🕋 تفسير سورة القمر
(Al-Qamar) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ
📘 কিয়ামত আসন্ন,[১] চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। [২]
[১] প্রথমতঃ এ কথা বিশ্বসৃষ্টির বিগত কাল অনুপাতে। কারণ, যা অতিবাহিত হয়ে গেছে তার তুলনায় যা অবশিষ্ট আছে, তা অল্প। দ্বিতীয়তঃ আগামী প্রত্যেকটি জিনিসই নিকটবর্তী হয়। তাই নবী করীম (সাঃ) তাঁর নিজের ব্যাপারে বলেছেন যে, আমার আগমন কাল কিয়ামত সংলগ্নে। অর্থাৎ, আমার ও কিয়ামতের মধ্যে আর কোন নবী আসবেন না।
[২] এটি সেই মু'জেযা, যা মক্কাবাসীদের দাবী অনুযায়ী দেখানো হয়েছিল। চাঁদ দু' টুকরো হয়ে গিয়েছিল। এমনকি লোকেরা তার (দু'খন্ড চাঁদের) মাঝ দিয়ে হিরা পাহাড়কে দেখতে পায়। অর্থাৎ, চাঁদের এক টুকরো পাহাড়ের একদিকে এবং দ্বিতীয় টুকরো পাহাড়ের অপর দিকে চলে যায়।
(বুখারীঃ আনসারদের ফযীলত অধ্যায়, মুসলিমঃ কিয়ামতের বর্ণনা অধ্যায়)
পূর্বের প্রায় সকল সালাফে সালেহীনের এটাই মত।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) লিখছেন যে, 'উলামাগণ সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, চাঁদ নবী করীম (সাঃ)-এর যুগে দ্বিখন্ডিত হয় এবং এটা তাঁর সুস্পষ্ট মু'জিযাসমূহের অন্যতম। বিশুদ্ধসূত্রে সাব্যস্ত বহুবিধ সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলোও তা প্রমাণ করে।'
فَدَعَا رَبَّهُ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ
📘 তখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, ‘আমি তো অসহায়, অতএব তুমি আমার প্রতিশোধ নাও।’
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ
📘 ফলে প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ দ্বারা আমি আকাশের দরজাসমূহ খুলে দিলাম। [১]
[১] مُنْهَمِرٌ এর অর্থ অধিক বা প্রবল। هَمْرٌ ব্যবহার হয় صَبٌّ (বয়ে যাওয়া)এর অর্থে। বলা হয় যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত একটানা অতি প্রবল বৃষ্টি হতে থাকে।
وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَىٰ أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
📘 এবং মাটি হতে ঝরনা প্রবাহিত করলাম, অতঃপর সকল পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে।[১]
[১] অর্থাৎ, আকাশ ও পাতালের পানি মিলিত হয়ে সেই কাজ পূর্ণ করে দিল, যা হওয়ার ব্যাপার নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ, বন্যা সৃষ্টি হয়ে সবকে ডুবিয়ে দিল।
وَحَمَلْنَاهُ عَلَىٰ ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ
📘 তখন নূহকে আরোহণ করালাম কাঠ ও পেরেক দ্বারা নির্মিত এক নৌযানে। [১]
[১] دُسُرٌ হল دِسَارٌএর বহুবচন। ঐ রশি যা দিয়ে নৌকার তক্তা বাঁধা হয়। অথবা ঐ পেরেক যা দিয়ে নৌকার তক্তা জোড়া হয়।
تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِمَنْ كَانَ كُفِرَ
📘 যা চলল আমার চোখের সামনে, এ ছিল অবিশ্বাসীদের প্রতিফল।
وَلَقَدْ تَرَكْنَاهَا آيَةً فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 আমি এটাকে এক নিদর্শনরূপে রেখে দিয়েছি;[১] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? [২]
[১] تَرَكْنَاهَا এর মধ্যে ها (এটা) সর্বনামের লক্ষ্য হল سَفِيْنَةٌ (নৌযান)। অথবা فِعْلَةٌ (উক্ত কর্ম)। অর্থাৎ, আমি এই নৌযান বা কর্মকে এক নিদর্শনরূপে রেখে দিয়েছি।
[২] مُدَّكٍرٍ এর প্রকৃত রূপ ছিল تا। مَذْتَكِرٍ 'তা' অক্ষরটিকে د 'দাল' অক্ষর দ্বারা পরিবর্তন করা হয় এবং ذ 'যাল' অক্ষরকে د 'দাল' বানিয়ে দালকে দালের মধ্যে সন্ধি ঘটানো হয়। অর্থ হল, শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণকারী।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 সুতরাং কেমন ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি।[১] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
