WhatsApp Book A Free Trial
القائمة

🕋 تفسير سورة التغابن

(At-Taghabun) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۖ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

📘 আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, [১] সার্বভৌমত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই, [২] তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [১] অর্থাৎ, আসমান ও যমীনে বিদ্যমান সকল সৃষ্টিকুল মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে; অবস্থার ভাষায় এবং মুখের ভাষাতেও। এ কথা পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে। [২] অর্থাৎ, এই উভয় বৈশিষ্ট্যই কেবল তাঁরই জন্য। যদি কারো কোন এখতিয়ার থাকে, তবে তা তাঁরই প্রদত্ত এবং তা ক্ষণস্থায়ী। কেউ যদি কোন সৌন্দর্য ও পূর্ণতা লাভ করে থাকে, তবে তাও তাঁরই করুণার ভান্ডার থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ লাভ করে। কাজেই প্রকৃতপক্ষে প্রশংসা পাওয়ার অধিকারী একমাত্র তিনিই।

وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ خَالِدِينَ فِيهَا ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

📘 আর যারা কুফরী করবে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ ঐ প্রত্যাবর্তনস্থল!

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ ۚ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

📘 আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন বিপদই আপতিত হয় না।[১] আর যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন।[২] আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [১] অর্থাৎ, প্রত্যেক বিপদই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং তাঁরই ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এই আয়াত অবতীর্ণের কারণ হল কাফেরদের এই উক্তি, যদি মুসলমানরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে দুনিয়াতে কোন বালা-মুসীবত তাদের উপর আসত না। (ফাতহুল ক্বাদীর) [২] অর্থাৎ, সে জেনে নেয় যে, তার উপর যে বিপদই এসেছে, তা আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তাঁর নির্দেশে এসেছে। ফলে সে ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, তার অন্তরে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে দেন। ফলে সে জেনে যায় যে, তার উপর যে বিপদ আসার আছে, তা টলতে পারে না এবং যা তার উপর আসার নয়, তা আসতে পারে না। (ইবনে কাসীর)

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ ۚ فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَإِنَّمَا عَلَىٰ رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ

📘 তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য কর। কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমার রসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে প্রচার করা। [১] [১] অর্থাৎ, আমার রসূলের তাতে কিছু এসে যাবে না। কেননা, তাঁর কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন, আল্লাহর কাজ রসূল প্রেরণ করা। আর রসূলের কাজ পৌঁছে দেওয়া। মানুষের কাজ তা মান্য করা। (ফাতহুল ক্বাদীর)

اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ

📘 আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং বিশ্বাসীরা যেন আল্লাহর উপরই নির্ভর করে।[১] [১] অর্থাৎ, সমস্ত বিষয় তাঁকেই সোপর্দ করে, তাঁরই উপর ভরসা করে এবং শুধুমাত্র তাঁরই কাছে প্রার্থনা ও আশ্রয় কামনা করে। কেননা, তিনি ব্যতীত কেউ প্রয়োজন পূরণকারীও নেই এবং মুসীবত দূরকারীও নেই। (বিপত্তারণ ও পতিতপাবন একমাত্র তিনিই।)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ ۚ وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ

📘 হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু,[১] অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো।[২] আর তোমরা যদি তাদেরকে মার্জনা কর, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা কর এবং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাহলে (জেনে রেখো যে,) নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [৩] [১] অর্থাৎ, যারা তোমাদের নেক কাজ ও আনুগত্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে, জেনে নিও তারা তোমার কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী নয়, বরং শত্রু। [২] অর্থাৎ, তুমি তাদের পিছনে পড়ো না, বরং তাদেরকে তোমার পিছনে লাগাও, যাতে তারাও আল্লাহর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে নেয়। তুমি তাদের পিছনে পড়ে নিজের পরিণাম মন্দ করো না। [৩] এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয় যে, মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে মদীনা আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কারণ, তখন হিজরত করার নির্দেশ বড়ই তাকীদের সাথে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিরা হিজরতের পথে বাধা সৃষ্টি করে তাঁদেরকে হিজরত করতে দিল না। পরে যখন তাঁরা রসূল (সাঃ)-এর নিকট এসে পড়লেন, তখন দেখলেন যে, তাঁদের পূর্বে আসা লোকেরা ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছুই শিখে নিয়েছেন। তখন তাঁরা তাঁদের সেই স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের প্রতি রাগাম্বিত হলেন, যারা তাঁদেরকে হিজরত করতে বাধা দিয়েছিল। সুতরাং তাঁরা তাদেরকে সাজা দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাঁদেরকে মার্জনা এবং উপেক্ষা করার কথা শিক্ষা দিলেন। (সুনানে তিরমিযী সূরা তাগাবুনের তাফসীর পরিচ্ছেদ)

