🕋 تفسير سورة يوسف
(Yusuf) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ الر ۚ تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ
📘 আলিফ লা-ম রা। এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।
قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَأَلْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ
📘 তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘ইউসুফকে হত্যা করো না, বরং যদি তোমরা কিছু করতেই চাও, তাহলে তাকে কোন গভীর কূপে[১] নিক্ষেপ কর, যাত্রীদলের কেউ তাকে তুলে নিয়ে যাবে।’ [২]
[১] جبٌ কূপকে ও غِيابَةٌ কূপের গভীরতাকে বলা হয়। কূপ এমনিতেই গভীর হয় এবং তাতে নিক্ষিপ্ত বস্তুকে দেখতে পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও কূপের গভীরতার কথা উল্লেখ করে অতিশয়োক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, পথচারী মুসাফির, যখন পানির খোঁজে কূপের নিকট আসবে, তখন হয়তো কেউ জানতে পারবে যে, কূপে কোন মানুষ পড়ে আছে এবং সে তাকে তুলে নিজের সাথে নিয়ে যাবে। ইউসুফ (আঃ)-এর এক ভাই এই বুদ্ধি দয়াবশতঃ পেশ করলেন। হত্যার পরিবর্তে উক্ত বুদ্ধিতে সত্যই সহানুভূতির আর্দ্রতা ছিল। ভাইদের মনে হিংসার আগুন এমনভাবে জ্বলে উঠেছিল যে, উক্ত অভিমত তিনি ভয়ে ভয়ে পেশ করে বলেছিলেন যে, যদি তোমাদেরকে কিছু করতেই হয়, তবে এরূপ কর।
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا ۖ وَقَالَ يَا أَبَتِ هَٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُمْ مِنَ الْبَدْوِ مِنْ بَعْدِ أَنْ نَزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِمَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
📘 আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল[১] এবং তারা সবাই তার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।[২] সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা;[৩] আমার প্রতিপালক তা বাস্তবে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে[৪] এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও[৫] আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে[৬] আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] কতিপয় ব্যাখ্যাকরীদের মত যে, ইউসুফ (আঃ)-এর মাতা বলতে বিমাতা এবং আপন খালা ছিলেন। কেননা তাঁর আপন মাতা বিনয়্যামীনের জন্মের পর মারা গিয়েছিলেন। ইয়াকূব (আঃ) তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বোনকে বিবাহ করেছিলেন। উক্ত খালাই ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথে মিসর গিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর) কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী এর বিপরীত বলেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর নিজস্ব মাতা মারা যাননি, তিনিই ইয়াকূব (আঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন।
[২] কেউ কেউ এর তরজমা করেছেন যে, তারা সবাই আদব ও সম্মান করতঃ তার সামনে অবনত হল। কিন্তু ﴿وَخَرُّوْا لَهُ سُجَّدًا﴾ এর শব্দগুলো প্রমাণ করছে যে, তারা ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে মাটিতে সিজদাবনত হয়েছিলেন। অর্থাৎ সিজদার অর্থ এখানে সিজদাই। তবে এই সিজদা সম্মানের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আর সম্মানের (তা'যীমী) সিজদা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে জায়েয ছিল। ইসলামে শিরকের দরজা বন্ধ করার জন্য সম্মানসূচক সিজদাকেও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন সম্মানসূচক সিজদাও কারো জন্য বৈধ নয়। ("মুআয যখন শাম (দেশ) থেকে ফিরে এলেন তখন নবী (সাঃ)-কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বললেন, "একি মুআয?" মুআয বললেন, 'আমি শাম গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকেরা তাদের যাজক ও পাদ্রীগণকে সিজদা করছে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনার জন্য সিজদা করব।' তা শুনে তিনি বললেন "খবরদার! তা করো না। কারণ, আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করতে কাউকে আদেশ করতাম, তাহলে মহিলাকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।)
(ইবনে মাজাহ ১৮৫৩ নং, আহমাদ ৪/৩৮১, ইবনে হিব্বান ৪১৭১ নং, হাকেম ৪/১৭২, বায্যার ১৪৬১নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২০৩নং)
[৩] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ) যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এসব পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার এই তা'বীর (ব্যাখ্যা) সামনে এল যে, মহান আল্লাহ তাঁকে রাজ সিংহাসনে বসালেন এবং পিতা-মাতা সহ সকল ভায়েরা তাঁকে সিজদা করলেন।
[৪] আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের মধ্যে কূপ থেকে বের করার কথা উল্লেখ করলেন না, যেন তাতে তাঁর ভায়েরা লজ্জিত না হন, এ হল নববী চরিত্র।
[৫] এটাও উদার চরিত্রের একটি নমুনা যে, ভাইদেরকে একটুও দোষারোপ না করে শয়তানকে উক্ত কীর্তিকলাপের কারণ বানালেন।
[৬] মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কানআন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بَدْو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।
۞ رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنْتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
📘 হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ[১] এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ; [২] হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান কর এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর।’ [৩]
[১] অর্থাৎ মিসরের রাজত্ব দান করেছ; যেমন পূর্বে বিস্তারিত উল্লেখ হয়েছে।
[২] ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন, যাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী অবতীর্ণ হতো এবং বিশেষ বিশেষ কথার জ্ঞান তাঁকে প্রদান করা হতো। অতএব উক্ত নবুঅতী জ্ঞানের আলোকে পয়গম্বর স্বপ্নের ব্যাখ্যাও সঠিকভাবে করে নিতেন। তথাপি মনে হচ্ছে যে, স্বপ্ন ব্যাখ্যার বিষয়ে তাঁর বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল। যেমন কয়েদখানার সঙ্গীদের স্বপ্নের এবং সাতটি গাভীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
[৩] মহান আল্লাহ ইউসুফ (আঃ)-এর উপর যেসব অনুগ্রহ করেছিলেন সেগুলিকে তিনি স্মরণ করে এবং আল্লাহর অন্যান্য গুণাবলী উল্লেখ করে দু'আ করছেন যে, মুসলিম অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয় এবং আমাকে সজ্জনদের সাথে মিলিত কর। সজ্জনগণ অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর পূর্বপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাক আলাইহিমাস সালাম প্রভৃতি। কতক লোক এখান হতে সংশয়ে পতিত হয়েছে যে, ইউসুফ (আঃ) মৃত্যুর দু'আ করেছিলেন। অথচ এটা মৃত্যুর দু'আ নয়, বরং আমরণ ইসলামের উপর অটল থাকার দু'আ।
ذَٰلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ ۖ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ
📘 এটা অদৃশ্য লোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি অহী দ্বারা অবহিত করছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল, তখন তুমি তাদের নিকট ছিলে না। [১]
[১] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকালে, যখন তারা তাকে কূপে নিক্ষেপ করে এসেছিল। অথবা উদ্দেশ্য ইয়াকূব (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকালে, যাতে তারা তাকে এই বলেছিল যে, ইউসুফ (আঃ)-কে নেকড়ে বাঘে খেয়ে নিয়েছে এবং এই হল রক্তরঞ্জিত তার জামা। এই বলে তার সাথে ছলনা করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ এ স্থানেও এ বিষয়ের খন্ডন করেছেন যে, নবী কারীম (সাঃ) গায়বের এলেম (অদৃশ্যের জ্ঞান) রাখতেন। তবে এখানে খন্ডন সাধারণ জ্ঞানের নয়, কেননা মহান আল্লাহ তাঁকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। এ খন্ডন প্রত্যক্ষ দর্শনের, যেহেতু সেই সময়ে তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অনুরূপ এমন লোকদের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল না, যাদের কাছ থেকে তিনি তা শুনতে পারেন। এ তো শুধু আল্লাহই, যিনি তাঁকে এই অদৃশ্য ঘটনার সংবাদ দিয়েছেন, যা এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, তিনি আল্লাহর সত্য নবী এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর উপর অহী অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ আরো কয়েক স্থানে অনুরূপ অদৃশ্যের জ্ঞানের এবং প্রত্যক্ষ দর্শনের কথা খন্ডন করেছেন। (উদাহরণ স্বরূপ দেখুনঃ সূরা আলে ইমরান ৩:৭ ও ৩:৪৪ নং আয়াত, সূরা ক্বস্বাস্ব ২৮:৪৫-৪৬নং আয়াত এবং সূরা স্বা-দ ৩৮:৬৯-৭০ নং আয়াত)
وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ
📘 তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। [১]
[১] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ পূর্বের ঘটনাবলী সম্বন্ধে অবহিত করছেন, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহর পয়গম্বরদের পথ অনুসরণ করে চিরস্থায়ী মুক্তির অধিকারী হয়ে যায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনয়ন করে না। কেননা তারা বিগত সম্প্রদায়ের ঘটনা শোনে বটে; কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য নয়, শুধু মনোরঞ্জন ও আনন্দ উপভোগ করার জন্য। তাই তারা ঈমান থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।
وَمَا تَسْأَلُهُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ
📘 আর তুমি তো তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক দাবী করছ না,[১] এ (কুরআন) তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। [২]
[১] যাতে তাদের সংশয় সৃষ্টি হয় যে, নবুঅতের দাবি তো শুধু ধন সঞ্চয় করার বাহানা।
[২] যেন মানুষ এর দ্বারা হিদায়াত গ্রহণ করে এবং নিজ ইহ-পরকাল সাজিয়ে নেয়। এখন বিশ্ববাসী যদি এ থেকে বিমুখ হয় এবং হিদায়াত গ্রহণ না করে, তাহলে ত্রুটি তাদের এবং সেটা তাদের দুর্ভাগ্য। কুরআন তো বাস্তবে বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াত ও নসীহতই নিয়ে এসেছে। (পারস্য কবি বলেন,) 'চামচিকা যদি দিনের বেলায় না দেখে, তাহলে সূর্যের দোষ কি?'
وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ
📘 আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কত নিদর্শন রয়েছে যা তারা প্রত্যক্ষ করে; কিন্তু তারা এই সকলের প্রতি উদাসীন। [১]
[১] নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং উভয়ের মধ্যে অসংখ্য বস্তুর অস্তিত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা ও স্রষ্টা আছেন, যিনি উক্ত বস্তুসমূহকে অস্তিত দান করেছেন এবং একজন পরিচালক আছেন, যিনি এসব এমনভাবে পরিচালনা করছেন যে, আদিকাল থেকে এই নিয়ম-শৃঙ্খলা সুচারুরূপে চালু আছে; অথচ এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সংঘর্ষ নেই। কিন্তু মানুষ এসব কিছু দেখার পরও এমনিই উপেক্ষা ও অতিক্রম করে চলে যায়, না তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, আর না এ সবের মাধ্যমে নিজ প্রতিপালককে চেনে।
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ
📘 ০৬) তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে। [১]
[১] এটা সেই বাস্তবতা যার বর্ণনা কুরআন সুস্পষ্টাকারে বিভিন্ন স্থানে করেছে। আর তা এই যে, মুশরিকরা তো স্বীকার করত, আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, সবকিছুর মালিক, রুযীদাতা এবং পরিচালক শুধু মহান আল্লাহই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্যকেও শরীক করত। আর এইভাবেই অধিকাংশ মানুষই মুশরিক। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগে লোকেরা তাওহীদে রবূবিয়্যাত (প্রতিপালকত্বের তাওহীদ)-কে তো মেনে নেয়; কিন্তু তাওহীদে উলূহিয়্যাত (উপাসত্বের তাওহীদ)-কে মানতে প্রস্তুত হয় না। বর্তমান যুগের কবর পূজারীদের শিরকও ঠিক এই ধরণের যে, তারা কবরস্থ ব্যক্তিদেরকে উলূহিয়্যাতের গুণাবলীর অধিকারী মনে করে তাদেরকে সাহায্যের জন্য আহবানও করে এবং ইবাদতের বেশ কিছু অনুষ্ঠানও তাদের উদ্দেশ্যে পালন করে। আল্লাহ আমাদেরকে এত্থেকে বাঁচান। আমীন।
أَفَأَمِنُوا أَنْ تَأْتِيَهُمْ غَاشِيَةٌ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ أَوْ تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
📘 তবে কি তারা আল্লাহর সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে অথবা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ?
قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
📘 তুমি বল, ‘এটাই আমার পথ। আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারীবৃন্দও।[১] আল্লাহ পবিত্র। [২] আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’
[১] অর্থাৎ, এই তাওহীদের পথই আমার পথ; বরং তা সকল নবীর পথ। এ দিকেই আমি এবং আমার অনুবর্তীরা শরয়ী দলীল সহ পূর্ণ প্রত্যয়ের সাথে মানুষকে আহবান করে থাকি।
[২] অর্থাৎ, আমি ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ অংশীদার, সমকক্ষ, মন্ত্রী, পরামর্শদাতা, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী থেকে পবিত্র।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ ۗ أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ۗ وَلَدَارُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ لِلَّذِينَ اتَّقَوْا ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
📘 তোমার পূর্বে জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষদেরকেই আমি (রসূলরূপে) প্রেরণ করেছি; যাদের নিকট অহী পাঠাতাম।[১] তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল, তা দেখার জন্য তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি? যারা সংযমশীল তাদের জন্য পরলোকের গৃহই উত্তম; তোমরা কি বুঝ না?
