🕋 تفسير سورة الجاثية
(Al-Jathiya) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ حم
📘 হা-মীম,
مِنْ وَرَائِهِمْ جَهَنَّمُ ۖ وَلَا يُغْنِي عَنْهُمْ مَا كَسَبُوا شَيْئًا وَلَا مَا اتَّخَذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
📘 ওদের পশ্চাতে রয়েছে জাহান্নাম;[১] ওদের কৃতকর্ম ওদের কোন কাজে আসবে না [২] এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে অভিভাবক স্থির করেছে, তারাও নয়।[৩] আর ওদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
[১] অর্থাৎ, যারা এই আচরণের মানুষ, তাদের জন্য কিয়ামতে রয়েছে জাহান্নাম।
[২] অর্থাৎ, দুনিয়াতে যে মাল তারা অর্জন করেছে, যে সন্তান-সন্ততি এবং দল-বলের জন্য তারা অহংকার প্রদর্শন করে থাকে, এ সব কিছুই কিয়ামতের দিন তাদের কোনই উপকারে আসবে না।
[৩] যাদেরকে দুনিয়াতে নিজেদের আলিয়া, অভিভাবক, বন্ধু, সাহায্যকারী এবং উপাস্য বানিয়ে রেখেছিল, সেদিন তারা তাদের নজরেই পড়বে না। তারা সাহায্য আর কি করবে?
هَٰذَا هُدًى ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَهُمْ عَذَابٌ مِنْ رِجْزٍ أَلِيمٌ
📘 এ (কুরআন)[১] সৎপথের দিশারী। যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্য রয়েছে অতিশয় কষ্টদায়ক শাস্তি। [২]
[১] هٰذَا (এ) অর্থাৎ, কুরআন সৎপথের দিশারী। কারণ, এর অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে কুফরী ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে ঈমানের আলোয় নিয়ে আসা। তাই এটা যে পূর্ণ হিদায়াত ও সৎপথের দিশারী গ্রন্থ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এ থেকে হিদায়াত তো সে-ই পাবে, যে এর জন্য স্বীয় বক্ষকে উন্মুক্ত করে দেবে। অন্যথা সে ব্যক্তি কিভাবে পথ পাবে, যে পথের খোঁজই করে না?
[২] أَلِيْمٌ হল عَذَابٌ এর 'সিফাত' (বিশেষণ)। কেউ কেউ একে رِجْزٌ এর সিফাত বলেছেন। رِجْزٌ মানে عَذَابٌ شَدِيْدٌ (কঠিন শাস্তি)।
۞ اللَّهُ الَّذِي سَخَّرَ لَكُمُ الْبَحْرَ لِتَجْرِيَ الْفُلْكُ فِيهِ بِأَمْرِهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
📘 আল্লাহ তো সাগরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন,[১] যাতে তাঁর আদেশে তাতে জলযানসমূহ চলাচল করতে পারে[২] এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার[৩] এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। [৪]
[১] অর্থাৎ, তাকে এমন বানিয়ে দিয়েছেন যেন তার উপর দিয়ে তোমরা নৌকা ও জল-জাহাজের মাধ্যমে সফর করতে পার।
[২] অর্থাৎ, সমুদ্রে নৌকা ও জাহাজসমূহের গমনাগমন তোমাদের কৃতিত্ব ও দক্ষতার ফল নয়, বরং এটা চলে আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর ইচ্ছায়। তা নাহলে তিনি ইচ্ছা করলে সমুদ্র-তরঙ্গে এমন উত্তাল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন যে, কোন নৌকা ও জাহাজ তার পৃষ্ঠে স্থির থাকতে পারবে না। যেমন কখনো কখনো তিনি তাঁর মহাশক্তির (কিঞ্চিৎ) বিকাশ ঘটানোর জন্য এ রকম করে থাকেন। যদি অব্যাহতভাবে তরঙ্গ উত্তাল অবস্থায় থাকে, তবে তোমরা কখনোও সমুদ্রে সফর করার সুযোগই পাবে না।
[৩] অর্থাৎ, সমুদ্র-পথে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে, সমুদ্রে ডুব মেরে মুক্তা-প্রবালাদি ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস বের করে এবং সমুদ্রস্থিত প্রাণী (মাছ ইত্যাদি) শিকার করে।
[৪] এ সব কিছুই এই জন্য করেছেন যে, যাতে তোমরা এই নিয়ামতসমূহের উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর, যে নিয়ামতসমূহ সমুদ্রকে তোমাদের আয়ত্তে করে দেওয়ার ফলে অর্জিত হয়।
وَسَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
📘 তিনি তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজের পক্ষ হতে,[১] চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে বহু নিদর্শন।
