা প্রকাশ করে বলেছিল যে, আমরা প্রমাণ ব্যতীত শুধু তোমার কথামত আমাদের উপাস্যদেরকে কিভাবে বর্জন করব?

إِنْ نَقُولُ إِلَّا اعْتَرَاكَ بَعْضُ آلِهَتِنَا بِسُوءٍ ۗ قَالَ إِنِّي أُشْهِدُ اللَّهَ وَاشْهَدُوا أَنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ

📘 আমাদের কথা তো এই যে, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে হতে কেউ তোমাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করেছে।’[১] সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী থাক, তোমরা যে অংশী করছ নিশ্চিতভাবে আমি তা হতে মুক্ত। [২] [১] অর্থাৎ, তুমি যে আমাদের উপাস্যদের অপমান ও তাদের সাথে বেআদবী করছ এই কথা বলে যে, এরা কোন কিছু করতে সক্ষম নয়, মনে হচ্ছে আমাদের উপাস্যরাই তোমার এই বেআদবীর কারণে তোমার কিছু করে দিয়েছে এবং তাতে তোমার মন-মস্তিষ্ক খারাপ হয়ে গেছে। যেমন বর্তমানে নামধারী কিছু মুসলিমও এরূপ চিন্তা-ভাবনার শিকার হয়ে আছে। যখন তাদের বলা হয় যে, এই সকল মৃতব্যক্তি ও বুযুর্গদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তখন তারা বলে যে, এটা তাঁদের শানে বেআদবী এবং বড় আশঙ্কা আছে যে, তাঁরা এরূপ বেআদবদেরকে বিপদগ্রস্ত করবেন! আল্লাহর কাছে এমন গাঁজারে গল্প ও মনগড়া মিথ্যা কথা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। [২] অর্থাৎ, আমি সেই সমস্ত মূর্তি ও উপাস্য থেকে সম্পর্কহীন। আর তোমাদের যে বিশ্বাস যে, তারা আমার কিছু ক্ষতি করে দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাদের এ ক্ষমতাই নেই যে, তারা কারোর উপকার করে অথবা অপকার।

مِنْ دُونِهِ ۖ فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ

📘 সুতরাং তাঁকে (আল্লাহকে) ছেড়ে, তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাও। অতঃপর আমাকে সামান্য অবকাশও দিয়ো না। [১] [১] যদি আমার কথার উপর তোমাদের বিশ্বাস না হয়; বরং তোমরা নিজেদের এই দাবীতে সত্যবাদী হও যে, এই সকল মূর্তি কিছু করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে এই নাও! আমি উপস্থিত আছি, তোমরা এবং তোমাদের উপাস্য সহ সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে কিছু করে দেখাও। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, নবী সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী হন। যার ফলে তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস থাকে যে, নিঃসন্দেহে তিনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।

إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ ۚ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا ۚ إِنَّ رَبِّي عَلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ

📘 নিশ্চয় আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ভরসা করেছি। ভূপৃষ্ঠে যত বিচরণকারী জীব রয়েছে তাদের প্রত্যেকেরই চুলের ঝুঁটি তিনি ধারণ করে আছেন (সবাই তাঁর করায়ত্তে)।[১] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক সরল পথে আছেন। [২] [১] অর্থাৎ, যে সত্তার হাতে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আছে, তিনি সেই সত্তা যিনি আমার ও তোমাদের প্রতিপালক। আমার সর্বপ্রকার ভরসা তাঁরই উপর রয়েছে। এই বাক্য দ্বারা হূদ (আঃ)-এর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করে রেখেছ, তাদের উপরেও একমাত্র আল্লাহরই ক্ষমতা ও কর্তৃতত্ত্ব আছে। আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে যা ইচ্ছা আচরণ করতে পারবেন; তারা কারোর কিছুই করতে পারবে না। [২] অর্থাৎ, তিনি তওহীদের যে দাওয়াত দিচ্ছেন, নিঃসন্দেহে উক্ত দাওয়াতই হচ্ছে সরল সঠিক পথ। সেই পথ অবলম্বন করে তোমরা পরিত্রাণ ও কল্যাণ লাভ করতে পারবে। পক্ষান্তরে সেই সরল পথ বিচ্যুতি ও বিমুখতা ভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের কারণ হবে।

فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقَدْ أَبْلَغْتُكُمْ مَا أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَيْكُمْ ۚ وَيَسْتَخْلِفُ رَبِّي قَوْمًا غَيْرَكُمْ وَلَا تَضُرُّونَهُ شَيْئًا ۚ إِنَّ رَبِّي عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَفِيظٌ

📘 অতঃপর যদি তোমরা বিমুখ হয়ে যাও, তাহলে আমাকে যে পয়গাম দিয়ে তোমাদের প্রতি পাঠানো হয়েছে, আমি তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।[১] আর আমার প্রতিপালক অন্য কোন জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন এবং তোমরা তাঁর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না;[২] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক প্রত্যেক বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন।’ [৩] [১] অর্থাৎ, এর পরে আমার দায়িত্ব শেষ এবং তোমাদের উপর সমস্ত প্রমাণ পূর্ণ হয়ে গেছে। [২] অর্থাৎ, তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে তোমাদের জমি-সম্পদের মালিক অন্যদেরকে বানিয়ে দেবেন, তিনি এরূপ করার ক্ষমতা রাখেন এবং মোকাবেলায় তোমরা তাঁর কিছুই করতে পারবে না। বরং তিনি আপন ইচ্ছা ও হিকমত অনুযায়ী এরূপ করে থাকেন। [৩] অবশ্যই তিনি আমাকে তোমাদের প্রতারণা ও চক্রান্ত থেকে সুরক্ষিত রাখবেন এবং শয়তানী চাতুরী থেকে রক্ষা করবেন। তাছাড়া সকল ভাল ও মন্দ ব্যক্তিদেরকে তাদের ভাল ও মন্দ আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও প্রতিফল দান করবেন।

وَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا هُودًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِنَّا وَنَجَّيْنَاهُمْ مِنْ عَذَابٍ غَلِيظٍ

📘 আর যখন আমার (শাস্তির) হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি হূদকে এবং যারা তার সাথে বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে স্বীয় করুণায় রক্ষা করলাম। আর তাদেরকে বাঁচিয়ে নিলাম অতি কঠিন শাস্তি হতে। [১] [১] অতি কঠিন শাস্তি থেকে উদ্দেশ্য সেই 'কল্যাণশূন্য বায়ু' যার দ্বারা হূদ (আঃ)-এর সম্প্রদায় আ'দকে ধ্বংস করা হয়েছিল এবং যা থেকে হূদ (আঃ) ও তাঁর প্রতি ঈমান আনায়নকারীদের বাঁচিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

وَتِلْكَ عَادٌ ۖ جَحَدُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ وَعَصَوْا رُسُلَهُ وَاتَّبَعُوا أَمْرَ كُلِّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ

📘 আর এই আ’দ সম্প্রদায় নিজেদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলিকে অস্বীকার করল এবং তাঁর রসূলদেরকে অমান্য করল,[১] পক্ষান্তরে তারা প্রত্যেক প্রবল প্রতাপশালী হঠকারীর নির্দেশ অনুসরণ করল।[২] [১] আ'দ সম্প্রদায়ের নিকট একজনই নবী হূদ (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তারা তাঁর র সূলদের কে অমান্য করল। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় এই কথা প্রকাশ যে, একজন রসূলকে অমান্য ও অস্বীকার করার মানে, যেন সকল রসূলকে অমান্য ও অস্বীকার করা। কারণ সমস্ত রসূলদের প্রতি ঈমান রাখা অপরিহার্য। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, এ সম্প্রদায় তাদের কুফরী ও অস্বীকার করাতে এমন অতিরঞ্জন করে ফেলেছিল যে, হূদ (আঃ)-এর পরেও যদি আমি তাদের মাঝে কয়েকজন রসূল প্রেরণ করতাম, তাহলে তারা সেই সকল রসূলদেরকেও অস্বীকার ও মিথ্যাজ্ঞান করত এবং তাদের নিকটে কোন মতেই এই আশা ছিল না যে, তারা কোন একজন রসূলের প্রতি ঈমান আনত। অথবা এও হতে পারে যে, তাদের নিকট আরো রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা সকলকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল। [২] অর্থাৎ, তারা আল্লাহর পয়গম্বরদেরকে তো মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, কিন্তু যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করত ও অবাধ্য ছিল, সেই সম্প্রদায় তাদেরই আনুগত্য করল।