[১] অর্থাৎ, এর অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা, এ থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা এবং তা মুখস্থ করা আমি সহজ করে দিয়েছি। অতএব, এটা বাস্তব যে, কুরআন কারীম অলৌকিকতা ও ভাষাশৈলীর দিক দিয়ে অতি উচ্চস্তরের কিতাব হওয়া সত্ত্বেও কোন আরবের মানুষ তার প্রতি একটু মনোযোগ ও গুরুত্ব দিলে ব্যাকরণ, অভিধান ও সাহিত্যের কোন বই-পুস্তক না পড়েই তা অনায়াসে বুঝে নেয়। অনুরূপ এটি পৃথিবীর এমন অনন্য গ্রন্থ যার প্রতিটি শব্দ (অর্থ না জেনেও) হুবহু মুখস্থ করে নেওয়া যায়। এ ছাড়া কোন ক্ষুদ্র পুস্তকও এইভাবে মুখস্থ করা ও রাখা অতি কঠিন হয়। মানুষ যদি তার অন্তর ও বিবেকের দুয়ার উন্মুক্ত রেখে কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের দৃষ্টিতে পড়ে, নসীহতের কানে শোনে এবং উপলব্ধিকারী অন্তর দিয়ে এ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, তবে দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যের দরজাসমূহ তার জন্য খুলে যায় এবং কুরআন তার অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে কুফরী ও পাপাচরণের সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করে দেয়।
كَذَّبَتْ عَادٌ فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 আ’দ সম্প্রদায় মিথ্যাজ্ঞান করেছিল, সুতরাং কেমন ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!
إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي يَوْمِ نَحْسٍ مُسْتَمِرٍّ
📘 তাদের উপর আমি নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে ঝড়ো হাওয়া প্রেরণ করেছিলাম।[১]
[১] বলা হয় যে, এই দিনটি ছিল বুধবারের সন্ধ্যা। যখন এই প্রবল ও শীতল বায়ু শাঁ শাঁ করে বইতে আরম্ভ হল, তখন লাগাতার সাত রাত ও আট দিন ধরে চলতে থাকল। এই বাতাস ঘর-বাড়ি ও দুর্গের মধ্যে আশ্রয়গ্রহণকারী লোকদেরকেও সেখান থেকে তুলে এনে এত জোরে যমীনে আছাড় দিয়ে ফেলতে লাগল যে, তাদের মাথা দেহ থেকে পৃথক হয়ে গেল। এই দিন শাস্তির দিক দিয়ে তাদের অশুভ ও দুর্ভাগ্যজনক প্রমাণিত হয়েছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বুধবার বা অন্য কোন দিনে অশুভ বা কুলক্ষণ আছে; যেমন, অনেকে মনে করে। مُسْتَمِرٌّ (একটানা, নিরবচ্ছিন্ন বা লাগাতার) এর অর্থ হল, এই আযাব সে পর্যন্ত চলতে থাকল, যে পর্যন্ত না সবাই ধ্বংস হয়ে গেল।
وَإِنْ يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌّ
📘 তারা কোন নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত যাদু।[১]
[১] অর্থাৎ, কুরাইশরা ঈমান আনার পরিবর্তে তা যাদু বলে আখ্যায়িত করে নিজেদের বিমুখতার আচরণ বহাল রাখে।
تَنْزِعُ النَّاسَ كَأَنَّهُمْ أَعْجَازُ نَخْلٍ مُنْقَعِرٍ
📘 তা মানুষকে উৎখাত করেছিল উৎপাটিত খেজুর কান্ডের ন্যায়। [১]
[১] এতে তাদের দেহের উচ্চতার সাথে সাথে অক্ষমতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর শাস্তির মোকাবেলায় তারা কিছুই করতে পারেনি। অথচ তারা নিজের শক্তি-সামর্থ্যের ব্যাপারে চরম অহংকারী ছিল। أَعْجَازُ হল عِجْزٌ এর বহুবচন। কোন জিনিসের পিছনের অংশকে বলা হয়। مُنْقَعِرٌ যে স্বীয় মূল থেকে উপড়ে যাওয়া বা কেটে যাওয়া। অর্থাৎ, উৎপাটিত খেজুরের কান্ডের (বা কাটা গুঁড়ির) মত তাদের লাশগুলো মাটিতে পড়েছিল।
فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 সুতরাং কেমন ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
كَذَّبَتْ ثَمُودُ بِالنُّذُرِ