[১] 'অধীন' করার অর্থ হল, সেগুলোকে তোমাদের সেবায় নিযুক্ত করে রেখেছেন। তোমাদের জন্য যাবতীয় মঙ্গল ও উপকারিতা এবং তোমাদের জীবন ও জীবিকা সব কিছুই এরই সাথে সম্পৃক্ত। যেমন, চাঁদ-সূর্য, উজ্জ্বল তারকারাজি, মেঘ-বৃষ্টি এবং হাওয়া ইত্যাদি। আর 'নিজের পক্ষ হতে' মানে স্বীয় বিশেষ রহমতে ও অনুগ্রহে।
قُلْ لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ لِيَجْزِيَ قَوْمًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
📘 বিশ্বাসীদের বল, তারা যেন ক্ষমা করে ওদেরকে; যারা আল্লাহর দিনগুলির আশা করে না।[১] যাতে আল্লাহ এক সম্প্রদায়কে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেন। [২]
[১] অর্থাৎ, যারা এই ভয় রাখে না যে, আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সাহায্য করার এবং তাঁর শত্রুদের ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখেন। উদ্দেশ্য হল কাফের ও অবিশ্বাসীরা। أيَّام الله (আল্লাহর দিনগুলি) বলতে ঘটনাঘটন (আযাব-শাস্তি ইত্যাদি) যেমন, {وَذَكِّرْهُمْ بأَيَّامِ اللهِ} (إبراهيم: ৫) আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ, সেই কাফেরদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর, যারা আল্লাহর আযাব এবং তাঁর পাকড়াও থেকে বেপরোয়া। এ নির্দেশ প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদেরকে দেওয়া হয়েছিল। পরে যখন তারা মোকাবেলা করার যোগ্য হয়ে গেল, তখন তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (জিহাদ) করার নির্দেশ দেওয়া হল।
[২] অর্থাৎ, যখন তোমরা তাদের দেওয়া যাবতীয় কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবে এবং তাদের যুলুম-অত্যাচারকে ক্ষমা করবে, তখন এই সমস্ত পাপ তাদের ঘাড়ে থাকবে, যার শাস্তি কিয়ামতের দিন তাদেরকে দেওয়া হবে।
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا ۖ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ
📘 যে সৎকাজ করে, সে নিজ কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে ওর প্রতিফল সেই ভোগ করবে।[১] অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। [২]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক দল ও ব্যক্তির কর্ম, ভাল হোক অথবা মন্দ, তার লাভ ও ক্ষতি স্বয়ং কর্তারই; অন্য কারো নয়। এতে সৎকর্মের প্রতি উৎসাহিতও করা হয়েছে এবং অসৎকর্ম থেকে ভীতিপ্রদর্শনও।
[২] তিনি সকলকে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন। ভালো লোককে ভালো এবং মন্দলোককে মন্দ।
وَلَقَدْ آتَيْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ
📘 আমি তো বনী-ইস্রাঈলকে গ্রন্থ, কর্তৃত্ব[১] ও নবুঅত দান করেছিলাম এবং ওদেরকে উত্তম জীবিকা দিয়েছিলাম[২] এবং বিশ্বজগতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম। [৩]
[১] এখানে كتاب (গ্রন্থ) বলতে তাওরাত। আর حُكم (কর্তৃত্ব) থেকে রাজত্ব ও শাসন-ক্ষমতা অথবা বিবেক ও বিচার করার এমন যোগ্যতা, যা বিবাদ মিটানোর এবং মানুষের মাঝে মীমাংসা করার জন্য জরুরী হয়।
[২] সেই সব উত্তম রুযী ও জীবিকা, যা তাদের জন্য হালাল ছিল এবং এগুলোরই মধ্যে ছিল মান্ন্ ও সালওয়ার অবতরণ।
[৩] অর্থাৎ, তদানীন্তন বিশ্বে।
وَآتَيْنَاهُمْ بَيِّنَاتٍ مِنَ الْأَمْرِ ۖ فَمَا اخْتَلَفُوا إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ ۚ إِنَّ رَبَّكَ يَقْضِي بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
📘 ধর্ম সম্পর্কে ওদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণ[১] দান করেছিলাম। জ্ঞান আসার পর ওরা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ মতবিরোধ করেছিল।[২] ওরা যে বিষয়ে মতবিরোধ করত, তোমার প্রতিপালক কিয়ামতের দিন ওদের মধ্যে সে বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন। [৩]
