🕋 تفسير سورة الممتحنة
(Al-Mumtahana) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ ۙ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي ۚ تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ ۚ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ
📘 হে বিশ্বাসীগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।[১] তোমরা তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও,[২] অথচ তারা তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে, রসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করেছে এই কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর।[৩] যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্য আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বহির্গত হয়ে থাক (তাহলে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না)।[৪] তোমরা গোপনে তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমরা যা গোপন কর এবং তোমরা যা প্রকাশ কর, তা আমি সম্যক অবগত। তোমাদের যে কেউ এটা করে, সে তো সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়। [৫]
[১] মক্কার কাফেরগণ এবং নবী (সাঃ)-এর মাঝে হুদাইবিয়াতে যে সন্ধিচুক্তি হয়েছিল, মক্কার কাফেররা তা ভঙ্গ করল। এই জন্য নবী (সাঃ)ও গোপনে মুসলিমদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। হাত্বেব ইবনে আবী বালতাআ' (রাঃ) বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী একজন মুহাজির সাহাবী ছিলেন। কুরাইশদের সাথে তাঁর কোন আত্মীয়তা ছিল না। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি মক্কাতেই ছিল। তিনি ভাবলেন যে, মক্কার কুরাইশদেরকে যদি নবী (সাঃ)-এর প্রস্তুতি সম্পর্কে জানিয়ে দিই, তাহলে এই অনুগ্রহের বদলায় তারা আমার সন্তান-সন্ততি ও মাল-ধনের হিফাযত করবে। তাই তিনি এই সংবাদটা লিখিত আকারে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কাফেরদের নিকট প্রেরণ করলেন। এদিকে অহীর মাধ্যমে নবী করীম (সাঃ)-কে ব্যাপারটা জানিয়ে দেওয়া হয়। তাই তিনি আলী, মিকদাদ এবং যুবায়ের (রাঃ)-দেরকে বললেন, "যাও, 'রওয্বাতু খাখ' নামক স্থানে মক্কাগামিনী একজন মহিলাকে পাবে; তার কাছে আছে একটি পত্র, সেটি উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।" তাঁরা গিয়ে তাঁর কাছ থেকে পত্র উদ্ধার করে নিয়ে এলেন, যা সে তার মাথার চুলের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। তিনি হাত্বেব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন যে, "তুমি এ কাজ কেন করেছ?" তিনি বললেন, 'আমি এ কাজ কুফরী এবং দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যাওয়ার কারণে করিনি, বরং অন্যান্য মুহাজির সাহাবীদের আত্মীয়-স্বজন মক্কাতে বিদ্যমান থাকায় তারা এঁদের (মুহাজির সাহাবীদের) সন্তান-সন্ততির হিফাযত করে। আমার সেখানে কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই আমি চিন্তা করলাম যে, আমি যদি তাদের কিছু জানিয়ে দিই, তবে তারা আমার অনুগ্রহের মূল্য দিয়ে আমার সন্তানদের হিফাযত করবে।' রসূল (সাঃ) এ কথা সত্য জেনে তাঁকে কিছুই বললেন না। তবুও আল্লাহ সতর্কতা স্বরূপ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। যাতে আগামীতে কোন মু'মিন কোন কাফেরের সাথে যেন এই ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক না রাখে।
(বুখারী সূরা মুমতাহিনার তাফসীর, মুসলিম ফাযায়েলে সাহাবা অধ্যায়)
