🕋 تفسير سورة يس
(Ya-Sin) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ يس
📘 ইয়া-সীন,[১]
[১] অনেকে এর অর্থ, 'হে ব্যক্তি! বা হে মানুষ!' বলেছেন। আবার অনেকে এটিকে নবী (সাঃ)-এর নাম এবং অনেকে আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নামাবলীর একটি নাম রূপে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই সকল মত কোন প্রমাণ ছাড়াই পেশ করা হয়েছে। কারণ এটিও সেই 'হরূফে মুক্বাত্ত্বাআত' (বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা), যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ অবগত নয়।
وَسَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
📘 তুমি ওদেরকে সতর্ক কর বা না কর, ওদের পক্ষে উভয়ই সমান; ওরা বিশ্বাস করবে না। [১]
[১] অর্থাৎ, যারা নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ভ্রষ্টতার ঐ স্থানে পৌঁছে যায়, তাদেরকে ভীতি-প্রদর্শন ও সতর্ক করা নিরর্থক।
إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَخَشِيَ الرَّحْمَٰنَ بِالْغَيْبِ ۖ فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرٍ كَرِيمٍ
📘 তুমি কেবল তাদেরকে সতর্ক করতে পার[১] যারা উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে পরম দয়াময়কে ভয় করে। অতএব তাদেরকে তুমি ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।
[১] অর্থাৎ, ভীতি প্রদর্শন ও সতর্কীকরণ শুধু তাদের উপকারে আসে।
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ ۚ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ
📘 নিশ্চয় আমি মৃতকে জীবিত করি[১] এবং লিখে রাখি ওদের কৃতকর্ম ও যা ওরা পশ্চাতে রেখে যায়, [২] আমি প্রত্যেক জিনিস স্পষ্ট গ্রন্থে সংরক্ষিত রেখেছি। [৩]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে। এখানে মৃতকে জীবিত করার বর্ণনায় উদ্দেশ্য এই ইঙ্গিত করা যে, আল্লাহ তাআলা কাফেরদের মধ্য হতে যার অন্তরকে চান জীবিত করে দেন; যা কুফর ও ভ্রষ্টতার কারণে মৃত হয়ে গিয়েছিল। ফলে সে হিদায়াত ও ঈমান গ্রহণ করে নেয়।
[২] مَا قَدَّمُوْا দ্বারা ঐ সকল আমল বা কৃতকর্মকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ নিজের জীবনে করে থাকে। এবং 'آثَارَهُمْ দ্বারা ঐ সকল ভাল ও মন্দ আমলের নমুনাকে বুঝানো হয়েছে, যা সে পৃথিবীতে ছেড়ে যায় এবং তার মৃত্যুর পর তার অনুসরণে মানুষ সেই আমল করতে থাকে। যেমন হাদীসে আছে, "যে ব্যক্তি ইসলামে কোন ভালো রীতি (বা কর্ম) প্রবর্তিত করে, তার জন্য রয়েছে তার সওয়াব (প্রতিদান) এবং তাদের সমপরিমাণ সওয়াব যারা ঐ রীতির অনুকরণে আমল (কর্ম) করে। এতে তাদের কারো সওয়াব এতটুকু পরিমাণও হ্রাস করা হয় না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতি (বা কর্মের) সূচনা করে, তার জন্য রয়েছে তার পাপ এবং তাদের সমপরিমাণ পাপও যারা ঐ রীতির অনুকরণে আমল (বা কর্ম) করে। এতে তাদের কারো পাপ এতটুকু পরিমাণ হ্রাস করা হয় না।"
(মুসলিম১০১৭নং, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)
অনুরূপ একটি হাদীস "যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার তিন প্রকার আমল ছাড়া সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়। (ক) এমন ইলম, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। (খ) নেক সন্তান, যে মৃত ব্যক্তির জন্য দু'আ করে। (গ) অথবা সাদকায়ে জারিয়া (প্রবহমান দান), যার দ্বারা তার মৃত্যুর পরেও মানুষ উপকৃত হতে থাকে।
(মুসলিম)
(آثارهم) এর দ্বিতীয় অর্থ হল, পদচিহ্ন। অর্থাৎ মানুষ পুণ্য ও পাপকর্মের জন্য যে সফর করে বা এক স্থান থেকে অন্য স্থান চলাচল করে, তার পদচিহ্ন লিপিবদ্ধ করা হয়। যেমন নবী (সাঃ)-এর যুগে মসজিদে নববীর নিকটে কিছু খালি জায়গা ছিল। বানু সালমাহ (গোত্র) সেখানে ঘর তৈরীর ইচ্ছা করল। যখন নবী (সাঃ) এই কথা অবগত হলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে মসজিদের নিকটে ঘর তৈরী করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, (دِيَارَكُمْ تُكْتَبُ آثَارُكُمْ) অর্থাৎ তোমাদের ঘর যদিও দূরে, তবুও তোমরা ঐখানেই থাক। তোমরা যত পা হেঁটে আসবে তা লিপিবদ্ধ করা হবে।
(মুসলিমঃ কিতাবুল মাসাজিদ)
ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন, দুই অর্থই স্ব-স্ব স্থানে সঠিক। পরস্পরের মাঝে কোন বিরোধ নেই। বরং দ্বিতীয় অর্থে অধিক সতর্কীকরণ রয়েছে যে, যখন মানুষের পদচিহ্ন পর্যন্ত লেখা হয়, তখন মানুষ যে ভাল ও মন্দ কর্মের নমুনা ছেড়ে যায় এবং তার মৃত্যুর পর মানুষ যার অনুসরণ করে, তা তো অধিকরূপেই লেখা হবে।
[৩] 'স্পষ্ট গ্রন্থ' বলে উদ্দেশ্য হল 'লাওহে মাহফুয' এবং অনেকে আমলনামাও উদ্দেশ্য নিয়েছেন।
وَاضْرِبْ لَهُمْ مَثَلًا أَصْحَابَ الْقَرْيَةِ إِذْ جَاءَهَا الْمُرْسَلُونَ
📘 ওদের নিকট এক জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত উপস্থিত কর, যাদের নিকট রসূল এসেছিল।[১]
[১] যাতে মক্কাবাসী এটা বুঝতে পারে যে, তুমি কোন নতুন রসূল নও; বরং রসূল ও নবীগণের আগমনের এই ধারাবাহিকতা পূর্ব থেকেই চলে আসছে।
إِذْ أَرْسَلْنَا إِلَيْهِمُ اثْنَيْنِ فَكَذَّبُوهُمَا فَعَزَّزْنَا بِثَالِثٍ فَقَالُوا إِنَّا إِلَيْكُمْ مُرْسَلُونَ
📘 ওদের নিকট দু’জন রসূল পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু ওরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলল; তখন আমি তাদেরকে তৃতীয় একজন দ্বারা শক্তিশালী করেছিলাম এবং তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি।’ [১]
[১] উক্ত তিন জন রসূল কে ছিলেন? মুফাসসিরীনগণ তাঁদের বিভিন্ন নাম বর্ণনা করেছেন। কিন্তু নামগুলি কোন সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত নয়। কোন কোন মুফাসসিরের ধারণা যে, তাঁরা ঈসা (আঃ)-এর দূত ছিলেন, যাঁদেরকে তিনি আল্লাহর আদেশে আন্ত্বকিয়া নামক গ্রামে দাওয়াত ও তবলীগের জন্য পাঠিয়েছিলেন।
قَالُوا مَا أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَمَا أَنْزَلَ الرَّحْمَٰنُ مِنْ شَيْءٍ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا تَكْذِبُونَ
📘 ওরা বলল, ‘তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ, আর পরম দয়াময় তো কিছুই অবতীর্ণ করেননি। তোমরা কেবল মিথ্যাই বলছ।’
قَالُوا رَبُّنَا يَعْلَمُ إِنَّا إِلَيْكُمْ لَمُرْسَلُونَ
📘 তারা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক জানেন যে, আমরা অবশ্যই তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি।
وَمَا عَلَيْنَا إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ
📘 স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব।’
قَالُوا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ ۖ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيمٌ
📘 ওরা বলল, ‘আমরা তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি,[১] যদি তোমরা বিরত না হও, তাহলে অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ হতে তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি স্পর্শ করবে।’
[১] সম্ভবতঃ তাদের কিছু মানুষ ঈমান নিয়ে এসেছিল ও যার ফলে মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে তারা রসূলদের আগমনকে অমঙ্গল ও অশুভ বলে অভিহিত করেছিল। نعوذ بالله অথবা (সেই সময়) অনাবৃষ্টি চলছিল, যার কারণ তারা ঐ রসূলদের অশুভ আগমন ভেবে বসেছিল। نعوذ بالله من ذلك যেমন বর্তমানেও বদ-খেয়ালের মানুষ এবং দ্বীন ও শরীয়ত সম্বন্ধে অজ্ঞ মানুষরা ঈমানদার ও পরহেযগার লোকদেরকে অশুভ ও অমঙ্গল ধারণা করে থাকে!