📘 সামূদ সম্প্রদায় সতর্ককারীদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল;
فَقَالُوا أَبَشَرًا مِنَّا وَاحِدًا نَتَّبِعُهُ إِنَّا إِذًا لَفِي ضَلَالٍ وَسُعُرٍ
📘 তারা বলেছিল, ‘আমরা কি আমাদেরই মধ্যকার এক ব্যক্তির অনুসরণ করব? তাহলে তো নিশ্চয় আমরা ভ্রষ্ট ও পাগলরূপে গণ্য হব। [১]
[১] অর্থাৎ, একজন মানুষকে রসূল বলে স্বীকার করে নেওয়া তাদের নিকট ভ্রষ্টতা ও পাগলামি ছিল। سُعُرٌ হল سَعِيْرٌ এর বহুবচন। যার অর্থ, আগুনের শিখা। এখানে তা পাগলামি বা শাস্তি ও কঠোরতা অর্থে ব্যবহার হয়েছ
أَأُلْقِيَ الذِّكْرُ عَلَيْهِ مِنْ بَيْنِنَا بَلْ هُوَ كَذَّابٌ أَشِرٌ
📘 আমাদের মধ্যে কি ওরই প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে? বরং সে তো একজন মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক।’ [১]
[১] أَشِرٌ এর অর্থ مُتَكَبِّرٌ (অহংকারী)। অথবা তার অর্থ, মিথ্যা বলায় সীমা অতিক্রমকারী। অর্থাৎ, সে ভীষণ মিথ্যুক। সে বলে, আমার উপর অহী আসে। আমাদের মধ্যে কেবল তারই কাছে কি অহী আসার ছিল? নাকি এর মাধ্যমে আমাদের উপর স্বীয় বড়ত্ব দেখানো তাঁর উদ্দেশ্য।
سَيَعْلَمُونَ غَدًا مَنِ الْكَذَّابُ الْأَشِرُ
📘 আগামীকাল তারা জানবে, কে মিথ্যাবাদী, দাম্ভিক। [১]
[১] এরাই রসূলের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপকারী, নাকি স্বালেহ? যাঁকে মহান আল্লাহ অহী ও নবুঅত দানে ধন্য করেছেন। غَدًا আগামীকাল বলতে কিয়ামতের দিন অথবা দুনিয়াতে তাদের জন্য আযাবের নির্দিষ্ট দিন।
إِنَّا مُرْسِلُو النَّاقَةِ فِتْنَةً لَهُمْ فَارْتَقِبْهُمْ وَاصْطَبِرْ
📘 নিশ্চয় আমি তাদের পরীক্ষার জন্যে এক উষ্ট্রী পাঠাব;[১] অতএব তুমি (হে স্বালেহ) তাদের আচরণ লক্ষ্য কর এবং ধৈর্যশীল হও। [২]
[১] এই দেখার জন্য যে, তারা ঈমান আনে, না আনে না? এটা সেই উটনী, যা মহান আল্লাহ তাদেরই দাবীর ভিত্তিতে কঠিন পাথর থেকে বের করেছিলেন।
[২] অর্থাৎ দেখ, তারা নিজেদের অঙ্গীকার অনুযায়ী ঈমানের পথ ধরে, না ধরে না? এবং তাদের কষ্টদানের উপর ধৈর্য ধারণ কর।
وَنَبِّئْهُمْ أَنَّ الْمَاءَ قِسْمَةٌ بَيْنَهُمْ ۖ كُلُّ شِرْبٍ مُحْتَضَرٌ
📘 আর তুমি তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের মধ্যে পানি বণ্টন নির্ধারিত[১] এবং পানির অংশের জন্য প্রত্যেকে হাজির হবে পালাক্রমে। [২]
[১] অর্থাৎ, একদিন উটনীর পানি পানের জন্য এবং একদিন লোকেদের পানি পানের জন্য।
[২] অর্থাৎ, প্রত্যেকের পানির অংশ তার সাথে নির্দিষ্ট। সে নিজের পালির দিনে উপস্থিত হয়ে তা সংগ্রহ করবে। অপরজন সে দিন আসবে না। شُرْبٌ মানে পানির অংশ।
فَنَادَوْا صَاحِبَهُمْ فَتَعَاطَىٰ فَعَقَرَ
📘 অতঃপর তারা তাদের এক সঙ্গীকে আহবান করল,[১] সে ওকে (উষ্ট্রীকে) ধরে হত্যা করল। [২]
[১] অর্থাৎ, যাকে তারা উটনীকে হত্যা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। যার নাম কুবদার বিন সালেফ বলা হয়। তাকে তার কাজ সম্পাদন করার জন্য ডাক দিল।
[২] অথবা তরবারি বা উটনীকে ধরে তার পা কেটে দিল। অতঃপর তাকে জবাই করে দিল। কেউ কেউ فَتَعَاطَى অর্থ করেছেন, فَجَسَرَ সে সাহস করল।
وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ ۚ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ
📘 তারা মিথ্যা মনে করে এবং নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, আর প্রত্যেক কাজের জন্য একটি স্থিরীকৃত সময় রয়েছে। [১]
[১] এটা মক্কার কাফেরদের মিথ্যা ভাবার ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করার কথা খন্ডন ও বাতিল করার জন্য বলা হচ্ছে যে, প্রতিটি কাজের একটি শেষ পরিণতি আছে। তাতে সে কাজ ভাল হোক বা মন্দ। অর্থাৎ, পরিশেষে তার একটি ফল বের হবে। ভাল কাজের ফল ভাল হবে এবং মন্দ কাজের ফল মন্দ হবে। সেই ফলের বিকাশ দুনিয়াতেও হতে পারে; যদি আল্লাহর ইচ্ছা হয়। অন্যথা পরকালে তো অবশ্যই হবে।