۞ وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ۚ كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

📘 আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই।[১] আর তিনি প্রত্যেকের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন;[২] সবই সুস্পষ্ট গ্রন্থে (লাওহে মাহ্ফুযে লিপিবদ্ধ) রয়েছে। [১] অর্থাৎ, তিনি রুযীর যিম্মাদার ও দায়িতত্ত্বশীল। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল সৃষ্টিজীব, মানুষ হোক বা জীন, পশু হোক বা পক্ষীকুল, ছোট হোক বা বড়, জলচর হোক বা স্থলচর; মোটকথা, তিনি সমুদয় প্রাণীকে তার প্রয়োজন মত রুযী দান করেন। [২] مستقر ومستودع (স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র)এর ব্যাখ্যার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। অনেকের নিকট مستقر হল চলা ফেরা করতে করতে যেখানে থেমে যায় সেই জায়গা এবং যেখানে অবস্থান করে তা হল مستودع । কেউ কেউ বলেন, মায়ের গর্ভাশয় হল مستقر আর পিতার পিঠ হল مستودع। আবার অনেকের নিকট মানুষ বা পশু জীবিত অবস্থায় যেখানে অবস্থান করে তা হল তার مستقر এবং মৃত্যুর পর যেখানে দাফন করা হবে তা হল তার مستودع। (তাফসীর ইবনে কাসীর) ইমাম শওকানী (রঃ) বলেন, مستقر হল মায়ের গর্ভাশয় এবং مستودع হল পৃথিবীর সেই অংশ যেখানে মানুষ দাফন হয়। ইমাম হাকেমের এক বর্ণনা অনুযায়ী এই অর্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সুতরাং অর্থ যাই হোক, আয়াতের অর্থ পরিষ্কার যে, আল্লাহ তাআলা সকলের (স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র) সম্পর্কে অবগত। তিনি সকলকে রুযী দানের ক্ষমতা রাখেন এবং তিনি রুযীর দায়িতত্ত্বশীল। আর তিনি আপন দায়িতত্ত্ব পূর্ণ করে থাকেন।

وَأُتْبِعُوا فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ أَلَا إِنَّ عَادًا كَفَرُوا رَبَّهُمْ ۗ أَلَا بُعْدًا لِعَادٍ قَوْمِ هُودٍ

📘 আর এই দুনিয়াতে অভিসম্পাত তাদের সঙ্গে সঙ্গে রইল এবং কিয়ামতের দিনও।[১] জেনে রেখো! আ’দ (সম্প্রদায়) নিজ প্রতিপালককে অমান্য করল। আরো জেনে রেখো, দূর হয়ে গেল আ’দ (আল্লাহর করুণা হতে); যারা হূদের সম্প্রদায় ছিল। [২] [১] لعنة (লানত, অভিসম্পাত) শব্দটির অর্থ হল আল্লাহর রহমত থেকে দূর হওয়া, মঙ্গলময় বস্তু থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং লোকের অসন্তুষ্টি ও নিন্দার শিকার হওয়া। দুনিয়াতে এই অভিসম্পাত এইভাবে হবে যে, মু'মিনদের মাঝে সর্বদা তাদের আলোচনা নিন্দা ও অসন্তুষ্টির সাথে হবে। আর কিয়ামতের দিন এইভাবে হবে যে, তারা সকলের সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে এবং আল্লাহর শাস্তিতে গ্রেফতার হবে। [২] بُعْدٌ শব্দটিও রহমত থেকে দূর এবং অভিসম্পাত ও ধ্বংসের অর্থে ব্যবহার হয়, এর পূর্বেও তা বর্ণনা করা হয়েছে।

۞ وَإِلَىٰ ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ۚ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ هُوَ أَنْشَأَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُجِيبٌ

📘 আর আমি সামূদ (জাতি)এর নিকট তাদের ভাই সালেহকে (নবীরূপে প্রেরণ করলাম)।[১] সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[২] তিনি তোমাদেরকে পৃথিবী (মাটি) হতে সৃষ্টি করেছেন[৩] এবং তোমাদেরকে তাতে আবাদ করেছেন।[৪] অতএব তোমরা (নিজেদের পাপের জন্য) তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর প্রত্যাবর্তন কর তাঁরই দিকে; নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক নিকটবর্তী, আহবানে সাড়াদানকারী।’ [১] وإلى ثمودَ পূর্ব বাক্যের উপর সংযোজন হয়েছে, অর্থাৎ, وأرسلنا إلى ثمود অর্থাৎ আমি সা'মূদ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছি। এ সম্প্রদায় তাবুক ও মদীনার মাঝে মাদায়েন সালেহ (হিজর) নামক স্থানে বসবাস করত এবং এ সম্প্রদায় আ'দ সম্প্রদায়ের পরে আবির্ভূত হয়েছিল। সালেহ (আঃ)-কে এখানেও সা'মূদের ভাই বলেছেন। এর উদ্দেশ্য হল তাদেরই বংশ ও গোত্রেরই এক ব্যক্তি। [২] সালেহ (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে সর্বপ্রথম তওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, যেমন সমস্ত নবীদের তরীকা তাই ছিল। [৩] অর্থাৎ, প্রথমে তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তা এরূপ যে তোমাদের পিতা আদম (আঃ) মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। অতঃপর সকল মানুষ আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং সমস্ত মানুষ আসলে মাটি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। অথবা অর্থ এই যে, তোমরা যা কিছু ভক্ষণ করছ, তা মাটি থেকেই উৎপন্ন হয় এবং সেই খাবার দ্বারা সেই বীর্য তৈরী হয় যা মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির উপাদান হয়। [৪] অর্থাৎ, তোমাদের মাঝে ভূমি আবাদ ও চাষ করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা সৃষ্টি করেছেন, যার দ্বারা তোমরা বসবাসের জন্য ঘর নির্মাণ কর, খাবারের জন্য চাষাবাদ কর এবং জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করার জন্য কারিগরী করে থাক।

قَالُوا يَا صَالِحُ قَدْ كُنْتَ فِينَا مَرْجُوًّا قَبْلَ هَٰذَا ۖ أَتَنْهَانَا أَنْ نَعْبُدَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا وَإِنَّنَا لَفِي شَكٍّ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ مُرِيبٍ

📘 তারা বলল, ‘হে সালেহ! তুমি তো ইতিপূর্বে আমাদের মধ্যে আশার পাত্র ছিলে, তুমি কি আমাদেরকে ঐ বস্তুর উপাসনা করতে নিষেধ করছ; যার উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষেরা করে এসেছে? আর যে ধর্মের দিকে তুমি আমাদেরকে আহবান করছ, বস্তুতঃ আমরা তো সে সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে রয়েছি।’[১] [১] অর্থাৎ, যেহেতু নবীগণ আপন সম্প্রদায়ে স্বভাব-চরিত্র, আমানত ও দ্বীনের ব্যাপারে সর্বোত্তম হন, সেহেতু তাঁর নিকট থেকে সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেক কল্যাণের আশাবাদী হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সালেহ (আঃ)-এর সম্প্রদায় তাঁকে এই কথা বলেছিল। কিন্তু তওহীদের দাওয়াত দেওয়া মাত্র তাদের উক্ত আশাস্থল, তাদের চোখের কাঁটা হয়ে গেল এবং সালেহ (আঃ) তাদেরকে যে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, সেই দ্বীনের (তওহীদের) প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করল।

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّي وَآتَانِي مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ عَصَيْتُهُ ۖ فَمَا تَزِيدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ

📘 সে (সালেহ) বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, যদি আমি নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমার প্রতি নিজের করুণা (নবুঅত) দান করে থাকেন;[১] অতএব আমি যদি আল্লাহর অবাধ্য হই,[২] তাহলে তার শাস্তি হতে কে আমাকে রক্ষা করবে? সুতরাং তোমরা তো আমার ক্ষতিই বৃদ্ধি করছ। [৩] [১] بينةٍ (প্রমাণ) এর অর্থ হল সেই ঈমান ও ইয়াকীন, যা আল্লাহ তাআলা পয়গম্বরগণকে দান করেন এবং রহমত (করুণা) এর অর্থ নবুঅত। যেমন এর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। [২] এখানে অবাধ্য হওয়ার অর্থ এই যে, যদি আমি তোমাদেরকে সত্যের দাওয়াত ও এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেওয়া ছেড়ে দিই, যেমন তোমরা চাচ্ছ। [৩] অর্থাৎ, যদি আমি এরূপ করি, তাহলে তোমরা আমার কোন উপকার করতে পারবে না, বরং তোমরা আমার আরো অমঙ্গল ও ক্ষতিই বৃদ্ধি করবে।

وَيَا قَوْمِ هَٰذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللَّهِ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ قَرِيبٌ

📘 আর হে আমার সম্প্রদায়! এটা হচ্ছে আল্লাহর উটনী, যা তোমাদের জন্য নিদর্শন। অতএব ওকে ছেড়ে দাও; আল্লাহর যমীনে চরে খাক, আর ওকে খারাপ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করো না, অন্যথা তোমাদেরকে আকস্মিক শাস্তি এসে পাকড়াও করবে।’ [১] [১] এটা সেই উটনী যা আল্লাহ তাআলা তাদের কথা অনুযায়ী তাদের চক্ষুর সামনে এক পর্বত বা একটি পাথর থেকে বের করেছিলেন। এই জন্যই তাকে ناقة الله (আল্লাহর উটনী) বলা হয়েছে। কারণ তা একমাত্র আল্লাহর আদেশে মু'জিযা স্বরূপ অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে উল্লিখিত পন্থায় আবির্ভূত হয়েছিল। তার ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে, তাকে যেন কেউ কোন কষ্ট না দেয়, নচেৎ তোমরা আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হবে।

فَعَقَرُوهَا فَقَالَ تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ ۖ ذَٰلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٍ

📘 কিন্তু তারা ওকে মেরে ফেলল। তখন সে বলল, ‘তোমরা নিজেদের ঘরে আরো তিনটি দিন জীবন উপভোগ করে নাও। এ একটি এমন প্রতিশ্রুতি যাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা নেই।’ [১] [১] কিন্তু সেই যালেমরা এমন উত্তম মু'জিযা দেখার পরেও শুধু ঈমান থেকে দূরেই থাকেনি; বরং প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর আদেশের সীমালঙ্ঘন করে (সেই উটনীর পা কেটে) তাকে মেরে ফেলল। তার পরে তাদেরকে তিন দিন সময় দেওয়া হল এই বলে যে, তিন দিন পর তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا صَالِحًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِنَّا وَمِنْ خِزْيِ يَوْمِئِذٍ ۗ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ

📘 অতঃপর যখন আমার (আযাবের) নির্দেশ এসে পৌঁছল,[১] তখন আমি সালেহকে এবং যারা তার সাথে বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে নিজ করুণায় রক্ষা করলাম, আর বাঁচালাম সেই দিনের বড় লাঞ্ছনা হতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [১] এর উদ্দেশ্য সেই আযাব, যা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চতুর্থ দিনে এসেছিল এবং সালেহ (আঃ) ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসীদের ছাড়া সকলকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

وَأَخَذَ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دِيَارِهِمْ جَاثِمِينَ

📘 আর সেই অত্যাচারীদেরকে এক প্রচন্ড গর্জন এসে পাকড়াও করল;[১] ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে (মৃত অবস্থায়) উপুড় হয়ে পড়ে রইল। [২] [১] এই আযাব صيحة (প্রচন্ড শব্দ, মেঘগর্জন) রূপে এসেছিল। অনেকের মতে এটা জিবরীল (আঃ) এর প্রচন্ড গর্জন ছিল এবং অনেকের নিকট তা আকাশ থেকে আসা কোন গর্জন ছিল। যে গর্জনে তাদের অন্তর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পরিশেষে তাদের মৃত্যু সংঘটিত হয়েছিল। তার পরে বা তার সাথে সাথেই ভূমিকম্প (رجفة) এসেছিল। যা সমস্ত বস্তুকে তছনছ করে দিয়েছিল; যেমন সূরা আ'রাফের ৭:৭৮ নং আয়াতে (فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَة) শব্দ এসেছে।[২] পাখি মরার পর যেরূপ মাটিতে পড়ে থাকে, অনুরূপ এরাও মৃত্যুবরণ করে মাটিতে উবুড় হয়ে পড়ে ছিল।

كَأَنْ لَمْ يَغْنَوْا فِيهَا ۗ أَلَا إِنَّ ثَمُودَ كَفَرُوا رَبَّهُمْ ۗ أَلَا بُعْدًا لِثَمُودَ

📘 যেন তারা সেই গৃহগুলিতে কখনো বসবাস করেনি।[১] ভালরূপে জেনে রাখ! সামূদ সম্প্রদায় নিজ প্রতিপালককে অস্বীকার করল; জেনে রাখ! সামূদ সম্প্রদায় (তাঁর) করুণা হতে দূর হয়ে পড়ল । [১] তাদের গ্রামকে অথবা তাদেরকে অথবা উভয়কে মুদ্রিত ভুল অক্ষরের মত এমনভাবে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক যেন তারা সেখানে কখনও বসবাস করেনি।

وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا سَلَامًا ۖ قَالَ سَلَامٌ ۖ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ

📘 আর আমার প্রেরিত ফিরিশতারা ইব্রাহীমের নিকট সুসংবাদ[১] নিয়ে আগমন করে বলল, ‘সালাম।’[২] ইব্রাহীমও (উত্তরে) বলল, ‘সালাম।’[৩] অতঃপর অনতিবিলম্বে একটা ভুনা বাছুর নিয়ে এল। [৪] [১] এটা আসলে লূত (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়ের ঘটনার এক অংশ । লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর চাচাতো ভাই ছিলেন। তাঁর গ্রাম মৃত সাগরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ছিল। আর ইবরাহীম (আঃ) ফিলিস্তীনে বসবাস করতেন। যখন লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেওয়ার ফায়সালা করে নেওয়া হল, তখন তাদের নিকট ফিরিশতা পাঠানো হল। উক্ত ফিরিশতাগণ লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের নিকট যাওয়ার পথে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট গিয়েছিলেন এবং তাঁকে পুত্র-সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। [২] অর্থাৎ, سلمنا عليك سلامًا (আমরা আপনাকে সালাম দিচ্ছি।) [৩] যেরূপ প্রথম সালাম এক ঊহ্য ক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ছিল, অনুরূপ এ سلامٌ 'মুবতাদা' অথবা 'খবর' হওয়ার কারণে পেশ অবস্থায় আছে। পূর্ণ বাক্য হবে, أمرُكٌمْ سَلاَمٌ يا عَلَيْكُمْ سَلامٌ [৪] ইবরাহীম (আঃ) বড় মেহমান-নেওয়ায ছিলেন। তিনি জানতে পারেননি যে, এঁরা ফিরিশতা মানুষের রূপধারণ করে এসেছেন এবং এঁদের পানাহারের কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং তিনি তাঁদেরকে (মানুষ) মেহমান মনে করেন এবং অবিলম্বে মেহমানদের খাতির করার জন্য বাছুরের ভুনা গোশত তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত করলেন। এতে বুঝা যায় যে, মেহমানকে জিজ্ঞাসা করা জরুরী নয়; বরং ঘরে যা কিছু আছে তাই মেহমানের সামনে পেশ করা উচিত।

وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۗ وَلَئِنْ قُلْتَ إِنَّكُمْ مَبْعُوثُونَ مِنْ بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ

📘 আর তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছ দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপরে ছিল;[১] যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করে নেন, তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম কে?[২] আর যদি তুমি বল, ‘নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে’, তাহলে যারা অবিশ্বাসী তারা অবশ্যই বলবে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট যাদু।’ [১] এ কথাই সহীহ হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এক হাদীসে পাওয়া যায় যে, "আল্লাহ তাআলা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে, সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্য লিখেছেন। আর সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল।" (বুখারী ও মুসলিম) [২] অথবা কে উত্তম কর্ম করে? অর্থাৎ এই আকাশ ও পৃথিবী শুধু শুধু বেকার ও বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেননি; বরং তার পশ্চাতে উদ্দেশ্য হল, মানুষ ও জীন জাতিকে পরীক্ষা করা যে, তাদের মধ্যে কে সৎকর্ম করছে? বিঃদ্রঃ - আল্লাহ তাআলা এখানে এই কথা বলেননি যে, কে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ আমল করে; বরং এই কথা বলেছেন যে, কে সবচেয়ে বেশি ভালো আমল করে। কারণ ভালো, উত্তম বা নেক আমল হল তা, যা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হবে এবং সুন্নত (নবী (সাঃ) এর তরীকা) অনুযায়ী হবে। যদি কোন আমলে এই দুই শর্তের মধ্যে কোন একটি শর্ত পাওয়া না যায়, তবে তা নেক আমল নয়, তাতে তা পরিমাণে যতই বেশি হোক। আল্লাহর নিকট সেই আমলের কোন মর্যাদা নেই।

فَلَمَّا رَأَىٰ أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۚ قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمِ لُوطٍ

📘 কিন্তু যখন সে দেখল যে, তাদের হাত সেই খাদ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে না, তখন তাদেরকে অদ্ভুত ভাবতে লাগল এবং মনে মনে তাদের ব্যাপারে শঙ্কিত হল;[১] (এ দেখে) তারা বলল, ‘তুমি ভয় করবে না, আমরা লূত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’ [২] [১] ইবরাহীম (আঃ) যখন দেখলেন যে, তাঁরা খাবার খাচ্ছেন না, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। বলা হয় যে, তাঁদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, কারো বাড়িতে আগত মেহমান যদি মেহমানি গ্রহণ না করে, তাহলে ভাবা হত যে, আগত মেহমান কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। এই ঘটনাতে এও বুঝা গেল যে, আল্লাহর পয়গম্বরগণ গায়বের খবর জানতেন না। ইবরাহীম (আঃ) যদি গায়বের খবর জানতেন, তাহলে তিনি বাছুরের ভুনা গোশত আনতেন না এবং তাঁদের ব্যাপারে ভীতি অনুভব করতেন না। [২] তাঁর এই ভীতি ফিরিশতাগণ অনুভব করতে পেরেছিলেন, অথবা সেই চিহ্ন দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন যা এমতাবস্থায় মানুষের মুখমন্ডলে প্রকাশ পায়, অথবা ইবরাহীম (আঃ)-এর কথাবার্তার মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়েছিল, যেমন অন্য স্থানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, {إِنَّا مِنكُمْ وَجِلُونَ} "আমরা তোমাদের আগমনে আতঙ্কিত।" (সূরা হিজর ১৫:৫২) সুতরাং ফিরিশতাগণ বললেন, আতঙ্কিত হবেন না, আপনি যা ভাবছেন আমরা তা নই। বরং আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছি এবং আমরা লূত সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছি।

وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِنْ وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ

📘 সে সময় তার স্ত্রী দন্ডায়মান ছিল, সে হেসে উঠল।[১] তখন আমি তাকে (ইব্রাহীমের স্ত্রীকে) সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পর ইয়াকূবের। [১] ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী কেন হেসেছিলেন? অনেকে বলেন, লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে তিনিও অবগত ছিলেন, তাই তাদের ধ্বংসের সংবাদ শুনে তিনি আনন্দ অনুভব করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, এই জন্য হেসেছিলেন যে, দেখো! আকাশে তাদের ধ্বংসের ফায়সালা হয়ে গেছে, আর এই সম্প্রদায় এখনো বেখবর হয়ে বসে আছে। অনেকে বলেন, বাক্যটি অগ্র-পশ্চাৎ হয়ে আছে এবং হাসির সম্পর্ক সেই সুসংবাদের সাথে আছে, যে সুসংবাদ ফিরিশতাগণ উভয় বৃদ্ধকে দিয়েছিলেন। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ

📘 সে বলল, ‘হায় ভাগ্য! আমি কি সন্তান প্রসব করব অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ! বাস্তবিকই এটা তো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার!’ [১] [১] উক্ত স্ত্রী সারাহ ছিলেন। তিনি নিজে বৃদ্ধা ও তাঁর স্বামী ইবরাহীম (আঃ)ও বৃদ্ধ ছিলেন। এই জন্য বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল, আর তারই বহিঃপ্রকাশ তাঁর দ্বারা হয়েছিল।

قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۖ رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ ۚ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

📘 তারা বলল, ‘তুমি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময়বোধ করছ?[১] (হে নবীর) পরিবার! তোমাদের প্রতি তো আল্লাহর (বিশেষ) করুণা ও তাঁর বরকতসমূহ রয়েছে।[২] নিশ্চয় তিনি প্রশংসার যোগ্য মহিমান্বিত।’ [১] এটা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন। অর্থাৎ তুমি আল্লাহ তাআলার ফায়সালা ও ভাগ্যের উপর বিস্ময়বোধ করছ? অথচ তাঁর জন্য কোন বস্তুই দুষ্কর নয়। আর না তিনি প্রয়োজনীয় উপকরণের মুখাপেক্ষী, তিনি যা চান, তা كن (হও) শব্দ দ্বারা তৈরী করতে পারেন।[২] ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রীকে এখানে ফিরিশতাগণ 'আহলে বায়ত' বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার জন্য বহুবচন (আপনাদের) শব্দ ব্যবহার করেছেন। যাতে প্রথমতঃ এই কথা প্রমাণ হয় যে, স্ত্রী সর্বপ্রথম আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়তঃ এ প্রমাণ হয় যে, 'আহলে বায়তের' জন্য বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করাও ঠিক। যেমন সূরা আহযাবের ৩৩:৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ)-এর পবিত্রা স্ত্রীগণকেও 'আহলে বায়ত' বলেছেন এবং তাঁদেরকেও বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ দ্বারা সম্বোধন করেছেন।

فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ

📘 অতঃপর যখন ইব্রাহীমের সেই ভয় দূর হয়ে গেল এবং সে সুসংবাদ প্রাপ্ত হল, তখন আমার (প্রেরিত ফিরিশতাদের) সাথে লূত-সম্প্রদায় সম্বন্ধে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করে দিল। [১] [১] এই তর্ক-বিতর্কের অর্থ হল, ইবরাহীম (আঃ) ফিরিশতাগণকে বললেন যে, আপনারা যে গ্রামকে ধ্বংস করতে যাচ্ছেন, সেখানে লূত বর্তমানে উপস্থিত আছে। এর উত্তরে ফিরিশতাগণ বললেন "আমরা জানি যে, সেখানে লূত বসবাস করেন। কিন্তু আমরা তাঁর স্ত্রী ছাড়া তাঁকে ও তাঁর বাড়ির লোকদেরকে বাঁচিয়ে নেব।" (আনকাবূত ৩২)

إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُنِيبٌ

📘 নিশ্চয় ইব্রাহীম ছিল বড় সহিষ্ণু প্রকৃতির, কোমল হৃদয়ের, আল্লাহ অভিমুখী।

يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَٰذَا ۖ إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَإِنَّهُمْ آتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُودٍ

📘 হে ইব্রাহীম! এ (তর্ক) হতে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর এমন এক শাস্তি আসছে যা কিছুতেই টলবার নয়। [১] [১] ফিরিশতাগণ ইবরাহীম (আঃ)-কে বললেন, এখন এই তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই, তর্ক-বিতর্ক বাদ দিন! তাদের ধ্বংসের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার সেই আদেশ এসে গেছে, যা তাঁর নিকট তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং উক্ত আযাব এখন না কারো তর্ক-বিতর্কে বন্ধ হবে, আর না কারোর দু'আতে স্থগিত হবে।

وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ

📘 আর যখন আমার ফিরিশতারা লূতের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তাদের ব্যাপারে চিন্তাবৃত হল এবং তাদের কারণে তার হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর বলল, ‘আজকের দিনটি অতি কঠিন।’ [১] [১] লূত (আঃ)-এর অস্থিরতার কারণ তফসীরবিদগণ এই লিখেছেন যে, উক্ত ফিরিশতাগণ দাঁড়িবিহীন তরুণের আকৃতিতে এসেছিলেন, ফলে লূত (আঃ) নিজ সম্প্রদায়ের নোংরা স্বভাবের কারণে এই পরিস্থিতিকে বড় সংকটজনক ভাবছিলেন। কারণ তিনি জানতেন না যে, আগত উক্ত তরুণগুলি, (মানুষ) মেহমান নয়; বরং আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতা, যাঁরা এই সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্যই এসেছেন।

وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ ۚ قَالَ يَا قَوْمِ هَٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي ۖ أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ

📘 আর তার সম্প্রদায় তার কাছে ছুটে এল এবং তারা পূর্ব হতে কুকর্ম করেই আসছিল;[১] লূত বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! (তোমাদের ঘরে) আমার এই কন্যারা রয়েছে, এরা তোমাদের জন্য পবিত্রতম।[২] অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার মেহমানদের ব্যাপারে লাঞ্ছিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভালো মানুষ নেই?’ [৩] [১] যখন সেই সমকাম লোভী লম্পটরা জানতে পারল যে, কিছু সুন্দর যুবক লূতের বাড়িতে মেহমান এসেছে, তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে এল এবং তাদেরকে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করতে লাগল, যাতে তাদের সাথে আপন বিকৃত যৌন-কামনা চরিতার্থ করতে পারে। [২] অর্থাৎ, যদি এখানে আসার পিছনে তোমাদের উদ্দেশ্য যৌন-প্রবৃত্তিই পূরণ করে শান্তি ও তৃপ্তি অর্জন করাই হয়, তাহলে তার জন্য আমার নিজের মেয়েরা উপস্থিত আছে, তাদেরকে তোমরা বিয়ে করে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করে নাও। এটাই তোমাদের জন্য সর্বদিক থেকে কল্যাণকর হবে। কোন কোন তফসীরকার বলেন, (লূত (আঃ) আমার) কন্যা বলে সমগ্র জাতির মহিলাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং তাদেরকে স্বীয় কন্যা এই জন্য বলেছেন যে, পয়গম্বরগণ নিজ উম্মতের জন্য পিতৃতুল্য। উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের উক্ত কাজের জন্য নারীজাত আছে, তাদেরকে বিবাহ কর ও নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ কর। (ইবনে কাসীর) [৩] অর্থাৎ, আমার বাড়িতে আগত মেহমানদের সাথে জোরপূর্বক দুর্ব্যবহার করে আমাকে অপমানিত করো না। তোমাদের মাঝে কি এমন কোন ন্যায়নিষ্ঠ ভাল মানুষ নেই, যে অতিথিপরায়ণতার চাহিদা ও এই স্পর্শকাতর অবস্থাকে বুঝতে পারে এবং তোমাদেরকে তোমাদের নোংরা সংকল্প থেকে বিরত রাখে? লূত (আঃ) এ সব কথা এই জন্য বলেছিলেন যে, তিনি সেই ফিরিশতাগণকে অভ্যাগত (মানুষ) মুসাফির ও মেহমান ভাবছিলেন। ফলে তিনি তাদের হিফাযত করাকে নিজ ইজ্জত ও সম্মান রক্ষার জন্য জরুরী ভাবছিলেন। যদি তিনি জানতে পারতেন, কিংবা তিনি 'আ-লিমুল গায়ব' হতেন, তাহলে ঐ অস্থিরতায় ভুগতেন না; যে অস্থিরতার কথা কুরআন মাজীদ এখানে বর্ণনা করেছে।

قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ

📘 তারা বলল, ‘তুমি নিশ্চয় জানো যে, তোমার এই কন্যাগুলিতে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, আর আমরা কি চাই, তাও তুমি অবশ্যই জানো।’ [১] [১] অর্থাৎ বৈধ ও স্বাভাবিক নিয়মকে তারা একদম অস্বীকার করে দিল এবং অস্বাভাবিক কর্ম এবং নির্লজ্জতার উপর অটল থাকল। যাতে আন্দাজ করা যায় যে, এই সম্প্রদায় তাদের সেই অশ্লীল কুকর্মে কত বাড়া বেড়েছিল এবং বিকৃত যৌনাচারে কতটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

وَلَئِنْ أَخَّرْنَا عَنْهُمُ الْعَذَابَ إِلَىٰ أُمَّةٍ مَعْدُودَةٍ لَيَقُولُنَّ مَا يَحْبِسُهُ ۗ أَلَا يَوْمَ يَأْتِيهِمْ لَيْسَ مَصْرُوفًا عَنْهُمْ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ

📘 আর যদি আমি নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য[১] তাদের শাস্তিকে বিলম্বিত করি, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, ‘সেই শাস্তিকে কিসে আটক রাখছে?’ স্মরণ রেখ, যেদিন ওটা তাদের উপর এসে পড়বে, তখন তা ফিরাবার কেউ থাকবে না, আর যা নিয়ে তারা উপহাস করছিল, তা এসে তাদেরকে ঘিরে নেবে। [২] [১] أُمَّةٌ (উম্মাহ বা উম্মত) শব্দটি কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়েছে। শব্দটি أم থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ হল উদ্দেশ্য। এখানে এর অর্থ হল সেই মেয়াদ ও সময়, যা সময় আযাব অবতীর্ণ করার জন্য উদ্দিষ্ট। (ফাতহুল কাদীর) সূরা ইউসুফের ১২:৪৫নং (وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ) আয়াতেও একই অর্থ পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরো যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তার মধ্যে একটি অর্থ হল, ইমাম বা নেতাঃ যেমন (إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً) অর্থাৎ, নিশ্চয় ইবরাহীম ছিল একজন ইমাম। (সূরা নাহল ১৬:১২০) মিল্লাত, দ্বীন বা মতাদর্শঃ যেমন (إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ) অর্থাৎ, আমরা তো আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের অনুসারী পেয়েছি। (সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩) জামাআত বা দলঃ যেমন (وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ) অর্থাৎ, যখন সে মাদয়্যানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছে। (সূরা ক্বাস্বাস ২৮:২৩) (وَمِن قَوْمِ مُوسَى أُمَّةٌ) অর্থাৎ, মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা (অন্যকে) ন্যায় পথ দেখায় ও ন্যায় বিচার করে। (সূরা আ'রাফ ৭:১৫৯) ইত্যাদি। আরো একটি অর্থ হল সেই বিশেষ সম্প্রদায় বা জাতি যাদের নিকট কোন রসূল প্রেরিত হয়েছিলেনঃ (وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَسُولٌ) অর্থাৎ, প্রত্যেক জাতির জন্য এক একজন রসূল ছিল। (সূরা ইউনুস ১০:৪৭) একে উম্মতে দাওয়াতও বলা হয়। অনুরূপ নবীদের প্রতি ঈমান আনয়নকারী জাতিকে উম্মত বা উম্মতে ইত্তিবা' বা উম্মতে ইজাবাহ বলা হয়। (ইবনে কাসীর) [২] এখানে তাড়াতাড়ি চাওয়াকে ঠাট্টা-উপহাস করা বলা হয়েছে। কারণ তাদের সেই তাড়াতাড়ি ঠাট্টা-উপহাস স্বরূপই হত। সুতরাং উদ্দেশ্য তাদেরকে এই কথা বুঝানো যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আযাবে দেরী হওয়াতে মানুষের উদাসীন হওয়া উচিত নয়। যেহেতু তাঁর আযাব যে কোন সময় আসতে পারে।

قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَىٰ رُكْنٍ شَدِيدٍ

📘 সে বলল, ‘হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।’[১] [১] শক্তি থেকে উদ্দেশ্য হল নিজ দৈহিক বল ও উপকরণ-শক্তি অথবা সন্তান-সন্ততিদের ক্ষমতা। 'দৃঢ় স্তম্ভ' থেকে উদ্দেশ্য হল বংশ, গোত্র বা অনুরূপ কোন সুদৃঢ় আশ্রয়। অর্থাৎ, নিরুপায় হয়ে তিনি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন যে, 'হায়! যদি আমার নিজের শক্তি থাকত বা কোন আত্মীয়-স্বজন ও আমার গোত্রের আশ্রয় ও সাহায্য-সহযোগিতা হত, তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। আমি ঐ দুর্বৃত্তদেরকে সামলে নিতাম এবং মেহমানদের হিফাযত করতে পারতাম।' লূত (আঃ)-এর উক্ত আশা আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী নয়। যেহেতু বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা বৈধ। আর 'আল্লাহর উপর ভরসা'র সহীহ অর্থও এই যে, প্রথমে সকল বাহ্যিক উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করতে হবে, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। হাত-পা বেঁধে বসে থাকা এবং মুখে 'আল্লাহর উপর ভরসা আছে' বলা একেবারে ভুল ব্যাখ্যা। সুতরাং বাহ্যিক উপকরণের দিকে লক্ষ্য রেখে লূত (আঃ) যা বলেছেন, বিলকুল ঠিকই বলেছেন। যাতে এই কথা প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর পয়গম্বরগণ যেমন 'আ-লিমুল গায়ব' হন না, অনুরূপ তাঁরা ইচ্ছাময়ও হন না (যেমন বর্তমানে মানুষ অনেকের ব্যাপারে এরূপ বিশ্বাস রাখে)। যদি দুনিয়াতে নবীদের কোন এখতিয়ার থাকত, তবে অবশ্যই লূত (আঃ) নিজ অক্ষমতা ও সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন না, যা তিনি উল্লিখিত শব্দে ব্যক্ত করেছেন।

