WhatsApp Book A Free Trial
القائمة

🕋 تفسير سورة القصص

(Al-Qasas) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ طسم

📘 ত্ব-সীম্-মীম;

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَارِغًا ۖ إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَىٰ قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

📘 মূসা-জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিল।[১] যাতে সে আস্থাশীল হয় সেজন্য তার হৃদয়কে আমি সুদৃঢ় করে না দিলে, সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিত। [২] [১] فَارِغ মানে শূন্য বা খালি। অর্থাৎ, তাঁর অন্তর প্রত্যেক বস্তুর চিন্তা হতে খালি হয়ে গিয়ে শুধুমাত্র মূসার চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছিল। যাকে অস্থির বা ব্যাকুল হওয়া বলা যেতে পারে। [২] অর্থাৎ, দুঃখের কারণে এ কথা প্রকাশ করে দিতেন যে, এ শিশু আমার। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর অন্তরকে সুদৃঢ় রাখলেন। সুতরাং তিনি ধৈর্যধারণ করলেন আর বিশ্বাস রাখলেন যে, আল্লাহ মূসাকে সকুশল ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অবশ্যই পূর্ণ হবে।

وَقَالَتْ لِأُخْتِهِ قُصِّيهِ ۖ فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنُبٍ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

📘 সে মূসার ভগিনীকে[১] বলল, ‘এর পিছনে পিছনে যাও।’ সুতরাং সে ওদের অজ্ঞাতসারে দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল। [২] [১] মূসা (আঃ)-এর ভগ্নির নাম ছিল মারয়্যাম বিন্তে ইমরান। যেমন, ঈসার মাতার নামও ছিল মারয়্যাম বিন্তে ইমরান। উভয়ের নামে ও পিতার নামে ছিল অভিন্নতা। [২] অতএব তিনি নদীর ধারে ধারে দেখতে দেখতে যাচ্ছিলেন। পরিশেষে তিনি দেখতে পেলেন যে, তাঁর ভাই ফিরআউনের প্রাসাদে পৌঁছে গেল।

۞ وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ

📘 আমি পূর্ব হতেই ধাত্রীস্তন্য পানে তাকে বিরত রেখেছিলাম।[১] মূসার ভগিনী বলল, ‘তোমাদেরকে কি আমি এমন পরিবারের কথা বলব, যারা তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর হিতাকাঙ্ক্ষী হবে?’ [২] [১] অর্থাৎ, আমি আমার কুদরতে ও সৃষ্টিগত নির্দেশে মূসাকে তাঁর মাতা ছাড়া অন্য সব ধাত্রীর দুধ পান করা নিষেধ করেছিলাম। সুতরাং বহু চেষ্টা-চরিত্র করার পর কোন ধাত্রী তাঁকে দুধ পান করাতে ও চুপ করাতে সফল হল না। [২] এ সকল দৃশ্য তাঁর বোন চুপি চুপি প্রত্যক্ষ করছিলেন। পরিশেষে বলে ফেললেন যে, 'আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি পরিবারের কথা বলব, যারা এই শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে?'