فَكَيْفَ كَانَ عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 সুতরাং কেমন ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী!
إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ صَيْحَةً وَاحِدَةً فَكَانُوا كَهَشِيمِ الْمُحْتَظِرِ
📘 নিশ্চয় আমি তাদের উপর এক বিরাট আওয়াজ প্রেরণ করলাম, ফলে তারা খোয়াড় প্রস্তুতকারীর চূর্ণ-বিচূর্ণ ডাল-পাতার মত হয়ে গেল। [১]
[১] حَظِيْرَةٌ এর অর্থ, مَحْظُوْرَةٌ খোয়াড়; যা কাঁটাযুক্ত শুকনো ডালপালা বা কাষ্ঠখন্ড দিয়ে পশুর সংরক্ষণের জন্য তৈরী করা হয়। مُحْتَظِر হল 'ইসম ফা-য়েল' (কর্তৃপদ), অর্থঃ صَاحِبُ الْحَظِيْرَةِ (খোয়াড়-ওয়ালা)। আর هَشِيْمٌ হল শুকনো ঘাস বা কর্তিত শুকনো ফসলাদি। অর্থাৎ, যেভাবে একজন বেড়া নির্মাতার শুকনো কাঠের টুকরো ও ডালপালাগুলো লাগাতার পদতলে পিষ্ট হওয়ার কারণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, তারাও ঐভাবে আমার আযাবে চূর্ণ হয়ে যায়।
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
كَذَّبَتْ قَوْمُ لُوطٍ بِالنُّذُرِ
📘 লূত সম্প্রদায় মিথ্যা মনে করেছিল সতর্ককারীদেরকে।
إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ حَاصِبًا إِلَّا آلَ لُوطٍ ۖ نَجَّيْنَاهُمْ بِسَحَرٍ
📘 নিশ্চয় আমি তাদের উপর প্রেরণ করেছিলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়,[১] কিন্তু লূত পরিবারের উপর নয়; তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছিলাম ভোর রাতে--[২]
[১] অর্থাৎ, এমন হাওয়া প্রেরণ করেছিলাম, যা তাদের উপর কাঁকর নিক্ষেপ করছিল। অর্থাৎ, তাদের জনপদকে তাদের উপর এমনভাবে উল্টে দেওয়া হয়েছিল যে, তার উপরের অংশ নীচে এবং নীচের অংশ উপরে করে দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর তাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছিল। যেমন, সূরা হুদ ১১:৭৭-৮৩ আয়াত প্রভৃতিতে এর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।[২] 'লূত পরিবার' বলতে স্বয়ং লূত (আঃ) এবং তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারী ব্যক্তিবর্গ। তবে এদের মধ্যে লূত (আঃ)-এর স্ত্রী শামিল ছিল না। কারণ, সে 'মু'মিনা' ছিল না। অবশ্য লূত (আঃ)-এর দুই কন্যা তাঁর সাথে ছিলেন। যাঁরা মুক্তি লাভে ধন্য হয়েছিলেন। سحر বলতে রাতের শেষ প্রহর।
نِعْمَةً مِنْ عِنْدِنَا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي مَنْ شَكَرَ
📘 আমার বিশেষ অনুগ্রহ স্বরূপ;[১] যারা কৃতজ্ঞ আমি এভাবেই তাদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে আযাব থেকে মুক্তি দেওয়াটা ছিল তাদের উপর আমার কৃত দয়া ও অনুগ্রহ।
وَلَقَدْ أَنْذَرَهُمْ بَطْشَتَنَا فَتَمَارَوْا بِالنُّذُرِ
📘 সে (লূত) আমার কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করেছিল,[১] কিন্তু তারা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতন্ডা শুরু করল।[২]
[১] অর্থাৎ, আযাব আসার পূর্বে আমার শক্ত পাকড়াও থেকে তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিলেন।
[২] কিন্তু তারা তার কোন পরোয়া করেনি, বরং সন্দেহ পোষণ করেছিল এবং ভীতি প্রদর্শনকারীর সাথে বিবাদে লিপ্ত হল।
وَلَقَدْ رَاوَدُوهُ عَنْ ضَيْفِهِ فَطَمَسْنَا أَعْيُنَهُمْ فَذُوقُوا عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 তারা তার নিকট হতে তার মেহমানদের ব্যাপারে ফুসলাতে লাগল,[১] তখন আমি তাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিলাম[২] (এবং বললাম,) আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম!