قَالُوا يَا لُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصِلُوا إِلَيْكَ ۖ فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا امْرَأَتَكَ ۖ إِنَّهُ مُصِيبُهَا مَا أَصَابَهُمْ ۚ إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ ۚ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ

📘 তারা বলল, ‘হে লূত! আমরা তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত (ফিরিশতা), ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। অতএব তুমি রাত্রির কোন এক ভাগে নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে (অন্যত্র) চলে যাও। তোমাদের কেউ যেন পিছনের দিকে ফিরেও না দেখে, কিন্তু তোমার স্ত্রী নয়, তার উপরেও ঐ (আযাব) আসবে, যা অন্যান্যদের উপরে আসবে। তাদের (শাস্তির) নির্ধারিত সময় হল প্রভাতকাল; প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?’ [১] [১] ফিরিশতাগণ যখন লূত (আঃ)-এর অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা স্বচক্ষে দেখে নিলেন, তখন বললেন, 'হে লূত (আঃ) আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমাদের নিকট তো দূরের কথা, এখন ওরা আপনার নিকটেও পৌঁঁছতে পারবে না। আপনি কিছুটা রাত থাকতে আপনার স্ত্রী ছাড়া বাকি লোকজনসহ এখান থেকে অন্যত্র সরে যান! প্রত্যুষকালেই এই গ্রামকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।'

فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ مَنْضُودٍ

📘 অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি ঐ ভূ-খন্ডের উপরিভাগকে নীচে করে দিলাম এবং তার উপর ক্রমাগত ঝামা পাথর বর্ষণ করলাম।

مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ ۖ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدٍ

📘 যা বিশেষরূপে চিহ্নিত করা ছিল তোমার প্রতিপালকের নিকট; আর ঐ (জনপদ)গুলি এই যালেমদের নিকট হতে বেশী দূরে নয়। [১] [১] এই আয়াতে هي (ঐ) এর লক্ষ্যবস্তু কোন কোন মুফাসসির সেই চিহ্নিত ঝামা পাথর বলেছেন যা তাদের উপর বর্ষণ করা হয়েছিল। পক্ষান্তরে অনেকের নিকট তার লক্ষ্যবস্তু হল, সেই সমস্ত জনপদ যা ধ্বংস করা হয়েছিল; যা শাম ও মদীনার মাঝে অবস্থিত ছিল। আর 'যালেম' দ্বারা মক্কার মুশরিক ও অন্যান্য মিথ্যাজ্ঞানকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা যে, তোমাদের উপরেও সেরূপ আযাব আসতে পারে।

۞ وَإِلَىٰ مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا ۚ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ وَلَا تَنْقُصُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ ۚ إِنِّي أَرَاكُمْ بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُحِيطٍ

📘 আর আমি মাদয়্যানের (অধিবাসীদের)[১] প্রতি তাদের ভ্রাতা শুআইবকে প্রেরণ করলাম; সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া আর কেউ তোমাদের সত্যিকার উপাস্য নেই; আর তোমরা মাপে ও ওজনে কম করো না,[২] আমি তোমাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি।[৩] আর আমি তোমাদের উপর এক সর্বগ্রাসী দিনের শাস্তির ভয় করছি।[৪] [১] মাদয়্যান সম্বন্ধে জানার জন্য সূরা আ'রাফের ৭:৮৫নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।[২] (শুআইব (আঃ) নিজ সম্প্রদায়কে) তওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর, সেই সম্প্রদায়ের মাঝে যে ওজন ও পরিমাপে কম দেওয়ার মত প্রসিদ্ধ বদ অভ্যাস ছিল, তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করলেন। তাদের এই অভ্যাস ছিল যে, যখন তাদের নিকট কেউ কিছু বিক্রি করতে আসত, তখন তাদের নিকট থেকে ওজনে ও পারিমাপে বেশি নিত এবং যখন কোন ক্রেতার নিকট কিছু বিক্রি করত, তখন ওজনে কম দিত ও দাঁড়ি মারত।[৩] এটা উক্ত নিষেধাজ্ঞার কারণ যে, যখন আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর অনুগ্রহ করছেন এবং তিনি তোমাদের অবস্থা ভাল ও সচ্ছল করেছেন, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, তখন তারপরেও এরূপ জঘন্য কর্ম কেন করছ?[৪] এটা দ্বিতীয় কারণ যে, যদি তোমরা তোমাদের এই কর্ম থেকে বিরত না হও, তবে আমার ভয় হয় যে, কিয়ামতের দিনের আযাব থেকে তোমরা রক্ষা পাবে না। محيط (পরিবেষ্টনকারী বা সর্বগ্রাসী) দিন হল কিয়ামতের দিন, সেই দিন না কোন পাপী আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা পাবে, আর না পালিয়ে কোথাও লুকাতে পারবে।

وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ

📘 হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা মাপ ও ওজনকে পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন কর এবং লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না,[১] আর পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়ো না। [২] [১] নবীগণের দাওয়াত দুটি গুরুতত্ত্বপূর্ণ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথমঃ আল্লাহর হক আদায় করা এবং দ্বিতীয়ঃ বান্দার হক আদায় করা। 'তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর' বাক্য দ্বারা প্রথম এবং 'তোমরা মাপে ও ওজনে কম করো না' বাক্য দ্বারা দ্বিতীয় হকের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখন তারই তাকীদস্বরূপ তাদেরকে ইনসাফের সাথে পূর্ণমাত্রায় ওজন ও পরিমাপ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং লোকদেরকে কোন বস্তু কম দেওয়া থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। কারণ আল্লাহ তাআলার নিকট এটা একটা বড় অন্যায় এবং আল্লাহ তাআলা পূর্ণ একটি সূরাতে উক্ত অন্যায়ের জঘন্যতা ও আখেরাতে তার শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ، الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ، وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ অর্থাৎ, মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।" (সূরা মুত্বাফফিফীন ৮৩:১-৩) [২] আল্লাহর অবাধ্যতা করে, বিশেষ করে মানুষের অধিকার নষ্ট করে; যেমন ওজন ও পরিমাপে কম বেশি করাতে পৃথিবীতে অবশ্যই ফাসাদ সৃষ্টি করা হয়, যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল।

بَقِيَّتُ اللَّهِ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ۚ وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِحَفِيظٍ

📘 যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তাহলে আল্লাহ প্রদত্ত যা অবশিষ্ট থাকে,[১] তাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম। আর আমি তো তোমাদের পাহারাদার নই।’ [২] [১] بقيت الله (আল্লাহ প্রদত্ত অবশিষ্ট) এর অর্থ হল, সেই মুনাফা যা ওজনে কোন প্রকার কম-বেশি না করে সঠিক মাপে ধার্মিকতার সাথে পণ্য দেওয়ার পর অর্জন হয়ে থাকে। যেহেতু তা হালাল ও পবিত্র এবং তাতে বরকত আছে, যার জন্য সেই মুনাফাকে আল্লাহর অবশিষ্ট সম্পদ বলে গণ্য করা হয়েছে। [২] অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে শুধু তবলীগ করতে পারি এবং তাও আল্লাহর আদেশে করছি। কিন্তু তোমাদেরকে অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখা ও তার উপর শাস্তি দেওয়া আমার ইচ্ছাধীন নয়। উভয় কর্মের এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর আছে।