فَرَدَدْنَاهُ إِلَىٰ أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

📘 অতঃপর আমি তাকে তার জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম,[১] যাতে তার চক্ষু জুড়ায়, সে দুঃখ না পায় এবং জানতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।[২] কিন্তু ওদের অধিকাংশই এ জানে না। [৩] [১] অতঃপর তারা মূসার বোনকে বলল, 'যাও! সেই মহিলাকে ডেকে আনো।' সুতরাং তিনি দ্রুত গিয়ে নিজ মা (যিনি মূসারও মা ছিলেন তাঁকে) ডেকে নিয়ে এলেন।[২] মূসা (আঃ) যখন নিজ মায়ের দুধ পান করে ফেললেন তখন ফিরআউন মূসা (আঃ)-এর মাতাকে রাজ-প্রাসাদে থাকার আহবান জানাল, যাতে সঠিকভাবে শিশুর লালন-পালন ও দেখাশোনা হয়। কিন্তু তিনি বললেন, আমি স্বামী ও অন্য সন্তানদেরকে ছেড়ে থাকতে পারি না। শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক হল যে, তিনি শিশুকে নিজ ঘরে নিয়ে যাবেন ও সেখানেই লালন-পালন করবেন এবং রাজকোষ হতে তার মজুরী ও পারিশ্রমিক তাঁকে দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ, আল্লাহর কি অপার মহিমা! তিনি নিজ সন্তানকে দুধ পান করাবেন, আর পারিশ্রমিক (দুশমন) ফিরআউন হতে পাবেন! মহান আল্লাহ মূসাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কি সুন্দরভাবেই না পূর্ণ করলেন।{فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ} একটি মুরসাল হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যে কারিগর নিজ তৈরী জিনিসের মধ্যে নেকী ও কল্যাণের নিয়ত রাখে, তার উদাহরণ মূসার মায়ের মত; যে নিজ সন্তানকে দুধ পান করায়, উপরন্তু তার উপর পারিশ্রমিকও লাভ করে! (মারাসীলে আবী দাউদ) [৩] এমন বহু কাজ আছে যার বাস্তব পরিণামের কথা অধিকাংশ লোকের অজানা থাকে। কিন্তু আল্লাহর নিকট রয়েছে তার শুভ পরিণামের জ্ঞান। সেই জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা যা অপছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারাহ ২:২১৬ আয়াত) অন্যত্র বলেছেন, "এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ।" (সূরা নিসা ৪:১৯ আয়াত) এই কারণে মানুষের উচিত, নিজ পছন্দ-অপছন্দ দৃষ্টিচ্যুত করে প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করা। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও শুভ পরিণাম।

وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَىٰ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

📘 যখন মূসা পূর্ণ যৌবনে ও পরিণত বয়সে উপনীত হল, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম; [১] এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। [১] 'প্রজ্ঞা ও জ্ঞান' বলতে যদি নবুঅত বুঝানো হয়, তাহলে এই মর্যাদায় তিনি কিভাবে পৌঁছলেন তার বিবরণ পরে আসছে। আবার কিছু ব্যাখ্যাদাতার নিকট এর অর্থ নবুঅত নয়; বরং সাধারণ জ্ঞান যা তিনি পারিবারিক পরিবেশে থেকে শিখেছিলেন।

وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَىٰ حِينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَٰذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهَٰذَا مِنْ عَدُوِّهِ ۖ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَىٰ فَقَضَىٰ عَلَيْهِ ۖ قَالَ هَٰذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ ۖ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلٌّ مُبِينٌ

📘 সে নগরীতে প্রবেশ করল এমন এক সময়ে যখন এর অধিবাসীরা অসতর্ক অবস্থায় ছিল,[১] সেখানে সে দু’টি লোককে মারামারি করতে দেখল; একজন তার নিজ দলের এবং অপরজন তার শত্রু দলের।[২] মূসার দলের লোকটি তার শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা ওকে ঘুষি মারল; এভাবে সে তাকে হত্যা করে বসল। মূসা বলল, ‘এ তো শয়তানের কাজ।[৩] নিশ্চয় সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।’ [৪] [১] এ অবস্থাকে কিছু লোক মাগরেব ও এশার মধ্যকার সময়, আবার কেউ কেউ দুপুরের সময় মনে করেছেন, যখন মানুষ বিশ্রাম নেয়। [২] অর্থাৎ, ফিরআউনের সম্প্রদায়ভুক্ত কিবত্বীদের একজন ছিল। [৩] একে 'শয়তানের কাজ' এই কারণে বলা হয়েছে, যেহেতু হত্যা একটি জঘন্যতম অপরাধ; যদিও মূসা (আঃ)-এর ইচ্ছা হত্যা করা ছিল না। [৪] মানুষের সঙ্গে যার শত্রুতা সুস্পষ্ট এবং মানুষকে পথভ্রষ্ট করার যে চেষ্টা সে করে থাকে, তাও কারো নিকট অস্পষ্ট নয়।

قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

📘 সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের প্রতি যুলুম করেছি; সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর।’[১] অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১] এই অনিচ্ছাকৃত আকস্মিক হত্যা যদিও কাবীরাহ গোনাহ ছিল না (কারণ মহান আল্লাহ নবীগণকে তা হতে সুরক্ষা করেন) তা সত্ত্বেও তিনি এই গোনাহকে এমন ভাবলেন, যার ফলে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরী মনে করলেন। দ্বিতীয়তঃ এ আশঙ্কাও তাঁর ছিল যে, ফিরআউন যদি জানতে পারে, তাহলে তার বদলা নিতে সে হয়তো তাঁকেও হত্যা করবে।

قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ

📘 সে আরও বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ, সুতরাং আমি কখনও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক হব না।’ [১] [১] অর্থাৎ, তুমি যে অনুগ্রহ আমার প্রতি করেছ তার ফলে আমি সেই ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষক হব না, যে কাফের এবং তোমার বিধানের বিরোধী।

فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَائِفًا يَتَرَقَّبُ فَإِذَا الَّذِي اسْتَنْصَرَهُ بِالْأَمْسِ يَسْتَصْرِخُهُ ۚ قَالَ لَهُ مُوسَىٰ إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُبِينٌ

📘 অতঃপর ভীত-সতর্ক অবস্থায়[১] সে নগরীতে তার প্রভাত হল। হঠাৎ সে শুনতে পেল, গতকাল যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল, সে তার সাহায্যের জন্য চীৎকার করছে। মূসা তাকে বলল, ‘নিশ্চয় তুমি একজন সুস্পষ্ট বিভ্রান্ত ব্যক্তি।’ [২] [১] خَائِفًا ভয়ে ভয়ে يَتَرَقّب এদিক-ওদিক দেখে আর নিজের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে। অর্থাৎ, ভীত-সতর্ক অবস্থায়। [২] অর্থাৎ, মূসা (আঃ) তাকে ধমক দিয়ে বললেন, তোমাকে গত কাল একজনের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেছিলাম আবার আজও একজনের সাথে ঝগড়া করছ? 'তুমি একজন সুস্পষ্ট বিভ্রান্ত ব্যক্তি' কথার অর্থঃ সত্যই তুমি একজন ঝগড়াটে মানুষ।

فَلَمَّا أَنْ أَرَادَ أَنْ يَبْطِشَ بِالَّذِي هُوَ عَدُوٌّ لَهُمَا قَالَ يَا مُوسَىٰ أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ ۖ إِنْ تُرِيدُ إِلَّا أَنْ تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ

📘 অতঃপর মূসা যখন উভয়ের শত্রুকে পাকড়াও করতে উদ্যত হল,[১] তখন সে ব্যক্তি বলে উঠল, ‘হে মূসা! গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে কেবল স্বেচ্ছাচারী হতে চাও এবং শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না!’ [২] [১] মূসা (আঃ) কিবতীকে ধরে নিতে চাইলেন। কারণ সেই ছিল মূসা ও ইস্রাঈলীর শত্রু, যাতে ঝগড়া না বাড়তে পায়। [২] সাহায্যপ্রার্থী (ইস্রাঈলী) মনে করল, হয়তো মূসা (আঃ) তাকেও পাকড়াও করবেন, এই ভয়ে সে বলে উঠল, "হে মূসা! গতকাল তুমি যেমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, তেমনি আমাকেও কি হত্যা করতে চাও?" যার ফলে কিবতী জানতে পারে, গতকাল যে হত্যা হয়েছিল তার হত্যাকারী মূসা। সে গিয়ে ফিরআউনকে এ কথা বলে দেয়। যার জন্য ফিরআউন বদলাস্বরূপ মূসাকে হত্যা করার মনস্থ করে। (মতান্তরে উক্ত উক্তি কিবতীর; যেমন বাহ্যার্থে স্পষ্ট। আর কিবতী কোন ইস্রাঈলীর নিকট থেকে মূসা (আঃ)-এর হত্যা করার কথা আগেই শুনেছিল।)

تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ

📘 এগুলি সুস্পষ্ট গ্রন্থের বাক্য ।

وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَىٰ قَالَ يَا مُوسَىٰ إِنَّ الْمَلَأَ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ

📘 নগরীর দূরপ্রান্ত হতে এক ব্যক্তি ছুটে এল ও বলল,[১] ‘হে মূসা! (ফিরআউনের) পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্র করছে। সুতরাং তুমি বাইরে চলে যাও, আমি অবশ্যই তোমার মঙ্গলকামী।’ [১] এ ব্যক্তি কে ছিল? কেউ কেউ বলেন, সে ছিল ফিরআউনের জাতিভুক্তই একটি লোক; কিন্তু সে গোপনভাবে মূসা (আঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী ছিল। আর এ কথা স্পষ্ট যে, শত্রুপক্ষের গুপ্ত ষড়্যন্ত্রের সংবাদ এই রকম লোক দ্বারা আসাটা অসম্ভব নয়। আবার কেউ বলেন, এ ব্যক্তি ছিল মূসা (আঃ)-এর এক ইস্রাঈলী নিকটাত্মীয়। 'নগরীর দূর প্রান্ত হতে' বলতে 'মানাফ'কে বুঝানো হয়েছে যেখানে ছিল ফিরআউনের রাজ প্রাসাদ ও রাজধানী, যা ছিল নগরীর শেষ প্রান্তে।

فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ ۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

📘 ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সন্তর্পণে সে সেখান হতে বের হয়ে পড়ল[১] এবং বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি অত্যাচারী সম্প্রদায় হতে আমাকে রক্ষা কর।’ [২] [১] যখন মূসা (আঃ) একথা জানতে পারলেন, তখন সেখান থেকে পলায়ন করলেন, যাতে ফিরআউন তাঁকে বন্দী করতে না পারে। [২] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার পারিষদের কবল হতে, যারা আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। কথিত আছে যে, মূসা (আঃ)-এর জানাই ছিল না যে, তাঁকে কোথায় যেতে হবে? কারণ, মিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার এ ঘটনা ছিল আকস্মিক; পূর্ব হতে কোন পরিকল্পনা ছিল না। মহান আল্লাহ ঘোড়-সওয়ার এক ফিরিশতাকে পাঠালেন। তিনিই তাঁকে পথ নির্দেশ করেছিলেন। والله أعلم (ইবনে কাসীর)

وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَىٰ رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ

📘 যখন মূসা মাদ্‌য়্যান অভিমুখে যাত্রা করল, তখন বলল, ‘আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’ [১] [১] মহান আল্লাহ তাঁর এই দু'আ কবুল করলেন এবং এমন এক সোজা রাস্তা প্রদর্শন করলেন, যাতে তাঁর ইহকাল ও পরকাল উভয় সফল হল। তিনি হলেন নিজে সুপথপ্রাপ্ত ও অন্যদের পথপ্রদর্শক।

وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ ۖ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا ۖ قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ ۖ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ

📘 যখন সে মাদ্‌য়্যানের কূপের নিকট পৌঁছল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছে[১] এবং তাদের পশ্চাতে দু’জন রমণী তাদের পশুগুলিকে আগলে আছে। মূসা বলল, ‘তোমাদের কি ব্যাপার?’ [২] ওরা বলল, ‘রাখালেরা ওদের পশুগুলিকে নিয়ে সরে না গেলে আমরা আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাতে পারি না।[৩] আর আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ মানুষ।’[৪] [১] যখন মাদয়্যান গিয়ে পৌঁছলেন তখন সেখানে এক কুয়ার নিকট কিছু মানুষের ভিড় দেখলেন, যারা তাদের পশুদেরকে পানি পান করাচ্ছিল। মাদয়্যান একটি গোত্রের নাম, এরা ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর ছিল। আর মূসা (আঃ) ছিলেন ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধর; যিনি (ইয়াকূব) ইবরাহীম (আঃ)-এর পৌত্র ও ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ছিলেন। এই হিসাবে মাদয়্যানবাসী ও মূসা (আঃ)-এর মধ্যে বংশগত একটি সম্পর্ক ছিল। (আইসারুত তাফাসীর) আর এটিই ছিল শুআইব (আঃ)-এর বাসস্থান ও নবুঅতের এলাকা। [২] দু'টি মেয়েকে তাদের ছাগল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মূসা (আঃ)-এর মনে দয়ার সঞ্চার হল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কেন তোমাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছ না? [৩] যাতে পুরুষদের সাথে আমাদের সহ (মিশ্র) অবস্থান না ঘটে। رِعَاء শব্দটি رَاعٍ শব্দের বহুবচন। [৪] সেই জন্য তিনি নিজে পানি পান করানোর জন্য এখানে আসতে পারেন না। (ফলে মেয়ে হয়েও আমরা আসতে বাধ্য হই।)

فَسَقَىٰ لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّىٰ إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