[২] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-এর এই প্রস্তুতির খবর তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপন করতে চাও?[৩] যখন তাদের তোমাদের সাথে এবং সত্যের সাথে এই ধরনের আচরণ, তখন তোমাদের জন্য কি এটা উচিত যে, তোমরা তাদের সাথে ভালবাসা রাখবে ও সহানুভূতি দেখাবে?[৪] বন্ধনীর মাঝে এটা শর্তের জওয়াব; যা আয়াতে ঊহ্য আছে।[৫] অর্থাৎ, আমার এবং তোমাদের শত্রুদের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক জুড়া এবং তাদের কাছে গোপনে পত্র ও বার্তা প্রেরণ করা হল ভ্রষ্টতার পথ, যা অবলম্বন করা কোন মুসলিমের উচিত নয়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ الْمُؤْمِنَاتُ مُهَاجِرَاتٍ فَامْتَحِنُوهُنَّ ۖ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِهِنَّ ۖ فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ ۖ وَآتُوهُمْ مَا أَنْفَقُوا ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ۚ وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ وَاسْأَلُوا مَا أَنْفَقْتُمْ وَلْيَسْأَلُوا مَا أَنْفَقُوا ۚ ذَٰلِكُمْ حُكْمُ اللَّهِ ۖ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
📘 হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের নিকট বিশ্বাসী নারীরা দেশত্যাগ করে আসলে, তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা কর। [১] আল্লাহ তাদের ঈমান (বিশ্বাস) সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন। যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা বিশ্বাসীনী,[২] তবে তাদেরকে অবিশ্বাসীদের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিয়ো না। বিশ্বাসী নারীরা অবিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয় এবং অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসী নারীদের জন্য বৈধ নয়।[৩] অবিশ্বাসীরা যা ব্যয় করেছে, তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও।[৪] অতঃপর তোমরা তাদেরকে বিবাহ করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না;[৫] যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও। তোমরা অবিশ্বাসী নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না।[৬] তোমরা যা ব্যয় করেছ,[৭] তা ফেরত চেয়ে নাও এবং অবিশ্বাসীরা ফেরত চেয়ে নিক, যা তারা ব্যয় করেছে।[৮] এটাই আল্লাহর ফায়সালা। তিনি তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করছেন।[৯] আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
[১] হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্রে একটি শর্ত এও ছিল যে, মক্কা থেকে কোন ব্যক্তি মুসলিমদের নিকট চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাতে পুরুষ বা মহিলা বলে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ ছিল না। তবে বাহ্যিকভাবে (أَحَدٌ) এর মধ্যে উভয়েই শামিল। কিছু দিন পর কোন কোন মহিলা মক্কা থেকে হিজরত করে মুসলমানদের কাছে চলে গেলে কাফেররা তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী করে। ফলে এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুসলমানদের পথ প্রদর্শন করলেন এবং এই নির্দেশ দিলেন। পরীক্ষা করার অর্থ, এ ব্যাপারে যাচাই করে নাও যে, হিজরত করে আগমনকারিণী যে মহিলারা ঈমান আনার কথা প্রকাশ করছে, তারা তাদের স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে অথবা কোন মুসলিমের প্রেমে পড়ে কিংবা অন্য কোন স্বার্থের কারণে তো চলে আসেনি? কেবল আশ্রয় গ্রহণের জন্য ঈমান আনার দাবী করছে না তো?
[২] অর্থাৎ, যাচাই করার পর যখন তোমরা এই ফলাফলে পৌঁছবে এবং প্রবল ধারণা এই সৃষ্টি হবে যে, বাস্তবিকই এ মু'মিনা।