[১] অর্থাৎ, হালাল ও হারাম বিবৃত স্পষ্ট বিধান। অথবা মু'জিযা ও অলৌকিক ঘটনাবলী। কিংবা নবী (সাঃ)-এর আগমনের জ্ঞান। তাঁর নবী হওয়ার প্রমাণাদি এবং নির্দিষ্টভাবে সেই স্থানের জ্ঞান, যেখানে তিনি হিজরত করে যাবেন।
[২] بَغْيًا بَيْنَهُمْ এর অর্থ, আপোসে একে অপরের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষবশতঃ অথবা খ্যাতি ও পদমর্যাদা লাভের জন্য জ্ঞান আসার পর তারা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে মতবিরোধ অথবা রসূল (সাঃ)-এর রিসালাতকে অস্বীকার করল।
[৩] হকপন্থীদেরকে উত্তম প্রতিদান এবং বাতিলপন্থীদেরকে মন্দ বদলা দিবেন।
ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
📘 এরপর আমি তোমাকে ধর্মের বিশেষ বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি;[১] সুতরাং তুমি ওর অনুসরণ কর এবং অজ্ঞদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। [২]
[১] شَرِيعَة শরীয়তের আভিধানিক অর্থ হলঃ রাস্তা, ধর্মাদর্শ, বিধান এবং নিয়ম-পদ্ধতি। রাজপথ বা 'মেনরোড'কেও شَارع 'শারে' বলা হয়। কারণ, তা গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেয়। তাই শরীয়ত বলতে এখানে সেই দ্বীনের বিধানকে বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। যাতে মানুষ সে পথে চলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। আয়াতের অর্থ হল, আমি তোমাকে একটি সুস্পষ্ট রাস্তায় বা তরীকায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, যা তোমাকে সত্য পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
[২] যারা আল্লাহর তাওহীদ এবং তাঁর শরীয়তের ব্যাপারে অজ্ঞ। এ থেকে উদ্দেশ্য হল, মক্কার কাফের ও তাদের সাথীরা।
إِنَّهُمْ لَنْ يُغْنُوا عَنْكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا ۚ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۖ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ
📘 আল্লাহর কাছে অবশ্যই ওরা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না; নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ সাবধানীদের বন্ধু।
تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
📘 এ গ্রন্থ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।
هَٰذَا بَصَائِرُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
📘 এ (কুরআন) মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলীল[১] এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা। [২]
[১] অর্থাৎ, সেই দলীল-সমষ্টি যা দ্বীনের বিধি-বিধান সংবলিত এবং যার সাথে মানুষের যাবতীয় চাহিদা ও প্রয়োজনাদি সম্পৃক্ত। (এটি মানুষের জন্য একটি গাইডবুক ও জীবন-সংবিধান।)
[২] অর্থাৎ, ইহকালে সৎপথ দেখায় এবং পরকালে আল্লাহর করুণার অধিকারী বানায়।
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ ۚ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
📘 দুষ্ককৃতকারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে ওদেরকে তাদের সমান গণ্য করব, যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকাজ করে? [১] ওদের ফায়সালা কত নিকৃষ্ট।
[১] অর্থাৎ, ইহকালে ও পরকালে উভয়ের মধ্যে যেন কোন পার্থক্য করব না। এ রকম কখনও হতে পারে না। অথবা অর্থ হল, যেভাবে দুনিয়াতে ওরা সমান সমান ছিল, অনুরূপ আখেরাতেও সমান সমান থাকবে। মরে এরাও শেষ হয়ে যাবে এবং ওরাও? না দুষ্ককৃতকারীদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে, আর না বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করা হবে। এ রকম হবে না। এই জন্য পরে বলেছেন, ওদের ফায়সালা কতই না মন্দ!
وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
📘 আল্লাহ যথাযথভাবে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কর্মানুযায়ী ফল দেওয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [১]
[১] আর এটাই সুবিচার যে, কিয়ামতের দিন কোন পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই ফায়সালা হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমল অনুযায়ী ভাল অথবা মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। এ রকম হবে না যে, তিনি সৎ ও অসৎ উভয়ের সাথে একই ধরনের আচরণ করবেন; যেমন কাফেরদের ভ্রান্ত ধারণা। তাদের এই ধারণার খন্ডন পূর্বের আয়াতেও করা হয়েছে। কেননা, উভয়কে সমান সমান অবস্থায় রাখা যুলুম; অর্থাৎ, সুবিচারের বিপরীত এবং স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বস্বীকৃত বিষয় তথা বাস্তব-বিরোধীও বটে। তাই যেমন নিমগাছ লাগিয়ে আঙ্গুর ফল অর্জন করা যায় না, অনুরূপ অন্যায় কাজ সম্পাদন করে সেই মর্যাদা লাভ করা যাবে না, যা আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন।
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
📘 তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজের উপাস্য করে নিয়েছে?[১] আল্লাহ জেনেশুনেই ওকে বিভ্রান্ত করেছেন[২] এবং ওর কর্ণ ও হৃদয় মোহর করে দিয়েছেন[৩] এবং ওর চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা।[৪] অতএব, আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পর কে তাকে পথনির্দেশ করবে?[৫] তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? [৬]
[১] তাই সেটাকেই সে ভাল মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি ভাল মনে করে এবং সেটাকেই সে মন্দ মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি মন্দ মনে করে। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের যাবতীয় বিধি-বিধানের উপর স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য এবং তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ জ্ঞান-বুদ্ধিও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অথবা স্বার্থপরতার শিকার হয়ে প্রবৃত্তির মত ভুল ফায়সালাও করতে পারে। একটি অর্থ এর এই করা হয়েছে; যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণকৃত পথনির্দেশ ও দলীল ছাড়াই স্বীয় মনমর্জির দ্বীন অবলম্বন করে। আর কেউ কেউ বলেছেন, এ থেকে এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে পাথর পূজা করত। যখন তুলনামূলক কোন সুন্দর পাথর পেয়ে যেত, তখন সে পূর্বের পাথরকে ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় পাথরটিকে উপাস্য বানিয়ে নিত।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] অর্থাৎ, তিনি জানেন যে, সে এই ভ্রষ্টতার উপযুক্ত। অথবা অর্থ এই যে, জ্ঞান এসে যাওয়া এবং হুজ্জত কায়েম হয়ে যাওয়ার পরও (জেনেশুনে) সে ভ্রষ্টতার পথ অবলম্বন করে। যেমন, নিজেকে বড় জ্ঞানী মনে করে এমন বহু অহংকারী ভ্রষ্ট আলেমদের অবস্থা; তারা ভ্রষ্ট হয়। মতামত তাদের ভিত্তিহীন হয়, কিন্তু 'আমার মত বড় পন্ডিত কেউ নেই' মনে করার এই অহমিকায় তারা নিজেদের দলীলাদিকে এমন মনে করে, যেন তা আসমান থেকে পেড়ে আনা তারকা। এইভাবে জেনেশুনে তারা কেবল নিজেরাই ভ্রষ্ট হয় না, বরং অন্যদেরকেও ভ্রষ্ট করে গর্ববোধ করে। نَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ هَذَا الْعِلْمِ الضَّالِّ وَالْفَهْمِ السَّقِيْمِ وَالْعَقْلِ الزَّائِغِ।[৩] যার কারণে ভালো কথা শোনা থেকে তার কান এবং হিদায়াত গ্রহণ করা হতে তার অন্তর বঞ্চিত হয়ে গেছে।[৪] তাই সে সত্য দেখতেও পায় না।[৫] যেমন বলেছেন, ﴿مَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَلاَ هَادِيَ لَهُ وَيَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ﴾ (الأعراف: ১৮৬)[৬] অর্থাৎ, চিন্তা-ভাবনা করবে না? যাতে প্রকৃত ব্যাপার তোমাদের কাছে স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায়।
وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ ۚ وَمَا لَهُمْ بِذَٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ ۖ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ
📘 ওরা বলে, ‘একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, এখানেই আমরা মরি ও বাঁচি; মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে।’[১] বস্তুতঃ এ ব্যাপারে ওদের কোন জ্ঞান নেই, ওরা তো কেবল ধারণা করে মাত্র।