[১] এই আয়াত এ কথার প্রমাণ যে, সকল নবী পুরুষ ছিলেন এবং মহিলাদের মধ্য হতে কেউ নবুঅত লাভ করেনি। অনুরূপ তাঁরা সকলেই সমাজবদ্ধ জনপদের অধিবাসী ছিলেন, যাতে ছোট শহর, বড় শহর এবং গ্রামাঞ্চলও শামিল। তাঁদের মধ্যে কেউই মরুবাসী (বেদুঈন) ছিলেন না। কেননা মরুবাসীরা নগরবাসীদের তুলনায় কঠোর মেজাজের এবং অসভ্য চরিত্রের হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে শহরবাসীরা তাদের তুলনায় কোমল, গম্ভীর, সভ্য ও ভদ্র হয়ে থাকে। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্য নবুঅতের জন্য আবশ্যক।
قَالُوا يَا أَبَانَا مَا لَكَ لَا تَأْمَنَّا عَلَىٰ يُوسُفَ وَإِنَّا لَهُ لَنَاصِحُونَ
📘 তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদেরকে অবিশ্বাস করছেন কেন, যদিও আমরা তার হিতাকাঙ্ক্ষী?[১]
[১] এতে বুঝা যায় যে, ইতিপূর্বে ভাইরা ইউসুফ (আঃ)-কে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং পিতা তাঁদের সাথে পাঠাতে অস্বীকার করেছিলেন।
حَتَّىٰ إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَنْ نَشَاءُ ۖ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ
📘 অবশেষে যখন রসূলগণ নিরাশ হল[১] এবং (লোকে) ভাবল যে, তাদেরকে মিথ্যা (প্রতিশ্রুতি) দেওয়া হয়েছে,[২] তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য এল।[৩] অতঃপর আমি যাকে ইচ্ছা করলাম, তাকে উদ্ধার করা হল।[৪] আর অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি রদ করা হয় না।
[১] এ নৈরাশ্য স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমান নিয়ে আসার ব্যাপারে ছিল।[২] ক্বিরাআত হিসেবে এই আয়াতের কয়েকটা অর্থ করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থ এই যে, ظَنُّوا এর কর্তা القوم অর্থাৎ কাফেরদেরকে করা হোক। অর্থাৎ কাফেররা প্রথমে তো শাস্তির ধমক পেয়ে ভয় করল; কিন্তু যখন বেশি দেরী হল তখন ধারণা করল যে, পয়গম্বরের দাবি অনুসারে আযাব তো আসছে না, আর না আসবে বলে মনে হচ্ছে, সেহেতু বলা যায় যে, নবীদের সাথেও মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য নবী করীম (সাঃ)-কে সান্তনা প্রদান করা যে, তোমার সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে দেরী হওয়ার কারণে ঘাবড়ানোর দরকার নেই, পূর্বের সম্প্রদায়সমূহের উপর আযাব আসতে অনেকানেক বিলম্ব হয়েছে এবং আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত অনুসারে তাদেরকে অনেক অবকাশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি রসূলগণ স্বীয় সম্প্রদায়ের ঈমানের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছেন এবং লোকেরা ধারণা করতে লেগেছে যে, তাদের সাথে আযাবের মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে।[৩] এতে বাস্তবে মহান আল্লাহর অবকাশ দানের সেই নীতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা তিনি অবাধ্যদেরকে দিয়ে থাকেন, এমনকি এ সম্পর্কে তিনি স্বীয় নবীদের ইচ্ছার বিপরীতও অধিকাধিক অবকাশ দেন, তাড়াহুড়া করেন না। ফলে অনেক সময়ে নবীদের অনুবর্তীরাও আযাব থেকে নিরাশ হয়ে বলতে শুরু করেন যে, তাদের সাথে এমনিই মিথ্যা ওয়াদা করা হয়েছে। স্মরণ থাকে যে, মনের মধ্যে শুধু এ ধরনের কুমন্ত্রণার উদ্রেক ঈমানের পরিপন্থী নয়।[৪] এ উদ্ধারের অধিকারী শুধু ঈমানদাররাই ছিল।
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَٰكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
📘 তাদের কাহিনীতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। এটা এমন বাণী; যা মিথ্যা রচনা নয়, বরং এটা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী, সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ এবং বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথ-নির্দেশ ও করুণা। [১]
[১] অর্থাৎ এই কুরআন যাতে ইউসুফ (আঃ) সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ঘটনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে, মনগড়া নয়। বরং তা পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং এতে রয়েছে দ্বীনের সমস্ত জরুরী মাসায়েলের বিবরণ। আর রয়েছে ঈমানদারদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।
أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
📘 আপনি আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন, সে ফল-মূল খাবে ও খেলাধূলা করবে,[১] আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
[১] খেলাধূলা ও ভ্রমণের প্রতি আকর্ষণ মানুষের (বিশেষ করে শিশুদের) প্রকৃতিগত স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। এই জন্য আল্লাহ তাআলা কোন যুগেই বৈধ খেলা ও ভ্রমণের ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা জারী করেননি। ইসলামেও শর্ত-সাপেক্ষে তার বৈধতা আছে। অর্থাৎ, এমন খেলাধূলা ও ভ্রমণ বৈধ, যাতে শরয়ী কোন আপত্তি না থাকে অথবা তা কোন হারাম পর্যন্ত পৌঁছে না দেয়। সুতরাং ইয়াকূব (আঃ)ও খেলাধূলার ব্যাপারে কোন আপত্তি করেননি। অবশ্য এই আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে, তোমরা খেলাধূলায় বিভোর হয়ে যাবে, আর তাকে হয়তো নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলবে। কারণ সেই এলাকার উন্মুক্ত ময়দানে ও মরুভূমিতে সাধারণতঃ নেকড়ে বাঘ থাকত।
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَنْ تَذْهَبُوا بِهِ وَأَخَافُ أَنْ يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنْتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ
📘 সে বলল, ‘তোমাদের ওকে নিয়ে যাওয়াটা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হবে। আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা ওর প্রতি অমনোযোগী হলে ওকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।’
قَالُوا لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَخَاسِرُونَ
📘 তারা বলল, ‘আমরা একটি (সংহত) দল হওয়া সত্ত্বেও যদি নেকড়ে বাঘ ওকে খেয়ে ফেলে, তাহলে তো আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’ [১]
[১] এই কথা দ্বারা পিতাকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, তা কি করে সম্ভব হতে পারে? আমাদের এতগুলো ভায়ের উপস্থিতিতে ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলবে?
فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَأَجْمَعُوا أَنْ يَجْعَلُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ ۚ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُمْ بِأَمْرِهِمْ هَٰذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
📘 অতঃপর যখন তারা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে গভীর কূপে নিক্ষেপ করতে একমত হল। এমতাবস্থায় আমি তাকে (ইউসুফকে) জানিয়ে দিলাম, ‘তুমি তাদেরকে তাদের এই কর্মের কথা অবশ্যই বলে দেবে; যখন তারা তোমাকে চিনবে না।’ [১]
[১] কুরআন মাজীদ অতি সংক্ষেপে উক্ত ঘটনা বর্ণনা করছে। ঘটনা এই যে, যখন তাঁরা তাঁদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র অনুযায়ী ইউসুফ (আঃ)-কে কূপে নিক্ষেপ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে সান্তনা ও সাহস দেওয়ার জন্য অহী করলেন যে, তুমি ঘাবড়ে যেয়ো না, আমি শুধু তোমার সুরক্ষাই করব না; বরং তোমাকে এমন মর্যাদার অধিকারী করব যে, তোমার সকল ভাইরা তোমার দরবারে ভিক্ষা চাওয়ার জন্য আসবে এবং তুমি তাদেরকে বলবে যে, তোমরা আপন ভায়ের সাথে এর পূর্বে পাষাণ-হৃদয়ের আচরণ করেছিলে, যা শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে যাবে। ইউসুফ (আঃ) যদিও সেই সময় শিশু ছিলেন, কিন্তু যে শিশু নবুঅত লাভ করে, শৈশবেও তার প্রতি অহী অবতীর্ণ হয়। যেমন ঈসা ও ইয়াহইয়া (আলাইহিমাস সালাম) প্রভৃতি নবীগণের প্রতি অহী অবতীর্ণ হয়েছিল।
وَجَاءُوا أَبَاهُمْ عِشَاءً يَبْكُونَ
📘 তারা রাতে কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার নিকট এল।
قَالُوا يَا أَبَانَا إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِنْدَ مَتَاعِنَا فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ ۖ وَمَا أَنْتَ بِمُؤْمِنٍ لَنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ
📘 তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না; যদিও আমরা সত্যবাদী।’ [১]
[১] অর্থাৎ, যদিও আমরা আপনার নিকট বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হতাম, তবুও আপনি ইউসুফ সম্পর্কে আমাদের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করতেন না। এখন তো এমনিতেই আমাদের ব্যক্তিত্ব সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের মত, এখন আপনি আমাদের কথা আর কিভাবে বিশ্বাস করবেন?
وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
📘 আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী গড়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়।[১] তোমরা যা বর্ণনা করছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’[২]
[১] বলা হয় যে, তাঁরা একটি ছাগল ছানা যবেহ করে ইউসুফের জামায় রক্ত লেপন করে নেন এবং এ কথা তাঁরা ভুলে যান যে, যদি ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলত, তবে অবশ্যই তাঁর জামাও ছিঁড়ে যেত। কিন্তু জামা অক্ষত অবস্থায় ছিল। যা দেখে এবং তার উপর ইউসুফ (আঃ)-এর স্বপ্ন এবং নিজ নবুঅতের জ্ঞান দ্বারা অনুমান করে ইয়াকূব (আঃ) বললেন, ঘটনা ঐরূপ ঘটেনি, যেরূপ তোমরা বর্ণনা করছ; বরং তোমরা নিজের মন থেকে সাজিয়ে এ কথা বলছ। সুতরাং যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াকূব (আঃ) ঘটনার আসল রহস্য জানতেন না, ফলে ধৈর্য ছাড়া কোন অবলম্বন এবং আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন উপায় তাঁর ছিল না।
[২] মদীনার মুনাফেকরা যখন আয়েশা (রাঃ) উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, তখন নবী (সাঃ) তাঁর ব্যাপারে যা বুঝেছিলেন ও বলেছিলেন তার উত্তরে তিনিও বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের আব্বার ঐ উদাহরণই দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং "আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।" অর্থাৎ আমারও ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلَىٰ دَلْوَهُ ۖ قَالَ يَا بُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَامٌ ۚ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَعْمَلُونَ
📘 এক যাত্রীদল এসে তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির বালতি নামিয়ে দিল। সে বলে উঠল, কি সুখবর! এ যে এক কিশোর![১] অতঃপর তারা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখল।[২] তারা যা করছিল, সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবগত ছিলেন। [৩]
[১] وارد (পানি সংগ্রাহক) সেই ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কাফেলা বা যাত্রীদলের জন্য পানি ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে কাফেলার আগে আগে যাত্রা করে; যাতে উপযুক্ত স্থানে কাফেলা থাকার ব্যবস্থা হয়। উক্ত পানি সংগ্রাহক যখন কূপের নিকট এল ও পানি উঠানোর জন্য বালতি নিচে নামাল, তখন ইউসুফ (আঃ) তার দড়ি ধরে নিলেন। পানি সংগ্রাহক একটি সুদর্শন শিশু দেখে তাঁকে উপরে টেনে তুলল এবং অতি আনন্দিত হল।
[২] بضاعة বাণিজ্যের পণ্যকে বলা হয়। أسروه (লুকিয়ে রাখল) এর فاعل (কর্তা) কে? অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসার পণ্য হিসাবে কে লুকিয়ে রেখেছিল? এতে মতভেদ আছে। হাফেয ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত কর্মের কর্তা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদেরকে ধরেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, যখন বালতির সাথে ইউসুফ (আঃ) কূপ থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন সেখানে তাঁর ভাইরাও উপস্থিত ছিলেন। তারপরেও তাঁরা প্রকৃত ঘটনা লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা এ কথা বলেননি যে, এটা আমাদের ভাই। আর ইউসুফ (আঃ)ও হত্যার ভয়ে তাঁরা যে তাঁর ভাই এ কথা প্রকাশ করেননি। বরং তাঁর ভায়েরা তাঁকে বিক্রির পণ্য বললেও তিনি নিশ্চুপ থাকলেন এবং নিজেকে বিক্রি হওয়াটাই পছন্দ করলেন। সুতরাং সেই পানি সংগ্রাহক কাফেলার লোকদেরকে সুসংবাদ শুনালো যে, একটি ছেলে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই কথা পূর্ব আলোচনার সাথে মিলে না। (বরং খাপছাড়া মনে হয়।) এর বিপরীত ইমাম শওকানী (রঃ) أسروه শব্দটির কর্তা পানি সংগ্রাহক ও তার সাথীদেরকে ধরে বলেছেন যে, তারা এ কথা প্রকাশ করেনি যে, এই ছেলেটি কূপে পাওয়া গেছে। কারণ তা প্রকাশ করলে কাফেলার সমস্ত লোকই ঐ "বাণিজ্যিক পণ্যে" শরীক হয়ে যেত। বরং কাফেলার লোকদের নিকট গিয়ে এ কথা বলল যে, কূপের মালিক তাদেরকে এই ছেলেটি মিশরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করার জন্য দিয়েছে। কিন্তু সব থেকে উত্তম উক্তি হল এই যে, কাফেলার লোকরা ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যবসাপণ্য গণ্য করে লুকিয়ে নিয়েছিল, যাতে তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা তাঁর খোঁজে এখানে এসে না যায় এবং বিনা মূল্যে তাকে ফিরিয়ে দিতে না হয়। কারণ কূপে একজন ছেলে পাওয়া যাওয়া, এই কথাই প্রমাণ করে যে, সে কোন স্থানীয় কোন বাসিন্দা হবে এবং খেলাধূলা করতে করতে কূপে পড়ে গিয়ে থাকবে।
[৩] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে যা কিছু ঘটছিল, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। তার পরেও আল্লাহ তাআলা এত কিছু এই জন্য হতে দিলেন, যাতে আল্লাহর লিখিত ভাগ্য বাস্তবায়িত হয়। তাছাড়া এতে নবী (সাঃ) এর জন্য সান্ত্বনা রয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বর (সাঃ)-কে জানাচ্ছেন যে, তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা অবশ্যই তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং আমি তা থেকে তাদেরকে বিরত রাখার ক্ষমতাও রাখি। কিন্তু আমি তাদেরকে সেইরূপ ঢিল দিচ্ছি, যেরূপ ইউসুফের ভাইদেরকে ঢিল দিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি ইউসুফকে মিসরের রাজ-সিংহাসনে বসিয়েছিলাম এবং তার ভাইদেরকে অক্ষম ও অসহায় করে তার দরবারে উপস্থিত করেছিলাম। হে নবী! এমন এক সময় আসবে, যখন তোমারও এরূপ মাথা উঁচু হবে এবং এই কুরায়েশ দলপতিরা তোমার ভ্রূর ইঙ্গিত ও মুখের কথার অপেক্ষায় থাকবে। সুতরাং মক্কা বিজয়ের দিন উক্ত অবস্থা অতি সত্ত্বর এসে গিয়েছিল।
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
📘 নিশ্চয় আমি এটি অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআনরূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। [১]