[৩] এটা হল তাদেরকে তাদের কাফের স্বামীদের নিকট ফিরিয়ে না পাঠানোর কারণ। আর তা হল, এখন আর কোন মু'মিন মহিলা কোন কাফেরের জন্য হালাল নয়, যেমন ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এটা জায়েয ছিল। তাই তো নবী করীম (সাঃ)-এর কন্যা যায়নাব (রায্বিয়াল্লাহু আনহার) বিবাহ আবূল আ'স ইবনে রাবী'র সাথে হয়েছিল, অথচ সে মুসলিম ছিল না। আয়াতে আগামীতে এ রকম করতে নিষেধ করা হল। আর এই কারণেই এখানে বলা হল যে, তারা একে অপরের জন্য হালাল নয়। সুতরাং তাদেরকে কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দিও না। হ্যাঁ, স্বামীও যদি মুসলিম হয়ে যায়, তবে তাদের বিবাহ বন্ধন প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে, যদিও স্বামী তার স্ত্রীর পরে (ইদ্দতের মধ্যে) হিজরত করে আসে।
[৪] অর্থাৎ, তাদের কাফের স্বামীরা তাদেরকে যে মোহর দিয়েছিল, তা তোমরা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও।
[৫] এ কথা মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে যে, যে নারীরা ঈমানের কারণে তাদের কাফের স্বামীদেরকে ত্যাগ করে তোমাদের কাছে এসে গেছে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে পার। তবে শর্ত হল, তাদের প্রাপ্য মোহর তাদেরকে দিয়ে দেবে। তবে এ বিয়েও যথানিয়মে হবে। অর্থাৎ, প্রথমতঃ ইদ্দত পূরণ হওয়ার পর হবে। দ্বিতীয়তঃ এতে অভিভাবকের সম্মতি ও অনুমতি ও দু'জন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিও আবশ্যক। অবশ্য যে মহিলার সাথে তার স্বামীর কোন সম্পর্ক (মিলন) হয়নি, তার সাথে ইদ্দত ছাড়াই সত্বর বিবাহ জায়েয।
[৬] عِصَمٌ হল, عِصْمَةٌ এর বহুবচন। এখানে এর অর্থ, দাম্পত্য সম্পর্ক। অর্থাৎ, যদি স্বামী মুসলিম হয়ে যায় এবং স্ত্রী কাফের ও মুশরিক রয়ে যায়, তাহলে এ রকম মুশরিক মহিলাকে স্বীয় বিবাহ বন্ধনে রাখা বৈধ নয়। স্বামী তাকে সত্বর তালাক দিয়ে নিজের কাছ থেকে পৃথক করে দেবে। সুতরাং এই নির্দেশের পর উমার (রাঃ) তাঁর দু'জন মুশরিক স্ত্রীকে এবং ত্বালহা ইবনে উবায়দুল্লাহও তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন।
(ইবনে কাসীর)
তবে স্ত্রী যদি কিতাবিয়া (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান) হয়, তাহলে তাকে তালাক দেওয়া জরুরী নয়। কেননা, তাদের সাথে বিবাহ বৈধ। কাজেই সে (ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান স্ত্রী) যদি প্রথম থেকেই স্ত্রীরূপে স্বামীর কাছে থেকে থাকে, তবে ইসলাম কবুল করার পর তাকে বিচ্ছিন্ন করার কোন প্রয়োজন নেই।
[৭] অর্থাৎ, সেই মহিলাদের উপর, যারা কুফরীতে অবিচল থাকার কারণে কাফেরদের নিকট চলে গেছে।
[৮] অর্থাৎ, সেই মহিলাদের উপর, যারা মুসলিম হয়ে হিজরত করে মদীনায় চলে এসেছে।
[৯] অর্থাৎ, উভয়েরই একে অপরকে মোহরের পাওনা আদায় করার, বরং চেয়ে নেওয়ার উল্লিখিত বিধান হল আল্লাহর বিধান। ইমাম ক্বুরত্বুবী বলেন, এ বিধান সেই যুগের সাথেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ব্যাপারে সকল মুসলিমের ঐকমত্য রয়েছে।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
আর এর কারণ হল সেই চুক্তি, যা সেই সময় উভয় দলের মাঝে হয়েছিল। এই ধরনের চুক্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতেও উক্ত বিধানের উপর আমল করা জরুরী হবে। অন্যথা হবে না।
وَإِنْ فَاتَكُمْ شَيْءٌ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ إِلَى الْكُفَّارِ فَعَاقَبْتُمْ فَآتُوا الَّذِينَ ذَهَبَتْ أَزْوَاجُهُمْ مِثْلَ مَا أَنْفَقُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنْتُمْ بِهِ مُؤْمِنُونَ
📘 তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যদি কেউ হাত ছাড়া হয়ে অবিশ্বাসীদের নিকট চলে যায় এবং তোমাদের যদি প্রতিশোধ নেওয়ার কোন সুযোগ আসে,[১] তাহলে যাদের স্ত্রীরা হাত ছাড়া হয়ে গেছে তাদেরকে, তারা যা ব্যয় করেছে তার সমপরিমাণ অর্থ প্রদান কর, আর তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।