قَالُوا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ ۚ أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ ۚ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ
📘 তারা বলল, ‘তোমাদের অমঙ্গল তোমাদের সঙ্গেই।[১] এ কি এ জন্য যে, তোমাদেরকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে? বরং তোমরা এক সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’
[১] অর্থাৎ, ওটা তো তোমাদের স্বকৃত পাপকর্মের ফল, যা তোমাদের সঙ্গেই আছে, আমাদের সঙ্গে নয়।
وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ
📘 জ্ঞানগর্ভ কুরআনের শপথ, [১]
[১] অথবা এর অর্থ, সুবিন্যস্ত কুরআনের, যা শব্দছন্দ ও অর্থের দিক থেকে সুবিন্যস্ত ও মজবুত। وَ শপথের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে শপথের জওয়াব পরবর্তী আয়াতে।
وَجَاءَ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ رَجُلٌ يَسْعَىٰ قَالَ يَا قَوْمِ اتَّبِعُوا الْمُرْسَلِينَ
📘 নগরীর এক প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এল এবং বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! রসূলদের অনুসরণ কর, [১]
[১] ঐ ব্যক্তি মুসলিম ছিলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন যে, এই সম্প্রদায় রসূলদের দাওয়াতকে মেনে নিচ্ছে না, তখন তিনি এসে রসূলদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তাদেরকে তাঁদের অনুসরণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন।
اتَّبِعُوا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ
📘 অনুসরণ কর তাদের যারা তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চায় না এবং যারা সৎপথপ্রাপ্ত।
وَمَا لِيَ لَا أَعْبُدُ الَّذِي فَطَرَنِي وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
📘 যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যাঁর নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে আমি তাঁর উপাসনা করব না কেন? [১]
[১] তিনি নিজের তওহীদবাদী হওয়ার কথা প্রকাশ করলেন, যাতে তাঁর উদ্দেশ্য নিজ সম্প্রদায়ের মঙ্গল কামনা ও তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া। এও হতে পারে যে, তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে বলেছিল যে, তুমিও সেই উপাস্যের উপাসনা করছ, যার দিকে এই সকল রসূল আমাদেরকে আহবান করছে এবং তুমিও আমাদের উপাস্যকে বর্জন করে বসেছ? যার উত্তরে তিনি এ কথা বলেছিলেন। মুফাসসিরগণ তাঁর নাম হাবীব নাজ্জার বলেছেন। আর আল্লাহই অধিক জানেন।
أَأَتَّخِذُ مِنْ دُونِهِ آلِهَةً إِنْ يُرِدْنِ الرَّحْمَٰنُ بِضُرٍّ لَا تُغْنِ عَنِّي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا وَلَا يُنْقِذُونِ
📘 আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্য উপাস্য গ্রহণ করব? পরম দয়াময় আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলে ওদের সুপারিশ আমার কোন কাজে আসবে না এবং ওরা আমাকে উদ্ধার করতেও পারবে না।[১]
[১] এখানে সেই বাতিল উপাস্যদের অক্ষমতা ও অসহায়তার কথা প্রকাশ করা হয়েছে, যাদের উপাসনা তাঁর সম্প্রদায় করত এবং শিরকের সেই ভ্রষ্টতা থেকে নিস্তার দেওয়ার জন্য তাদের নিকট রসূল প্রেরণ করা হয়েছিল। 'উদ্ধার করতেও পারবে না' কথাটির অর্থ হল, যদি আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি সাধন করতে চান, তবে এ (বাতিল উপাস্য)রা আমাকে রক্ষা করতে পারবে না।
إِنِّي إِذًا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
📘 এরূপ করলে আমি অবশ্যই স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পড়ব। [১]
[১] অর্থাৎ, যদি আমিও তোমাদের মত এক আল্লাহকে ছেড়ে সেই ক্ষমতাহীন অসহায় উপাস্যদের উপাসনা শুরু করে দিই, তবে আমিও প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়ে যাব। অথবা ضَلاَل (বিভ্রান্তি) শব্দটি এখানে خُسِرَان (ক্ষতি) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ এটা তো একেবারে ক্ষতিকর বাণিজ্য হবে।
إِنِّي آمَنْتُ بِرَبِّكُمْ فَاسْمَعُونِ
📘 আমি তো তোমাদের প্রতিপালকে বিশ্বাসী, অতএব তোমরা আমার কথা শোন। [১]
[১] তওহীদের দাওয়াত দেওয়া ও একত্বকে স্বীকার করার ফলে তাঁর জাতি তাঁকে হত্যা করতে চাইলে তিনি পয়গম্বরগণকে সম্বোধন করে বললেন (উদ্দেশ্য নিজের ঈমানের উপর সেই পয়গম্বরগণকে সাক্ষ্য রাখা) অথবা তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বললেন (যার উদ্দেশ্য সত্য দ্বীনের উপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা প্রকাশ ছিল), তোমরা যা ইচ্ছা করতে পার; কিন্তু ভালোভাবে শুনে নাও যে, আমার ঈমান সেই প্রতিপালকের উপরে আছে যিনি তোমাদেরও প্রতিপালক। বলা হয় যে, তারা তাঁকে মেরে ফেলেছিল এবং তাতে তাদেরকে কেউ বাধা দেয়নি। রাহিমাহুল্লাহ।
قِيلَ ادْخُلِ الْجَنَّةَ ۖ قَالَ يَا لَيْتَ قَوْمِي يَعْلَمُونَ
📘 (তখন তারা তাকে হত্যা করল এবং তার মৃত্যুর পর) তাকে বলা হল, ‘তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর।’ সে বলে উঠল, ‘হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারত--
بِمَا غَفَرَ لِي رَبِّي وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُكْرَمِينَ
📘 কি কারণে আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত লোকদের দলভুক্ত করেছেন।’[১]\r\n