[১] বা প্ররোচিত করতে লাগল কিংবা লূত (আঃ)-এর নিকট তাঁর মেহমানদেরকে চাইতে লাগল। অর্থাৎ, যখন লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় জানতে পারল যে, তাঁর কাছে কিছু সুন্দর সুন্দর নব যুবক এসেছে (যাঁরা প্রকৃতপক্ষে ফিরিশতা ছিলেন এবং তাদেরকে আযাব দেওয়ার জন্যই তাঁরা এসেছিলেন), তখন তারা লূত (আঃ)-এর কাছে দাবী করল যে, ঐ অতিথিদেরকে আমাদের হাওয়ালা করে দেওয়া হোক। যাতে আমরা আমাদের বিকৃত যৌনক্ষুধা তাদের দ্বারা নিবৃত্ত করি।
[২] বলা হয় যে, এই ফিরিশতাগণ ছিলেন জিবরীল, মীকাঈল এবং ইস্রাফীল (আলাইহিমুসসালাম)। যখন তারা কুকর্ম করার উদ্দেশ্যে ফিরিশতাদের (অতিথিদের)-কে সঙ্গে নেওয়ার জন্য বেশী পীড়াপীড়ি করতে লাগল, তখন জিবরীল (আঃ) তাঁর ডানার একটি অংশ তাদের উপর মারলেন; যার ফলে তাদের চোখ বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ বলেছেন, শুধু চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়েছিল। যাই হোক ব্যাপক আযাব আসার পূর্বে বিশেষ এই আযাব তাদের উপর এসেছিল, যারা কুমতলব নিয়ে লূত (আঃ)-এর নিকট এসেছিল। চোখ থেকে বা দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা বাড়ী পৌঁছে ছিল। অতঃপর ভোর সকালে সেই ব্যাপক আযাবে ধ্বংস হয়ে গেল, যা সমগ্র জাতির জন্য এসেছিল।
(তাফসীর ইবনে কাসীর)
وَلَقَدْ صَبَّحَهُمْ بُكْرَةً عَذَابٌ مُسْتَقِرٌّ
📘 ভোর সকালে বিরামহীন শাস্তি তাদেরকে আঘাত করল। [১]
[১] অর্থাৎ, ভোর সকালে তাদের নিকট বিরামহীন শাস্তি এসে গেল। مستقر (বিরামহীন)এর অর্থ, তাদের উপর অবতীর্ণ এমন আযাব, যা তাদেরকে ধ্বংস না করে ছাড়েনি।
فَذُوقُوا عَذَابِي وَنُذُرِ
📘 এবং (আমি বললাম,) আস্বাদন কর আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম!
وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنَ الْأَنْبَاءِ مَا فِيهِ مُزْدَجَرٌ
📘 তাদের নিকট এসেছে সংবাদ,[১] যাতে আছে ধমক। [২]
[১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী জাতিদের ধ্বংসের সংবাদ, যখন তারা মিথ্যাজ্ঞান করেছিল।
[২] অর্থাৎ, যাতে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের দিক রয়েছে। কেউ যদি তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে শিরক ও পাপ থেকে বাঁচতে চায়, তাহলে সে বাঁচতে পারে। مُزْدَجَرٌ আসলে مُزْتَجَرٌ ছিল। এটা زَجْرٌ থেকে ক্রিয়াবিশেষ্য (মাসদার)।
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 নিশ্চয় আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি।[১] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
[১] এই সূরার মধ্যে تيسير قرآن তথা কুরআন সহজ করে দেওয়ার কথাটা বারবার উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, এই কুরআন বোঝা ও তা মুখস্থ করা সহজ বানিয়ে দেওয়া মহান আল্লাহর একটি বড় অনুগ্রহ। তাই তাঁর কৃতজ্ঞতা থেকে উদাসীন হওয়া মানুষের উচিত নয়।
وَلَقَدْ جَاءَ آلَ فِرْعَوْنَ النُّذُرُ
📘 নিশ্চয় ফিরআউন সম্প্রদায়ের নিকটও এসেছিল সতর্ককারী,[১]
[১] نُذُرٌ হল نَذِيْرٌ এর বহুবচন (সতর্ককারী)। অথবা إِنْذَار অর্থে যা 'মাসদার' (ক্রিয়াবিশেষ্য)।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا كُلِّهَا فَأَخَذْنَاهُمْ أَخْذَ عَزِيزٍ مُقْتَدِرٍ
📘 তারা আমার সকল নিদর্শনকে মিথ্যাজ্ঞান করল।[১] অতঃপর পরাক্রমশালী ও সর্বশক্তিমানের পাকড়াও করার মত আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।[২]
[১] সেই সব নিদর্শনাবলী যার মাধ্যমে মূসা (আঃ) ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়েছিলেন। এগুলো মোট নয়টি নিদর্শন ছিল; যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম। কারণ, সে আযাব এমন পরাক্রমশালীর কঠিন পাকড়াও ছিল, যিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। আর তাঁর পাকড়াও থেকে কেউ বাঁচতে পারে না।
أَكُفَّارُكُمْ خَيْرٌ مِنْ أُولَٰئِكُمْ أَمْ لَكُمْ بَرَاءَةٌ فِي الزُّبُرِ
📘 (হে কুরাইশদল!) তোমাদের মধ্যকার অবিশ্বাসীগণ কি তাদের (পূর্বের অবিশ্বাসীগণ) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ?[১] নাকি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে তোমাদের কোন অব্যাহতি লেখা রয়েছে? [২]
[১] এই জিজ্ঞাসা অস্বীকৃতি সূচক। নয় বা না অর্থে। অর্থাৎ, হে আরববাসী। তোমাদের কাফেররা পূর্বের কাফেরদের চাইতে উত্তম নয়। তাদেরকে যখন তাদের কুফরীর কারণে ধ্বংস করে দেওয়া হল, তখন তোমরা যারা তাদের থেকেও নিকৃষ্ট, আযাব হতে মুক্তি লাভের আশা কিভাবে রাখ?
[২] زُبُرٌ থেকে বিগত নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাবগুলোকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবগুলোতে তোমাদের ব্যাপারে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে নাকি যে, এই কুরাইশ বা আরবরা যা ইচ্ছা করুক, তাদের উপর কোন আযাব আসবে না।
أَمْ يَقُولُونَ نَحْنُ جَمِيعٌ مُنْتَصِرٌ
📘 নাকি তারা বলে যে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ অপরাজেয় দল।’[১]
[১] সংখ্যাধিক্য এবং উপায়-উপকরণ ও শক্তি-সামর্থ্যের কারণে অন্য কারো আমাদের উপর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অথবা অর্থ হল, আমরা পরস্পর সংঘবদ্ধ। কাজেই আমরা শত্রুদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম।
سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ
📘 এই দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।[১]