[১] فَعَاقَبْتُمْ (তোমরা শাস্তি দাও অথবা প্রতিশোধ নাও) এর একটি অর্থ হল, মুসলিম হয়ে আগমনকারী মহিলাদের প্রাপ্য মোহর যা তোমাদেরকে তাদের কাফের স্বামীদেরকে দিতে হত, সেটা তোমরা সেই মুসলিমদেরকে দিয়ে দাও, যাদের স্ত্রীরা কাফের হওয়ার কারণে কাফেরদের কাছে চলে গেছে এবং মুসলিমদের মোহরের পাওনা ফেরত দেয়নি। (অর্থাৎ, এটাও এক প্রকার সাজা।) দ্বিতীয় অর্থ হল, তোমরা কাফেরদের সাথে জিহাদ কর। অতঃপর যে গনীমতের মাল অর্জন কর, তা থেকে বণ্টনের পূর্বে প্রথমে যে মুসলিমদের স্ত্রীরা চলে গিয়ে কাফেরদের দলে মিলিত হয়েছে। তাদের ব্যয়কৃত অর্থের সমপরিমাণ তাদেরকে দিয়ে দাও। অর্থাৎ, গনীমতের মাল থেকে মুসলিমদের ক্ষতি পূরণ করা এটাও এক প্রকার শাস্তি বা প্রতিশোধ।
(আইসারুত তাফাসীর ও ইবনে কাসীর)
যদি গনীমতের মাল থেকে ক্ষতি পূরণ সম্ভব না হয়, তাহলে বাইতুল মাল থেকে সাহায্য করা হবে।
(আইসারুত তাফাসীর)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَنْ لَا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
📘 হে নবী! বিশ্বাসী নারীরা যখন তোমার নিকট এসে বায়আত করে এই মর্মে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ কর[১] এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] এই 'বায়আত' সেই সময় নেওয়া হত, যখন মহিলারা হিজরত করে আসত। যেমন, সহীহ বুখারীতে সূরা মুমতাহিনার তফসীরে এসেছে। এ ছাড়া মক্কা বিজয়ের দিনেও নবী (সাঃ) কুরাইশ মহিলাদের কাছ থেকে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। বায়আত নেওয়ার সময় তিনি কেবল মৌখিকভাবে তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিতেন। কোন মহিলার হাত তিনি স্পর্শ করতেন না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! বায়আত গ্রহণকালে নবী করীম (সাঃ)-এর হাত কখনোও কোন মহিলার হাত স্পর্শ করেনি। বায়আত নেওয়ার সময় তিনি কেবল বলতেন, "আমি এই কথার উপর তোমার কাছে বায়আত গ্রহণ করলাম।"
(বুখারী, সূরা মুমতাহিনার তাফসীর পরিচ্ছেদ)
বায়আতে তিনি মহিলাদের কাছ থেকে এ প্রতিশ্রুতিও নিতেন যে, তারা শোকে রোদন করবে না, বুকের কাপড় ছিঁড়ে মাতম করবে না। মাথার চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করবে না এবং জাহেলী যুগের মহিলাদের মত ডাক পাড়বে না।
(বুখারী ও মুসলিম প্রভৃতি)
এই বায়আতে নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত ইত্যাদির কথা উল্লেখ নেই। কারণ, এগুলো ইসলামের রুকন এবং দ্বীনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ আচার, বিধায় তার বর্ণনার প্রয়োজন হয় না। তিনি বিশেষ করে সেই জিনিসগুলোর বায়আত নেন, সাধারণতঃ যেগুলো মহিলাদের দ্বারা বেশী হয়ে থাকে। যাতে তারা দ্বীনের রুকনগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়ার সাথে সাথে এই জিনিসগুলো থেকেও বিরত থাকে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উলামা, দ্বীনের প্রতি আহবানকারী এবং বক্তাগণ যেন তাঁদের বক্তব্যকে কেবল আরকানে দ্বীন বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রাখেন। কেননা, এগুলো তো পূর্ব থেকেই স্পষ্ট। বরং তাঁদের উচিত সেই সব অন্যায়-অনাচার, অনিসলামী রসম-রেওয়াজ, কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিবাদ জানানো, যা সমাজে ব্যাপকভাবে চলছে এবং যা থেকে নামায-রোযার প্রতি যত্নবান ব্যক্তিরাও অনেক সময় দূরে থাকে না।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا مِنَ الْآخِرَةِ كَمَا يَئِسَ الْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَابِ الْقُبُورِ