[১] আসমানী গ্রন্থসমূহকে অবতীর্ণ করার উদ্দেশ্য হল, মানুষকে হিদায়াত ও পথ প্রদর্শন করা। আর উক্ত উদ্দেশ্য তখনই অর্জন হবে, যখন সেই গ্রন্থ এমন ভাষায় হবে, যে ভাষা তারা বুঝতে পারবে। এই জন্যই সমস্ত আসমানী গ্রন্থ যে জাতির হিদায়াতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে সে জাতির ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। কুরআন কারীম যেহেতু সর্বপ্রথম আরববাসীদেরকে লক্ষ্য করে অবতীর্ণ করা হয়েছে, সেহেতু তা আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাছাড়া আরবী ভাষা সাহিত্য- শৈলী, শব্দালঙ্কার, অলৌকিকতা ও অর্থ প্রকাশের দিক থেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষা। এই জন্য আল্লাহ তাআলা এই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ (কুরআন মাজীদ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ (আরবী) ভাষাতে, সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি, সর্বশ্রেষ্ঠ ফিরিশতা (জিবরীল)এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন এবং মক্কা যেখানে অবতীর্ণ হতে আরম্ভ হয়েছে, তা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান, যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে, সে মাসটিও সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমযান মাস এবং যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছে, সে রাতও সর্বশ্রেষ্ঠ রাত শবেকদরের রাত।
وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ
📘 আর তারা তাকে স্বল্প মূল্যে মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল।[১] তারা ছিল এতে নির্লোভ। [২]
[১] ভাইরা অথবা অন্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী কাফেলার লোকেরা বিক্রি করেছিল।
[২] কারণ কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু, যা মানুষ বিনা পরিশ্রমে অর্জন করে, তা যতই দামী হোক না কেন, তার সঠিক মূল্য মানুষের নিকট পরিষ্ফুটিত হয় না।
وَقَالَ الَّذِي اشْتَرَاهُ مِنْ مِصْرَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَىٰ أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا ۚ وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِّمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَىٰ أَمْرِهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
📘 মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে[১] বলল, ‘সম্মানজনকভাবে এর থাকবার ব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপে গ্রহণ করব।’ আর এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম[২] তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।
[১] বলা হয় যে, সে সময় মিসরের বাদশাহ ছিলেন রাইয়ান বিন অলীদ এবং মিসরের 'আযীয' যিনি ইউসুফকে খরিদ করেছিলেন, তিনি বাদশার খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর স্ত্রীর নাম অনেকে রাঈল এবং অনেকে যুলাইখা বলেছেন। আর আল্লাই ভালো জানেন।
[২] অর্থাৎ, যেমন আমি ইউসুফ (আঃ)-কে কূপ থেকে, যালেম ভাইদের কবল থেকে পরিত্রাণ দিলাম, অনুরূপ আমি ইউসুফকে মিসরের ভূখন্ডে একটি উৎকৃষ্ট বাসস্থান প্রদান করলাম।
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
📘 সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম।[১] আর এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
[১] অর্থাৎ, নবুঅত অথবা নবী হওয়ার পূর্বের জ্ঞান ও বিচার ক্ষমতা।
وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ ۚ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
📘 সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল, সে তার কাছে (উপযাচিকা হয়ে) যৌন-মিলন কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এস! (আমরা কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করি।)’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তিনি (আযীয) আমার প্রভু! তিনি আমাকে সম্মানজনকভাবে স্থান দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’ [১]
[১] এখান থেকে ইউসুফ (আঃ)-এর এক নতুন পরীক্ষা আরম্ভ হল। মিসরের আযীযের স্ত্রী, যাকে তার স্বামী বলেছিল যে, ইউসুফকে সম্মানের সাথে রাখবে, সে ইউসুফ (আঃ)-এর রূপ-সৌন্দর্য দেখে আসক্তা হয়ে পড়ল এবং উপযাচিকা হয়ে তাঁকে ব্যভিচারের দিকে আহবান করতে লাগল। কিন্তু ইউসুফ (আঃ) তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকলেন।
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ ۖ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَىٰ بُرْهَانَ رَبِّهِ ۚ كَذَٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
📘 নিশ্চয় সেই মহিলা তার প্রতি আসক্তা হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত;[১] যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত।[২] তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম।[৩] অবশ্যই সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের একজন।
[১] কোন কোন মুফাসসির এর এই মর্মার্থ বর্ণনা করেছেন যে, (لَولاَ أَن رَّأى بُرْهَانَ رَبِّهِ) বাক্যটির পূর্ব বাক্য (وَهَمَّ بِهَا) এর সাথে কোন সম্পর্ক নেই; বরং তার উত্তর ঊহ্য আছে। অর্থাৎ বাক্যটি হল এরূপ لَولاَ أنْ رَأى بُرْهَانَ رَبِّهِ لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِهِ অর্থ হবে, "যদি ইউসুফ আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করত, তাহলে যে কাজের সংকল্প সে করেছিল তা করে বসত।" এই অর্থই অধিকাংশ মুফাসসিরগণের তফসীর সমর্থন করে। আর যাঁরা তা لَولاَ শব্দের সাথে জুড়ে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, (সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত; যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত। অর্থাৎ) ইউসুফ (আঃ) (নিদর্শন দেখার ফলে মন্দের) কোন সংকল্পই করেননি। কিন্তু পূর্বেকার তফসীরবিদগণ তা আরবীর বর্ণনাভঙ্গির পরিপন্থী বলেছেন এবং এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)ও সংকল্প করে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রথমতঃ এই সংকল্প ও ইচ্ছা এখতিয়ারী ছিল না; বরং আযীযের স্ত্রীর প্রলোভন ও চাপ তাতে প্রভাবশীল ছিল। দ্বিতীয়তঃ কোন পাপ করার ইচ্ছা করাটা পবিত্রতার পরিপন্থী নয়; বরং পাপ কাজে লিপ্ত হওয়া পবিত্রতার পরিপন্থী। (ফাতহুল কাদীর, ইবনে কাসীর) কিন্তু সত্যানুসন্ধানী মুফাসসিরগণ এই অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, যদি আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট প্রমাণ না দেখতেন, তবে ইউসুফ (আঃ)ও পাপের সংকল্প করে নিতেন। অর্থাৎ, তিনি তাঁর প্রভুর স্পষ্ট প্রমাণ দেখেছিলেন, ফলে আযীযের স্ত্রীর নিকটবর্তী হওয়ার ইচ্ছাই করেননি। বরং পাপের দিকে আহবান শুনেই مَعَاذَ الله বলেছিলেন। অবশ্য পাপ-ইচ্ছা না করার অর্থ এ নয় যে, তাঁর মনে কোন কামনা ও বাসনাই জাগ্রত হয়নি। মনের ভিতর পাপের কামনা ও বাসনা জাগা, আর তার ইচ্ছা করে নেওয়া দু'টি আলাদা জিনিস। প্রকৃতত্ব এই যে, যদি কারো মনের ভিতর একেবারেই কামনা ও বাসনা না জাগে, তাহলে এমন ব্যক্তির এরূপ পাপকর্ম থেকে বিরত থাকা কোন কৃতিত্ব নয়। কৃতিত্ব তো তখনই হবে, যখন মনের মাঝে চাহিদা ও বাসনা সৃষ্টি হবে এবং মানুষ তার উপর নিয়ন্ত্রণ এনে তা থেকে বিরত থাকবে। ইউসুফ (আঃ) এরূপই পরিপূর্ণ ধৈর্য ও সহ্যের নযীরবিহীন কৃতিত্ব পেশ করেছেন।
[২]প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী এখানে لَولاَ শব্দটির জওয়াব (উত্তর) ঊহ্য আছে, আর তা হল (لَفَعَلَ مَا هَمَّ بِه) অর্থাৎ, যদি ইউসুফ (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিদর্শন প্রত্যক্ষ না করতেন, তবে তিনি যা ইচ্ছা করেছিলেন, তা করে বসতেন। উক্ত নিদর্শন কি ছিল? এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। উদ্দেশ্য হল যে, প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এমন কোন জিনিস তাকে দেখানো হয়েছিল যে, তা প্রত্যক্ষ করে তিনি যৌন-কামনা সংবরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা নিজ পয়গম্বরগণকে এইভাবেই হিফাযত করে থাকেন।
[৩] অর্থাৎ, যেরূপ আমি ইউসুফ (আঃ)-কে নিদর্শন দেখিয়ে, কুকর্ম বা তার ইচ্ছা থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম, অনুরূপ আমি তাকে সর্ববিষয়ে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করেছি। কারণ সে আমার মনোনীত ও বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ ۚ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
📘 তারা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল[১] এবং মহিলাটি পিছন হতে (তাকে টেনে রুখতে গিয়ে) তার জামা ছিঁড়ে ফেলল। তারা মহিলাটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলাটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে কুকর্ম কামনা করে, তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ব্যতীত কি দন্ড হতে পারে?’ [২]
[১] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এ নারী মন্দকর্মের ইচ্ছায় অটল, তখন তিনি বাইরে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে পালাতে লাগলেন, আর তাঁকে ধরার জন্য সে নারীও তাঁর পশ্চাতে দৌড়তে লাগল। এইভাবে উভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল।
[২] অর্থাৎ স্বামীকে দেখেই সে (নারী) সতী-সাধী সেজে গেল এবং ইউসুফকে সর্বপ্রকার দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর জন্য শাস্তিও ঠিক করে ফেলল। অথচ প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত ছিল। দোষী সে নিজেই ছিল। আর ইউসুফ (আঃ) একেবারে নিষ্পাপ ছিলেন। তিনি সেই কুকর্ম থেকে বাঁচতে আগ্রহী ও সচেষ্ট ছিলেন।
قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي ۚ وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ
📘 সে (ইউসুফ) বলল, ‘সেই আমার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিল।’[১] মহিলাটির পরিবারের একজন সাক্ষী[২] সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে মহিলাটি সত্য কথা বলেছে এবং সে মিথ্যাবাদী।
[১] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এ মহিলা সমস্ত দোষ তাঁর উপরই চাপিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি আসল রহস্য বর্ণনা করে বললেন যে, সেই আমাকে কুকর্মে লিপ্ত হওয়ার জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করেছে। আর আমি তার স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য বাইরের দরজার দিকে ছুটে পালিয়ে এসেছি।
[২] এটা তারই বংশের কোন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিল, যে উক্ত ফায়সালা করেছিল। ফায়সালাকে এখানে شهد (সাক্ষ্য দিল) শব্দে এই জন্য বুঝানো হয়েছে যে, তখনও বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। কোন কোন বর্ণনায় একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর সাক্ষ্যদানের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু তা সহীহ সূত্রে সাব্যস্ত নয়। সহীহাইন (বুখারী-মুসলিমে) তিনজন দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বলার হাদীস আছে। যাদের মধ্যে এ চতুর্থ শিশু নয়, যার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়।
وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ
📘 আর যদি তার জামা পিছন দিক হতে ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে মহিলাটি মিথ্যা কথা বলেছে এবং সে সত্যবাদী।’
فَلَمَّا رَأَىٰ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ ۖ إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ
📘 সুতরাং গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পিছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়েছে, তখন সে বলল, ‘এটা তোমাদের (নারীদের) ছলনা; নিশ্চয় তোমাদের ছলনা বিরাট! [১]
[১] এ কথাটি মিসরের আযীযের ছিল, তিনি নিজ স্ত্রীর কুস্বভাব দেখে নারী সম্পর্কে (আমভাবে) এই মন্তব্য করেছিলেন। এটা আল্লাহর মন্তব্য নয়। আর না এই উক্তি সকল নারীর ক্ষেত্রে সঠিক। সুতরাং তা সকল নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং এর ভিত্তিতে নারী মাত্রই সকলকে ছলনাময়ী ও চক্রান্তের বেড়াজাল বলে চিহ্নিত করা কখনই কুরআনের উদ্দেশ্য নয়। যেমন অনেকে উক্ত বাক্য দ্বারা নারী সম্পর্কে এরূপ কথাবার্তা বলে থাকে।
يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَٰذَا ۚ وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ ۖ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ
📘 হে ইউসুফ! তুমি এ বিষয়কে উপেক্ষা কর[১] এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তুমিই অপরাধিনী।’[২]
[১] অর্থাৎ, এ কথা প্রচার করো না।
[২] এতে বুঝা যায় যে, মিসরের আযীযের নিকট ইউসুফ (আঃ) যে নির্দোষ তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَٰذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ
📘 আমি তোমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী[১] বর্ণনা করছি, অহীর মাধ্যমে তোমার কাছে এই কুরআন প্রেরণ করে; যদিও এর পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত। [২]
[১] قصص শব্দটি মাসদার (ক্রিয়া-বিশেষণ)। অর্থ হল কোন বস্তুর পেছনে লাগা। উদ্দেশ্য চমৎকার ঘটনা। কেচ্ছা, শুধু কোন কল্পিত কাহিনী বা মনোরঞ্জন উপন্যাসকে বলা হয় না; বরং অতীতে ঘটে গেছে এমন ঘটনার বর্ণনাকে (অর্থাৎ, তার পিছনে লাগাকে আরবীতে কিসসা) 'কেচ্ছা' বলা হয়। (ইউসুফ (আঃ)-এর) এ ঘটনা ঠিক অতীতে সংঘটিত ইতিহাসের বাস্তব বর্ণনা এবং এতে হিংসা ও শত্রুতার পরিণতি, আল্লাহর সাহায্যের আজব পদ্ধতি, মন্দ-প্রবণ মনের পাপাচরণের কুফল এবং মানুষের বিভিন্ন অবস্থার সুন্দর বর্ণনা এবং বড় গুরুতত্ত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যার জন্য কুরআন একে 'সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনী' বলে আখ্যায়িত করেছে।
[২] কুরআন কারীমের এই শব্দাবলী দ্বারাও পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, নবী করীম (সাঃ) 'আ-লিমুল গায়েব' ছিলেন না, নচেৎ আল্লাহ তাআলা তাঁকে উক্ত ঘটনা সম্পর্কে 'অনবহিত' আখ্যায়িত করতেন না। দ্বিতীয় কথা এও বুঝা গেল যে, তিনি আল্লাহর সত্য নবী। কারণ তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেই এই সত্য ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি কোন শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন না যে, তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আর না অন্য কারোর সাথে তাঁর এমন সম্পর্ক ছিল যে, তার নিকট থেকে শ্রবণ করে এরূপ ঐতিহাসিক ঘটনা তার গুরুতত্ত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি অংশ সহ বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা নিঃসন্দেহে তা অহীর মাধ্যমে তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। যেমন এখানে সে কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।
۞ وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتَاهَا عَنْ نَفْسِهِ ۖ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا ۖ إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
📘 নগরে কতিপয় মহিলা বলল, ‘আযীযের স্ত্রী তার যুবক দাসের কাছে যৌন-মিলন কামনা করে; তার প্রেম তাকে উন্মত্ত করে ফেলেছে। আমরা তো তাকে দেখছি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।’ [১]
[১] যেরূপ পর্দা দ্বারা সুবাস গোপন করা যায় না, প্রেম-ভালোবাসার বিষয়টিও অনুরূপ। মিসরের আযীয ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত ঘটনা ভুলে যাওয়ার জন্য বললেন। আর সত্যই তিনি তাঁর পবিত্র মুখে এর কোন চর্চাই করেননি। তার পরেও ঘটনাটি জঙ্গলের আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল এবং মিসরের মহিলাদের মাঝে এর দারুণ চর্চা হতে লাগল। মহিলারা আশ্চর্য হল এই ভেবে যে, (স্বামী থাকতেও যুলাইখা অন্যাসক্তা!) যদি প্রেম করার খুব ইচ্ছাই ছিল, তাহলে একজন সুদর্শন (স্বাধীন) পুরুষের সাথে করত। সে আপন দাসের প্রতি প্রেমে উন্মত্তা হয়ে পড়েছে! এটা তার বড় মূর্খামি!
فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَأً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ۖ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَٰذَا بَشَرًا إِنْ هَٰذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ
📘 মহিলাটি যখন তাদের চক্রান্তের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল[১] এবং একটি বৈঠকের আয়োজন করল।[২] তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিল এবং তাকে বলল, ‘তাদের সামনে বের হও।’[৩] অতঃপর তারা যখন তাকে দেখল, তখন তারা তার (রূপ-মাধুর্যে) অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল।[৪] তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! এ তো মানুষ নয়। এ তো এক মহিমান্বিত ফিরিশতা!’ [৫]
[১] মিসরের মহিলাদের পশ্চাতে সমালোচনা এবং নিন্দা ও ভৎর্সনাকে 'চক্রান্ত' বলা হয়েছে। যার ফলে কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, শহরের সেই নারীদের নিকটেও ইউসুফ (আঃ)-এর অপরূপ সৌন্দর্যের সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারাও কোনক্রমে সেই সৌন্দর্যের অধিকারী (ইউসুফ)-কে দেখতে চাচ্ছিল। সুতরাং তারা তাদের সেই চক্রান্ত (গুপ্ত কৌশলে) কৃতকার্য হয়ে গেল। যেহেতু আযীয-পত্নী এই কথা প্রমাণ করার জন্য সেই মহিলাদেরকে যিয়াফত করল এবং তাদের ভোজনের ব্যবস্থা করল যে, আমি যার প্রতি আসক্তা হয়ে পড়েছি, সে শুধু একজন দাস বা সাধারণ ব্যক্তি নয়; বরং সে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক এমন অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী যে, তাকে দেখে মন মুগ্ধ ও প্রাণ লুণ্ঠিত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
[২] অর্থাৎ, এমন বসার স্থান নির্দিষ্ট করল, যেখানে হেলান-বালিশ রাখা হয়ে ছিল। যেমন বর্তমানে আরবদের মাঝে এরূপ মজলিস প্রসিদ্ধ আছে, এমনকি হোটেল ও রেস্তরাঁতেও তা রাখা হয়।
[৩] অর্থাৎ, ইউসুফ (আঃ)-কে প্রথমে আড়ালে রাখা হয়েছিল। অতঃপর যখন উপস্থিত সব মহিলারা (ফল বা অন্য কিছু কেটে খাওয়ার জন্য) ছুরি হাতে নিল, তখন আযীয-পত্নী (যুলাইখা) ইউসুফ (আঃ)-কে উক্ত মজলিসে আসার আদেশ দিল।
[৪] অর্থাৎ, ইউসুফের মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে প্রথমতঃ তাঁর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার কথা স্বীকার করল এবং দ্বিতীয়তঃ তারা নিজেরা এমন দিশেহারা হয়ে পড়ল যে, (ফল কাটার জায়গায়) নিজ নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসল, ফলে তাদের হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে গেল। হাদীসে এসেছে যে, ইউসুফকে (সৃষ্টির) অর্ধেক রূপ দান করা হয়েছিল।
(মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)
[৫] এর অর্থ এ নয় যে, ফিরিশতাগণ আকার-আকৃতিতে মানুষ থেকে অধিক সুন্দর। কারণ, ফিরিশতাদেরকে তো মানুষ দেখেইনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা মানুষ সম্পর্কে নিজেই কুরআন মাজীদে বর্ণনা দিয়েছেন যে, আমি তাদেরকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি। (সূরা তীন) সেই মহিলাগণ ইউসুফ (আঃ)-কে 'মানুষ নয়' এই জন্য বলেছিল যে, তারা তখন যেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী ব্যক্তিকে দেখেছিল, সেরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী কোন মানুষকে কখনো দেখেনি এবং তারা এই জন্য তাঁকে ফিরিশতা বলেছিল যে, সাধারণতঃ মানুষ মনে করে যে, ফিরিশতাগণ রূপ ও গুণের দিক থেকে এমন হন, যা মানুষ থেকে ঊর্ধ্বে। এ থেকে বুঝা গেল যে, নবীগণের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও স্বতন্ত্র গুণাবলীর কারণে তাঁদেরকে মানব-বংশ থেকে বের করে 'নূরের সৃষ্টি' বলা সর্বযুগের এমন মানুষদের স্বভাব ছিল, যারা নবুঅত ও তাঁর মর্যাদার ব্যাপারে অজ্ঞ।
قَالَتْ فَذَٰلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ ۖ وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ ۖ وَلَئِنْ لَمْ يَفْعَلْ مَا آمُرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِنَ الصَّاغِرِينَ
📘 সে বলল, ‘এই সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করেছ।[১] আমি তো তার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছি; কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আমি তাকে যা আদেশ করি, সে যদি তা না করে, তাহলে অবশ্যই সে কারারুদ্ধ হবে এবং লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ [২]
[১] যখন আযীযের স্ত্রী দেখল যে তার ছলনা ও চক্রান্ত সফল ও কৃতকার্য হয়েছে এবং ইউসুফের রূপ দেখে সমালোচক মহিলারা অভিভূত হয়ে পড়েছে, তখন বলতে লাগল যে, তাকে এক ঝলক দেখাতেই তোমাদের এ অবস্থা হয়ে গেল, তাহলে কি এখন তার প্রেম-জালে আবদ্ধ হওয়ার কারণে তোমরা আমার নিন্দা করবে? এ তো সেই তরুণ, যার সম্পর্কে তোমরা আমার নিন্দা করেছ।
[২] সমালোচক মহিলাদেরকে অভিভূত হতে দেখে তার স্পর্ধা আরো বেড়ে গেল এবং লজ্জা-শরমের সমস্ত পর্দা খুলে দিয়ে সে তার অসৎ কামনা আরো একবার প্রকাশ করল। (এবং এবারে অস্বীকার অবস্থায় তাকে হুমকি দেখানো হল।)
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجَاهِلِينَ
📘 ইউসুফ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই মহিলারা আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়। তুমি যদি তাদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না কর, তাহলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ [১]
[১] ইউসুফ (আঃ) মনে মনে উক্ত দু'আ করেছিলেন। কারণ মুমিনের জন্য দু'আ একটি হাতিয়ার। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের মধ্যে একজন হল সেই ব্যক্তি, যাকে একজন সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী কুকর্ম করার জন্য আহবান করে। কিন্তু সে তাকে এই বলে উত্তর দেয় যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।"
(বুখারী ও মুসলিম)
فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
📘 অতঃপর তার প্রতিপালক তার আহবানে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا رَأَوُا الْآيَاتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّىٰ حِينٍ
📘 নিদর্শনাবলী দেখার পরও তাদের মনে হল যে, তাকে কিছুকালের জন্য কারারুদ্ধ করতেই হবে। [১]
[১] নির্দোষিতা ও পবিত্রতা প্রকাশ হওয়ার পরেও ইউসুফ (আঃ)-কে জেলখানায় পাঠানোতে আযীযের দৃষ্টিতে এই যুক্তি ও কল্যাণ থাকতে পারে যে, তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে তাঁর স্ত্রী থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছিলেন, যাতে সে পুনরায় ইউসুফ (আঃ)-কে নিজ প্রেম-জালে ফাঁসানোর চেষ্টা না করতে পারে, যেমন তার ইচ্ছা তাই ছিল।
وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِ ۖ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا ۖ وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْزًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ ۖ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ
📘 তার সাথে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি (আঙ্গুর) নিঙড়ে মদ তৈরী করছি’ এবং অপরজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি আমার মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে আপনি এর তাৎপর্য জানিয়ে দিন, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।’ [১]
[১] উক্ত দুই যুবক রাজকর্মচারী ছিল। প্রথমজন শারাব পান করানোর কাজ করত এবং দ্বিতীয়জন রুটি তৈরী করত। কোন কারণে উভয়কে জেলখানায় বন্দী করা হয়েছিল। ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর পয়গম্বর ছিলেন। দাওয়াত ও তবলীগের সাথে সাথে ইবাদত ও আচরণ, পরহেযগারী ও সচ্চরিত্রতার দিক থেকে জেলখানার অন্যান্য বন্দীদের থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) করার বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। উক্ত বন্দীদ্বয় যখন স্বপ্ন দেখল, তখন তারা ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট এল এবং বলল, আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি। আপনি আমাদেরকে আমাদের স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দিন। কেউ কেউ محسن শব্দটির অর্থ এই বলেছেন যে, আপনি স্বপ্নের ভাল তাৎপর্য বর্ণনা করতে পারেন।
قَالَ لَا يَأْتِيكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهِ إِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ۚ ذَٰلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي ۚ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ
📘 ইউসুফ বলল, ‘তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয়, তা আসবার পূর্বে আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দেব, এ জ্ঞান আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তারই অন্তর্ভুক্ত।[১] যে সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে না ও পরলোকে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি। [২]
[১] অর্থাৎ, আমি যে তাৎপর্য বলব, তা জ্যোতিষী ও গণকদের মত ধারণা বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, যাতে ঠিক ও ভুল উভয়েরই সম্ভাবনা থাকে। বরং আমার তাৎপর্য সুদৃঢ় জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে হবে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে প্রদান করা হয়েছে। যাতে ভুলের কোন অবকাশ নেই।
[২] এটা ইলহাম ও আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান লাভের কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, আমি সেই লোকদের মতবাদ বর্জন করেছি, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে না। এরই বদৌলতে আমার উপর আল্লাহর এই অনুগ্রহ হয়েছে।
وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ مَا كَانَ لَنَا أَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ
📘 আমি আমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক এবং ইয়াকূবের দ্বীন অনুসরণ করি।[১] আল্লাহর সাথে কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নয়।[২] এটা আমাদের এবং সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
[১] পিতামহ-প্রপিতামহকেও পিতা বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ তাঁরাও পিতা। পুনরায় পর্যায়ক্রমে প্রপিতামহ ইবরাহীম (আঃ) তাঁরপর পিতামহ ইসহাক (আঃ) এবং তাঁরপর পিতা ইয়াকূব (আঃ)-কে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, প্রথমে প্রথম পুরুষ, অতঃপর দ্বিতীয় পুরুষ ও সবশেষে তৃতীয় পুরুষকে উল্লেখ করেছেন।
[২] সেই তওহীদের দাওয়াত এবং শিরকের খন্ডন; যা প্রত্যেক নবীর বুনিয়াদী ও প্রাথমিক শিক্ষা এবং দাওয়াত ছিল।
يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ
📘 হে আমার কারা-সঙ্গীদ্বয়![১] ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? [২]
[১] 'কারাসঙ্গী' বা জেলখানার সাথী এই জন্য বলেছেন যে, এরা সকলে দীর্ঘ সময় ধরে জেলখানায় বন্দী হয়ে ছিল।
[২] অর্থাৎ, সত্তা, গুণ ও সংখ্যার দিক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপালক। অর্থাৎ, সেই সকল (কল্পিত) প্রতিপালক উত্তম, যারা নিজ নিজ সত্তার দিক থেকে এক অপর হতে আলাদা, গুণের দিক থেকে এক অপর হতে পৃথক এবং সংখ্যার দিক থেকেও বিভিন্ন, নাকি সেই আল্লাহ উত্তম, যিনি নিজ সত্তা ও গুণে একক, যাঁর কোন অংশীদার নেই এবং তিনি সকলের উপর পরাক্রমশালী ও ক্ষমতাবান?
إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ
📘 যখন ইউসুফ[১] তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা! আমি (স্বপ্নে) এগারটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্র দেখলাম;[২] দেখলাম ওরা আমাকে সিজদাহ করছে।’
[১] অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! তোমার সম্প্রদায়ের নিকট ইউসুফ (আঃ)-এর ঘটনা বর্ণনা কর, যখন সে তার পিতাকে বলল---। ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা ছিলেন ইয়াকূব (আঃ); যেমন অন্য জায়গায় স্পষ্টভাবে তা উল্লিখিত হয়েছে। আর হাদীসেও উক্ত সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে, কারীম (সম্মানিত) বিন কারীম বিন কারীম, ইউসুফ বিন ইয়াকূব বিন ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম)।
(আহমাদ ২/৯৬)
[২] কোন কোন তফসীরবিদ বলেছেন যে, এগারটি নক্ষত্র থেকে উদ্দেশ্য হল, ইউসুফ (আঃ)-এর এগার ভাই। আর চাঁদ ও সূর্য থেকে উদ্দেশ্য হল, তাঁর পিতা-মাতা। এ স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) ৪০ অথবা ৮০ বছর পর যখন তাঁর পিতা-মাতা সহ সমস্ত ভায়েরা মিসরে গিয়ে তাঁর সামনে সিজদাবনত হয়েছিলেন, তখন বাস্তব রূপ পেয়েছিল। যেমন এ কথা সূরার শেষের দিকে (১২:১০০ নং আয়াতে) আসবে।
مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
📘 তাকে ছেড়ে তোমরা শুধু এমন কতকগুলি নামের উপাসনা করছ যা তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখে নিয়েছ। এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি।[১] বিধান দেওয়ার অধিকার শুধু আল্লাহরই। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারোও উপাসনা করবে না। এটাই সরল-সঠিক দ্বীন।[২] কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়। [৩]
[১] এর এক অর্থ এই যে, তাদের 'উপাস্য' নামটি তোমরা নিজেরাই দিয়েছ। প্রকৃতপক্ষে না তারা উপাস্য, আর না সে সম্পর্কে কোন প্রমাণ আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেই উপাস্যদের বিভিন্ন নাম যা তোমরা দিয়ে রেখেছ; যেমন বর্তমানে, খাজা গরীব নেওয়ায, গঞ্জ বখশ, কিরনী ওয়ালা, কারমাঁ ওয়ালা, গওসে আযম, দস্তগীর, মুশকিল কুশা (অনুরূপ দাতা সাহেব, খাজাবাবা, সাঁইবাবা) ইত্যাদি এসব তোমাদের নিজেদের মনগড়া নাম, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এর কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করা হয়নি।[২] এই দ্বীন, যার দিকে আমি তোমাদেরকে আহবান জানাচ্ছি, যাতে কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত করার কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক ও সুদৃঢ়, যা অবলম্বন করার আদেশ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।[৩] যার কারণে অধিকাংশ মানুষ শির্কে লিপ্ত হয়, মহান আল্লাহ বলেন,{وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللّهِ إِلاَّ وَهُم مُّشْرِكُونَ} অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাঁর অংশী স্থাপন করে।
(সূরা ইউসুফ ১২:১০৬)
{وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ} অর্থাৎ, তুমি যতই আগ্রহী হও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (
সূরা ইউসুফ
১২:১০৩)
يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا ۖ وَأَمَّا الْآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ ۚ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ
📘 হে আমার কারাসঙ্গীদ্বয়![১] তোমাদের একজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে তার প্রভুকে মদ্য পান করাবে[২] এবং অপরজন সম্বন্ধে কথা এই যে, সে শূলবিদ্ধ হবে, অতঃপর তার মস্তক হতে পাখি আহার করবে।[৩] যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।’ [৪]
[১] তওহীদের নসীহত করার পর এখন ইউসুফ (আঃ) তাদের বর্ণনাকৃত স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা করছেন।
[২] এ সেই ব্যক্তি যে স্বপ্নে নিজেকে আঙ্গুরের জুস তৈরী করতে দেখেছিল। এর পরেও তিনি উভয়ের মধ্যে কোন একজনকে নির্দিষ্ট করেননি, যাতে যে শূলবিদ্ধ হবে, সে আগে থেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে।
[৩] এ সেই ব্যক্তি যে স্বপ্নে নিজ মাথার উপর রুটির ঝুড়ি বহন করতে দেখেছিল।
[৪] অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্ত যা আমি স্বপ্নের তাৎপর্য হিসাবে বর্ণনা করেছি, তা পূর্ব থেকেই স্থিরীকৃত হয়ে আছে। নিঃসন্দেহে তা বাস্তবায়িত হবে। যেমন হাদীসে আছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, যতক্ষণ স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা না করা হয়, ততক্ষণ তা পাখির পায়ে (অস্থিতিশীল) থাকে। অতঃপর যখন তার তাৎপর্য বর্ণনা করে দেওয়া হয়, তখন তা বাস্তবে সংঘটিত হয়।"
(আহমাদ, ইবনে কাসীর)
وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ
📘 ইউসুফ তাদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।’ কিন্তু শয়তান তাকে তার প্রভুর কাছে তার বিষয় বলবার কথা ভুলিয়ে দিল; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থেকে গেল। [১]
[১] بضع শব্দটি তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার জন্য ব্যবহার হয়। অহাব বিন মুনাব্বেহ বলেন, আইয়ুব (আঃ) তাঁর ব্যাধি অবস্থায় এবং ইউসুফ (আঃ) জেলখানায় সাত বছর ছিলেন। আর বুখতে নাসরের আযাবও সাত বছর ছিল। পক্ষান্তরে অনেকে বলেন, বারো বছর এবং অনেকের মতে চৌদ্দ বছর জেলখানাতে ছিলেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَىٰ سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ ۖ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ
📘 রাজা বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী; ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তাহলে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।’
قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلَامٍ ۖ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الْأَحْلَامِ بِعَالِمِينَ
📘 তারা বলল, ‘এটা আবোল-তাবোল স্বপ্ন এবং আমরা এরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই।’ [১]
[১] أضغاثٌ শব্দটি ضغثٌ এর বহুবচন, যার অর্থ হল ঘাসের গোছা। أحلامٍ শব্দটি حُلم এর বহুবচন যার অর্থ হল স্বপ্ন। أضغاث أحلام এর অর্থ হবে, অর্থহীন স্বপ্ন বা বিক্ষিপ্ত খেয়াল, যার কোন ব্যাখ্যা হয় না। উক্ত স্বপ্ন মিসরের সেই রাজা দেখলেন, আযীয যাঁর মন্ত্রী ছিলেন। এই স্বপ্ন দ্বারা আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে জেল থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। সুতরাং রাজার সভাসদ, জ্যোতিষী ও গণকমন্ডলী সকলে সেই জটিল স্বপ্নের তাৎপর্য বর্ণনা করতে অক্ষমতা প্রকাশ করল। কেউ কেউ বলেন, জ্যোতিষী প্রভৃতিদের অক্ষমতা প্রকাশ করার অর্থ, তাদের আদৌ ব্যাখ্যার জ্ঞান ছিল না। পক্ষান্তরে কিছু তফসীরবিদ বলেন, তারা ব্যাখ্যা জানতো না এমন নয়, আর না তারা না জানার কথা বলেছে, বরং তারা কেবল উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করার অক্ষমতা প্রকাশ করেছে।
وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونِ
📘 দু’জন কারা-বন্দীর মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পরে তার স্মরণ হল সে বলল, ‘আমি এর তাৎপর্য তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠিয়ে দাও।’ [১]
[১] এ ব্যক্তি জেলখানার সঙ্গীদ্বয়ের একজন ছিল, যে অবিলম্বে ছাড়া পাবে। তাকে ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন যে, 'তুমি তোমার প্রভুর (মালিকের) নিকট আমার কথা বলবে, যাতে আমিও মুক্ত হতে পারি।' সেই ব্যক্তির হঠাৎ স্মরণ হল এবং সে বলল, 'আমাকে সময় দাও, আমি তোমাদেরকে এই স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দেব।' সুতরাং সেখান থেকে বের হয়ে সে সোজা ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট গেল এবং স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তার তাৎপর্য জানতে চাইল।
يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ سُنْبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ لَعَلِّي أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ
📘 সে বলল, ‘হে ইউসুফ! হে মহা সত্যবাদী! সাতটি স্থূলকায় গাভী, ওগুলিকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে আপনি আমাদেরকে ব্যাখ্যা দিন, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং যাতে তারা অবগত হতে পারে।’
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ
📘 ইউসুফ বলল, ‘তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে, তা ব্যতীত সমস্ত শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে।
ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَٰلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تُحْصِنُونَ
📘 এরপর আসবে সাতটি কঠিন (দুর্ভিক্ষের) বছর, এই সাত বছর যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকে তা খাবে;[১] শুধু সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। [২]
[১] আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে স্বপ্নের ব্যাখ্যা-জ্ঞান প্রদান করেছিলেন, ফলে তিনি অবিলম্বে সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুঝতে পারলেন। তিনি সাতটি মোটা-তাজা গাভী দ্বারা এমন সাতটি বছর অর্থ নিলেন, যে বছরগুলিতে খুব ভাল ফসল উৎপন্ন হবে। আর সাতটি শীর্ণকায় গাভী দ্বারা তার বিপরীত দুর্ভিক্ষের সাতটি বছর অর্থ নিলেন। অনুরূপ সাতটি সবুজ শীষ দ্বারা ব্যাখ্যা নিলেন যে, যমীনে অধিকহারে ফসল উৎপন্ন হবে এবং সাতটি শুষ্ক শীষ দ্বারা যমীনে সাত বছর ফসল উৎপন্ন না হওয়ার ব্যাখ্যা নিলেন। সেই সাথে তার জন্য কি ব্যবস্থা নিতে হবে তাও বলে দিলেন; বললেন, 'পর পর সাত বছর চাষাবাদ করবে এবং যে শস্য উৎপন্ন হবে, তা কেটে শীষ সহ জমা রাখবে; যাতে শস্য ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে। পরে যখন সাতটি দুর্ভিক্ষের বছর আসবে, তখন সে শস্য তোমাদের কাজে আসবে, যা তোমরা সঞ্চয় করে রাখবে।'
[২] مما تحصنون (যা তোমরা সংরক্ষণ করবে)এর অর্থ হল, সেই শস্যবীজ যা পুনরায় চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখবে।
ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذَٰلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ
📘 এবং এরপর আসবে এক বছর, সেই বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সেই বছর মানুষ ফলের রস নিঙড়াবে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, দুর্ভিক্ষের সাতটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পর প্রচুর বৃষ্টি হবে, ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং তোমরা আঙ্গুর থেকে তার রস বের করবে, যায়তুন থেকে তেল বের করবে এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকে দুধ দোয়াবে। উক্ত ব্যাখ্যার সাথে স্বপ্নের খুব সূক্ষ্ণ সম্পর্ক আছে, যা একমাত্র সেই ব্যক্তিই বুঝতে পারে, যাকে আল্লাহ তাআলা সঠিক বুঝার ক্ষমতা দান করেছেন এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আঃ)-কে তা প্রদান করেছিলেন।
قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا ۖ إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ
📘 (পিতা ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের নিকট বর্ণনা করো না, করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।[১] শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।[২]
[১] ইয়াকূব (আঃ) সপ্ন শুনে অনুমান করলেন যে, তাঁর এই পুত্র মহা সম্মানের অধিকারী হবে। ফলে তিনি ভয় করছিলেন যে, এই স্বপ্ন শুনে তাঁর অন্য ভাইরাও তাঁর মর্যাদার কথা বুঝতে পেরে তাঁর কোন ক্ষতি না করে বসে। তাই তিনি এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করতে নিষেধ করলেন।
[২] তিনি ভাইদের চক্রান্তের কারণও বলে দিলেন যে, শয়তান যেহেতু মানুষের চিরশত্রু সেহেতু সে মানুষকে ভ্রষ্ট ও হিংসা-বিদ্বেষে নিমজ্জিত করার সর্বদা সুযোগ খোঁজে। বলা বাহুল্য, এটা শয়তানের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল যে, ইউসুফ (আঃ)-এর বিরুদ্ধে ভাইদের মনে হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। যেমন পরে সত্য সত্যই সে তাই করেছিল এবং ইয়াকূব (আঃ)-এর আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।
وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ ۖ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَىٰ رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ ۚ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ
📘 রাজা বলল, ‘তোমরা ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এস।’[১] সুতরাং যখন দূত তার কাছে উপস্থিত হল, তখন সে বলল, ‘তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিল, তাদের অবস্থা কি?[২] আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্বন্ধে সম্যক অবগত।’
[১] উদ্দেশ্য এই যে, যখন সেই ব্যক্তি ব্যাখ্যা নিয়ে বাদশার নিকট গেল ও ব্যাখ্যা বর্ণনা করল, তখন সেই ব্যাখ্যা ও ইউসুফ (আঃ)-এর বলা তদবীর শ্রবণ করে বাদশাহ বড় প্রভাবিত হলেন এবং তিনি অনুমান করলেন যে, এই ব্যক্তি, যাঁকে বেশ কিছুদিন থেকে জেলে রাখা হয়েছে, তিনি অসাধারণ জ্ঞান, মর্যাদা ও উচ্চ যোগ্যতার অধিকারী। সুতরাং বাদশাহ তাঁকে দরবারে উপস্থিত করার জন্য আদেশ দিলেন।
[২] ইউসুফ (আঃ) যখন দেখলেন যে, এখন বাদশাহ সম্মান দিতে প্রস্তুত, তখন তিনি এইভাবে শুধু অনুগ্রহের পাত্র হয়ে জেল থেকে বের হওয়া পছন্দ করলেন না। বরং আপন চরিত্রকে উচ্চ এবং নিজের পবিত্রতাকে সাব্যস্ত করাকে প্রাধান্য দিলেন, যাতে পৃথিবীর সামনে তাঁর নির্মল চরিত্র ও সুউচ্চ মর্যাদা পরিষ্ফুটিত হয়ে যায়। কারণ একজন (দায়ী) আল্লাহর পথে আহবানকারীর জন্য এই পবিত্রতা ও মহান চরিত্র খুবই জরুরী।
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ ۚ قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ ۚ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ
📘 রাজা মহিলাদেরকে বলল, ‘কী ব্যাপার তোমাদের? যখন তোমরা ইউসুফের কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিলে, (তখন কি সে সম্মত হয়েছিল?)’ তারা বলল, ‘আল্লাহ পবিত্র! আমরা তার মধ্যে কোন দোষ দেখিনি।’[১] আযীযের স্ত্রী বলল, ‘এক্ষণে সত্য প্রকাশ পেয়ে গেল। আমিই তার কাছে যৌন-মিলন কামনা করেছিলাম, আর সে অবশ্যই সত্যবাদী। [২]
[১] বাদশার জিজ্ঞাসাবাদে সমস্ত মহিলা ইউসুফ (আঃ) এর পবিত্রতার কথা স্বীকার করল।
[২] এখন আযীযের স্ত্রী যুলাইখারও এই কথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকল না। সে স্বীকার করল যে, ইউসুফ নির্দোষ এবং প্রেমের পয়গাম আমার পক্ষ থেকেই ছিল। ইউসুফের এই ত্রুটির সাথে কোন সম্পর্ক নেই।
ذَٰلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ
📘 এটা এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি[১] এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। [২]
[১] জেলখানাতে যখন ইউসুফ (আঃ)-কে এই সমস্ত সংবাদ জানানো হল, তখন তিনি তা শ্রবণ করে এই কথা বলেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি বাদশার নিকট গিয়ে এই কথা বলেছিলেন এবং কোন কোন তফসীরকারকের নিকট এটাও যুলাইখারই উক্তি ছিল। উদ্দেশ্য এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর অনুপস্থিতিতেও তাকে মিথ্যাভাবে অপবাদ দিয়ে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করব না। বরং আমানতদারীর চাহিদা সামনে রেখেই আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, আমি আমার স্বামীর খিয়ানত করিনি এবং কোন বড় পাপ করে বসিনি। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
[২] যে, সে আপন ছলনা ও চক্রান্তে সর্বদা কৃতকার্য থাকবে। বরং তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে ও সাময়িক হয়। পরিশেষে সত্য ও সত্যবাদীরই জয় হয়। সত্যবাদীদেরকে সাময়িক কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় মাত্র।
۞ وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَحِيمٌ
📘 আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, [১] মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ, [২] কিন্তু সে নয় যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন।[৩] নিশ্চয় আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
[১] এটা যদি ইউসুফ (আঃ)-এর উক্তি হয়, তাহলে এটা তাঁর পক্ষ থেকে আত্মবিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। কেননা এটা সুস্পষ্ট যে, সব দিক থেকেই তাঁর পবিত্রতা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। পক্ষান্তরে এটা যদি মিশরের বাদশার স্ত্রীর কথা হয়, (যেমন ইবনে কাসীরের মত) তাহলে তা বাস্তবের উপরই প্রতিষ্ঠিত। কেননা সে নিজের অপরাধ এবং ইউসুফ (আঃ)-কে ফুসলানো ও ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করানোর কথা স্বীকার করেছিল।
[২] এটা সে তার নিজের কৃত অপরাধের কারণ উল্লেখ করে বলছে যে, মানুষের মনের প্রবণতা এমন যে, সে তাকে মন্দ কর্মের প্রতি প্ররোচিত করে এবং খারাপ কাজের দিকে অগ্রসর করে।
[৩] অর্থাৎ, মনের কুপ্রবণতা থেকে সেই বেঁচে থাকে, যার প্রতি আল্লাহর রহমত ও অনুকম্পা হয়। যেমন তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে বাঁচিয়ে নিলেন।
وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِي ۖ فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ
📘 রাজা বলল, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এস, আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করব।[১] অতঃপর রাজা যখন তার সাথে কথা বলল, তখন বলল, ‘আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বাসভাজন।’ [২]
[১] যখন বাদশা আযীয (রাইয়ান বিন অলীদ)-এর সামনে ইউসুফ (আঃ)-এর জ্ঞান ও মর্যাদা সহ তাঁর চরিত্রের উৎকর্ষতা ও পবিত্রতাও প্রস্ফুটিত হয়ে গেল, তখন তিনি আদেশ করলেন যে, তাঁকে (ইউসুফ (আঃ)-কে) আমার কাছে পেশ কর; আমি তাঁকে আমার সঙ্গী (প্রিয়পাত্র) ও মন্ত্রী (পরামর্শদাতা) বানাতে চাই।
[২] مَكِيْنٌ অর্থাৎ মর্যাদার অধিকারী এবং أمِيْنٌ (বিশ্বস্ত) অর্থাৎ রাষ্ট্র রহস্যবিদ।
قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
📘 সে বলল, ‘আমাকে দেশের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করুন।[১] নিশ্চয়ই আমি সুসংরক্ষণকারী, সুবিজ্ঞ।’ [২]
[১] خَزَائِنُ শব্দটি خِزَانَةٌ শব্দের বহুবচন। خِزَانَةٌ এমন স্থানকে বলা হয় যেখানে জিনিসপত্র হিফাযতে রাখা হয়। خَزَائِنُ الْأرْضِ বলতে সেই সব গুদামকে বুঝানো হয়েছে, যেখানে রসদ-শস্য জমা করা হতো অর্থাৎ, শস্যাগার। তিনি এ (শস্যাগারের) ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিজ হাতে নেওয়ার ইচ্ছা এই জন্য প্রকাশ করলেন, যাতে (স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যা অনুসারে) আসন্ন দুর্ভিক্ষের জন্য উচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে শস্য সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে। সাধারণ অবস্থায় যদিও পদ বা নেতৃত্ব প্রার্থনা করা বৈধ নয়, কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর এই পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে জানা যায় যে, বিশেষ অবস্থায় যদি কোন লোক এটা মনে করে যে, জাতি ও রাষ্ট্রের উপর আগত সঙ্কটের উচিত ব্যবস্থার যথাযথ যোগ্যতা আমার মধ্যে বিদ্যমান, যা অন্যের মধ্যে নেই, তাহলে সে নিজের যোগ্যতা অনুসারে এই বিশেষ পদ প্রার্থনা করতে পারে। পক্ষান্তরে ইউসুফ (আঃ) মূলতঃ পদ প্রার্থনাই করেননি। বরং যখন মিসরের রাজা তাঁর সামনে এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন তিনি এমন পদ গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, যাতে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি জাতি ও রাষ্ট্রের সেবা সুন্দর ও সহজভাবে করতে পারেন।[২] حفيظ অর্থাৎ, আমি শস্যাগারের এমনভাবে সুরক্ষা করব যে, আমি কখনো তার অপব্যয় ঘটতে দিব না। عَلِيْمٌ অর্থাৎ, শস্য জমা করা, ব্যয় করা এবং রাখার ও বের করার উত্তম জ্ঞান রাখি।
وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوَّأُ مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ ۚ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نَشَاءُ ۖ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
📘 এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; সে ঐ দেশে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত।[১] আমি যাকে ইচ্ছা তার প্রতি দয়া করে থাকি। আর আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না।[২]
[১] অর্থাৎ আমি ইউসুফ (আঃ)-কে ঐ দেশের উপর এমন শক্তি ও কৌশল প্রদান করলাম যে, মিসরের রাজা তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতেন এবং তিনি মিসরের মাটিতে এমন অধিকার প্রয়োগ করতেন, যেমন কোন মানুষ নিজ গৃহে প্রয়োগ করে থাকে। তিনি যেখানে ইচ্ছা সেখানে অবস্থান করতেন, পুরা মিসর ছিল তাঁর পরিপূর্ণ অধীনস্থ।
[২] এটা যেন তাঁর সেই সবরের সুফল, যা তিনি ভাইদের অন্যায়-অত্যাচারের উপর করেছিলেন এবং ঐ সুদৃঢ় পদক্ষেপের (বদলা ছিল) যা তিনি যুলাইখার পাপের আহবানের মোকাবিলায় এখতিয়ার করেছিলেন এবং সেই দৃঢ়তার (বদলা ছিল), যা তিনি কয়েদখানার জীবনে অবলম্বন করেছিলেন। ইউসুফ (আঃ)-এর এই পদ সেই পদ ছিল, যার উপর ইতিপূর্বে মিসরের সেই রাজা অধিষ্ঠিত ছিলেন, যাঁর স্ত্রী ইউসুফ (আঃ)-কে ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছিল। কারো কারো মন্তব্য যে, উক্ত রাজা ইউসুফ (আঃ)-এর দা'ওয়াত ও তবলীগে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। অনুরূপ কারো কারো মন্তব্য যে, মিসরের রাজা ইতফীরের মৃত্যুর পর ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে যুলাইখার বিয়ে হয়েছিল এবং দুটি সন্তানও হয়েছিল; একজনের নাম আফরাইম এবং দ্বিতীয়জনের নাম মীশা ছিল। আফরাইমই ছিল ইউশা' বিন নূন ও আইউব (আঃ)-এর স্ত্রী 'রাহমাত'-এর পিতা। (তাফসীর ইবনে কাসীর) কিন্তু এ কথাটা কোন বিশ্বস্ত সূত্রে প্রমাণিত নয়, তাই বিবাহ সংক্রান্ত কথাটা বিশুদ্ধ বলে মনে হয় না। এ ছাড়া উক্ত মহিলার পক্ষ থেকে পূর্বে যে অসদাচরণ প্রদর্শিত হয়েছিল, তার কারণে এক নবী পরিবারের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম হওয়ার কথা নেহাতই অনুচিত মনে হচ্ছে।
وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
📘 অবশ্যই যারা বিশ্বাসী ও সাবধানী তাদের জন্য পরকালের পুরস্কারই উত্তম।
وَجَاءَ إِخْوَةُ يُوسُفَ فَدَخَلُوا عَلَيْهِ فَعَرَفَهُمْ وَهُمْ لَهُ مُنْكِرُونَ