[১] আল্লাহ তাদের ভ্রান্ত ধারণার খন্ডন করলেন। জামাআত তথা দল বলতে মক্কার কাফেরদেরকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বদরের যুদ্ধে তাদের পরাজয় হয় এবং তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করে। শিরক ও কুফরীর নেতাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বদর যুদ্ধের সময় যখন নবী করীম (সাঃ) স্বীয় তাঁবুতে কাকুতি-মিনতি সহকারে দু'আয় মগ্ন ছিলেন, তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, حَسْبُكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَلْحَحْتَ عَلَى رَبِّكَ। "যথেষ্ট হয়েছে হে আল্লাহর রসূল! আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট অনুনয়-বিনয় খুব করলেন।" অতঃপর তিনি যখন তাঁবুর বাইরে এলেন, তখন তাঁর পবিত্র জবানে এই আয়াতটিই আবৃত্ত হচ্ছিল।
(বুখারীঃ তাফসীর সূরা ক্বামার)
بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَىٰ وَأَمَرُّ
📘 বরং কিয়ামত তাদের শাস্তির নির্ধারিতকাল। আর কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্ততর। [১]
[১] أَدْهَى শব্দটি دَهَاءٌ থেকে গঠিত। কঠিন অপমানকারী। أَمَرُّ শব্দটি مَرَارَةٌ থেকে গঠিত, অতি তিক্ত। অর্থাৎ, দুনিয়াতে এদেরকে যে হত্যা এবং বন্দী ইত্যাদি করা হয়েছে, এটাই এদের শেষ শাস্তি নয়, বরং এর থেকেও আরো অনেক কঠিন শাস্তি তাদেরকে কিয়ামতের দিন দেওয়া হবে, যার প্রতিশ্রুতি এদের সাথে করা হয়েছে।
إِنَّ الْمُجْرِمِينَ فِي ضَلَالٍ وَسُعُرٍ
📘 নিশ্চয় অপরাধীরা বিভ্রান্তি ও শাস্তির মধ্যে রয়েছে।
يَوْمَ يُسْحَبُونَ فِي النَّارِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ ذُوقُوا مَسَّ سَقَرَ
📘 যেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের দিকে; (সেদিন বলা হবে,) ‘সাক্বার (জাহান্নামে)র যন্ত্রণা আস্বাদন কর।’ [১]
[১] سَقَرٌ জাহান্নামের নাম। অর্থাৎ, তার উত্তাপ এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ আস্বাদন কর।
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ
📘 নিশ্চয় আমি প্রত্যেক বস্তুকে সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।[১]
[১] আহলে সুন্নাহর ইমামগণ এই আয়াত এবং এই ধরনের অন্যান্য আয়াতগুলোকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে ভাগ্য যে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সে কথা সাব্যস্ত করেছেন। যার অর্থ হল, মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করার পূর্ব থেকেই তাদের ব্যাপারে জানতেন এবং (সেই জানার আলোকে) তিনি তাদের সকলের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে দেন। এ আয়াতে সেই ফির্কা ক্বাদরিয়ার খন্ডন রয়েছে, যাদের আবির্ভাব ঘটে সাহাবাদের একেবারে শেষ যুগে।
(ইবনে কাসীর)
حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ ۖ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ
📘 এটা পরিপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ বাণী,[১] তবে এই সতর্কবাণীসমূহ তাদের কোন উপকারে আসেনি। [২]
[১] অর্থাৎ, এমন বাণী, যা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষাকারী। অথবা এই কুরআন সম্পূর্ণ বিজ্ঞানময়। তাতে কোন খুঁত বা ত্রুটি নেই। অথবা মহান আল্লাহ যাকে চান, হিদায়াত দেন এবং যাকে চান, পথভ্রষ্ট করেন, তাতেও যে বড় কৌশল নিহিত আছে সে কথা কেবল তিনিই জানেন।
[২] অর্থাৎ, যার জন্য আল্লাহ পাক দুর্ভাগ্য লিখে দিয়েছেন এবং যার অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন নবীদের ভীতিপ্রদর্শন আর কি তার উপকারে আসতে পারে? তার জন্য তো {سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُم} কথাই প্রযোজ্য। নিম্নের আয়াতটিও প্রায় অনুরূপ অর্থেরইঃ {قُلْ فَلِلّٰهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ فَلَوْ شَاء لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِينَ} (তুমি বলে দাও! অতঃপর চূড়ান্ত প্রমাণ তো আল্লাহরই। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে পথ প্রদর্শন করতেন।
(সূরা আনআম ৬:১৪৯ আয়াত)
وَمَا أَمْرُنَا إِلَّا وَاحِدَةٌ كَلَمْحٍ بِالْبَصَرِ
📘 আমার আদেশ তো একটি কথায় নিষ্পন্ন হয়, চক্ষুর পলকের মত।
وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا أَشْيَاعَكُمْ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