📘 হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের প্রতি রুষ্ট তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না, [১] তারা তো পরকাল সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছে, যেমন হতাশ হয়েছে অবিশ্বাসীরা কবরবাসীদের বিষয়ে। [২]
[১] এ থেকে কেউ ইয়াহুদীদের, কেউ মুনাফিকদের এবং কেউ সমস্ত কাফেরদেরকে বুঝিয়েছেন। আর এই শেষের উক্তিটাই বেশী সঠিক মনে হচ্ছে। কেননা, এতে ইয়াহুদী ও মুনাফিকরাও এসে যায়। এ ছাড়া সমস্ত কাফেররা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হওয়ারই যোগ্য। অতএব অর্থ হবে, কোন কাফেরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখো না। যেমন, কুরআনের আরো কয়েকটি স্থানে এ বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
[২] পরকাল সম্পর্কে হতাশ হওয়ার অর্থ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা অস্বীকার করা। কবরবাসী থেকে নিরাশ হওয়ার অর্থও এটাই যে আখেরাতে পুনরায় তাদেরকে উঠানো হবে না। এর দ্বিতীয় অর্থ এও করা হয়েছে যে, কবরস্থ কাফের সর্বপ্রকার মঙ্গল থেকে নিরাশ। কেননা, মৃত্যুবরণ করার পর সে তার কুফরীর পরিণাম দেখে নিয়েছে। অতএব সে মঙ্গলের কি আর আশা করতে পারে?
(ইবনে জারীর ত্বাবারী)
إِنْ يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَأَلْسِنَتَهُمْ بِالسُّوءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ
📘 তোমাদেরকে কাবু করতে পারলে, তারা তোমাদের শত্রু হবে এবং হস্ত ও রসনা দ্বারা তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে এবং চাইবে যে, তোমরা অবিশ্বাসী হয়ে যাও। [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে বিরাজ করছে এই ধরনের হিংসা ও বিদ্বেষ, আর তোমরা তাদের উপর ভালবাসার ফুল বর্ষণ করতে চাও?
لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ ۚ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
📘 তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোনই কাজে আসবে না।[১] আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন। [২] আর তোমরা যা কর, তিনি তা দেখেন।
[১] অর্থাৎ, যে সন্তান-সন্ততিদের জন্য তোমরা কাফেরদের প্রতি ভালবাসা দেখাচ্ছ তারা তো তোমাদের কোন উপকারে আসবে না। তাহলে তাদের জন্য কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট কেন করছ? কিয়ামতের দিন যে জিনিস উপকারে আসবে, তা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য। অতএব এর প্রতি যত্নবান হও।
[২] এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ তোমাদেরকে পৃথক পৃথক করে দেবেন। অর্থাৎ, আনুগত্যকারীদেরকে জান্নাতে এবং অবাধ্যজনদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। কেউ কেউ বলেন, পৃথক হওয়ার অর্থ হল, এক অপরের কাছ থেকে পালাবে। যেমন, আল্লাহ বলেন, ﴿يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ﴾ যেদিন (কঠিন ভয়াবহতার কারণে) ভাই ভাই থেকে পালাবে।
(আবাসাঃ ৩৪)
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ إِلَّا قَوْلَ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ۖ رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
📘 অবশ্যই তোমাদের জন্য ইব্রাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ;[১] তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার উপাসনা কর, তার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।[২] আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের জন্য সৃষ্টি হল শত্রুতা ও বিদ্বেষ, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছ।’[৩] তবে ব্যতিক্রম তার পিতার প্রতি ইব্রাহীমের উক্তি,[৪] ‘আমি নিশ্চয়ই তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব এবং তোমার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট কোন অধিকার রাখি না।’ (ইব্রাহীম ও তাঁর অনুসারিগণ বলেছিল,) ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো তোমারই উপর নির্ভর করেছি,[৫] তোমারই অভিমুখী হয়েছি এবং প্রত্যাবর্তন তো তোমারই নিকট।