[১] এটা হল নাস্তিকদের এবং তাদেরই মত মক্কার মুশরিকদের উক্তি, যারা পুনর্জীবন ও পরকালকে অস্বীকার করত। তারা বলত যে, পার্থিব এই জীবনই হল প্রথম ও শেষ জীবন। এর পর আর কোন জীবন নেই এবং এতে জীবন ও মরণের যে ধারাবাহিকতা চলে আসছে, তা কেবল (প্রাকৃতিক নিয়ম বা) কাল-বিবর্তনের ফল। যেমন, দার্শনিকদের একটি দল বলে যে, প্রত্যেক ছত্রিশ হাজার বছর পর প্রতিটি জিনিস পুনরায় তার অবস্থায় ফিরে আসে। আর এই ধারাবাহিকতা কোন স্রষ্টা ও পরিচালক ছাড়াই অব্যাহত আছে এবং থাকবে। না তার কোন শুরু আছে, আর না শেষ। এ দলকে 'দাহরিয়া' বলা হয়।
(ইবনে কাসীর)
পরিষ্কার কথা যে, এ মতবাদ জ্ঞান ও যুক্তির পরিপন্থী এবং তা বর্ণিত (হাদীস ও কুরআনের) উক্তিরও বিপরীত। হাদীসে কুবদসীতে আছে মহান আল্লাহ বলেন, "আদম-সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়; তারা কালকে গালি দেয় (অর্থাৎ, তার প্রতি কার্যসমূহের সম্পর্ক জুড়ে তাকে গালি-গালাজ করে) অথচ (কাল স্বয়ং কিছুই নয়) আমিই হলাম কাল। আমার হাতেই (কালের) সমস্ত এখতিয়ার। আমিই রাত ও দিনের আগমন-প্রত্যাগমন ঘটাই।"
(বুখারীঃ তাফসীর সূরাতুল জাসিয়াহ, মুসলিমঃ কিতাবুল আলফায)
وَإِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ مَا كَانَ حُجَّتَهُمْ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتُوا بِآبَائِنَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
📘 ওদের নিকট যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয় তখন কেবল এ উক্তি ছাড়া ওদের কোন যুক্তি থাকে না যে, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে উপস্থিত কর।’[১]
[১] এটাই হল তাদের সব চেয়ে বড় দলীল, যা কাট-হুজ্জতি ও অসার তর্ক বৈ কিছুই নয়।
قُلِ اللَّهُ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يَجْمَعُكُمْ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
📘 বল, ‘আল্লাহই তোমাদেরকে জীবন দান করেন অতঃপর তোমাদের মৃত্যু ঘটান। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’
وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَخْسَرُ الْمُبْطِلُونَ
📘 আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাশ্রয়ীরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
وَتَرَىٰ كُلَّ أُمَّةٍ جَاثِيَةً ۚ كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَىٰ إِلَىٰ كِتَابِهَا الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
📘 আর প্রত্যেক সম্প্রদায়কে দেখবে ভয়ে নতজানু[১] অবস্থায়, প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তার আমলনামা দেখতে আহবান করা হবে এবং বলা হবে, ‘তোমরা যা করতে, আজ তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।
[১] جَاثية এই শব্দ থেকে সূরাটির নামকরণ হয়েছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কিয়ামতে প্রত্যেক সম্প্রদায় (চাহে তারা আম্বিয়াগণের অনুসারী হোক অথবা তাঁদের বিরোধী সকলেই) ভয় ও আতঙ্কে নতজানু অবস্থায় বসে থাকবে।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
তারপর তাদেরকে হিসাব-নিকাশের জন্য ডাকা হবে। যেমন, আয়াতের অবশিষ্ট অংশ থেকে তা স্পষ্ট হয়।
هَٰذَا كِتَابُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّ ۚ إِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
📘 আমার (নিকট সংরক্ষিত) এ আমলনামা যা তোমাদের ব্যাপারে সত্য কথা বলবে।[১] তোমরা যা করতে নিশ্চয় আমি তা লিপিবদ্ধ করাতাম।’[২]
[১] كتاب বলতে সেই আমলনামা (রেজিষ্টার)-কে বুঝানো হয়েছে, যাতে মানুষের সমস্ত আমল লেখা থাকবে। ﴿وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِآئَي بِالنَّبِيِّنَ وَالشُّهَدَاءُ﴾ "আমলনামা সামনে উপস্থিত করা হবে এবং আম্বিয়া ও সাক্ষীগণকে আনা হবে।"
(যুমারঃ ৬৯)
এই আমলনামা মানুষের জীবনের এমন পরিপূর্ণ লিখিত বিবরণ হবে, যাতে কোন প্রকারের কমবেশী হবে না। মানুষ তা দেখে বলে উঠবে, ﴿مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لاَيُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَلاَ كَبِيْرَةً اِلاَّ أَحْصَاهَا﴾ (الكهف: ৪৯) "এ কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কিছুই বাদ দেয়নি; বরং এ সমস্ত কিছুর হিসাব রেখেছে!"