قَالُوا يَا شُعَيْبُ أَصَلَاتُكَ تَأْمُرُكَ أَنْ نَتْرُكَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا أَوْ أَنْ نَفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَاءُ ۖ إِنَّكَ لَأَنْتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ

📘 তারা বলল, ‘হে শুআইব! তোমার ধর্মনিষ্ঠা[১] কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্য বর্জন করি, যাদের উপাসনা আমাদের পিতৃপুরুষরা করে আসছে? অথবা আমাদের নিজেদের মালে নিজেদের ইচ্ছানুসারে আচরণ বর্জন করি।[২] তুমি তো বড় সহিষ্ণু, সদাচারী! [৩] [১] صلوةٌ শব্দের অর্থ হল, ইবাদত, ধর্মনিষ্ঠা অথবা তেলাঅত। [২] কোন কোন মুফাসসিরের নিকট এর অর্থ যাকাত ও সাদকা, সকল আসমানী কিতাবে তার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর আদেশকৃত যাকাত বের করা, আল্লাহর অবাধ্যদের উপর বড় কঠিন হয় এবং তারা ভাবে যে, যেখানে আমরা নিজ পরিশ্রম ও ক্ষমতাবলে সম্পদ উপার্জন করি, সেখানে তা খরচ করা বা না করাতে আমাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে কেন? এবং তার কিছু অংশ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বের করার জন্য আমাদেরকে কেন বাধ্য করা হবে? অনুরূপ ইনকাম ও ব্যবসা ইত্যাদিতে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধতার নিষেধাজ্ঞাও এ সকল লোকদের উপর বড় কষ্টকর হয়। সম্ভবত ওজনে ও পরিমাপে কম দেওয়া থেকে নিষেধ করাকেও তারা নিজ সম্পদের ব্যাপারে অনুচিত হস্তক্ষেপ ভেবেছে এবং এই শব্দে তা অস্বীকার করেছে। এর উভয় ভাবার্থই সঠিক। [৩] শুআইব (আঃ)-কে তারা বিদ্রূপ স্বরূপ উক্ত ব্যাক্য বলেছিল।

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَىٰ مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ۚ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

📘 সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আচ্ছা বল তো, যদি আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর নিকট হতে একটি উত্তম সম্পদ (নবুঅত) দান করে থাকেন[১] (তবুও কি আমি নিজ কর্তব্য থেকে বিরত থাকব)? আর আমি এটা চাই না যে, আমি তোমাদের বিপরীত সেই সব কাজ করি, যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি;[২] আমি তো আমার সাধ্যমত সংশোধন করারই ইচ্ছা পোষণ করি।[৩] আর আমার কৃতকার্যতা তো শুধু আল্লাহরই সাহায্যে;[৪] আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী। [১] 'উত্তম সম্পদ'এর দ্বিতীয় অর্থ নবুঅতও করা হয়েছে। (ইবনে কাসীর) [২] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে যে কর্ম থেকে বিরত থাকতে বলব, তার বিপরীত সে কর্ম আমি নিজে করব, তা হতে পারে না। [৩] আমি তোমাদেরকে যে কর্ম করার বা না করার আদেশ দিই, তাতে আমার উদ্দেশ্য, সাধ্যমত তোমাদের সংশোধন। [৪] অর্থাৎ, সত্য পর্যন্ত পৌঁছনোর আমার যে প্রবল ইচ্ছা, তা একমাত্র আল্লাহর তওফীক বা সাহায্যেই সম্ভব। এই জন্য প্রত্যেক কাজে আমি আল্লাহরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি।

وَيَا قَوْمِ لَا يَجْرِمَنَّكُمْ شِقَاقِي أَنْ يُصِيبَكُمْ مِثْلُ مَا أَصَابَ قَوْمَ نُوحٍ أَوْ قَوْمَ هُودٍ أَوْ قَوْمَ صَالِحٍ ۚ وَمَا قَوْمُ لُوطٍ مِنْكُمْ بِبَعِيدٍ

📘 আর হে আমার সম্প্রদায়! আমার প্রতি তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ যেন তোমাদেরকে এমন কাজে উদ্বুদ্ধ না করে, যাতে তোমাদের উপর সেইরূপ (আযাব) এসে পতিত হয়, যেরূপ নূহের সম্প্রদায় অথবা হূদের সম্প্রদায় অথবা সালেহর সম্প্রদায়ের উপর পতিত হয়েছিল। আর লূতের সম্প্রদায় তো তোমাদের হতে দূরে নয়। [১] [১] অর্থাৎ, তাদের অবস্থানক্ষেত্র তোমাদের থেকে দূরে নয়, অথবা সেই কারণ তোমাদের থেকে দূরে নয় যে কারণে তারা আযাবে পতিত হয়েছিল।

وَلَئِنْ أَذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَاهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَئُوسٌ كَفُورٌ

📘 আর যদি আমি মানুষকে স্বীয় অনুগ্রহ আস্বাদন করিয়ে তার নিকট হতে তা ছিনিয়ে নিই, তাহলে সে নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে।[১] [১] সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে যে খারাপ গুণ পাওয়া যায়, এই আয়াতে ও পরের আয়াতে তারই বর্ণনা রয়েছে। হতাশা ভবিষ্যতের সাথে সম্পৃক্ত আর অকৃতজ্ঞতা অতীত ও বর্তমানের সাথে সম্পৃক্ত।

وَاسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودٌ

📘 আর তোমরা তোমাদের পাপের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন কর; নিশ্চয় আমার প্রতিপালক পরম দয়ালু, অতি প্রেমময়।’

قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِمَّا تَقُولُ وَإِنَّا لَنَرَاكَ فِينَا ضَعِيفًا ۖ وَلَوْلَا رَهْطُكَ لَرَجَمْنَاكَ ۖ وَمَا أَنْتَ عَلَيْنَا بِعَزِيزٍ

📘 তারা বলল, ‘হে শুআইব! তুমি যা বল, তার অনেক কথা আমাদের বুঝে আসে না[১] এবং আমরা অবশ্যই নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি।[২] তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতাম।[৩] আর তুমি আমাদের উপর পরাক্রমশালীও নও।’ [৪] [১] এই কথা তারা হয় ঠাট্টা-বিদ্রূপ স্বরূপ বলেছিল। কারণ প্রকৃতপক্ষে তাঁর কথা যে তারা বুঝতো না -তা নয়। সুতরাং এই অবস্থাতে এখানে বুঝতে না পারার কথা রূপকার্থে হবে। অথবা তাদের উদ্দেশ্য গায়েব সম্পর্কিত কথা বুঝতে না পারার ওজর প্রকাশ করা। যেমন মরণের পর পুনর্জীবন, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি। এই হিসাবে বুঝতে না পারার কথা প্রকৃতার্থে ধরা হবে। [২] এ দুর্বলতা শারীরিক দুর্বলতা ছিল, যেমন অনেকের মতে শুআইব (আঃ) চোখে কম দেখতেন অথবা তিনি শারীরিক দিক থেকে শীর্ণকায় ও পাতলা ছিলেন অথবা এই জন্য তাঁকে দুর্বল বলেছে যে, তিনি নিজে একা বিরোধীদের সাথে মুকাবিলা করার ক্ষমতা রাখতেন না। [৩] বলা হয় যে, শুআইব (আঃ)-এর স্বগোত্র থেকে তাঁর কোন সমর্থক ছিল না, কিন্তু সে গোত্র যেহেতু কুফর ও শিরকের দিক থেকে তাঁর জাতির সাথে ছিল, ফলে একই ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সেই গোত্রের খেয়াল শুআ'ইব (আঃ)-এর সাথে কঠিন দুর্ব্যবহার করা এবং তাঁর ক্ষতি সাধন করাতে বাধা হয়ে ছিল। [৪] যেহেতু তোমার গোত্রের মর্যাদা আমাদের অন্তরে আছে, সেহেতু আমরা ক্ষমার চোখে দেখছি।

قَالَ يَا قَوْمِ أَرَهْطِي أَعَزُّ عَلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَاتَّخَذْتُمُوهُ وَرَاءَكُمْ ظِهْرِيًّا ۖ إِنَّ رَبِّي بِمَا تَعْمَلُونَ مُحِيطٌ