[১] অর্থাৎ, যে ঈমান ও তওহীদের কারণে আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যদি সে কথা আমার সম্প্রদায় জানত, তাহলে তারাও ঈমান ও তাওহীদে বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর ক্ষমা ও তাঁর বিভিন্ন অনুগ্রহের হকদার হয়ে যেত। এইভাবে সে ব্যক্তি মৃত্যুর পরেও নিজ জাতির মঙ্গল চেয়েছেন। একজন প্রকৃত মু'মিনকে এমনই হওয়া দরকার যে, সে সর্বদা মানুষের মঙ্গল কামনা করবে; অমঙ্গল নয়। তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবে; পথভ্রষ্ট করবে না। তাতে মানুষ তার সাথে যেমনই ব্যবহার করুক না কেন; এমনকি যদিও তাকে মেরে ফেলে।
۞ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَىٰ قَوْمِهِ مِنْ بَعْدِهِ مِنْ جُنْدٍ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا كُنَّا مُنْزِلِينَ
📘 আমি তার মৃত্যুর পর তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আকাশ হতে কোন বাহিনী প্রেরণ করিনি[১] এবং বাহিনী প্রেরণ করা আমার নীতিও ছিল না। [২]
[১] অর্থাৎ, হাবীব নাজ্জারের হত্যার পর আমি তাদেরকে ধ্বংসের জন্য আসমান থেকে ফিরিশতাদের কোন বাহিনী প্রেরণ করিনি। এ কথা বলে ঐ জাতির তুচ্ছ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, যে জাতিকে ধ্বংস করার অন্য পন্থা লেখা হয়, সে জাতির জন্য আমি ফিরিশতাও প্রেরণ করি না।
إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ خَامِدُونَ
📘 কেবলমাত্র এক মহাগর্জন হল। ফলে ওরা নিথর-নিস্তব্ধ হয়ে গেল। [১]
[১] বলা হয়েছে যে, জিবরীল (আঃ) একটি হুঙ্কার দিয়েছিলেন, যাতে সকলের শরীর থেকে প্রাণ বের হয়ে গিয়েছিল এবং তারা নিভানো আগুনের মত স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। জীবন যেন এক প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা। আর মৃত্যু হল তা নিভে ভষ্মে পরিণত হওয়া।
إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ
📘 তুমি অবশ্যই প্রেরিত (রসূল)দের অন্তর্ভুক্ত; [১]
[১] মুশরিকরা নবী (সাঃ)-এর রসূল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করত। ফলে তারা তাঁর রিসালাতকে অস্বীকার করত ও বলত, (لَسْتَ مُرْسَلًا) "তুমি তো পয়গম্বরই নও।" (সূরা রা'দ ১৩:৪৩ আয়াত) আল্লাহ তাআলা তাদের উত্তরে জ্ঞানগর্ভ কবুরআনের কসম করে বললেন, তিনি অবশ্যই তাঁর পয়গম্বর। এতে রয়েছে নবী (সাঃ)-এর সম্মান ও মাহাত্ম্যের বিকাশ। যেহেতু আল্লাহ তাআলা অন্য কোন রসূলের জন্য তাঁর রিসালাতের কসম করেননি। রিসালাত প্রমাণ করতে আল্লাহ তাআলার কসম রসূল (সাঃ)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ ۚ مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
📘 পরিতাপ এমন দাসদের জন্য! [১] ওদের নিকট যখনই কোন রসূল এসেছে, তখনই ওরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে।
[১] হতভাগ্য ঐ বান্দাগণ নিজেদের উপর আক্ষেপ ও আফসোস প্রকাশ করবে কিয়ামতের দিন আযাব দর্শনের পর এবং বলবে যে, যদি আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আমরা অবহেলা না করতাম! অথবা আল্লাহ তাআলা বান্দার অবস্থার উপর আফসোস করছেন যে, তাদের নিকট যখনই কোন রসূল এসেছে, তখনই তারা তাঁদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে।
أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنَ الْقُرُونِ أَنَّهُمْ إِلَيْهِمْ لَا يَرْجِعُونَ
📘 ওরা কি লক্ষ্য করে না, ওদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি, যারা ওদের মধ্যে ফিরে আসবে না।[১]
[১] এতে মক্কাবাসীদের জন্য সতর্কবাণী রয়েছে যে, রসূলের রিসালাতকে মিথ্যা ভাবার কারণে যেমন পূর্ব জাতি ধ্বংস হয়েছে, অনুরূপ তারাও ধ্বংস হতে পারে।
وَإِنْ كُلٌّ لَمَّا جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ
📘 এবং অবশ্যই ওদের সকলকে একত্রে আমার নিকট উপস্থিত করা হবে। [১]
[১] এখানে إن হল নাফিয়াহ (নেতিবাচক) এবং لَمَّا শব্দটি إِلاَّ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আসল অনুবাদ হবেঃ এমন কেউ নেই, যে আমার নিকট উপস্থিত হবে না। উদ্দেশ্য হল যে, অতীতে যারা অতিবাহিত হয়ে গেছে ও ভবিষ্যতে যারা আসবে সকল মানুষ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে। যেখানে তাদের হিসাব নিকাশ হবে।
وَآيَةٌ لَهُمُ الْأَرْضُ الْمَيْتَةُ أَحْيَيْنَاهَا وَأَخْرَجْنَا مِنْهَا حَبًّا فَمِنْهُ يَأْكُلُونَ
📘 মৃত ধরিত্রী ওদের জন্য একটি নিদর্শন,[১] যাকে আমি সঞ্জীবিত করি এবং যা হতে উৎপন্ন করি শস্য, যা ওরা ভক্ষণ করে।
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা এবং মৃতদের পুনরায় জীবিত করার উপর নিদর্শন।
وَجَعَلْنَا فِيهَا جَنَّاتٍ مِنْ نَخِيلٍ وَأَعْنَابٍ وَفَجَّرْنَا فِيهَا مِنَ الْعُيُونِ
📘 ওতে আমি সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগানসমূহ[১] এবং উৎসারিত করি বহু প্রস্রবণ।
[১] অর্থাৎ, মৃত পৃথিবীকে জীবিত করে আমি তা থেকে তাদের খাবারের নিমিত্তে শুধু ফসলই উৎপন্ন করিনি, বরং তাদের কাজ ও মুখের তৃপ্তির জন্য বিভিন্ন রকমের ফল অধিক মাত্রায় সৃষ্টি করেছি। এই আয়াতে শুধু দুই প্রকার ফলের কথা উল্লেখ হওয়ার কারণ হল, উক্ত ফল দুটি খুবই উপকারী এবং আরবদের নিকট অতি পছন্দনীয়ও বটে। তাছাড়া এই দুই ফলের গাছ আরব্য-ভূমিতেই অধিক হারে পাওয়া যায়। ফসলের উল্লেখ আগে করেছেন। কারণ ফসল অধিক পরিমাণে উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং মানুষের খোরাকের দিক দিয়েও ফসলের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মানুষ যতক্ষণ ভাত-রুটি ইত্যাদি খাবার পেট পূর্ণ করে না খায়, ততক্ষণ শুধু ফল-ফ্রুট দ্বারা খাবারের প্রয়োজন পূর্ণ হয় না।
لِيَأْكُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ ۖ أَفَلَا يَشْكُرُونَ
📘 যাতে ওরা ভক্ষণ করতে পারে তার ফলমূল,[১] যা ওদের হাতের সৃষ্টি নয়।[২] তবুও কি ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?