(কাহ্ফঃ ৪৯)
[২] অর্থাৎ, তোমাদের আমল সম্বন্ধে আমার তো জানা আছেই। এ ছাড়াও আমার ফিরিশতাগণ আমার নির্দেশে তোমাদের প্রত্যেকটি কর্মাকর্ম লিপিবদ্ধ করত এবং সুরক্ষিত রাখত।
إِنَّ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِلْمُؤْمِنِينَ
📘 নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَيُدْخِلُهُمْ رَبُّهُمْ فِي رَحْمَتِهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْمُبِينُ
📘 সুতরাং যারা বিশ্বাস করেছে ও সৎকাজ করেছে[১] তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজ করুণায় প্রবেশ করাবেন।[২] এটিই মহাসাফল্য।
[১] এখানেও বিশ্বাস ও ঈমানের সাথে সৎকাজ ও নেক আমলের কথা উল্লেখ করে তার গুরুত্বকে স্পষ্ট করা হয়েছে। আর নেক আমল বলা হয় সেই সব সৎকর্মসমূহকে যা (একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে) সুন্নত (নবী (সাঃ)-এর তরীকা) অনুযায়ী সম্পাদন করা হয়। সেই সব কর্মসমূহকে নেক আমল বলা হয় না, যা মানুষ তার নিজের বিবেকে ভাল মনে করে অতি যত্নসহকারে ও বড়ই উদ্দীপনার সাথে সম্পাদন করে। যেমন, অনেক বিদআতী কার্যকলাপ বহু মযহাবপন্থী জামাআতগুলোর মধ্যে প্রচলিত আছে। আর এ কাজগুলোর গুরুত্ব এ জামাআতের মধ্যে ওয়াজিব ও ফরয কাজের থেকেও অনেক বেশী। এই জন্য এরা বহু ফরয ও সুন্নত কাজকে ব্যাপকহারে ত্যাগ করে, কিন্তু বিদআতী কার্যকলাপ করার প্রতি এমন যত্ন নেয় যে, এতে কোন প্রকারের শৈথিল্য ও উদাসীনতার কথা ভাবাই যায় না। অথচ নবী (সাঃ) বিদআতকে شَرُّ الأمُور (সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ) গণ্য করেছেন।
[২] 'রহমত' বা করুণা বলতে জান্নাত বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেমন, হাদীসে আছে যে, মহান আল্লাহ জান্নাতকে বলবেন, أَنْتِ رَحْمَتِيْ أَرْحَمُ بِكِ مَنْ أَشَاءُ "তুমি আমার রহমত। তোমার মাধ্যমে (অর্থাৎ, তোমার মধ্যে স্থান দিয়ে) আমি যাকে চাইব রহম করব।"
(বুখারী, তাফসীর সূরা ক্বাফ)
وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا أَفَلَمْ تَكُنْ آيَاتِي تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ فَاسْتَكْبَرْتُمْ وَكُنْتُمْ قَوْمًا مُجْرِمِينَ
📘 আর যারা অবিশ্বাস করেছে (তাদেরকে বলা হবে), ‘তোমাদের নিকট কি আমার আয়াত পাঠ করা হয়নি?[১] কিন্তু তোমরা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিলে এবং তোমরা ছিলে এক অপরাধী সম্প্রদায়।’[২]
[১] ধমক স্বরূপ তাদেরকে এ কথা বলা হবে। কেননা, রসূলগণ তাদের কাছে এসেছিলেন। তাঁরা আল্লাহর যাবতীয় বিধি-বিধান তাদেরকে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কোন পরোয়াই করেনি।
[২] অর্থাৎ, সত্যকে গ্রহণ করার ব্যাপারে তোমরা অহংকার প্রদর্শন করেছ এবং ঈমান আননি, আসলে তোমরা পাপীই ছিলে।
وَإِذَا قِيلَ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ لَا رَيْبَ فِيهَا قُلْتُمْ مَا نَدْرِي مَا السَّاعَةُ إِنْ نَظُنُّ إِلَّا ظَنًّا وَمَا نَحْنُ بِمُسْتَيْقِنِينَ
📘 আর যখন বলা হত, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামত (সত্য), এতে কোন সন্দেহ নেই’, তখন তোমরা বলতে, ‘কিয়ামত কি? আমরা জানি না; আমরা এ বিষয়ে ধারণা করি মাত্র এবং আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নই।’ [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারটা কেবল ধারণা ও অনুমান। আমরা তো নিশ্চিত নই যে, তা সংঘটিত হবে।
وَبَدَا لَهُمْ سَيِّئَاتُ مَا عَمِلُوا وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
📘 ওদের মন্দ কর্মগুলি ওদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং যা নিয়ে ওরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা ওদেরকে পরিবেষ্টন করবে। [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামতের যে আযাবের ব্যাপারে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, অর্থাৎ, ভাবত যে, তা কিছুই নয়, তাতে তারা ধরা খাবে।