📘 আমি অবশ্যই ধ্বংস করেছি তোমাদের মত দলগুলোকে,[১] অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
[১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কাফেরদেরকে। যারা কুফরীতে তোমাদেরই মত ছিল।
وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ
📘 তারা যা কিছু করেছে, তার প্রত্যেকটাই আমল-নামায় (লিপিবদ্ধ) আছে। [১]
[১] বা দ্বিতীয় অর্থ হল, 'লওহে মাহ্ফূযে' লিপিবদ্ধ আছে।
وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُسْتَطَرٌ
📘 আছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সবকিছুই লিপিবদ্ধ; [১]
[১] অর্থাৎ, সৃষ্টির সমস্ত আমল এবং কথা ও কাজ লিপিবদ্ধ আছে। তাতে তা ছোট হোক বা বড়, তুচ্ছ হোক অথবা সুউচ্চ। দুর্ভাগ্যজনদের আলোচনার পর এবারে সৌভাগ্যবানদের আলোচনা করা হচ্ছে।
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ
📘 সাবধানীরা থাকবে জান্নাতসমূহ ও নহরে। [১]
[১] অর্থাৎ, বিভিন্ন প্রকার (জান্নাত) বাগানে থাকবে। نَهْرٌ জিন্স (জাতি) হিসাবে ব্যবহার হয়েছে, যাতে জান্নাতের সকল প্রকার নদী শামিল।
فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِنْدَ مَلِيكٍ مُقْتَدِرٍ
📘 যথাযোগ্য আসনে,[১] সার্বভৌমক্ষমতার অধিকারী সম্রাটের সান্নিধ্যে। [২]
[১] مَقْعَدِ صِدْقٍ সম্মানের আসন বা সত্যের আসন। যেখানে না কোন পাপের কথা হবে, আর না অশ্লীলতার। অর্থাৎ, জান্নাত।
[২] مَلِيْكٍ مُّقْتَدِرٍ মহাশক্তিধর সম্রাট। অর্থাৎ, তিনি সর্বপ্রকার ক্ষমতার মালিক। যা চান, তা-ই করতে পারেন। তাঁকে কেউ অপারগ ও ব্যর্থ করতে পারে না। عِنْدَ (সান্নিধ্যে) বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে সেই উচ্চ স্থান, মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি, যা ঈমানদারগণ আল্লাহর নিকট লাভ করবেন।
فَتَوَلَّ عَنْهُمْ ۘ يَوْمَ يَدْعُ الدَّاعِ إِلَىٰ شَيْءٍ نُكُرٍ
📘 অতএব তুমি তাদেরকে উপেক্ষা কর। (সেদিনকে স্মরণ কর,) যেদিন আহবানকারী (ইস্রাফীল) আহবান করবে এক অপ্রিয় বিষয়ের দিকে।[১]
[১] يَوْمَ এর পূর্বে اُذْكُرْ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, স্মরণ কর সেই দিনকে, যেদিন---। نُكُرٌ (অপ্রিয়)এর অর্থ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ। এ থেকে হাশর প্রান্তরের ও হিসাবের ময়দানের ভয়াবহতা এবং পরীক্ষাকে বুঝানো হয়েছে।
خُشَّعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُنْتَشِرٌ
📘 অপমানে অবনমিত নেত্রে কবর হতে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের ন্যায়। [১]
[১] অর্থাৎ কবর থেকে বের হয়ে তারা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং হিসাবের মাঠের দিকে অতি দ্রুততার সাথে এমনভাবে দৌড়বে যে, যেন তারা সেই পঙ্গপালের দল, যা কখনো কখনো শূন্যে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় উড়তে দেখা যায়।
مُهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ ۖ يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَٰذَا يَوْمٌ عَسِرٌ
📘 তারা আহবানকারীর দিকে ছুটে আসবে ভীত-বিহ্বল হয়ে।[১] অবিশ্বাসীরা বলবে, ‘এ তো কঠিন দিন।’
[১] مُهْطِعِيْنَ অর্থ مُسْرِعِيْنَ দৌড়াবে, পিছনে থাকবে না।
۞ كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ فَكَذَّبُوا عَبْدَنَا وَقَالُوا مَجْنُونٌ وَازْدُجِرَ
📘 এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও মিথ্যা মনে করেছিল; তারা মিথ্যাবাদী মনে করেছিল আমার দাসকে এবং বলেছিল, ‘এ তো এক পাগল।’ আর তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। [১]
[১] وَازْدُجِرَ এর প্রকৃতরূপ হল وَازْتُجِرَ অর্থাৎ, নূহ (আঃ)-এর জাতি নূহ (আঃ)-কে শুধু মিথ্যাবাদীই ভাবেনি, বরং তারা তাঁকে ভয় দেখিয়েছিল, ধমক দিয়েছিল এবং হুমকিও দেখিয়েছিল। যেমন অন্যত্র বলেন, {لَئِن لَّمْ تَنتَهِ يَا نُوحُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمَرْجُومِينَ} হে নূহ! তুমি যদি বিরত না হও, তাহলে তোমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হবে।
(সূরা শুআরা ২৬:১১৬ আয়াত)