[১] অর্থাৎ, কিছু জায়গায় পানির ঝরনা প্রবাহিত করেন, যার পানি দ্বারা উৎপাদিত ফল মানুষ ভক্ষণ করে থাকে।
[২] ইমাম জারীর (রহঃ) এর নিকট এখানে ما নাফিয়াহ (নেতিবাচক)। অর্থাৎ উৎপন্ন ফল-ফসল আল্লাহ তাআলার বান্দাদের প্রতি এক বিশেষ অনুগ্রহ। তাতে বান্দার প্রচেষ্টা, মেহনত, পরিশ্রম ও কষ্টের কোন হাত নেই। এর পরেও তারা আল্লাহর এই সকল নিয়ামতের উপর তাঁর শুকরিয়া জ্ঞাপন কেন করে না? অনেকের নিকট ما মওসূলাহ যা الَّذِيْ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, যাতে তারা সেই ফল ভক্ষণ করে এবং ঐ বস্তুও ভক্ষণ করে, যা তাদের হাত তৈরি করেছে। হাতের কর্ম বলতে জমি চাষ করে তাতে বীজ বপন করা, সেচন ও দেখাশোনা করা, অনুরূপ ফল খাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি; যেমন তার রস বের করে পান করা, বিভিন্ন ফল-ফ্রুটকে একত্রিত করে আচার, জেলি, মোরব্বা ইত্যাদি বানিয়ে খাওয়া ইত্যাদি।
سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ
📘 পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি মাটি হতে উৎপন্ন উদ্ভিদ, স্বয়ং মানুষ এবং ওরা যাদের জানে না, তাদের সকলকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন। [১]
[১] অর্থাৎ, মানুষের মত পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকেও আমি নর ও মাদী করে সৃষ্টি করেছি। এ ছাড়া আকাশে ও মাটির নিম্নদেশে যে সকল বস্তু তোমাদের অদৃশ্য, যা তোমাদের জ্ঞ্যন-বহির্ভূত, তাদের মাঝেও জোড়া বা নর-মাদার এই নিয়ম রেখেছি। অতএব তোমরা সকল সৃষ্টিই জোড়া জোড়া। বৃক্ষাদির মাঝেও নর-মাদার একই নিয়ম আছে। এমনকি পরকালের জীবন ইহকালের জীবনের জোড়া সমতুল্য। আর ইহকালের জীবন পরকালের জীবনের জন্য একটি বিবেক-প্রসূত যুক্তি ও প্রমাণ স্বরূপও। শুধু এক আল্লাহর সত্তা; যিনি সৃষ্টি জগতের এই গুণ ও সকল প্রকার কমি ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। তিনি একক, অদ্বিতীয়, বিজোড়; তাঁর কোন জোড়া নেই।
وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُظْلِمُونَ
📘 রাত ওদের জন্য এক নিদর্শন, এ হতে আমি দিবালোক অপসারিত করি, ফলে সকলেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর অসীম শক্তির একটি প্রমাণ এও যে, তিনি দিনকে রাত থেকে আলাদা করে দেন। যার ফলে সাথে সাথে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। سلخ এর অর্থ কোন পশুর দেহ থেকে তার চামড়া আলাদা করে দেওয়া, যাতে তার গোশত বের হয়ে যায়। অনুরূপ আল্লাহ তাআলা দিনকে রাত থেকে আলাদা করে দেন। أظلم এর অর্থ হল অন্ধকারে প্রবেশ করা। যেমন أصبح، أمسى، أظهر এর অর্থ হল সকাল, সন্ধ্যা এবং যোহরের সময়ে প্রবেশ করা।
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
📘 আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্ডীর মধ্যে আবর্তন করে;[১] এ পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ (আল্লাহর) নিয়ন্ত্রণ।
[১] অর্থাৎ, নিজের সেই কক্ষ পথে ঘোরে, যা আল্লাহ তাআলা তার জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন। নির্দিষ্ট সেই স্থান থেকে তারা পরিক্রমা আরম্ভ করে এবং সেই স্থানেই ভ্রমণ শেষ করে। তা থেকে সামান্য পরিমাণও এমন এদিক ওদিক হয় না যে, তার ফলে কোন অন্য চলমান গ্রহের সাথে ধাক্কা লেগে যাবে। দ্বিতীয় অর্থ হল, "নিজ অবস্থান ক্ষেত্রের জন্য।" আর তার ঐ ক্ষেত্র হল আরশে ইলাহীর নিম্নদেশ। যেমন হাদীসে বর্ণনা হয়েছে যে, "সূর্য প্রত্যহ অস্তমিত হওয়ার পর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। অতঃপর সেখান থেকে পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়।"
(বুখারীঃ সূরা ইয়াসীনের তফসীর)
দুই অর্থেই لِمُسْتَقَرٍّ শব্দটিতে লাম ইল্লাত (কারণ বর্ণনা) এর জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ لِأَجَلِ مُسْتَقَرِّ لَّهَا অনেকে বলেন যে, এখানে لام হরফটি إلى এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আর তখন তার مُستَقَرّ (স্থিরতার সময়) হবে কিয়ামত। অর্থাৎ, সূর্যের এই চলাফেরা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কিয়ামতের দিন তার চলা বন্ধ হয়ে যাবে। এই তিন প্রকার অর্থই নিজ নিজ স্থানে সঠিক।
وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ
📘 এবং চন্দ্রের জন্য আমি বিভিন্ন কক্ষ নির্দিষ্ট করেছি;[১] অবশেষে তা পুরাতন খেজুর মোছার ডাঁটার আকার ধারণ করে। [২]
[১] চাঁদের ২৮টি কক্ষপথ আছে। প্রত্যহ একটি করে কক্ষপথ অতিক্রম করে। অতঃপর দুই রাত্রি অদৃশ্য থেকে তৃতীয় রাত্রে বের হয়ে আসে।
[২] অর্থাৎ, যখন শেষ কক্ষে পৌঁছে যায়, তখন একেবারে সরু হয়ে যায়; যেমন খেজুরের পুরাতন মোছার ডাঁটা, যা শুকিয়ে বাঁকা হয়ে যায়। চাঁদের এই বৃদ্ধি-হ্রাসযুক্ত পরিভ্রমণ দ্বারা পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষ নিজেদের দিন, মাস ও বছরের হিসাব এবং ইবাদতের সময় নির্ণয় করে থাকে।
عَلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
📘 তুমি সরলপথে প্রতিষ্ঠিত, [১]
[১] এটা 'إِنَّكَ -র দ্বিতীয় খবর। অর্থাৎ নবী (সাঃ) সেই পথে আছেন, যে পথে তাঁর পূর্ববর্তী পয়গম্বর ছিলেন। অথবা তিনি এমন সরল ও সঠিক পথে আছেন, যা তাঁকে অভীষ্ট গন্তব্যস্থল (জান্নাতে) পৌঁছাবে।
لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ ۚ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
📘 সূর্যের পক্ষে চন্দ্রের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়,[১] রজনীও দিবসকে অতিক্রম করতে পারে না[২] এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে। [৩]
[১] অর্থাৎ, সূর্যের জন্য সম্ভব নয় যে, সে চাঁদের কাছাকাছি হবে এবং তার ফলে তার আলো শেষ হয়ে যাবে। বরং উভয়ের নিজ নিজ কক্ষপথ ও আলাদা আলাদা গন্ডিসীমা আছে। সূর্য দিনে ও চাঁদ রাতেই উদিত হয়, কখনও এর ব্যতিক্রম না ঘটা এ কথারই প্রমাণ যে, এ সবের নিয়ন্তা ও পরিচালক একজন আছেন।
[২] বরং এরাও এক নিয়ম-সূত্রে আবদ্ধ হয়ে আছে এবং এক অপরের পরে আসতে থাকে।
[৩] كُلٌّ বলতে সূর্য, চন্দ্র, অথবা তার সাথে অন্য নক্ষত্রকেও বুঝানো হয়েছে। সব কিছু নিজ নিজ কক্ষপথে পরিক্রমণ করে, তাদের কারো একে অপরের সাথে সংঘর্ষ হয় না।
وَآيَةٌ لَهُمْ أَنَّا حَمَلْنَا ذُرِّيَّتَهُمْ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ
📘 ওদের জন্য এক নিদর্শন এই যে, আমি ওদের বংশধরদেরকে বোঝাই জলযানে আরোহণ করিয়েছিলাম; [১]
[১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করছেন যে, তিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রে নৌকাসমূহ (জাহাজ) চলাচল সহজ করে দিয়েছেন, এমনকি তোমরা নিজেদের সাথে ভরা জাহাজে আপন সন্তান-সন্ততিকেও নিয়ে যাও। দ্বিতীয় অর্থ এও করা হয়েছে যে, ذُرِّيَّةٌ (বংশধর) বলতে উদ্দেশ্য হল পিতৃপুরুষদের বংশধর এবং 'বোঝাই জলযান' বলতে নূহ (আঃ)-এর জাহাজকে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ নূহ (আঃ)-এর জাহাজে যে সকল লোকদেরকে উঠানো হয়েছিল, পরে তাদের থেকেই মানুষের বংশ বৃদ্ধি হয়েছে। সত্যপক্ষে মনুষ্য-বংশের পিতৃপুরুষ তাতে সওয়ার ছিল।
وَخَلَقْنَا لَهُمْ مِنْ مِثْلِهِ مَا يَرْكَبُونَ
📘 এবং ওদের জন্য অনুরূপ যানবাহন সৃষ্টি করেছি, যাতে ওরা আরোহণ করে। [১]
[১] অর্থাৎ, এমন যানবাহন যা নৌকার মতই মানুষ এবং বাণিজ্য-সামগ্রীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। এতে কিয়ামত পর্যন্ত যত প্রকার যানবাহন আবিষ্কৃত হবে সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন উড়োজাহাজ, (মোটর চালিত) জলজাহাজ, ট্রেন, বাস, ট্যাক্সি এবং অন্যান্য যানবাহন।
وَإِنْ نَشَأْ نُغْرِقْهُمْ فَلَا صَرِيخَ لَهُمْ وَلَا هُمْ يُنْقَذُونَ
📘 আমি ইচ্ছা করলে ওদেরকে ডুবিয়ে দিতে পারি; সে অবস্থায় ওরা কোন সাহায্যকারী পাবে না এবং ওরা পরিত্রাণও পাবে না--
إِلَّا رَحْمَةً مِنَّا وَمَتَاعًا إِلَىٰ حِينٍ
📘 ওদের প্রতি আমার করুণা না হলে এবং ওদেরকে কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে না দিলে।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّقُوا مَا بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَمَا خَلْفَكُمْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
📘 যখন ওদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা অগ্রে যা (পাপ বা শাস্তি) আছে ও পশ্চাতে যা (পাপ বা শাস্তি) আছে, তাকে ভয় কর; যাতে তোমরা করুণার পাত্র হতে পার।’ (তখন ওরা তা অগ্রাহ্য করে।)
وَمَا تَأْتِيهِمْ مِنْ آيَةٍ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ
📘 যখনই ওদের প্রতিপালকের কোন নিদর্শন ওদের নিকট আসে, তখনই ওরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [১]
[১] অর্থাৎ, তওহীদ ও রসূলের সত্যতার যে সকল নিদর্শনই তাদের সামনে আসে, তাতে তারা চিন্তা-ভাবনাই করে না যে, তাতে তারা উপকৃত হবে। বরং প্রত্যেক নিদর্শনকে অস্বীকার করাই তাদের স্বভাব।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ قَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنُطْعِمُ مَنْ لَوْ يَشَاءُ اللَّهُ أَطْعَمَهُ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
📘 যখন ওদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে যে রুযী দান করেছেন, তা হতে ব্যয় কর’,[১] তখন অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, ‘যাকে ইচ্ছা করলে আল্লাহ খাওয়াতে পারতেন, আমরা কেন তাকে খাওয়াব? [২] তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, গরীব-মিসকীন এবং অভাবী ব্যক্তিদেরকে দান কর।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহ চাইলে তাদেরকে গরীবই করত না, অতএব আমরা তাদেরকে দান করে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত আচরণ কেন করব?