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ

📘 তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ।[১] আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার।[২] [১] যারা তোমাদেরকে হারাম উপার্জন করতে প্ররোচিত করে এবং আল্লাহর অধিকার আদায় করতে বাধা দেয়। আর এই পরীক্ষায় তোমরা তখনই সফল হতে পারবে, যখন আল্লাহর অবাধ্যাচরণে তাদের আনুগত্য করবে না। অর্থাৎ, মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর নিয়ামতও বটে এবং তা মানুষের পরীক্ষার মাধ্যমও বটে। আল্লাহ দেখতে চান যে, তাঁর অনুগত কে এবং অবাধ্য কে? [২] অর্থাৎ, সেই ব্যক্তির জন্য, যে মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততির ভালবাসার মোকাবেলায় আল্লাহর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয় এবং তাঁর অবাধ্যাচরণ থেকে বিরত থাকে।

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ ۗ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

📘 তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় কর এবং শোনো, আনুগত্য কর[১] ও ব্যয় কর, তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে।[২] আর যারা অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম। [১] অর্থাৎ, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের কথাগুলোকে মনোযোগ ও ধ্যান দিয়ে শোনো এবং তার উপর আমল কর। কেননা, কেবল শুনে নেওয়া কোন উপকারে আসবে না, যতক্ষণ না আমল হবে। [২] خَيْرًا أَيْ: إِنْفَاقًا خَيْرًا، يَكُن الإِنْفَاقُ خَيْرًا 'ব্যয় কর' শব্দটি ব্যাপকার্থবোধক শব্দ, যা ওয়াজেব ও নফল উভয় প্রকার সাদাকাই শামিল।

إِنْ تُقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضَاعِفْهُ لَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَاللَّهُ شَكُورٌ حَلِيمٌ

📘 যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর,[১] তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। [২] আর আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল।[৩] [১] অর্থাৎ, খালেস নিয়তে (আন্তরিকতার সাথে) এবং সন্তুষ্ট মনে যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর। (তাহলে তা তোমাদের বৃথা যাবে না। বরং তা ঋণের মত পরিশোধ করা হবে।) [২] অর্থাৎ, তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে পরিশোধ করার সাথে সাথে তিনি তোমাদের গোনাহসমূহকেও মার্জনা করে দেবেন। [৩] তিনি গুণগ্রাহীঃ তিনি তাঁর অনুগতদেরকে أَضْعَافًا مُضَاعَفَةً বহুগুণ সওয়াব দানে ধন্য করেন। তিনি সহনশীলঃ তিনি অবাধ্যদেরকে সত্বর পাকড়াও করেন না।

عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

📘 তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنْكُمْ كَافِرٌ وَمِنْكُمْ مُؤْمِنٌ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