[১] কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না করার বিষয়কে আরো স্পষ্ট করার জন্য ইবরাহীম (আঃ)-এর উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে। أُسْوَةٌ এর অর্থ হল, এমন উত্তম নমুনা ও আদর্শ যার অনুসরণ করা যায়।[২] অর্থাৎ, শিরকের কারণে আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া আল্লাহর উপাসকদের সাথে গায়রুল্লাহর পূজারীদের কি সম্পর্ক থাকতে পারে?[৩] অর্থাৎ, এই বিচ্ছেদ ও বিদ্বেষ ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না তোমরা কুফরী ও শিরক ত্যাগ করে তাওহীদকে অবলম্বন করেছ। যখন তোমরা এক আল্লাহর অনুসারী হয়ে যাবে, তখন এ শত্রুতা বন্ধুত্বে এবং বিদ্বেষ সম্প্রীতিতে পরিবর্তন হয়ে যাবে।[৪] فِي ابراهيم এর মধ্যে সম্বন্ধসূচক যে শব্দ ঊহ্য আছে তা থেকে এটা ব্যতিক্রান্ত। অর্থাৎ, {قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي مَقَالاَتِ إِبْرَاهِيْمَ إلاَّ قَوْلَهُ لِأَبِيْه}ِ অথবা أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ থেকে ব্যতিক্রান্ত। কারণ তাঁর কথাগুলো সবই আদর্শ। যেন বলা হয়েছে যে, {قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيْمَ فِي جَمِيْعِ أَقْوَالِهِ وأَفْعَالِهِ إِلاَّ قَوْلَهُ لِأَبِيْه}ِ (فتح القدير) অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর পুরো জীবনটাই এক অনুসরণীয় আদর্শ। তবে তাঁর (মুশরিক) পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এমন একটি কাজ, যাতে তাঁর অনুসরণ করা উচিত নয়। কেননা, তাঁর এই কাজটা ছিল তখনকার, যখন তিনি নিজ পিতার ব্যাপারটা জানতেন না। সুতরাং যখন তিনি অবগত হলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্নতার কথা ঘোষণা করলেন। যেমন, সূরা তাওবার ৯:১১৪ নং আয়াতে রয়েছে।[৫] 'তাওয়াক্কুল' (নির্ভর, ভরসা) করার অর্থ হল, সাধ্যমত বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার সাথে সাথে ব্যাপারকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণ অবলম্বন না করেই আল্লাহর উপর ভরসা প্রকাশ করা হোক। এ থেকে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই 'তাওয়াক্কুল' এর এই (উপায়-উপকরণ গ্রহণ না করেই ভরসা করা) অর্থ ভুল হবে। নবী (সাঃ)-এর নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হল এবং তার উটকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। তিনি তাকে (উটের কথা) জিজ্ঞাসা করলে, সে বলল, 'আমি উটকে আল্লাহর ভরসায় রেখে এসেছি।' তিনি (সাঃ) বললেন, (اعْقِلْها وَتَوَكَّلْ) "প্রথমে একে বাঁধ, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।"
(তিরমিযী)
إنابة অর্থ হল, আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন করা, আল্লাহর অভিমুখী হওয়া।
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
📘 হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে অবিশ্বাসীদের জন্য ফিতনার কারণ করো না,[১] হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
[১] অর্থাৎ কাফেরদেরকে আমাদের উপর বিজয় ও কর্তৃত্ব দান করো না। এতে তারা মনে করবে যে, তারাই সত্যের উপর আছে। এইভাবে আমরা কাফেরদের জন্য ফিতনা ও পরীক্ষার কারণ হয়ে যাব। অথবা অর্থ হল, তাদের হাতে কিংবা তোমার পক্ষ হতে আমাদেরকে কোন শাস্তির মধ্যে ফেলো না। এতেও আমাদের অস্তিত্ব তাদের জন্য ফিতনার কারণ হবে। কারণ তারা বলবে যে, যদি এরা হকপন্থী হত, তাহলে তাদের উপর এই কষ্ট কি আসত?