[৩] অর্থাৎ, 'গরীবদেরকে সাহায্য কর' এই কথা বলে তোমরা স্পষ্ট ভুল করছ। তাদের এই কথা ঠিক ছিল যে, দারিদ্র্য ও অসচ্ছলতা আল্লাহর ইচ্ছায় ছিল, কিন্তু তাকে আল্লাহর আদেশ অমান্য করার বাহানা বানিয়ে নেওয়া ভুল ছিল। কারণ তাদেরকে সাহায্য করার আদেশদাতাও তো আল্লাহ ছিলেন। সুতরাং তাঁর সন্তুষ্টি তো গরীব-মিসকীনদেরকে সাহায্য করাতেই নিহিত আছে। কারণ ইচ্ছা এক জিনিস, আর সন্তুষ্টি অন্য এক জিনিস। ইচ্ছার সম্পর্ক সৃষ্টিগত বিষয়সমূহের সাথে এবং তার ফলে যা কিছু ঘটে, তার হিকমত ও যৌক্তিকতা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আর সন্তুষ্টির সম্পর্ক শরয়ী বিষয়সমূহের সাথে, যা পালন করার আদেশ আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে, যাতে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
وَيَقُولُونَ مَتَىٰ هَٰذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
📘 ওরা বলে, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে বল, এ প্রতিজ্ঞা কখন পূর্ণ হবে?’
مَا يَنْظُرُونَ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً تَأْخُذُهُمْ وَهُمْ يَخِصِّمُونَ
📘 ওরা তো এক মহাগর্জনের অপেক্ষায় আছে যা এদের বাক্-বিতন্ডাকালে ওদেরকে আঘাত করবে। [১]
[১] অর্থাৎ, মানুষ বাজারে কেনা-বেচা এবং স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী কথাবার্তা ও বাক্-বিতন্ডায় ব্যস্ত থাকবে, এমতাবস্থায় হঠাৎ শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। এটা হবে প্রথম ফুৎকার, যাকে نَفْخَةُ فَزَعٍ বলা হয়। বলা হয়েছে যে, এর পরে দ্বিতীয় ফুৎকার হবে نَفْخَةُ الصَّعْقِ যাতে আল্লাহ তাআলা ছাড়া সমস্ত জীব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
تَنْزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ
📘 কুরআন পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। [১]
[১] এ কুরআন পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। অর্থাৎ, তা যারা অস্বীকার করে এবং তাঁর রসূল (সাঃ)-কে যারা মিথ্যা মনে করে তাদের নিকট থেকে তিনি বদলা নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তিনি পরম দয়ালু; অর্থাৎ, যে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর প্রকৃত দাস হয়ে যাবে, তার প্রতি তিনি পরম দয়ালু।
فَلَا يَسْتَطِيعُونَ تَوْصِيَةً وَلَا إِلَىٰ أَهْلِهِمْ يَرْجِعُونَ
📘 ওরা অসিয়ত করতে (শেষ কথা বলতে) সমর্থ হবে না এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে আসতে পারবে না।
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُمْ مِنَ الْأَجْدَاثِ إِلَىٰ رَبِّهِمْ يَنْسِلُونَ
📘 যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে[১] তখন মানুষ কবর থেকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে।
[১] প্রথম মত অনুযায়ী এটা দ্বিতীয় ফুৎকার এবং দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটা তৃতীয় ফুৎকার হবে, যাকে نَفْخَةُ الْبَعْثِ وَالنُّشُوْرِ বলা হয়। এতে মানুষ কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে।
(ইবনে কাসীর)
قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْقَدِنَا ۜ ۗ هَٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَٰنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ
📘 ওরা বলবে, ‘হায় দুর্ভোগ আমাদের! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল?’[১] এ হল তা-ই, পরম দয়াময় যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।
[১] কবরকে নিদ্রাস্থল বলার উদ্দেশ্য এ নয় যে, কবরে তাদের আযাব হবে না। বরং তখন যে ভয়ানক দৃশ্য এবং শাস্তির কঠিনতা দেখবে, তার তুলনায় তাদেরকে কবরের জীবন একটি নিদ্রাস্থল বলে মনে হবে।
إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيعٌ لَدَيْنَا مُحْضَرُونَ
📘 এ হবে এক মহাগর্জন; তখনই ওদের সকলকে আমার সম্মুখে উপস্থিত করা হবে।
فَالْيَوْمَ لَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا وَلَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
📘 এবং বলা হবে, আজ কারও প্রতি কোন জুলুম করা হবে না এবং তোমরা যা করতে কেবল তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।
إِنَّ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَاكِهُونَ
📘 এ দিন বেহেশ্তিগণ আনন্দে মগ্ন থাকবে, [১]
[১] فَاكِهُوْنَ এর অর্থ হল فَارِحُوْنَ আনন্দিত, স্বাচ্ছন্দ্যশীল।
هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ
📘 তারা এবং তাদের স্ত্রীগণ সুশীতল ছায়ায় থাকবে এবং হেলান দিয়ে বসবে সুসজ্জিত আসনে।
لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَا يَدَّعُونَ
📘 সেখানে তাদের জন্য থাকবে ফল-মূল এবং বাঞ্ছিত সমস্ত কিছু।
سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ
📘 পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবে ‘সালাম’ (শান্তি)। [১]
[১] আল্লাহর এই সালাম ফিরিশতাগণ জান্নাতীগণের নিকট পৌঁছে দেবেন। অনেকে বলেন যে, আল্লাহ তাআলা নিজে সরাসরি তাদেরকে সালাম দিয়ে সম্মানিত করবেন।
وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
📘 আর (বলা হবে,) ‘হে অপরাধিগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।’ [১]
[১] অর্থাৎ, মু'মিনদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াও। অর্থাৎ, হাশরের ময়দানে মু'মিন ও অনুগত এবং কাফের ও অবাধ্যকে আলাদা আলাদা করে দেওয়া হবে। যেমন অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেন (وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ (يَوْمَئِذٍ يَّصَّدَّعُوْنَ) أي :يَصِيْرُوْنَ صَدْعَيْنِ فِرْقَتَيْنِ অর্থাৎ, সেই দিন মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে।
(সূরা রূম ৩০:১৪, ৩০:৪৩ আয়াত)
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল যে, পাপীদেরকেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেওয়া হবে। যেমন ইয়াহুদীদের দল, খ্রিষ্টানদের দল, বেদ্বীনদের দল, অগ্নিপূজকদের দল, ব্যভিচারীদের দল, মদ্যপায়ীদের দল ইত্যাদি ইত্যাদি।
لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أُنْذِرَ آبَاؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُونَ
📘 যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে, যাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে ওরা উদাসীন। [১]