وَقِيلَ الْيَوْمَ نَنْسَاكُمْ كَمَا نَسِيتُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَٰذَا وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ نَاصِرِينَ
📘 ওদেরকে বলা হবে, ‘আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাৎকারকে ভুলে গিয়েছিলে।[১] তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’
[১] যেমন, হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তাঁর কোন কোন বান্দাকে বলবেন, "আমি কি তোমাকে স্ত্রী দান করিনি? আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি? আমি কি ঘোড়া এবং উট ইত্যাদিকে তোমার বশীভূত করে দিইনি? তুমি সর্দারীও করতে এবং করও সংগ্রহ করতে।" সে বলবে, 'হ্যাঁ, এসব ঠিকই তুমি দিয়েছিলে হে আমার প্রতিপালক!' মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, "আমার সাথে সাক্ষাৎ করার বিশ্বাস কি তোমার ছিল?" সে বলবে, 'না।' তখন মহান আল্লাহ বলবেন, (فَالْيَوْمَ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيْتَنِيْ) "আজ আমি তোমাকে (জাহান্নামে নিক্ষেপ করে) ভুলে যাব, যেমন তুমি আমাকে ভুলে ছিলে।"
(মুসলিম, কিতাবুয্ যুহদ)
ذَٰلِكُمْ بِأَنَّكُمُ اتَّخَذْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا وَغَرَّتْكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا ۚ فَالْيَوْمَ لَا يُخْرَجُونَ مِنْهَا وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ
📘 এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ ওদেরকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে না এবং তাদের ওজর-আপত্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর বিধানাদি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা এবং পার্থিব প্রতারণা ও ধোঁকায় পড়ে থাকা, এ দু'টি এমন অপরাধ যে, এই অপরাধই তোমাদেরকে জাহান্নামের আযাবের উপযুক্ত বানিয়েছে। এখন আর না এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব, আর না এই আশা আছে যে, কোন সময়ে তোমাদেরকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং তোমরা তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহকে রাযী করে নিতে পারবে।
فَلِلَّهِ الْحَمْدُ رَبِّ السَّمَاوَاتِ وَرَبِّ الْأَرْضِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 সকল প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশমন্ডলীর প্রতিপালক, পৃথিবীর প্রতিপালক এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
وَلَهُ الْكِبْرِيَاءُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
📘 আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাবতীয় গৌরব-গরিমা তাঁরই[১] এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] যেমন, হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ বলেন, "গৌরব ও গর্ব খাস আমার গুণ। সুতরাং যে তাতে আমার অংশী হতে চাইবে আমি তাকে শাস্তি দেব।"
(মুসলিম ২৬২০নং)
وَفِي خَلْقِكُمْ وَمَا يَبُثُّ مِنْ دَابَّةٍ آيَاتٌ لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
📘 তোমাদের সৃষ্টিতে এবং জীব-জন্তুর বংশবিস্তারে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে,
وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ رِزْقٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ آيَاتٌ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
📘 বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য রাত ও দিনের পরিবর্তনে, যে বৃষ্টি বর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর তিনি পুনর্জীবিত করেন তাতে[১] এবং বায়ুর পরিবর্তনে। [২]