📘 সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার স্বজনবর্গ কি তোমাদের কাছে আল্লাহ অপেক্ষাও অধিক পরাক্রমশালী? তোমরা তাঁকে বিস্মৃত হয়ে পশ্চাতে ফেলে রেখেছ।[১] নিশ্চয়ই তোমাদের সমস্ত কার্যকলাপ আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্তে রয়েছে। [১] তোমরা আমাকে আমার স্বজনবর্গের কারণে ছেড়ে দিচ্ছ। কিন্তু যে মহান আল্লাহ আমাকে নবুঅতের মর্যাদা দান করেছেন, তাঁর কোন সম্মান ও মর্যাদার কোন খেয়াল তোমাদের অন্তরে নেই এবং তাঁকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখে দিয়েছ! এখানে শুআইব (আঃ) أعزُّ عليكم منِّي 'আমার থেকে বেশী মর্যাদাবান' এর স্থানে أعزُّ عليكم من الله 'আল্লাহর থেকে বেশী মর্যাদাবান বা পরাক্রমশালী' বলেছেন। এতে এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, নবীর অসম্মান করা, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই অসম্মান করা। কারণ নবীগণ আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হন। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে হকপন্থী উলামাদের অসম্মান করা ও তাঁদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করা আসলে আল্লাহর দ্বীনের অসম্মান ও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করার নামান্তর। কারণ তাঁরা আল্লাহর দ্বীনের ধারক ও বাহক। واتَّخذتموه তে 'ه' এর লক্ষ্যবস্তু আল্লাহ, অর্থ এই যে, আল্লাহর সেই জিনিস, যা দিয়ে তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, তাকে তোমরা পিছনে ফেলে রেখেছ, তোমরা তার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করনি।

وَيَا قَوْمِ اعْمَلُوا عَلَىٰ مَكَانَتِكُمْ إِنِّي عَامِلٌ ۖ سَوْفَ تَعْلَمُونَ مَنْ يَأْتِيهِ عَذَابٌ يُخْزِيهِ وَمَنْ هُوَ كَاذِبٌ ۖ وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ

📘 আর হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা নিজেদের অবস্থায় কাজ করতে থাক আমিও (আমার) কাজ করে যাচ্ছি; এখন সত্বরই তোমরা জানতে পারবে, কার উপর আসবে লাঞ্ছনাকর শাস্তি ও কে মিথ্যাবাদী; আর তোমরা প্রতীক্ষায় থাক, আমিও প্রতীক্ষায় রইলাম।’ [১] [১] তিনি যখন দেখলেন যে, এ সম্প্রদায় নিজ কুফরী ও শিরকের উপর অটল এবং তাদের উপর ওয়ায-নসীহতের কোন প্রভাব পড়ছে না, তখন বললেন, ঠিক আছে তোমরা নিজের পথে চলতে থাক। অতি সত্ত্বর সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী কে এবং লাঞ্ছনাকর শাস্তির উপযুক্ত কে তা অবশ্যই জানতে পারবে।

وَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجَّيْنَا شُعَيْبًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِنَّا وَأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دِيَارِهِمْ جَاثِمِينَ

📘 যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমি নিজ করুণায় রক্ষা করলাম শুআইবকে এবং তার সাথে যারা বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে। আর যারা সীমালংঘন করেছিল তাদেরকে পাকড়াও করল এক বিকট গর্জন,[১] ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে (মৃত অবস্থায়) উপুড় হয়ে পড়ে রইল। [১] সেই চিৎকার শুনে তাদের অন্তর ফেটে চুর চুর হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল। তার পরে পরেই ভূমিকম্পও আরম্ভ হয়েছিল। যেমন সূরা আ'রাফের ৭:৯১ নং আয়াত ও সূরা আনকাবূতের ২৯:৩৭ নং আয়াতে আলোচনা হয়েছে।

كَأَنْ لَمْ يَغْنَوْا فِيهَا ۗ أَلَا بُعْدًا لِمَدْيَنَ كَمَا بَعِدَتْ ثَمُودُ

📘 যেন তারা এই গৃহগুলিতে বাস করেইনি। জেনে রাখ, (আল্লাহর করুণা হতে) দূর হল মাদয়্যান, যেমন দূর হয়েছিল সামূদ (সম্প্রদায়)।[১] [১] অর্থাৎ, অভিশপ্ত হল, আল্লাহর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত হল।

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَىٰ بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ

📘 আমি মূসাকে প্রেরণ করলাম আমার নিদর্শনাবলী ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে। [১] [১] কোন কোন তফসীরবিদের মতে নিদর্শনাবলী থেকে উদ্দেশ্য হল তাওরাত এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল মু'জিযাসমূহ। আর অনেকে বলেন যে, 'নিদর্শনাবলী' হল নয়টি মু'জিযা এবং সুষ্পষ্ট প্রমাণ হল লাঠি। যদিও লাঠি উক্ত নয় নিদর্শনেরই অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু এ মু'জিযা যেহেতু খুবই গুরুতত্ত্বপূর্ণ ছিল, সেহেতু তাকে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

إِلَىٰ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ فَاتَّبَعُوا أَمْرَ فِرْعَوْنَ ۖ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ

📘 ফিরআউন ও তার প্রধানবর্গের নিকট,[১] তারা ফিরআউনের নির্দেশ মেনে চলতে লাগল অথচ ফিরআউনের নির্দেশ মোটেই সঠিক ছিল না। [২] [১] ملاء (পারিষদবর্গ, প্রধানবর্গ) জাতির সম্মানিত ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদেরকে বলা হয়। (এর ব্যাখ্যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে।) ফিরাউনের সাথে তার দরবারের সম্মানিত লোকদের নাম এই জন্য নেওয়া হয়েছে যে, জাতির উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাই সর্ববিষয়ে দায়িতত্ত্বশীল হয়ে থাকে এবং জাতির মানুষ তাদেরই অনুসরণ করে চলে। যদি তারা মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনত, তবে অবশ্যই ফিরাউনের সমস্ত জাতি ঈমান আনত। [২] رشيد শব্দের অর্থ হল, সঠিক, বিবেকসম্মত, যুক্তিসঙ্গত, জ্ঞানসম্পন্ন ইত্যাদি। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কথাই সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল, কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। আর ফিরআউনের কথা, যা সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল না, তারা তার অনুসরণ করল।

يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمُ النَّارَ ۖ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ

📘 কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে।[১] আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে।[২] [১] অর্থাৎ ফিরআউন, যেমন দুনিয়াতে তাদের পথপ্রদর্শনকারী ও অগ্রবর্তী ছিল, কিয়ামতের দিনও সে তাদের অগ্রবর্তীই থাকবে এবং নিজ জাতিকে নিজের নেতৃত্যে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। [২] وِرْدٌ পানির ঘাটকে বলা হয়, যেখানে পিপাসিতরা আপন পিপাসা নিবৃত্ত করে। কিন্তু এখানে জাহান্নামকে وِرْد বলা হয়েছে।مورود সেই স্থান বা ঘাট অর্থাৎ জাহান্নাম; যেখানে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ স্থানও নিকৃষ্ট এবং যারা যাবে তারাও নিকৃষ্ট। আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন।

وَأُتْبِعُوا فِي هَٰذِهِ لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ ۚ بِئْسَ الرِّفْدُ الْمَرْفُودُ

📘 আর অভিশাপ তাদের সাথে সাথে রইল এই দুনিয়াতে এবং কিয়ামত দিবসেও।[১] তা হল নিকৃষ্ট পুরস্কার যা তাদেরকে দেওয়া হবে। [২] [১] 'লানত' (অভিশাপ) আল্লাহর রহমত থেকে দূর ও বঞ্চিত হওয়া। সুতরাং দুনিয়াতেও তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত এবং যদি তারা ঈমান না আনে, তবে আখেরাতেও রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে। [২] رفدٌ কোন পুরস্কার বা দানকে বলা হয়। এখানে অভিশাপকে পুরস্কার বলা হয়েছে। তাই তাকে অতি নিকৃষ্ট পুরস্কার বলা হয়েছে।مرفود সেই পুরস্কার বা দানকে বলা হয়, যা কাউকে প্রদান করা হয়। এটি الرفد এর তা'কীদ স্বরূপ ব্যবহার হয়েছে।