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ ۚ وَمَنْ يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
📘 নিশ্চয়ই তোমরা যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রত্যাশা কর,[১] তাদের জন্য তাদের মধ্যে[২] রয়েছে উত্তম আদর্শ। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে[৩] সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ।
[১] কেননা, এই ধরনের লোকরাই আল্লাহকে এবং আখেরাতের আযাবকে ভয় করে। এরাই অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী থেকে উপদেশ গ্রহণ করে।
[২] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ) এবং তাঁর অনুসারী সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে। এর পুনরাবৃত্তি তাকীদ স্বরূপ করা হয়েছে।
[৩] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর আদর্শ হতে মুখ ফিরিয়ে নিলে।
۞ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُمْ مِنْهُمْ مَوَدَّةً ۚ وَاللَّهُ قَدِيرٌ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
📘 যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে, সম্ভবতঃ আল্লাহ তাদের ও তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। [১] আর আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] অর্থাৎ, তাদেরকে মুসলমান করে তোমাদের ভাই ও সাথী বানিয়ে দেবেন। যার ফলে তোমাদের মাঝের শত্রুতা ও বিদ্বেষ বন্ধুত্ব ও ভালবাসায় পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর হলও তা-ই। মক্কা বিজয়ের পর মানুষ দলে দলে মুসলমান হতে শুরু করল। আর তাদের মুসলিম হওয়ার সাথে সাথেই আপোসের বিদ্বেষ ভালবাসায় পরিবর্তন হয়ে গেল। যারা মুসলমানদের রক্ত-পিপাসু ছিল, তারা পরস্পরের সাহায্যকারীতে পরিণত হয়ে গেল।
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
📘 দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি[১] এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি,[২] তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না।[৩] নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। [৪]
[১] এখানে এমন কাফেরদের সাথে পার্থিব লেনদেন ও আচার-ব্যবহার বিষয়ক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যারা দ্বীন ইসলামের কারণে মুসলিমদের সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতা রাখে না এবং এর ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। এটা প্রথম শর্ত।
[২] অর্থাৎ, তোমাদের সাথে এমন আচরণও করে না যে, তোমরা হিজরত করতে বাধ্য হয়ে যাও। এটা দ্বিতীয় শর্ত। পরের আয়াত থেকে তৃতীয় আর একটি শর্তও পরিষ্কার হয়ে যায়। আর তা হল, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্যান্য কাফেরদেরকে কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতাও করে না; না পরামর্শ দিয়ে, আর না অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে।
[৩] অর্থাৎ, এই ধরনের কাফেরদের সাথে অনুগ্রহ প্রদর্শন এবং সুবিচারপূর্ণ আচরণ করা নিষেধ নয়। যেমন, আসমা বিনতে আবী বাকর (রাঃ) তাঁর মুশরিক মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা সম্পর্কে নবী (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বললেন, صِلِىْ أُمَّكِ "তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কর।"
(বুখারীঃ আদব অধ্যায় ২৬২০নং, মুসলিমঃ যাকাত অধ্যায়ঃ ১০০৩নং)
[৪] এতে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি, কাফেরদের সাথেও। হাদীস শরীফে ন্যায়পরায়ণ ও সুবিচারকারীদের ফযীলত এইভাবে বর্ণিত হয়েছে, "আল্লাহর নিকট যারা ন্যায়পরায়ণ তারা দয়াময়ের ডান পার্শ্বে জ্যোতির মিম্বরের উপর অবস্থান করবে। আর তাঁর উভয় হস্তই ডান। (ঐ ন্যায়পরায়ণ তারা) যারা তাদের বিচারে, পরিবারে এবং তার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে ন্যায়নিষ্ঠ।"
(মুসলিম ১৮২৭ নং)
إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَىٰ إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
📘 আল্লাহ শুধু তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্করণে সহযোগিতা করেছে। তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে,[১] তারাই তো অত্যাচারী।[২]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার বাণী ও তাঁর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।[২] কেননা, তারা এমন লোকের সাথে ভালবাসা রাখে, যারা ভালবাসার পাত্র নয়। আর এইভাবে তারা নিজেদের নাফসের প্রতি যুলুম করে। কেননা, তাকে আল্লাহর আযাবের জন্য পেশ করে থাকে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاء بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
(সূরা মাইদাহ ৫:৫১ আয়াত)