📘 ইউসুফের ভাইগণ এল এবং তার নিকট উপস্থিত হল। সে তাদেরকে চিনল, কিন্তু তারা তাকে চিনতে পারল না। [১]
[১] এটা সেই সময়ের ঘটনা যখন ফল-ফসল-সমৃদ্ধ সাতটি বছর সমাপ্ত হয়ে দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হল, যা মিশর দেশের সমস্ত এলাকা ও শহরকে আক্রমণ করল, এমনকি কানআন পর্যন্ত এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল, যেখানে ইয়াকূব (আঃ) ও ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা বসবাস রত ছিলেন। ইউসুফ (আঃ) এই দুর্ভিক্ষের জন্য সুকৌশলের সাথে যে সুব্যবস্থা নিয়েছিলেন তা সফল হল এবং শস্যপ্রাপ্তির জন্য সব দিক থেকে লোকজন তাঁর কাছে আসতে লাগল। ইউসুফ (আঃ)-এর প্রসিদ্ধি কানআন পর্যন্তও পৌঁছে গেল যে, মিসরের বাদশা এভাবে শস্য বিক্রি করছেন। সুতরাং পিতার আদেশে ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরাও বাড়ি থেকে পুঁজি নিয়ে শস্য প্রাপ্তির জন্য রাজদরবারে উপস্থিত হলেন, যেখানে ইউসুফ (আঃ) রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভায়েরা তাঁকে চিনতে পারেননি, কিন্তু তিনি তাঁদেরকে চিনে নিয়েছিলেন।
وَلَمَّا جَهَّزَهُمْ بِجَهَازِهِمْ قَالَ ائْتُونِي بِأَخٍ لَكُمْ مِنْ أَبِيكُمْ ۚ أَلَا تَرَوْنَ أَنِّي أُوفِي الْكَيْلَ وَأَنَا خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ
📘 আর সে যখন তাদের খাদ্য-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন বলল, ‘তোমরা আমার নিকট তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে নিয়ে এস। তোমরা কি দেখছ না যে, আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দিই এবং আমিই উত্তম অতিথিপরায়ণ? [১]
[১] ইউসুফ (আঃ) অপরিচিত থেকে স্বীয় ভাইদেরকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করলে তারা অন্যান্য কথা বলার সাথে সাথে এটাও বলে ফেলল যে, আমরা দশ ভাই এখানে উপস্থিত রয়েছি, কিন্তু আরো দুজন বৈমাত্রেয় ভাই আছে, তাদের একজন তো জঙ্গলে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয়জনকে আববা সান্ত্বনা স্বরূপ নিজের কাছে রেখে নিয়েছেন, আমাদের সাথে পাঠাননি। তখন ইউসুফ (আঃ) বললেন, আগামীতে তাকেও নিয়ে আসবে, তোমরা কি দেখ না যে, আমি মাপও পরিপূর্ণ দিচ্ছি এবং চমৎকাররূপে আতিথ্যও করছি।
وَكَذَٰلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَىٰ أَبَوَيْكَ مِنْ قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
📘 এভাবে[১] তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন, আর তোমার প্রতি[২] ও ইয়াকূবের পরিবার-পরিজনের প্রতি[৩] তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্বে তা পূর্ণ করেছিলেন। তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।’
[১] অর্থাৎ যেভাবে তোমাকে তোমার প্রভু বড় মহত্তপূর্ণ স্বপ্ন দেখানোর জন্য বেছে নিয়েছেন, সেইভাবে তোমার প্রভু তোমাকে সম্মান দানে মনোনীত করবেন এবং স্বপ্নের তা'বীর (ব্যাখ্যা) শিখাবেন। تأويل الأحاديث এর প্রকৃত অর্থ হল কথার গভীরে পৌঁছনো। এখানে উদ্দেশ্য হল, স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য।
[২] এর উদ্দেশ্য হল নবুঅত; যা ইউসুফ (আঃ)-কে প্রদান করা হয়েছিল। অথবা সেই নেয়ামতসমূহ যা ইউসুফ (আঃ)-কে মিশরে প্রদান করা হয়েছিল।
[৩] এর দ্বারা ইউসুফ (আঃ)-এর ভাই, তাঁদের সন্তানাদিকে বুঝানো হয়েছে। যারা পরে আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী হয়েছিলেন।
فَإِنْ لَمْ تَأْتُونِي بِهِ فَلَا كَيْلَ لَكُمْ عِنْدِي وَلَا تَقْرَبُونِ
📘 কিন্তু তোমরা যদি তাকে আমার নিকট নিয়ে না আস, তাহলে আমার নিকট তোমাদের জন্য কোন খাদ্য-সামগ্রী থাকবে না এবং তোমরা আমার নিকটবর্তী হবে না।’ [১]
[১] লোভ দেওয়ার সাথে এটা ধমক ছিল যে, যদি তোমরা এগার নম্বর ভাইকে সাথে না নিয়ে আসো, তাহলে না তোমরা শস্য পাবে, আর না আমার পক্ষ থেকে আতিথ্যের সুব্যবস্থা থাকবে।
قَالُوا سَنُرَاوِدُ عَنْهُ أَبَاهُ وَإِنَّا لَفَاعِلُونَ
📘 তারা বলল, ‘ওর বিষয়ে আমরা ওর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।’ [১]
[১] অর্থাৎ সেই ভাইকে নিয়ে আসার জন্য আমরা আব্বাকে উদ্ধুদ্ধ করব, আশা করি যে, আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা সফল হব।
وَقَالَ لِفِتْيَانِهِ اجْعَلُوا بِضَاعَتَهُمْ فِي رِحَالِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَعْرِفُونَهَا إِذَا انْقَلَبُوا إِلَىٰ أَهْلِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
📘 ইউসুফ তার (কর্মচারী) যুবকদেরকে[১] বলল, ‘তাদের দেওয়া পণ্যমূল্য তাদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দাও;[২] যাতে ওরা স্বজনগণের নিকট ফিরে যাওয়ার পর তারা তা চিনতে পারে, তাহলে সম্ভবতঃ তারা পুনরায় ফিরে আসবে।’
[১] فِتْيَانٌ (যুবকগণ) শব্দ থেকে এখানে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, যারা রাজদরবারে ভৃত্য-চাকর এবং খাদেম-সেবক ও গোলাম-দাস হিসেবে নিযুক্ত ছিল।
[২] এর অর্থ সেই পণ্যমূল্য বা পুঁজি যা ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা শস্য ক্রয় করার জন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। رِحَالٌ (সফর সামান বা মালপত্র)-এর অর্থ তাদের ঐসব সরঞ্জাম যা তাদের সফরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। 'পুঁজি' গুপ্তভাবে তাদের সরঞ্জামে রেখে দেয়ার আদেশ এ জন্য দিয়েছিলেন যে, হয়তো দ্বিতীয়বার আসার জন্য তাদের কাছে পুঁজি না থাকলে এই পুঁজি নিয়েই চলে আসবে।
فَلَمَّا رَجَعُوا إِلَىٰ أَبِيهِمْ قَالُوا يَا أَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الْكَيْلُ فَأَرْسِلْ مَعَنَا أَخَانَا نَكْتَلْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
📘 অতঃপর যখন তারা তাদের পিতার নিকট ফিরে এল, তখন বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য খাদ্য-সামগ্রী নিষিদ্ধ করা হয়েছে।[১] সুতরাং আমাদের সাথে আমাদের ভাইকে পাঠিয়ে দিন; যাতে আমরা খাদ্য-সামগ্রী পেতে পারি। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’
[১] অর্থাৎ, আগামীর শস্যপ্রাপ্তি বিন্য়্যামীনকে পাঠানোর উপর নির্ভরশীল। যদি সে আমাদের সাথে যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে। আর যদি না যায়, তাহলে শস্য পাওয়া যাবে না। সুতরাং তাকে আমাদের সাথে অবশ্যই পাঠান, যেন গত বারের মত দ্বিতীয়বারও শস্য পাই। আর ইউসুফকে পাঠাবার সময় যে ভয় করেছিলেন, সে ধরনের ভয় করবেন না। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের।
قَالَ هَلْ آمَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنْتُكُمْ عَلَىٰ أَخِيهِ مِنْ قَبْلُ ۖ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
📘 সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে ওর সম্বন্ধে সেইরূপই বিশ্বাস করব, যেরূপ বিশ্বাস ওর ভাই সম্বন্ধে পূর্বে তোমাদেরকে করেছিলাম?[১] সুতরাং আল্লাহই শ্রেষ্ঠ রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ [২]
[১] অর্থাৎ, ইউসুফকেও সাথে নিয়ে যাবার সময় এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, কিন্তু যা কিছু হলো তা সকলের কাছে স্পষ্ট। এখন বল আমি তোমাদের প্রতি কিভাবে আস্থা রাখি?
[২] আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু শস্যের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, তাই পিতা বিনয়্যামীনকে তাদের সাথে পাঠাতে অস্বীকার করা উচিত মনে করলেন না এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তাকে পাঠাবার জন্য তৈরী হয়ে গেলেন।
وَلَمَّا فَتَحُوا مَتَاعَهُمْ وَجَدُوا بِضَاعَتَهُمْ رُدَّتْ إِلَيْهِمْ ۖ قَالُوا يَا أَبَانَا مَا نَبْغِي ۖ هَٰذِهِ بِضَاعَتُنَا رُدَّتْ إِلَيْنَا ۖ وَنَمِيرُ أَهْلَنَا وَنَحْفَظُ أَخَانَا وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيرٍ ۖ ذَٰلِكَ كَيْلٌ يَسِيرٌ
📘 যখন তারা তাদের মালপত্র খুলল, তখন তারা দেখতে পেল তাদের পণ্যমূল্য তাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করতে পারি?[১] এই তো আমাদের দেওয়া পণ্যমূল্য আমাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। পুনরায় আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী এনে দেব এবং আমরা আমাদের ভাইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করব এবং আমরা অতিরিক্ত আর এক উষ্ট্রী বোঝাই পণ্য আনব।[২] যা এনেছি তা পরিমাণে অল্প।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, বাদশাহ আমাদের যথারীতি আতিথ্যও করলেন এবং আমাদের পুঁজিও ফেরৎ দিলেন, তাঁর এই সদ্ব্যবহারের পর আর আমাদের কি চাই?
[২] কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিকে ততটা পরিমাণ শস্য দেওয়া হতো যতটা তার উট বহন করতে পারতো, বিনয়্যামীনের কারণে একটি উটের বোঝ পরিমাণ শস্য আরো বেশি পাওয়া যেতো।
[৩] يسير এর একটি ভাবার্থ এই যে, রাজার জন্য এক উটের বোঝা পরিমাণ শস্য দেয়া সহজ, কষ্টকর ব্যাপার নয়। দ্বিতীয় ভাবার্থ এই যে, ذلك দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই শস্যের দিকে যা তারা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল এবং يسير এর অর্থ অল্প, অর্থাৎ যে পরিমাণ শস্য আমরা সাথে নিয়ে এসেছি তা অল্প। বিন্য়্যামীনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে যদি বেশি পরিমাণে শস্য পাওয়া যায়, তাহলে তো ভাল কথা, আমাদের প্রয়োজনাদি ভালোরূপে পূরণ হয়ে যাবে।
قَالَ لَنْ أُرْسِلَهُ مَعَكُمْ حَتَّىٰ تُؤْتُونِ مَوْثِقًا مِنَ اللَّهِ لَتَأْتُنَّنِي بِهِ إِلَّا أَنْ يُحَاطَ بِكُمْ ۖ فَلَمَّا آتَوْهُ مَوْثِقَهُمْ قَالَ اللَّهُ عَلَىٰ مَا نَقُولُ وَكِيلٌ
📘 পিতা বলল, ‘আমি ওকে কক্ষনো তোমাদের সাথে পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা তাকে আমার নিকট অবশ্যই ফিরিয়ে আনবে; তবে তোমরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে সে কথা ভিন্ন।’[১] অতঃপর যখন তারা তাঁর নিকট অঙ্গীকার করল, তখন সে বলল, ‘আমরা যা কিছু বলছি, আল্লাহ তার বিধায়ক।’
[১] অর্থাৎ, তোমরা সকলে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড় অথবা তোমরা ধ্বংস কিংবা গ্রেপ্তার হয়ে যাও, যা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তোমরা অসমর্থ, তাহলে তা ভিন্ন কথা, উক্ত পরিস্থিতিতে তোমাদের ওযর গ্রহণযোগ্য হবে।
وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ ۖ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
📘 সে (ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (শহরের) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।[১] আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। বিধান আল্লাহরই।[২] আমি তাঁরই উপর নির্ভর করলাম এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা আল্লাহরই উপর নির্ভর করুক।’
[১] যখন বিনয়্যামীন সহ এগারো জন ভাই মিসর অভিমুখে রওয়ানা দিল, তখন তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কেননা একই পিতার এগারো জন পুত্র যারা দেহের উচ্চতা এবং আকার-আকৃতিতেও শ্রেষ্ঠ, যখন একসাথে একই স্থান অথবা দলবদ্ধভাবে কোথাও দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সাধারণতঃ লোকেরা আশ্চর্য এবং হিংসার দৃষ্টিতে দেখে, আর এটাই নজর লাগার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে বদনজর থেকে বাঁচাবার জন্য উপায় স্বরূপ এই নির্দেশনা দিলেন। নজর লাগা সত্য। এটি নবী (সাঃ) থেকে বহু বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন একটি হাদীসে আছে; الْعَيْنُ حَقٌّ অর্থাৎ নজর লাগা সত্য। (বুখারীঃ চিকিৎসা অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) এবং নবী (সাঃ) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য স্বীয় উম্মতকে কতিপয় উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস ভালো লাগে, তখন بَارَكَ اللهُ বলো।
(মুঅত্ত্বা
মালিক, আলবানীর তা'লীকাতে মিশকাত ১২৮৬নং)
যার নজরে নজর লাগে, তাকে গোসল করতে বলা এবং তার গোসলের এই পানি সেই ব্যক্তির শরীরে ঢালা যাকে নজর লেগেছে। (পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি) অনুরূপ ﴿مَا شَاءَ اللهُ لاَ قُوَّةَ إلاَّ بِالله﴾ِ পড়া কুরআন থেকে প্রমাণিত।
(সূরা কাহফ ১৮:৩৯)
﴿قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ﴾ এবং ﴿ قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ﴾ নজর লাগার চিকিৎসায় পড়ে ফুঁক দেওয়া উচিত।
(তিরমিযী)
[২] অর্থাৎ, উক্ত নির্দেশনা বাহ্যিক উপায়, সতর্কতা ও সুব্যবস্থা স্বরূপ; যা অবলম্বন করার আদেশ মানুষকে করা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্যে কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে না। ঘটবে সেটাই যেটা তাঁর সিদ্ধান্ত বা ফায়সালা অনুসারে তাঁর হুকুম হবে।
وَلَمَّا دَخَلُوا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُمْ مَا كَانَ يُغْنِي عَنْهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا حَاجَةً فِي نَفْسِ يَعْقُوبَ قَضَاهَا ۚ وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِمَا عَلَّمْنَاهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
📘 যখন তারা তাদের পিতা তাদেরকে যেভাবে আদেশ করেছিল সেভাবেই প্রবেশ করল, তখন আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে ওটা তাদের কোন কাজে আসল না; ইয়াকূব শুধু তার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করেছিল মাত্র।[১] আর সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল; কারণ আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়। [২]
[১] অর্থাৎ, এই কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্যকে মুলতবি বা রদ করা সম্ভব নয়, তবুও ইয়াকূব (আঃ)-এর মনে বদনজর লেগে যাওয়ার যে আশঙ্কা ছিল, তার ভিত্তিতে তিনি এরূপ বলেছিলেন।
[২] অর্থাৎ এই কৌশল অবলম্বন ইলাহী অহীর আলোকে ছিল এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না --এ আকীদাও আল্লাহর শিখানো জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই ছিল, যে ব্যাপারে অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ।
وَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَخَاهُ ۖ قَالَ إِنِّي أَنَا أَخُوكَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
📘 তারা যখন ইউসুফের সামনে হাজির হল, তখন সে তার (সহোদর) ভাইকে নিজের কাছে রাখল এবং বলল, ‘আমিই তোমার (সহোদর) ভাই, সুতরাং তারা যা করত, তার জন্য তুমি দুঃখ করো না।’[১]
[১] কতিপয় মুফাসসিরীন বলেন যে, এক একটি রুমে দু'জন করে ভাইকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল, এমনিভাবে বিনয়্যামীন যখন একাই অবশিষ্ট রয়ে গেলেন, তখন ইউসুফ (আঃ) তাঁকে একটি পৃথক রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। অতঃপর নির্জনে তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করলেন এবং পূর্বের ঘটনা উল্লেখ করে বললেন যে, এই ভায়েরা আমার সাথে যে আচরণ করেছে তার জন্য দুঃখ করো না। আর কতিপয় মুফাসসিরীন বলেন যে, বিনয়্যামীনকে আটকানোর জন্য যে ফন্দি বা বাহানা করার ছিল, সে সম্পর্কেও তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি পেরেশান না হন।
(ইবনে কাসীর)
۞ لَقَدْ كَانَ فِي يُوسُفَ وَإِخْوَتِهِ آيَاتٌ لِلسَّائِلِينَ
📘 নিশ্চয়ই ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। [১]
[১] অর্থাৎ, এই ঘটনাতে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং নবী (সাঃ)-এর নবুঅতের সত্যবাদিতার বড় নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন তফসীরবিদ এখানে ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের নাম এবং তাঁদের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
فَلَمَّا جَهَّزَهُمْ بِجَهَازِهِمْ جَعَلَ السِّقَايَةَ فِي رَحْلِ أَخِيهِ ثُمَّ أَذَّنَ مُؤَذِّنٌ أَيَّتُهَا الْعِيرُ إِنَّكُمْ لَسَارِقُونَ
📘 অতঃপর সে (ইউসুফ) যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন সে তার (সহোদর) ভাই-এর মালপত্রের মধ্যে পানপাত্র (সা’) রেখে দিল।[১] অতঃপর এক আহবায়ক চীৎকার করে বলল, ‘হে যাত্রীদল[২] তোমরা নিশ্চয়ই চোর।’ [৩]
[১] মুফাসসিরগণ বলেছেন যে, এই سِقَايَة (পানপাত্র)টি স্বর্ণ অথবা রৌপ্যনির্মিত ছিল। পানি পান করা ছাড়া শস্য মাপার কাজও তার দ্বারা নেওয়া হতো। ওটা চুপিসারে বিনয়্যামীনের মালপত্রে রেখে দেওয়া হয়েছিল।
[২] الْعِيْرُ বাস্তবে সেই উট, গাধা অথবা খচ্চরদলকে বলা হয় যাদের উপর শস্য চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, এখানে এর অর্থ হচ্ছে أصْحَابُ الْعِيْرِ অর্থাৎ যাত্রীদল।
[৩] চুরির এই দোষারোপ স্বস্থানে বাস্তবিক ছিল। কেননা আহবায়ক সেবক ইউসুফ (আঃ)-এর পরিকল্পিত কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিল না। অথবা এর অর্থ এই যে, তোমাদের অবস্থা তো চোরদের মত, যেহেতু রাজার অনুমতি ছাড়াই তাঁর পানপাত্র তোমাদের মালপত্রের ভিতরে রয়েছে।
قَالُوا وَأَقْبَلُوا عَلَيْهِمْ مَاذَا تَفْقِدُونَ
📘 তারা তাদের দিকে চেয়ে বলল, ‘তোমরা কি হারিয়েছ?’