[১] অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-কে রসূল এই জন্য মনোনীত করা হয়েছে এবং এই কিতাব (কুরআন) এই জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তিনি (সাঃ) ঐ সম্প্রদায়কে সতর্ক ও ভীতি প্রদর্শন করেন, যাদের মাঝে তাঁর পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। যার ফলে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এরা সত্য ধর্ম থেকে বেখবর ছিল। এ বিষয়ে পূর্বে কয়েক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে যে, আরবদের নিকট ইসমাঈল (আঃ)-এর পরে নবী (সাঃ)-এর পূর্ব পর্যন্ত সরাসরি কোন নবী আসেননি। এখানেও তাই আলোচনা করা হয়েছে।
۞ أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ ۖ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ
📘 হে আদম সন্তান-সন্ততিগণ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না,[১] কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু,[২]
[১] এখানে উদ্দেশ্য হল ঐ অঙ্গীকার যা আদম (আঃ)-এর পিঠ থেকে বের করার পর তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল।
(সূরা আ'রাফ ৭:১৭২ আয়াত দ্রঃ)
অথবা ঐ অসিয়ত যা পয়গম্বরদের মুখে মানুষকে করা হয়েছে। অনেকের নিকট সেই সকল জ্ঞান ও বিবেকভিত্তিক প্রমাণপুঞ্জ যা আকাশ ও পৃথিবীতে মহান আল্লাহ ছড়িয়ে রেখেছেন।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] অর্থাৎ, তোমাদেরকে শয়তানের ইবাদত এবং তার কুমন্ত্রণা গ্রহণ করা থেকে এই জন্য নিষেধ করা হয়েছে যে, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু এবং সে তোমাদেরকে সব রকমভাবে পথভ্রষ্ট করার শপথ করে রেখেছে।
وَأَنِ اعْبُدُونِي ۚ هَٰذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ
📘 এবং আমারই দাসত্ব কর।[১] এটিই সরল পথ। [২]
[১] অর্থাৎ, আমি কি তোমাদের কাছে আরো অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা একমাত্র আমারই ইবাদত করবে এবং আমার ইবাদতে কাউকে শরীক করবে না।
[২] অর্থাৎ, শুধু এক আল্লাহরই ইবাদত করবে, এটাই সেই সরল ও সঠিক পথ, যার প্রতি রসূলগণ মানুষকে আহবান করতেন এবং এটাই বাঞ্ছিত গন্তব্যস্থানে অর্থাৎ জান্নাতে পৌঁছবে।
وَلَقَدْ أَضَلَّ مِنْكُمْ جِبِلًّا كَثِيرًا ۖ أَفَلَمْ تَكُونُوا تَعْقِلُونَ
📘 শয়তান তো তোমাদের পূর্বে বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছে; তবুও কি তোমরা বোঝ না? [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের এতটুকুও জ্ঞান ও বুঝ নেই যে, শয়তান তোমাদের শত্রু, তার আনুগত্য করা উচিত নয় এবং আমি তোমাদের প্রভু, আমিই তোমাদেরকে অন্ন দান করি এবং আমিই দিবারাত্রি তোমাদের হিফাযত করি। সুতরাং আমার অবাধ্যতা করা তোমাদের উচিত নয়। তোমরা শয়তানের শত্রুতা এবং আমার ইবাদতের অধিকারকে না বুঝে নেহাতই নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞানতার পরিচয় দিচ্ছ।
هَٰذِهِ جَهَنَّمُ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
📘 এটিই জাহান্নাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।
اصْلَوْهَا الْيَوْمَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ
📘 তোমাদের অবিশ্বাস (কুফরী) করার কারণে আজ তোমরা এতে প্রবেশ কর। [১]
[১] অর্থাৎ, এখন সেই নির্বুদ্ধিতার ফল ভোগ কর এবং নিজেদের কুফরীর কারণে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির মজা আস্বাদন কর।
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَىٰ أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
📘 আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং এদের পা এদের কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে।[১]
[১] এই মোহর লাগানোর প্রয়োজন এই জন্য হবে যে, কিয়ামতের দিন প্রথম দিকে মুশরিকরা মিথ্যা বলবে এবং বলবে, (واللهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِيْنَ) অর্থাৎ, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি আমাদের প্রভু, আমরা মুশরিক ছিলাম না।
(সূরা আনআম ৬:২৩ আয়াত)
সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেবেন, ফলে তারা কথা বলার শক্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ তাআলা মানুষের শরীরের অন্য অঙ্গকে কথা বলার শক্তি প্রদান করবেন। সুতরাং হাত বলবে, 'আমার দ্বারা সে এই এই কর্ম করেছিল' এবং পা তার সাক্ষী দেবে। ঠিক এইভাবে স্বীকার ও সাক্ষী, উভয় পর্যায় পার হয়ে যাবে। এ ছাড়া কথা বলতে সক্ষম বস্তুর মোকাবেলায় কথা বলতে অক্ষম বস্তুর কথা বলে সাক্ষ্য দেওয়া, দলীল ও প্রমাণ হিসাবে অধিক প্রভাবশালী হয়; যেহেতু তাতে অলৌকিক বিষয় পাওয়া যায়।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
মুখ ছাড়া অন্য অঙ্গের কথা বলার বিষয়টি হাদীসসমূহেও বর্ণিত হয়েছে।
(দেখুন সহীহ মুসলিমঃ কিতাবুয্ যুহদ)
وَلَوْ نَشَاءُ لَطَمَسْنَا عَلَىٰ أَعْيُنِهِمْ فَاسْتَبَقُوا الصِّرَاطَ فَأَنَّىٰ يُبْصِرُونَ
📘 আমি ইচ্ছা করলে এদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিতে পারতাম। তখন এরা পথ চলতে চাইলে কি করে দেখতে পেত। [১]
[১] অর্থাৎ, দৃষ্টিশক্তি থেকে বঞ্চিত করার পর তারা কিভাবে পথ দেখত? কিন্তু এটা তো আমার সহনশীলতা ও দয়া যে, আমি তা করিনি।
وَلَوْ نَشَاءُ لَمَسَخْنَاهُمْ عَلَىٰ مَكَانَتِهِمْ فَمَا اسْتَطَاعُوا مُضِيًّا وَلَا يَرْجِعُونَ
📘 এবং আমি ইচ্ছা করলে এদের স্ব-স্ব স্থানে এদের আকার বিকৃত করে দিতে পারতাম, ফলে এরা আগে বাড়তে পারত না এবং ফিরেও আসতে পারত না। [১]
[১] অর্থাৎ, না সামনে আসতে পারত আর না পিছনে ফিরে যেতে পারত, বরং পাথরের মত একই স্থানে পড়ে থাকত। مسخ এর অর্থ হল সৃষ্টির আমূল বিকৃতি সাধন, অর্থাৎ মানুষকে পাথর বা জন্তুর রূপে পরিবর্তন করে দেওয়া।
وَمَنْ نُعَمِّرْهُ نُنَكِّسْهُ فِي الْخَلْقِ ۖ أَفَلَا يَعْقِلُونَ
📘 আমি যাকে দীর্ঘ জীবন দান করি, তাকে তো জরাগ্রস্ত করে দিই।[১] তবুও কি ওরা বোঝে না?[২]
[১] অর্থাৎ, আমি যাকে বেশি আয়ু দান করি, তার দৈহিক অবস্থা পরিবর্তন করে পুরো তার উল্টা অবস্থা করে দিই। অর্থাৎ সে যখন বাচ্চা থাকে, তখন তার বাড়-বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে এবং তার বুঝশক্তি ও দৈহিক শক্তিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এইভাবে সে যুবক ও প্রৌঢ় অবস্থায় পৌঁছে। তারপর এর বিপরীত তার বুঝশক্তি ও দৈহিক শক্তি ক্রমে ক্রমে দুর্বল হতে থাকে; এমনকি পরিশেষে সে একটি শিশুর ন্যায় হয়ে যায়।
[২] যে, যে আল্লাহ এরূপ করতে সক্ষম, তিনি কি পুনরায় মানুষকে জীবিত করতে সক্ষম নন?
وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُبِينٌ
📘 আমি তাকে (রসূলকে) কবিতা শিখাইনি এবং এ তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়। এ তো কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন;[১]
[১] মক্কার মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে মিথ্যুক প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলত। তার মধ্যে একটা কথা এই ছিল যে, তুমি কবি এবং এই কুরআন তোমারই কবিতার ছন্দ মাত্র। আল্লাহ তাআলা তাদের এই কথা খন্ডন করে বললেন যে, সে না কবি, আর না কুরআন কবিতামালার সমষ্টি; বরং এ হল নসীহত ও উপদেশমালা। কাব্যে সাধারণতঃ অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি এবং কখনো অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য থাকে। কবিতায় শুধু কবির আবেগ ও আকাশ-কুসুম কল্পনা থাকে। তার ভিত্তি হয় মিথ্যার উপরে। এ ছাড়া কবিরা শুধু বাক্য বিশারদ হয়, কাজের কাজী নয়। যার কারণে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, শুধু এই নয় যে, আমি আমার পয়গম্বরকে কবিতা শিক্ষা দিইনি এবং তাঁর প্রতি কবিতা অহী করিনি; বরং কুরআনের বাকরীতি ও প্রকৃতি এই রকম করেছি যে, কবিতার সাথে তার কোন সম্পর্ক ও সাদৃশ্যই নেই। আর এ জন্যই মহানবী (সাঃ) যখন কারোর কবিতা পড়তেন তখন অধিকাংশ ভুল পড়তেন এবং কবিতার ছন্দ ও ওজন ভেঙ্গে যেত; যার উদাহরণ হাদীসে বিদ্যমান। এই সতর্কতা অবলম্বন এই জন্য করা হয়েছে, যাতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রমাণ প্রতিষ্ঠা হয়, তাদের সন্দেহের অবসান ঘটে এবং তারা যেন বলতে না পারে যে, কুরআন তাঁর রচিত কাব্য। যেমন উক্ত সন্দেহ অবসানের নিমিত্তেই তিনি নিরক্ষর ছিলেন; যাতে মানুষ কুরআন সম্পর্কে এ কথা বলতে না পারে যে, এটা তিনি অমুক ব্যক্তি থেকে শিক্ষা অর্জন করে তা সাজিয়ে-গুছিয়ে রচনা করেছেন। অবশ্য কোন কোন সময় তাঁর মুবারক মুখ থেকে এমন বাক্য বের হয়ে যাওয়া, যা কবিতা ছত্র ও ছন্দের মত হয়ে থাকে, তা তাঁর কবি হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। কারণ এগুলি তাঁর ইচ্ছা ছাড়াই অবলীলাক্রমে মুখে এসে যেত এবং তা কবিতার ছাঁচে পড়ে যাওয়াটা আকস্মিক ব্যাপার ছিল, যেমন হুনাইনের দিন তাঁর মুখে ইচ্ছা ছাড়াই (যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠ্য) এই কবিতা আবৃত্ত হয়েছিলঃ أَنَا النَّبِيُّ لاَ كَذِب - أَنَا ابْنُ عَبْْدِ الْمُطَّلِبْ অন্য এক সময় তাঁর আঙ্গুল যখম হলে তিনি বলেছিলেন,هَلْ أَنْتِ إِلاَّ إِصْبَعٌ دَمِيْتِ - وَفِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا لَقِيْتِ
(বুখারী, মুসলিমঃ জিহাদ অধ্যায়)
لَقَدْ حَقَّ الْقَوْلُ عَلَىٰ أَكْثَرِهِمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
📘 ওদের অধিকাংশের জন্য (শাস্তির) বাণী অবধারিত হয়েছে, সুতরাং ওরা বিশ্বাস করবে না।[১]
[১] যেমন আবু জাহল, উতবা, শায়বা, ইত্যাদি। 'বাণী অবধারিত হয়েছে'-এর উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলার এই বাণী, "আমি নিশ্চয়ই মানব ও দানব উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব।"
(সূরা সাজদাহ ৩২:১৩ আয়াত)
শয়তানকে তিরস্কার করার সময়ও আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন, "তোমার দ্বারা ও ওদের মধ্যে তোমার সকল অনুসারীদের দ্বারা আমি অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।"
(সূরা স্বাদ ৩৮:৮৫ আয়াত)
অর্থাৎ, তারা শয়তানের অনুসরণ করে নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযুক্ত করে নিয়েছে। কারণ আল্লাহ তাআলা তো তাদেরকে ইচ্ছা, স্বাধীনতা ও এখতিয়ার দানে ধন্য করেছিলেন। কিন্তু তারা তা ভুল ব্যবহার করে নিজের এখতিয়ারেই জাহান্নামের জ্বালানি হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঈমান থেকে বঞ্চিত করেননি। কারণ জোর করে হলে তো তারা শাস্তির উপযুক্তই হত না।
لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقَّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ
📘 যাতে সে জীবিত (জাগ্রতচিত্ত) ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করতে পারে[১] এবং অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা সাব্যস্ত হয়। [২]
[১] অর্থাৎ, যার অন্তর শুদ্ধ ও সজাগ আছে সে সত্য গ্রহণ করে এবং বাতিল প্রত্যাখ্যান করে। لِيُنْذِرَ (সতর্ক করতে পারে) ক্রিয়ার কর্তা হল কুরআন।
[২] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অবিশ্বাস ও কুফরীর উপর অটল থাকবে, তার উপর আযাব সাব্যস্ত হবে।
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُونَ
📘 ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, আমি নিজ হাতে যা সৃষ্টি করেছি[১] তার মধ্যে ওদের জন্য সৃষ্টি করেছি পশু[২] এবং ওরাই এগুলির মালিক? [৩]
[১] এতে অন্য কারো অংশীদার হওয়ার কথা খন্ডন করা হয়েছে। অর্থাৎ, যা আমি নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি; যার সৃষ্টিতে অন্য কারোর কোন প্রকার অংশ নেই।
[২]- أَنْعَامٌ نَعَمٌ এর বহুবচন। যার অর্থ চতুষ্পদ জন্তু; অর্থাৎ উট, গরু, ছাগল এবং ভেঁড়া-দুম্বা।
[৩] অর্থাৎ, তারা তা ইচ্ছামত ব্যবহার করে। যদি আমি তাদের মধ্যে (অন্য কিছু জন্তুর মত) হিংস্রতা ভরে দিতাম, তাহলে এই সকল পশু পোষ না মেনে তাদের কাছ থেকে দূরে পালাত এবং তা তাদের অধীনে ও মালিকানায় আসত না।
وَذَلَّلْنَاهَا لَهُمْ فَمِنْهَا رَكُوبُهُمْ وَمِنْهَا يَأْكُلُونَ
📘 এবং আমি এগুলিকে ওদের বশীভূত করে দিয়েছি।[১] এগুলির কিছু ওদের সওয়ারী এবং কিছু ওদের খাদ্য।
[১] অর্থাৎ, ঐ সকল পশু দ্বারা তারা যেভাবে উপকৃত হতে চায়, তারা অস্বীকার করে না। এমন কি তারা তাদেরকে যবেহ্ করে এবং ছোট বাচ্চারাও তাদেরকে টেনে নিয়ে বেড়ায়।
وَلَهُمْ فِيهَا مَنَافِعُ وَمَشَارِبُ ۖ أَفَلَا يَشْكُرُونَ
📘 ওদের জন্য এগুলিতে বহু উপকারিতা আছে;[১] আছে পানীয় বস্তু। তবুও কি ওরা কৃতজ্ঞ হবে না?