[১] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং মানুষ ও জীব-জন্তুর সৃষ্টিতে, দিবারাত্রির আগমন-প্রত্যাগমনে এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে মৃত ভূমিকে পুনরায় জীবিত করে তোলা ইত্যাদি সহ সারা বিশ্বজাহানে এমন অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যা আল্লাহর একত্ব ও তাঁর প্রতিপালকত্বকে প্রমাণ করে।[২] অর্থাৎ, কখনো হাওয়া উত্তর ও দক্ষিণমুখী হয়, কখনো পূর্ব ও পশ্চিমমুখী, কখনো সমুদ্রের হাওয়া আবার কখনো মরুর লু হাওয়া, কখনো হাওয়া রাতে চলে আবার কখনো দিনে, কোন হাওয়া বৃষ্টিবাহী, কোন হাওয়া ফলপ্রসূ, কোন হাওয়া আত্মার খোরাক (অক্সিজেন)। আবার কোন হাওয়া সব কিছুকে ঝলসে দেয়, কোন হাওয়া শুধু ধুলোবালির ঝড় বয়ে আনে। এত প্রকারের হাওয়াও প্রমাণ করে যে, এই বিশ্বজাহানের কেউ পরিচালক আছেন এবং তিনি একজনই। দু'জন বা তার অধিক নন। সমস্ত এখতিয়ারের মালিক তিনি একাই। এতে তাঁর কোন শরীক নেই। সর্বপ্রকার কর্তৃত্ব কেবল তাঁরই হাতে। অন্য কারো হাতে সামান্য পরিমাণও কিছুর এখতিয়ার নেই। এই অর্থেরই আয়াত হল সূরা বাক্বারার ২:১৬৪ নং আয়াতটি।
تِلْكَ آيَاتُ اللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِالْحَقِّ ۖ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَ اللَّهِ وَآيَاتِهِ يُؤْمِنُونَ
📘 এগুলি আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি, সুতরাং আল্লাহর আয়াতের পরিবর্তে ওরা আর কোন্ বাণীতে বিশ্বাস করবে? [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর নাযিল করা এই কুরআন, যাতে রয়েছে তাঁর একত্ববাদের বহু প্রমাণাদি, যদি তারা এর উপরও ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর কথাকে বাদ দিয়ে কার কথার উপর এবং তাঁর নিদর্শনাবলীকে ছেড়ে আর কোন্ এমন নিদর্শন আছে যার উপর তারা ঈমান আনবে? بَعْدَ اللهِ অর্থ, بَعْدَ حَدِيْثِ اللهِ وَبَعْدَ آيَاتِهِ এখানে কুরআনকে হাদীস আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যেমন, ﴿اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ﴾ (الزمر: ২৩) আয়াতে এসেছে।
وَيْلٌ لِكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ
📘 দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী মহাপাপীর, [১]
[১] أَفَّاكٍ অর্থ, كَذَّابٍ (চরম মিথ্যুক) আর أَثِيْمٍ অর্থ, বড় পাপী। وَيْلٌ মানে ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।
يَسْمَعُ آيَاتِ اللَّهِ تُتْلَىٰ عَلَيْهِ ثُمَّ يُصِرُّ مُسْتَكْبِرًا كَأَنْ لَمْ يَسْمَعْهَا ۖ فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
📘 যে আল্লাহর আয়াতের আবৃত্তি শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে (নিজ মতবাদে) অটল থাকে; যেন সে তা শোনেইনি।[১] সুতরাং ওকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও।
[১] অর্থাৎ, কুফরীর উপর অটল থাকে এবং সত্যের মোকাবেলায় নিজেদের জ্ঞানকে বড় মনে করে এবং এই অহংকারের কারণে শোনা সত্ত্বেও তারা এমন ভান করে, যেন শোনেইনি।
وَإِذَا عَلِمَ مِنْ آيَاتِنَا شَيْئًا اتَّخَذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ
📘 যখন আমার কোন আয়াত সে অবগত হয়, তখন তা নিয়ে সে পরিহাস করে।[১] ওদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।
[১] অর্থাৎ, একে তো তারা কুরআনকে মন দিয়ে শোনেই না এবং (শোনার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও) যদি কোন কথা তাদের কানে পড়ে যায় অথবা কোন কথা তাদের জ্ঞানে এসে যায়, তবে সেটাকে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় বানিয়ে নেয়। আর এটা করে তাদের ছোট জ্ঞান ও অবুঝ হওয়ার কারণে অথবা কুফরী ও অবাধ্যতার উপর অটল থাকার কারণে অথবা অহংকারের কারণে।