قَالُوا نَفْقِدُ صُوَاعَ الْمَلِكِ وَلِمَنْ جَاءَ بِهِ حِمْلُ بَعِيرٍ وَأَنَا بِهِ زَعِيمٌ
📘 তারা বলল, ‘আমরা রাজার পানপাত্র (সা’) হারিয়েছি; যে ওটা এনে দেবে, সে এক উট বোঝাই মাল পাবে এবং আমি তার যামিন।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমি এই কথার যামানত দিচ্ছি যে, তল্লাশি চালানোর পূর্বে যে ব্যক্তি এই শাহী পানপাত্র আমাদেরকে ফেরত বা খুঁজে দেবে, তাকে পুরস্কার অথবা পারিশ্রমিক স্বরূপ এতটা পরিমাণ শস্য প্রদান করা হবে, যা একটি উট বহন করতে পারে।
قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمْتُمْ مَا جِئْنَا لِنُفْسِدَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كُنَّا سَارِقِينَ
📘 তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! তোমরা তো জান যে, আমরা এই দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে আসিনি এবং আমরা চোরও নই।’ [১]
[১] ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা যেহেতু এই সুপরিকল্পিত কৌশল সম্পর্কে অনবগত ছিলেন, যা ইউসুফ (আঃ) অবলম্বন করেছিলেন, সেহেতু তাঁরা নিজেদের ব্যাপারে চোর হওয়ার এবং দেশে অশান্তি সৃষ্টি করার কথা শপথ করে খন্ডন করছিলেন।
قَالُوا فَمَا جَزَاؤُهُ إِنْ كُنْتُمْ كَاذِبِينَ
📘 তারা বলল, ‘যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তাহলে তার শাস্তি কি?’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের মালপত্রে উক্ত শাহী পানপাত্র পাওয়া গেলে তার শাস্তি কি হবে?
قَالُوا جَزَاؤُهُ مَنْ وُجِدَ فِي رَحْلِهِ فَهُوَ جَزَاؤُهُ ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ
📘 তারা বলল, ‘এর শাস্তি এই যে, যার মালপত্রের মধ্যে পাত্রটি পাওয়া যাবে, সেই হবে তার বিনিময়।[১] এভাবে আমরা সীমালংঘনকারীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।’ [২]
[১] অর্থাৎ চোরকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঐ ব্যক্তির হাতে দাসরূপে সঁপে দেওয়া হতো, যার সে চুরি করতো। এটা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে শাস্তি ছিল, তাই সেই মোতাবেক ইউসুফ (আঃ)-এর ভায়েরা এই শাস্তির প্রস্তাব পেশ করলেন।
[২] এই উক্তিটিও ইউসুফ (আঃ)-এর ভাইদের। কতক ব্যাখ্যাকারীদের নিকট এ উক্তি ইউসুফ (আঃ)-এর কর্মচারীদের। তারা বলেছিল, আমরাও যালিম (অপরাধী)-দেরকে এ ধরনেরই সাজা দিয়ে থাকি। কিন্তু পরবর্তী আয়াতের এই অংশ 'রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না' এ কথার খন্ডন করছে।
فَبَدَأَ بِأَوْعِيَتِهِمْ قَبْلَ وِعَاءِ أَخِيهِ ثُمَّ اسْتَخْرَجَهَا مِنْ وِعَاءِ أَخِيهِ ۚ كَذَٰلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ ۖ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ ۚ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ ۗ وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ
📘 অতঃপর সে তার (সহোদর) ভ্রাতার মালপত্র তল্লাশি করার পূর্বে ওদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল।[১] এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম।[২] আল্লাহ ইচ্ছা না করলে রাজার আইনে তার সহোদরকে সে (দাস বানিয়ে) আটক করতে পারত না।[৩] আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি।[৪] আর প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে অধিক জ্ঞানী।[৫]
[১] প্রথমে অন্য ভাইদের মালপত্রের তল্লাশি নিল এবং শেষে বিনয়্যামীনের মালপত্র দেখল, যাতে করে তাদের সন্দেহ না হয় যে, এটা কোন সুপরিকল্পিত কৌশল।
[২] অর্থাৎ, আমি ইউসুফকে অহীর মাধ্যমে এই কৌশলটি বুঝিয়ে দিলাম। এ থেকে জানা গেল যে, কোন সঠিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ ধরনের কৌশল-পথ অবলম্বন করা বৈধ; যার বাহ্যিক রূপ বাহানা ও ফন্দি, এই শর্তে যে উক্ত পথ যেন কোন শরয়ী নিয়মের পরিপন্থী না হয়।
(ফাতহুল কাদীর)
[৩] অর্থাৎ রাজার যে আইন তথা নিয়ম মিসরে প্রচলিত ছিল, সেই মোতাবেক বিনয়্যামীনকে এভাবে আটকানো সম্ভব ছিল না, তাই তারা যাত্রীদলকেই জিজ্ঞেস করল যে, বল, এই অপরাধের দন্ড কি হওয়া উচিত?
[৪] যেমন নিজ দয়া ও অনুগ্রহে ইউসুফকে সুউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।
[৫] অর্থাৎ প্রত্যেক জ্ঞানী থেকে বড় কোন না কোন জ্ঞানী থাকে। সুতরাং কোন জ্ঞানী যেন এই ধোকায় নিপতিত না হয় যে, আমিই এই যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। কতক মুফাসসিরীন বলেছেন, এর ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক জ্ঞানীর উপর একজন সর্বজ্ঞানী অর্থাৎ মহান আল্লাহ আছেন।
۞ قَالُوا إِنْ يَسْرِقْ فَقَدْ سَرَقَ أَخٌ لَهُ مِنْ قَبْلُ ۚ فَأَسَرَّهَا يُوسُفُ فِي نَفْسِهِ وَلَمْ يُبْدِهَا لَهُمْ ۚ قَالَ أَنْتُمْ شَرٌّ مَكَانًا ۖ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَصِفُونَ
📘 তারা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে, তাহলে তার (সহোদর) ভাইও তো ইতিপূর্বে চুরি করেছিল।’[১] কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখল এবং তাদের কাছে প্রকাশ করল না। সে (মনে মনে) বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর[২] এবং তোমরা যা বলছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।’
[১] এটা তারা নিজেদের পবিত্রতা ও সাধুতা প্রকাশ করার জন্য বলেছিলেন। কেননা ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীন উভয়ই তাঁদের সহোদর ভাই ছিলেন না বরং বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। কতিপয় ব্যাখ্যাকারী ইউসুফ (আঃ)-এর চুরির ব্যাপারে দুটি রহস্যময় কথা উল্লেখ করেছেন, যা কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর ভিত্তিশীল নয়। বিশুদ্ধ কথা এটাই মনে হচ্ছে যে, তাঁরা নিজেদেরকে তো নেহাত সাধুতা ও সচ্চরিত্রের অধিকারী প্রমাণ করলেন। আর ইউসুফ (আঃ) ও বিনয়্যামীনকে হীন চরিত্রের সাব্যস্ত করলেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁদেরকে চোর ও বেঈমান প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করলেন।
[২] ইউসুফ (আঃ)-এর এই উক্তি থেকেও স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা তাঁর সম্বন্ধে চুরি করার কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ আরোপের কাজ করেছিলেন।
قَالُوا يَا أَيُّهَا الْعَزِيزُ إِنَّ لَهُ أَبًا شَيْخًا كَبِيرًا فَخُذْ أَحَدَنَا مَكَانَهُ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ
📘 তারা বলল, ‘হে আযীয![১] এর পিতা আছেন অতিশয় বৃদ্ধ, সুতরাং এর স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন! আমরা তো আপনাকে দেখছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন।’ [২]
[১] তাঁরা ইউসুফ (আঃ)-কে 'আযীয' (মিসরের রাজা) এ জন্য বলেছিলেন যে, সেই সময় সমস্ত মৌলিক এখতিয়ার ও শক্তি ইউসুফ (আঃ)-এর হাতেই ছিল। আর মিসরের আসল রাজা শুধু নামমাত্র রাজা ছিলেন।
[২] পিতা তো অবশ্যই বৃদ্ধ ছিলেন, কিন্তু এখানে তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিনয়্যামীনকে মুক্ত করা। তাঁদের মাথায় ইউসুফ (আঃ) সংক্রান্ত কথা স্মরণ হচ্ছিল যে, এমন আবার না হয় যে, বিনয়্যামীনকে ছেড়ে পিতার কাছে আমাদেরকে ফিরে যেতে হয় এবং তিনি আমাদেরকে বলেন যে, তোমরা আমার বিনয়্যামীনকে ইউসুফের মত হারিয়ে এলে। তাই ইউসুফ (আঃ)-এর মহানুভবতা ও অনুগ্রহের প্রশংসা করে এই কথা বললেন, হয়তো তিনি এ অনুগ্রহটুকুও করবেন যে, বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর স্থলে অন্য কোন ভাইকে রেখে নেবেন।
قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ أَنْ نَأْخُذَ إِلَّا مَنْ وَجَدْنَا مَتَاعَنَا عِنْدَهُ إِنَّا إِذًا لَظَالِمُونَ
📘 সে বলল, ‘যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি! এরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী হব।’ [১]
[১] এই উত্তর এ জন্য দিলেন যে, বিনয়্যামীনকেই আটকে রাখাই তো ইউসুফ (আঃ)-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।
إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَىٰ أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
📘 (স্মরণ কর) যখন তারা (তার ভাইরা) বলেছিল, ‘আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার (সহোদর) ভাই[১] (বিনয়ামীন)ই আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি (সংহত) দল,[২] আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছেন। [৩]
[১] 'তার (সহোদর) ভাই' বলে বিনয়্যামীনকে বুঝানো হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, আমরা দশ ভাই শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর ইউসুফ ও বিনয়্যামীন মাত্র দুইজন। এর পরেও তারা আমাদের পিতার চক্ষুর শীতলতা ও মনের প্রফুল্লতা!
[৩] এখানে বিভ্রান্তির অর্থ হল ভুল; যা তাঁদের ধারণা অনুযায়ী তাঁদের পিতা ইউসুফ ও বিনয়্যামীনকে অধিক ভালবেসে করেছিলেন।
فَلَمَّا اسْتَيْأَسُوا مِنْهُ خَلَصُوا نَجِيًّا ۖ قَالَ كَبِيرُهُمْ أَلَمْ تَعْلَمُوا أَنَّ أَبَاكُمْ قَدْ أَخَذَ عَلَيْكُمْ مَوْثِقًا مِنَ اللَّهِ وَمِنْ قَبْلُ مَا فَرَّطْتُمْ فِي يُوسُفَ ۖ فَلَنْ أَبْرَحَ الْأَرْضَ حَتَّىٰ يَأْذَنَ لِي أَبِي أَوْ يَحْكُمَ اللَّهُ لِي ۖ وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِينَ
📘 যখন তারা তার নিকট হতে সম্পূর্ণ নিরাশ হল, তখন তারা নির্জনে গিয়ে পরামর্শ করতে লাগল।[১] ওদের মধ্যে যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিল সে বলল, ‘তোমরা কি জান না যে, তোমাদের পিতা তোমাদের নিকট হতে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বেও তোমরা ইউসুফের ব্যাপারে ত্রুটি করেছিলে। সুতরাং আমি কিছুতেই এই দেশ ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন[২] অথবা আল্লাহ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। [৩]
[১] কেননা বিনয়্যামীনকে ছেড়ে যাওয়া ভীষণ কঠিন ছিল, তাঁরা পিতাকে মুখ দেখানোর যোগ্য ছিলেন না। তাই তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এখন কি করা যায়?