[১] অর্থাৎ, সওয়ারী ও খাওয়া ছাড়াও তাদের দ্বারা অনেক উপকৃত হওয়া যায়; যেমন তাদের লোম ও পশম থেকে বেশ কিছু জিনিস তৈরী হয়, তাদের চর্বি থেকে তেল পাওয়া যায় এবং কতক পশু গাড়ি টানা ও জমি চাষের কাজেও আসে।
وَاتَّخَذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ آلِهَةً لَعَلَّهُمْ يُنْصَرُونَ
📘 ওরা তো আল্লাহর পরিবর্তে অন্য উপাস্য গ্রহণ করেছে এ আশায় যে, ওরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।[১]
[১] এটা তাদের আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ যে, উল্লিখিত যে সকল নিয়ামতসমূহ দ্বারা তারা উপকৃত হচ্ছে, তা সবই আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু ঐ সকল নিয়ামতের উপর আল্লাহর (ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে) কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা বাদ দিয়ে তারা অন্যদের প্রতি আশা পোষণ করে ও তাদেরকে উপাস্য বানিয়ে নেয়।
لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَهُمْ وَهُمْ لَهُمْ جُنْدٌ مُحْضَرُونَ
📘 কিন্তু এরা ওদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম নয়; অথচ ওরা এদের জন্য উপস্থিত বাহিনী। [১]
[১] جُنْدٌ (বাহিনী)এর অর্থ হল, দেবতাদের সাহায্যকারী এবং তাদের জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী। مُحْضَرُوْنَ পৃথিবীতে তাদের নিকট উপস্থিত। উদ্দেশ্য এই যে, তারা যে সকল মূর্তিকে দেবতা মনে করে, তারা তাদের সাহায্য আর কি করবে? তারা তো নিজেদেরই সাহায্য করতে অক্ষম। যদি তাদেরকে কেউ গালাগালি করে বা তাদের নিন্দা করে, তাহলে এ (উপাসক)রাই উপস্থিত বাহিনীর মত তাদের সাহায্য ও তাদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করতে তৎপর হয়; তাদের সেই দেবতারা নিজে নয়।
فَلَا يَحْزُنْكَ قَوْلُهُمْ ۘ إِنَّا نَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ
📘 অতএব ওদের কথা তোমাকে যেন কষ্ট না দেয়। আমি তো জানি যা ওরা গোপন করে এবং যা ওরা ব্যক্ত করে।
أَوَلَمْ يَرَ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُبِينٌ
📘 মানুষ কি ভেবে দেখে না যে, আমি তাকে শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্টি করেছি? অতঃপর তখনই সে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী হয়ে পড়ে।
وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ ۖ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ
📘 মানুষ আমার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; এবং বলে, অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে; যখন তা পচে-গলে যাবে?
قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ
📘 বল, তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন[১] এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।
[১] অর্থাৎ, যে আল্লাহ তাআলা মানুষকে একবিন্দু নগণ্য বীর্য থেকে সৃষ্টি করেন, সেই আল্লাহ কি পুনরায় তাকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন না? হাদীসে তাঁর মৃতকে জীবন দান করার ক্ষমতার একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটনাটি এইরূপঃ এক ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার ছেলেদেরকে এই বলে অসিয়ত করে যে, তার মৃত্যুর পর তাকে আগুনে পুড়িয়ে তার অর্ধেক ছাই সমুদ্রে ও অর্ধেক ছাই ঝড়ো হাওয়ার দিন স্থলে উড়িয়ে দেবে। (তার কথা মত তাই করা হল।) আল্লাহ তাআলা সমস্ত ছাইগুলিকে একত্রিত করে তাকে জীবিত করলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তুমি এই কাজ কেন করলে? সে ব্যক্তি উত্তর দিল, তোমার ভয়ে ভীত হয়ে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
(বুখারীঃ আম্বিয়া ও রিক্বাক অধ্যায়)
إِنَّا جَعَلْنَا فِي أَعْنَاقِهِمْ أَغْلَالًا فَهِيَ إِلَى الْأَذْقَانِ فَهُمْ مُقْمَحُونَ
📘 আমি ওদের গলদেশে মোটা বেড়ি পরিয়েছি, তা ওদের চিবুক পর্যন্ত বর্তমান, ফলে ওরা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। [১]
[১] যার ফলে তারা না এদিক ওদিক দেখতে পারে, আর না মাথা ঝুঁকাতে পারে। বরং তারা মাথা উপর দিকে উঠিয়ে ও চোখ নিচের দিকে নামিয়ে থাকবে। এটা তাদের সত্য প্রত্যাখ্যান ও কার্পণ্য করার উদাহরণ। এও হতে পারে যে, এটা তাদের জাহান্নামের শাস্তি-পদ্ধতির বর্ণনা।
(আইসারুত তাফাসীর)
الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِنَ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَارًا فَإِذَا أَنْتُمْ مِنْهُ تُوقِدُونَ
📘 তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা হতে অগ্নি প্রজ্বলিত কর।[১]
[১] বলা হয় যে, আরবে দুটি এমন গাছ আছে যার নাম হল মার্খ্ ও আফার। এই গাছের দুটি ডাল একত্রিত করে ঘষা দিলে তা থেকে আগুন বের হয়। এখানে সবুজ বৃক্ষ থেকে অগ্নি উৎপাদন বলে ঐ গাছের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرٍ عَلَىٰ أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ ۚ بَلَىٰ وَهُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ
📘 যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি ওদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সমর্থ নন?[১] অবশ্যই। আর তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।
[১] অর্থাৎ, মানুষের অনুরূপ। উদ্দেশ্য হল, তিনি কি মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম নন, যেমন তাদেরকে পূর্বে সৃষ্টি করেছেন? এখানে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকেই মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন {لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ} অর্থাৎ, মানুষের সৃষ্টি অপেক্ষা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃষ্টি কঠিনতর।"
(সূরা মু'মিন ৪০:৫৭ আয়াত)
অনুরূপ বক্তব্য সূরা আহ্কাফের ৪৬:৩৩ নং আয়াতেও রয়েছে।
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
📘 তাঁর ব্যাপার তো এই যে, তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি কেবল বলেন, ‘হও’; ফলে তা হয়ে যায়। [১]
[১] অর্থাৎ, এমন ক্ষমতা থাকার পরেও তাঁর জন্য সকল মানুষকে জীবিত করা এমন কি কঠিন ব্যাপার?
فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
📘 অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি প্রত্যেক বিষয়ের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী[১] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [২]
[১] مُلك ও مَلَكُوت উভয়েরই অর্থ এক; বাদশাহী বা রাজত্ব। যেমন رحمة ও رحموت رهبة ও رهبوت جبر ও جبروت ইত্যাদি।
(ইবনে কাসীর)
অনেকে مَلَكُوت কে মুবালাগা (অতিশয়োক্তিবিশিষ্ট) শব্দ বলেছেন।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
অর্থাৎ ملكوت ملك এর মুবালাগা।
[২] অর্থাৎ, এমন হবে না যে, মাটির সাথে মিশে তোমাদের অস্তিত্ব একেবারে নিঃশেষ ও বিলীন হয়ে যাবে। কক্ষনো না; বরং পুনরায় তোমাদেরকে অস্তিত্ব দান করা হবে। আর এটাও সম্ভব হবে না যে, তোমরা পলায়ন করে অন্য কারোর নিকট আশ্রয় নেবে। সুতরাং তোমাদেরকে আল্লাহর নিকটেই উপস্থিত হতে হবে, অতঃপর তিনি তোমাদের কর্ম অনুযায়ী ভাল ও মন্দ প্রতিদান দেবেন।
وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
📘 আমি ওদের সম্মুখে ও পশ্চাতে অন্তরাল স্থাপন করেছি[১] এবং ওদের দৃষ্টির ওপর আবরণ রেখেছি; [২] ফলে ওরা দেখতে পায় না।
[১] অর্থাৎ, তাদের পার্থিব জীবন সৌন্দর্যময় করে দেওয়া হয়েছে। আর এটা যেন তাদের সামনের আড়াল, যার কারণে তারা পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়া কিছুই দেখে না। এটাই তাদের ও তাদের ঈমানের মাঝে অন্তরাল ও পর্দাস্বরূপ। আর তাদের মাথায় আখেরাতের বিষয়ে ভাবনা আসাকে অসম্ভব করে দেওয়া হয়েছে। এটা যেন তাদের পিছনের আড়াল। যার কারণে না তারা তওবা করে, আর না নসীহত গ্রহণ করে। কারণ, আখেরাতের কোন চিন্তা ও ভয়ই তাদের অন্তরে নেই।
[২] অর্থাৎ, তাদের চোখকে ঢেকে দিয়েছেন। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে শত্রুতা এবং তাঁর সত্যের দাওয়াত থেকে বৈমুখ্য তাদের চোখের উপর পটি বেঁধে দিয়েছে, অথবা তাদেরকে অন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে তারা দেখতে পায় না। এটা তাদের অবস্থার দ্বিতীয় উদাহরণ।