📘 তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় অবিশ্বাসী এবং কেউ বিশ্বাসী। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। [১] [১] অর্থাৎ, মানুষের জন্য ভাল-মন্দ, নেকী-বদী এবং কুফরী ও ঈমানের রাস্তাসমূহ পরিক্ককার বাতলে দেওয়ার পর মহান আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তারই ভিত্তিতে কেউ কুফরী এবং কেউ ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে। তিনি কাউকে কোন কিছুর উপর বাধ্য করেননি। তিনি বাধ্য করলে, কোন ব্যক্তি কুফরী ও অবাধ্যতার রাস্তা অবলম্বন করতে সক্ষম হত না। কিন্তু এইভাবে মানুষকে পরীক্ষা করা সম্ভব হত না। অথচ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হল মানুষকে পরীক্ষা করা। ﴿الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا﴾ (الملك: ২) অতএব যেমন কাফেরের স্রষ্টা আল্লাহ, তেমনি কুফরীর স্রষ্টাও তিনিই। কিন্তু এই কুফরী এই কাফেরের নিজের উপার্জিত। সে স্বেচ্ছায় তা অবলম্বন করেছে। অনুরূপ মু'মিন ও ঈমানের স্রষ্টা আল্লাহই, কিন্তু ঈমান এই মু'মিনের নিজের উপার্জন করা জিনিস। সে স্বেচ্ছায় এটা অবলম্বন করছে। আর এই উপার্জনের ভিত্তিতে উভয়কেই তাদের আমল অনুযায়ী বদলাও দেওয়া হবে। কারণ, তিনি সবারই আমল দেখছেন।

خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ ۖ وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ

📘 তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন।[১] তিনি তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন এবং তোমাদের আকৃতি সুন্দর করেছেন। [২] আর প্রত্যাবর্তন তো তাঁরই নিকট। [৩] [১] অর্থাৎ, তা তিনি অযথা সৃষ্টি করেননি। বরং এর সৃষ্টির পিছনে ন্যায়পরায়ণতা ও যুক্তি আছে। আর তার দাবী হল, নেককারকে তার নেকীর এবং বদকারকে তার বদীর বদলা দেওয়া হোক। সুতরাং তিনি এই ন্যায়পরায়ণতার (দাবীর) পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটাবেন কিয়ামতের দিন।[২] তোমাদের আকৃতি, শারীরিক গঠন এবং চেহারার আকৃতি এত সুন্দর বানিয়েছেন যে, আল্লাহর অন্য সৃষ্টিকুল এ থেকে বঞ্চিত। যেমন, সূরা ইনফিত্বার ৮২:৬-৮ এবং সূরা মু'মিন ৪০:৬৪ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ﴿يَا أَيُّهَا الْأِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ * الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ* فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ﴾ (الانفطار:৬-৮)﴿وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ ﴾ (المؤمن:৬৪)[৩] অন্য কারো কাছে নয় যে, আল্লাহর পাকড়াও ও হিসাব-নিকাশ হতে বেঁচে যাবে।

يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعْلِنُونَ ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ

📘 আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। তিনি জানেন তোমরা যা গোপন কর ও তোমরা যা প্রকাশ কর এবং আল্লাহ অন্তর্যামী। [১] [১] অর্থাৎ, তাঁর জ্ঞান আসমান ও যমীনে সারা বিশ্বেই পরিব্যাপ্ত। বরং তোমাদের অন্তরের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত। ইতিপূর্বে যেসব প্রতিশ্রুতি ও ধমকের কথা বর্ণিত হয়েছে এটা হচ্ছে তারই তাকীদ স্বরূপ।

أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ فَذَاقُوا وَبَالَ أَمْرِهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

📘 তোমাদের নিকট কি পূর্ববর্তী অবিশ্বাসীদের বৃত্তান্ত পৌঁছেনি? তারা তাদের কর্মের মন্দফল আস্বাদন করেছিল[১] এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [২] [১] এখানে বিশেষ করে মক্কাবাসী এবং সাধারণভাবে আরবের কাফেরদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর পূর্বের কাফের বলতে নূহ (আঃ)-এর জাতি, আ'দ সম্প্রদায় এবং সামুদ সম্প্রদায় ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। যাদেরকে তাদের কুফরী ও অবাধ্যতার কারণে দুনিয়াতে আযাব দিয়ে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। [২] অর্থাৎ, দুনিয়ার আযাব ছাড়াও আখেরাতের আযাবও তাদের জন্য প্রস্তুত আছে।

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُ كَانَتْ تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُوا وَتَوَلَّوْا ۚ وَاسْتَغْنَى اللَّهُ ۚ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَمِيدٌ

📘 তা এ জন্য যে,[১] তাদের নিকট তাদের রসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ আসত, তখন তারা বলত, ‘মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দেবে?’[২] অতঃপর তারা অবিশ্বাস করল[৩] ও মুখ ফিরিয়ে নিল[৪] এবং আল্লাহও কোন পরোয়া করলেন না।[৫] আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, [৬] প্রশংসার্হ। [৭] [১] ذَلِكَ এ থেকে ইঙ্গিত হল সেই আযাবের প্রতি যা দুনিয়াতে তারা পেয়েছে। আর আখেরাতেও তা পাবে। [২] এটা হল তাদের কুফরী করার কারণ। তারা এই কুফরী যা তাদের ইহকাল ও পরকালের আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়াল তা এই জন্য অবলম্বন করেছিল যে, তারা একজন মানুষকে তাদের পথপ্রদর্শক মানতে অস্বীকার করল। অর্থাৎ, একজন মানুষের রসূল হয়ে লোকদের হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য আসার ব্যাপারটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যেমন, আজও বিদআতীদের কাছে রসূলকে মানুষ মনে করা বড়ই কষ্টকর মনে হয়। هَدَاهُمُ اللهُ تَعَالَى। [৩] সুতরাং উক্ত কারণে তারা রসূলদেরকে 'রসূল' বলে মেনে নিতে এবং তাঁদের উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করল। [৪] অর্থাৎ, তাঁদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং যে দাওয়াত তাঁরা পেশ করতেন, সে ব্যাপারে তারা ভাবনা-চিন্তা করেও দেখল না। [৫] অর্থাৎ, তাদের ঈমান ও ইবাদতের। [৬] কারো ইবাদতে তাঁর লাভ কি এবং কেউ তাঁর ইবাদত না করলে তাঁর ক্ষতিই বা কি? [৭] অর্থাৎ, তিনি সকল সৃষ্টির কাছে প্রশংসনীয়। অর্থাৎ, সকল সৃষ্টিকুলের জবান সদা-সর্বদা তাঁর প্রশংসায় সিক্ত থাকে।

زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا ۚ قُلْ بَلَىٰ وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ ۚ وَذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ

📘 অবিশ্বাসীরা ধারণা করে যে, তারা কখনোই পুনরুত্থিত হবে না।[১] তুমি বল, ‘অবশ্যই হবে, আমার প্রতিপালকের কসম! তোমরা অবশ্য-অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে।[২] অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে।[৩] আর এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।’ [৪] [১] অর্থাৎ, এই বিশ্বাস রাখে যে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে না। এটা কাফেরদের কেবল ধারণা ছিল। যে ধারণার পিছনে তাদের কোন দলীল নেই। ধারণা শব্দের প্রয়োগ মিথ্যার উপরেও হয়ে থাকে।[২] কুরআন মাজীদের তিন জায়গায় মহান আল্লাহ তাঁর রসূলকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুমি তোমার প্রতিপালকের কসম খেয়ে ঘোষণা দাও যে, মহান আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করবেন। তার মধ্যে একটি জায়গা হল এই আয়াতে। দ্বিতীয়টি হল সূরা ইউনুস ১০:৫৩ নং আয়াতে এবং তৃতীয়টি হল, সূরা সাবা ৩৪:৩ নং আয়াতে।[৩] এটা হল কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার যৌক্তিকতা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ মানুষকে পুনরায় জীবিত এই জন্য করবেন যে, যাতে সেখানে প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের বদলা দেওয়া যায়। কেননা, দুনিয়াতে আমরা দেখি যে, এই বদলা পূর্ণরূপে পাওয়া যায় না। না নেককার পায়, না বদকার। এখন কিয়ামতেও যদি পূর্ণ প্রতিদানের কোন ব্যবস্থা না থাকে, তবে দুনিয়া খেলোয়াড়দের খেলার স্থান এবং একটি অনর্থক জিনিসই বিবেচিত হবে। অথচ মহান আল্লাহর সত্তা এ সব থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর তো কোন কাজই অনর্থক নয়। তাহলে জ্বিন ও ইনসানের সৃষ্টি বিনা উদ্দেশ্যে কেবল এক প্রকার খেল-তামাশা কিভাবে হতে পারে? تَعَالَى اللهُ عَنْ ذَلِكَ عُلُوًّا كَبِيْرًا[৪] এই দ্বিতীয়বার জীবিত করা মানুষদের কাছে যতই কঠিন অথবা অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা অতি সহজ ব্যাপার।

فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنْزَلْنَا ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

📘 অতএব[১] তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও যে জ্যোতি আমি অবতীর্ণ করেছি, তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর।[২] তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। [১] فَآمِنُوا তে 'ফা' অক্ষরটিকে বলা হয় 'ফা ফাসীহাহ' (যার অর্থঃ অতএব, সুতরাং, তাহলে) যা প্রমাণ করছে যে, এর পূর্বে কোন শর্ত ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, ব্যাপার যখন এই রকমই যা বর্ণিত হয়েছে, সুতরাং তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের উপর ঈমান আন এবং তাঁকে সত্য বলে মানো। [২] নবী (সাঃ)-এর সাথে যে নূর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা হল এই কুরআন মাজীদ। যার দ্বারা ভ্রষ্টতার অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং ঈমানের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়।

يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ ۖ ذَٰلِكَ يَوْمُ التَّغَابُنِ ۗ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

📘 (স্মরণ কর,) যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিবসে[১] সেদিন হবে হার-জিতের দিন।[২] যে ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করবে এবং সৎকর্ম করবে, তিনি তার পাপরাশি মোচন করবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহা সাফল্য। [১] কিয়ামতকে (সমাবেশ-দিবস বা একত্রিত হওয়ার দিন) এই কারণে বলা হয় যে, সেদিন পূর্বাপর সকলেই একই ময়দানে একত্রিত হবে। ফিরিশতা ডাক পাড়লে সকলেই তাঁর ডাকের শব্দ শুনতে পাবে। প্রত্যেকের দৃষ্টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেননা, মধ্যে কোন জিনিসের আড়াল থাকবে না। যেমন অন্যত্র বলেছেন, ﴿ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌمَشْهُودٌأَيْ: إِذَا كَانَ الأَمْرُ هَكَذَا فَصَدِّقُوْا بِاللهِ الجَمْع﴾ "এটা এমন একদিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে, সেদিনটি হাজিরের দিন।" (সূরা হুদ ১১:১০৩ আয়াত) ﴿قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ* لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ﴾ অর্থাৎ, বল, অবশ্যই পূর্ববর্তিগণ ও পরবর্তিগণ; সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে। (সূরা ওয়াক্বিআহ ৫৬;৪৯-৫০ আয়াত) [২] অর্থাৎ, একটি দল তো সাফল্য লাভ করবে আর একটি দল হবে ব্যর্থ। হকপন্থীরা বাতিলপন্থীদের উপর, ঈমানদাররা কাফেরদের উপর এবং আনুগত্যশীলরা অবাধ্যজনদের উপর জয়লাভ করবে। ঈমানদারদের সব থেকে বড় জিত এই হবে যে, তাঁরা জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং সেখানে সেই বাসস্থানগুলোও তাঁদের অধিকারে চলে আসবে, যেগুলো জাহান্নামীদের জন্য ছিল, যদি তারা জাহান্নামে যাওয়ার মত কাজ না করত। আর জাহান্নামীদের সব চেয়ে বড় হার হল, তাদের জাহান্নামে প্রবেশ করা। জাহান্নামীরা ভালকে মন্দ দ্বারা, উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট জিনিস দ্বারা এবং নিয়ামতসমূহকে আযাব দ্বারা পরিবর্তন করে নিয়েছে। غَبن অর্থ নোকসান ও ক্ষতি। অর্থাৎ, নোকসানের দিন। সেদিন কাফেরদের তো নোকসানের অনুভূতি হবেই, ঈমানদাররাও এই দিক দিয়ে নোকসান অনুভব করবেন যে, তাঁরা আরো অধিক সৎকর্ম করে আরো বেশী মর্যাদা কেন অর্জন করলেন না।