[২] তাঁদের বড় ভাই এই পরিস্থিতিতে নিজের মধ্যে পিতার সাথে সাক্ষাৎ করার শক্তি ও ক্ষমতা না পেয়ে স্পষ্ট বলে ফেললেন যে, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এখান থেকে যাব না; যতক্ষণ পর্যন্ত না আব্বাজান নিজে তদন্ত করে দেখে আমার নির্দোষ হওয়ার কথা বিশ্বাস করে নেবেন এবং আমাকে আসার অনুমতি দেবেন।
[৩] 'আল্লাহ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন' এর অর্থ হলো যে, কোন প্রকারে আযীয (মিসরের বাদশা) বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে আমার সাথে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দেন। অথবা এর অর্থ হলো এই যে, আল্লাহ তাআ'লা আমাকে এতটা শক্তি দান করুন যে, আমি বিনয়্যামীনকে তরবারির জোরে অর্থাৎ শক্তির জোরে মুক্ত করে আমার সাথে নিয়ে যাই।
ارْجِعُوا إِلَىٰ أَبِيكُمْ فَقُولُوا يَا أَبَانَا إِنَّ ابْنَكَ سَرَقَ وَمَا شَهِدْنَا إِلَّا بِمَا عَلِمْنَا وَمَا كُنَّا لِلْغَيْبِ حَافِظِينَ
📘 তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং বল, হে আমাদের পিতা! আপনার পুত্র চুরি করেছে এবং আমরা যা জানি, তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম।[১] আর অদৃশ্যের ব্যাপারে আমরা অবহিত ছিলাম না।[২]
[১] অর্থাৎ, আমরা যে কথা দিয়েছিলাম যে, আমরা বিনয়্যামীনকে সকুশল ফিরিয়ে নিয়ে আসব, তা আমাদের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দিয়েছিলাম, পরে যে ঘটনা ঘটল এবং যার কারণে বিনয়্যামীনকে রেখে আসতে হল, এটা তো আমাদের ধারণাতীত বিষয়। দ্বিতীয় অর্থ হলো এই যে, আমরা চুরির যে শাস্তির কথা বলেছিলাম যে, চোরকেই চুরির পরিবর্তে রেখে নেওয়া হোক, তা আমরা আমাদের জ্ঞানানুসারে নির্ধারণ করেছিলাম, এতে কোন প্রকার অসদুদ্দেশ্য ছিল না। (যেহেতু আমরা সুনিশ্চিত ছিলাম যে, আমাদের মধ্যে কেউ চুরি করতেই পারে না।) কিন্তু ঘটনাক্রমে যখন সামানের তল্লাশি নেওয়া হলো, তখন চুরিকৃত পানপাত্র বিনয়্যামীনের মালপত্র থেকেই বের হলো।
[২] অর্থাৎ ভবিষ্যতে ঘটিতব্য ঘটনা সম্পর্কে আমরা অনবগত ছিলাম।
وَاسْأَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا وَالْعِيرَ الَّتِي أَقْبَلْنَا فِيهَا ۖ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ
📘 যে জনপদে আমরা ছিলাম ওর অধিবাসীদেরকে এবং যে যাত্রীদলের সাথে আমরা এসেছিলাম তাদেরকেও জিজ্ঞাসা করুন; আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’ [১]
[১] الْقَرْيَة অর্থাৎ মিসর যেখানে তাঁরা শস্য নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। এখানে মিসর বলতে মিসরবাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অনুরূপ الْعِيْر (কাফেলা) বলতে কাফেলার যাত্রীদেরকে বুঝানো হয়েছে। আপনি মিসরে গিয়ে মিসরবাসীদেরকে এবং কাফেলার যাত্রীদেরকে যারা আমাদের সাথে এসেছে জিজ্ঞেস করে নিন যে, আমরা যা বলছি তাই সত্য; এতে মিথ্যার কোন মিশ্রণ (অবকাশ) নেই।
قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
📘 ইয়াকূব বলল, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে নিয়েছে;[১] সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়; হয়তো আল্লাহ ওদের সকলকেই আমার কাছে এনে দেবেন।[২] নিশ্চয় তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
[১] ইয়াকূব (আঃ) যেহেতু বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং মহান আল্লাহ তাঁকে অহীর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে অবগতও করেননি, সেহেতু তিনি এটাই বুঝেছিলেন যে, আমার এই ছেলেরা যেমন এর পূর্বে ইউসুফ সম্পর্কে মনগড়া কথা বলেছিল, অনুরূপ এর সম্পর্কেও মনগড়া কথা বলছে। এরা বিনয়্যামীনের সাথে কি আচরণ করেছে? এর নিশ্চিত জ্ঞান ইয়াকূব (আঃ)-এর নিকট ছিল না বটে, কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর ঘটনার উপর অনুমান করে তাঁদের সম্পর্কে তাঁর মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল।
[২] এমতাবস্থায় ধৈর্য ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। তবুও ধৈর্যের সাথে আশার বাসা ভেঙ্গে দেননি। جَمِيْعًا (সকলকেই) অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ), বিনয়্যামীন এবং তাঁদের বড় ভাই, যিনি লজ্জার বশবর্তী হয়ে মিসরেই থেকে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, আব্বাজান হয় আমাকে এ অবস্থায় আসার অনুমতি দিন, আর না হয় আমি যে কোন প্রকারে বিনয়্যামীনকে সাথে নিয়ে ফিরব।
وَتَوَلَّىٰ عَنْهُمْ وَقَالَ يَا أَسَفَىٰ عَلَىٰ يُوسُفَ وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ
📘 সে ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, ‘আফসোস ইউসুফের জন্য!’[১] আর শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল[২] এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট ।
[১] অর্থাৎ, এই টাটকা ঘা ইউসুফ হারানোর পুরাতন ঘাকেও তাজা করে তুলল।
[২] অর্থাৎ চোখের কালো তারা ভীষণ শোক ও দুঃখের কারণে সাদা হয়ে গিয়েছিল।
قَالُوا تَاللَّهِ تَفْتَأُ تَذْكُرُ يُوسُفَ حَتَّىٰ تَكُونَ حَرَضًا أَوْ تَكُونَ مِنَ الْهَالِكِينَ
📘 তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা স্মরণ করতেই থাকবেন, যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষু হবেন অথবা মৃত্যুবরণ করবেন।’ [১]
[১] حَرَضٌ ঐ শারীরিক বিকার অথবা বিবেকের দুর্বলতাকে বলা হয় যা বার্ধক্য, প্রেম-ভালবাসা অথবা নিরন্তর দুশ্চিন্তার কারণে মানুষের মাঝে দেখা দেয়। পিতার মুখে ইউসুফের কথা উল্লেখের কারণে তাঁর ভাইদের হিংসা-অগ্নি আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল, ফলে স্বীয় পিতাকে তাঁরা এমনটি বললেন।
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
📘 সে বলল, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ শুধু আল্লাহরই নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহর নিকট হতে তা জানি, যা তোমরা জান না। [১]
[১] এর উদ্দেশ্য, হয় সেই ইউসুফের দেখা স্বপ্ন যার সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, এর ব্যাখ্যা (বাস্তবতা) অবশ্যই সামনে আসবে এবং তিনি ইউসুফকে সিজদা করবেন। অথবা তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, ইউসুফ জীবিত আছে, জীবনে অবশ্যই তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে।
يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِنْ يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
📘 হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাঁর সহোদরের অনুসন্ধান কর[১] এবং আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয়ো না, কারণ অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর করুণা হতে নিরাশ হয় না।’[২]
[১] অতএব তিনি উক্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই স্বীয় পুত্রদেরকে এই আদেশ করলেন।[২] যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন: ﴿وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلاَّ الضَّآلُّونَ﴾ "কেবল ভ্রষ্ট লোকরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে থাকে।" (সূরা হিজর ১৫:৫৬) এর অর্থ এই যে, মুমিনদেরকে চরম কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্যহারা ও সংযমহীন হতে নেই এবং আল্লাহর অসীম কৃপার আশা ছাড়তে নেই।
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَيْهِ قَالُوا يَا أَيُّهَا الْعَزِيزُ مَسَّنَا وَأَهْلَنَا الضُّرُّ وَجِئْنَا بِبِضَاعَةٍ مُزْجَاةٍ فَأَوْفِ لَنَا الْكَيْلَ وَتَصَدَّقْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّ اللَّهَ يَجْزِي الْمُتَصَدِّقِينَ
📘 যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল[১] তখন বলল, ‘হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি[২] এবং আমরা তুচ্ছ পণ্য নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন[৩] এবং আমাদেরকে দান করুন; [৪] নিশ্চয় আল্লাহ দানীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।’
[১] তাঁদের মিসর আগমনের এটা তৃতীয় দফা ছিল।
[২] অর্থাৎ শস্য নেবার জন্য আমরা যে পরিমাণ পণ্যমূল্য (পুঁজি) নিয়ে এসেছি, তা অতি অল্প ও নগণ্য।
[৩] অর্থাৎ আমাদের অল্প পুঁজির দিকে লক্ষ্য না করে আমাদেরকে এর পরিবর্তে পূর্ণ মাপ দিন।
[৪] অর্থাৎ আমাদের এই অল্প পুঁজি গ্রহণ করে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও খয়রাত করুন। কোন কোন ব্যাখ্যাকারী এর অর্থ করেছেন যে, আমাদের ভাই বিনয়্যামীনকে ছেড়ে দিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।
قَالَ هَلْ عَلِمْتُمْ مَا فَعَلْتُمْ بِيُوسُفَ وَأَخِيهِ إِذْ أَنْتُمْ جَاهِلُونَ
📘 সে বলল, ‘তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে (পরিণাম সম্বন্ধে) অজ্ঞ?’ [১]
[১] যখন তাঁরা অতি নম্রতার সাথে দান-খয়রাত করার অথবা ভাইকে মুক্ত করার জন্য আপীল করলেন এবং সাথে সাথে পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র-বিচ্ছেদের আঘাতের কথাও উল্লেখ করলেন, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর হৃদয় আকুল হয়ে পড়ল, চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে গেল এবং বাস্তব ঘটনা ব্যক্ত করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তিনি ভাইদের শত্রুতার কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে উদার চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে ভুলে যাননি। সুতরাং তিনি বললেন, এ কাজ তোমরা তখন করেছিলে, যখন তোমরা মূর্খ ও অজ্ঞ ছিলে।
اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِنْ بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ
📘 ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোন (দূরবর্তী) স্থানে ফেলে এস, তাহলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে এবং তারপরে তোমরা (তওবা করে) ভাল লোক হয়ে যাবে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তওবা করে নেবে। অর্থাৎ, কূপে নিক্ষেপ করা অথবা হত্যা করার পর সেই গোনাহ থেকে আল্লাহর নিকট তওবা করে নেবে।
قَالُوا أَإِنَّكَ لَأَنْتَ يُوسُفُ ۖ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهَٰذَا أَخِي ۖ قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا ۖ إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
📘 তারা বলল, ‘তবে কি তুমিই ইউসুফ?’[১] সে বলল, ‘আমিই ইউসুফ এবং এই আমার সহোদর; আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; যে ব্যক্তি সংযম ও ধৈর্য অবলম্বন করে, আল্লাহ সেইরূপ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’ [২]
[১] ভায়েরা যখন মিসর-অধিপতির মুখ থেকে সেই ইউসুফের কথা শুনলেন, যাকে বাল্যকালে তাঁরা কানআনের এক অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করে দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা অবাক হলেন এবং তাঁর দিকে মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে ভাবলেন, ব্যাপার এমন তো নয় যে, যিনি আমাদের সাথে আলাপ করছেন, তিনিই ইউসুফ? তা নাহলে ইউসুফের ঘটনা তিনি কিভাবে জানতে পারলেন? সুতরাং তাঁরা প্রশ্ন করলেন যে, তুমিই ইউসুফ তো নও?
[২] প্রশ্নের জবাবে স্বীকারোক্তির সাথে সাথে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ এবং ধৈর্য ও সংযমের শুভ পরিণামের কথা বর্ণনা করে বললেন যে, তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রে কোন প্রকার ত্রুটি করনি, কিন্তু এটা আল্লাহর দয়া ও মেহেরবানী যে, তিনি না শুধু আমাকে কুয়া থেকে পরিত্রাণ দিলেন; বরং মিসরের রাজত্বও দান করলেন। আর এটা হলো সেই ধৈর্য ও সংযমের সুফল, যার তওফীক আল্লাহ আমাকে দান করেছিলেন।
قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللَّهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَخَاطِئِينَ
📘 তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে আমরাই ছিলাম অপরাধী।’ [১]
[১] ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর এই মহিমা দেখে নিজেদের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে নিলেন।
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
📘 সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই।[১] আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।
[১] ইউসুফ আলাইহিস সালামও নবুঅতী গরিমা দেখিয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন: যা হয়েছে তা হয়ে গেছে, আজ তোমাদেরকে কোন প্রকার ভৎর্সনা ও নিন্দা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ও মক্কার ঐসব কাফির এবং কুরাইশ বংশের নেতাদেরকে যারা তাঁর রক্ত-পিয়াসী ছিল এবং নানাবিধ যাতনা দিয়েছিল উক্ত শব্দগুলিই বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
اذْهَبُوا بِقَمِيصِي هَٰذَا فَأَلْقُوهُ عَلَىٰ وَجْهِ أَبِي يَأْتِ بَصِيرًا وَأْتُونِي بِأَهْلِكُمْ أَجْمَعِينَ
📘 তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার মুখমন্ডলের উপর রাখো; তিনি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন।[১] আর তোমরা তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে এস।’ [২]
[১] জামা মুখমন্ডলে রাখা মাত্র চোখের জ্যোতি ফিরে আসা একটি অলৌকিক মু'জিযা ও কারামত ছিল।
[২] এই বলে ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পরিবারের সকলকে মিসর আসার আহবান জানালেন।
وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ ۖ لَوْلَا أَنْ تُفَنِّدُونِ
📘 অতঃপর যাত্রীদল যখন বের হয়ে পড়ল, তখন তাদের পিতা বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে ভারসাম্যহীন মনে না কর, তাহলে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।’ [১]
[১] এদিকে উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছে মু'জিযা স্বরূপ ইউসুফ (আঃ)-এর সুগন্ধি আসতে লাগল। এটা যেন এ কথার ঘোষণা ছিল যে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ আসে রসূলও অনবগত থাকেন, যদিও পুত্র নিজ শহরের কোন কূপে থাকে (তবুও তিনি জানতে পারেন না)। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ যখন ব্যবস্থা করে দেন, তখন মিসরের মত দূর দূরান্ত এলাকা থেকেও পুত্রের সুগন্ধি চলে আসে।
قَالُوا تَاللَّهِ إِنَّكَ لَفِي ضَلَالِكَ الْقَدِيمِ
📘 তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন।’ [১]
[১] ضَلَال এর অর্থ মমতাময় ভালবাসার সেই বিহ্বলতা যা ইয়াকূব (আঃ)-এর স্বীয় পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে ছিল। পুত্রগণ বলতে লাগলেন, এখনও পর্যন্ত আপনি সেই আগের ভুলে; অর্থাৎ ইউসুফের মহব্বতে বিভোল রয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পরও ইউসুফের মহব্বত আপনার মন থেকে দূর হয়নি।
فَلَمَّا أَنْ جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَاهُ عَلَىٰ وَجْهِهِ فَارْتَدَّ بَصِيرًا ۖ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
📘 অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তার মুখমন্ডলের উপর জামাটি রাখল তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল।[১] সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে তা জানি, যা তোমরা জান না?’ [২]
[১] অর্থাৎ, যখন সুসংবাদদাতা এসে ইয়াকূব (আঃ)-এর চেহারায় উক্ত জামা রাখল, তখন অলৌকিকভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল।
[২] কেননা আমার নিকট জ্ঞানের একটি মাধ্যম অহীও আছে, যা তোমাদের মধ্যে কারো কাছে নেই। উক্ত অহীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদেরকে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুপাতে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন।
قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِئِينَ
📘 তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী।’
قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي ۖ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
📘 সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব,[১] তিনি অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
[১] সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে ভবিষ্যতে দু'আ করার ওয়াদা করলেন। উদ্দেশ্য এই ছিল যে, রাতের শেষ প্রহরে যে সময়টি আল্লাহর ইবাদতের জন্য তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ সময় সেই সময়ে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ করব। দ্বিতীয় কথা এই যে, ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি অন্যায় করেছিলেন, সেহেতু তাঁর পরামর্শ নেওয়া জরুরী ছিল। তাই তিনি সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে পরে করার ওয়াদা করলেন।
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ
📘 অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল[১] এবং বলল, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।
[১] অর্থাৎ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং ভক্তিপূর্ণ আপ্যায়ন করলেন।