📘 মূসা তখন ওদের পশুগুলিকে পানি পান করাল। তারপর সে ছায়ার নীচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ অবতীর্ণ করবে, নিশ্চয় আমি তার মুখাপেক্ষী।’ [১] [১] মূসা (আঃ) এত দূর সফর করে মিসর থেকে মাদয়্যান পৌঁছলেন, খাওয়া ও পান করার মত সঙ্গে কিছু ছিল না। দীর্ঘ সফরের ফলে ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত। সেই জন্য তাদের পশুগুলিকে পানি পান করানোর পর একটি গাছের ছায়ার আশ্রয় নিয়ে দু'আয় মগ্ন হলেন। خَير (কল্যাণ) শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহার হয়; যেমন, খাদ্য, কল্যাণময় কর্ম ও ইবাদত, শক্তি-সামর্থ্য এবং ধন-মাল ইত্যাদি। (আয়সারুত তাফাসীর) এখানে উক্ত শব্দটি খাদ্যের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আমার এখন খাবারের প্রয়োজন।

فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا ۚ فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ ۖ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

📘 তখন রমণী দু’জনের একজন লজ্জা-জড়িত পদক্ষেপে তার নিকট এল[১] এবং বলল, ‘আপনি যে আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করিয়েছেন, তার পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন।’[২] অতঃপর মূসা তার নিকট এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে সে বলল, ‘ভয় করো না। তুমি যালিম সম্প্রদায়ের কবল হতে বেঁচে গেছ।’ [৩] [১] আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর দু'আ কবুল করলেন এবং দুটি মেয়ের মধ্যে একজন তাঁকে ডাকতে এল। কুরআন বিশেষভাবে মেয়েটির লজ্জার কথা বর্ণনা করেছে। যেহেতু লজ্জাই হল নারীর ভূষণ। পক্ষান্তরে নারীর জন্য পুরুষদের মত লজ্জা ও পর্দার পরোয়া না করে নির্লজ্জ ও বেপর্দা হওয়া শরীয়তে অবৈধ ও ঘৃণিত। [২] মেয়ে দু'টির পিতা কে ছিলেন কুরআনে স্পষ্টভাবে তার পরিচয় বা নাম উল্লেখ করা হয়নি। অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারিগণ শুআইব (আঃ) মনে করেছেন। যিনি মাদয়্যানবাসীদের প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) এই মতটিকেই সমর্থন করেছেন। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, শুআইব (আঃ)-এর যুগ মূসা (আঃ)-এর নবুঅতের আগে ছিল। সুতরাং তিনি শুআইব (আঃ)-এর কোন ভায়ের ছেলে অথবা তাঁর জাতির কোন লোক হবেন। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন। যাই হোক, মূসা (আঃ) মেয়ে দুটির প্রতি যে সহানুভূতি প্রদর্শন ও উপকার করলেন তা তারা বাড়ি ফিরে বৃদ্ধ পিতার নিকট খুলে বলল। যার ফলে তাঁর অন্তরেও উপকারের বদলা দেওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হল। অথবা তাঁর পরিশ্রমের পারিশ্রমিক দেওয়া কর্তব্য মনে করলেন। [৩] অর্থাৎ, মিসরের ঘটনাবলী ও ফিরআউনের অত্যাচার-কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনা করলেন। বৃত্তান্ত শুনে তিনি বললেন, এই এলাকা ফিরআউনের রাজ্য-সীমার বাইরে। অতএব ভয়ের কোন কারণ নেই। আল্লাহ তোমাকে অত্যাচারী হতে পরিত্রাণ দিয়েছেন।

قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۖ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ

📘 ওদের একজন বলল, ‘হে আব্বা! আপনি এঁকে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসাবে নিশ্চয় সে (ব্যক্তি) উত্তম হবে, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।’ [১] [১] কোন কোন মুফাসসির লিখেছেন যে, পিতা মেয়েদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কিভাবে জানলে যে, লোকটি শক্তিশালী ও আমানতদার?' উত্তরে মেয়েরা বলল, 'তিনি যে কুয়া হতে আমাদের পশুদেরকে পানি পান করালেন সেই কুয়াটি এমন একটি বড় পাথর দিয়ে ঢাকা, যা দশজনের পক্ষে উঠানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, তিনি একাই সেই পাথরটিকে সরিয়েছেন এবং পরে ঢাকাও দিয়েছেন একাই। অনুরূপ আমি যখন তাঁকে এখানে আসার জন্য ডাকতে গিয়েছিলাম, রাস্তা যেহেতু আমারই জানা, সেই জন্য আমি আগে আগে চলতে শুরু করলাম আর তিনি পিছনে। কিন্তু বাতাসে আমার চাদর উড়তে থাকে, ফলে তিনি আমাকে তাঁর পিছনে চলতে বললেন; যাতে আমার দেহের কোন অংশ তাঁর দৃষ্টিতে না পড়ে। আর রাস্তা ভুল হলে পাথর ছুঁড়ে জানিয়ে দিতে বলেন।' এ সব কথার সত্যতা আল্লাহই ভাল জানেন। (ইবনে কাসীর)

قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنْكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَىٰ أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ ۖ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ ۖ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ ۚ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

📘 সে মূসাকে বলল, ‘আমি আমার এ কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই[১] এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার মজুরি খাটবে;[২] অতঃপর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, তবে সে তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।[৩] ইন শাআল্লাহ (আল্লাহর ইচ্ছায়) তুমি আমাকে সদাচারী পাবে।’ [৪] [১] আমাদের দেশে কন্যা পক্ষ হতে বিবাহের পয়গাম দেওয়া লজ্জার ব্যাপার মনে করা হয়। কিন্তু আল্লাহর শরীয়তে তা নিন্দনীয় নয়। সুন্দর চরিত্রবান যুবকের সন্ধান মিললে সরাসরি তার সাথে বা তার পরিবারের কারো সাথে নিজ কন্যার বিবাহের ব্যাপারে কথা-বার্তা বলা দোষের নয়; বরং তা প্রশংসনীয়। নবী (সাঃ) ও সাহাবা (রাঃ)-দের যুগেও এই প্রথাই প্রচলিত ছিল। [২] এখান থেকে উলামাগণ মজদুরী ও মজুরীর বৈধতা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ, মজুরী বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন পুরুষ দ্বারা কাজ নেওয়া বৈধ। [৩] অতিরিক্ত দু' বছর কাজ করা যদি কষ্টকর মনে হয়, তাহলে আট বছর পর যাওয়ার অনুমতি থাকবে। [৪] ঝগড়া-বিবাদ করব না, কোন কষ্টও দেব না এবং তোমার প্রতি কঠোরও হব না।

قَالَ ذَٰلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ ۖ أَيَّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ ۖ وَاللَّهُ عَلَىٰ مَا نَقُولُ وَكِيلٌ

📘 মূসা বলল, ‘আপনার ও আমার মধ্যে এ চুক্তিই রইল। এ দুটি মেয়াদের কোন একটি আমি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকবে না।[১] আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি আল্লাহ তার সাক্ষী।’ [২] [১] অর্থাৎ, আট বছর বা দশ বছর পর আমি যেতে চাইলে অধিক থাকার দাবী করা যাবে না। [২] কেউ কেউ বলেন, এটি শুআইব বা শুআইবের ভাইপোর উক্তি। আবার কেউ বলেন, এটি মূসা (আঃ)-এর কথা। হয়তো বা উভয়ের কথা; যেহেতু বহুবচন শব্দ ব্যবহার হয়েছে। মনে হয় এ ব্যাপারে দুজনেই আল্লাহকে সাক্ষী রাখলেন। আর এই কথার সাথে সাথেই তাঁর কন্যা ও মূসা (আঃ)-এর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেল। মহান আল্লাহ অন্য কথা বিস্তারিত আলোচনা করেননি। ইসলামী শরীয়তে উভয় পক্ষের সম্মতির সাথে সাথে বিবাহ-বন্ধনের সময় দু'জন মুসলমান সাক্ষী থাকা আবশ্যক।

۞ فَلَمَّا قَضَىٰ مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا قَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَعَلِّي آتِيكُمْ مِنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ جَذْوَةٍ مِنَ النَّارِ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ

📘 মূসা যখন তার মেয়াদ[১] পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করল,[২] তখন সে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পেল। সে তার পরিজনবর্গকে বলল, ‘তোমরা অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবতঃ আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কোন খবর আনতে পারব অথবা একখন্ড জ্বলন্ত আঙ্গার আনতে পারব, যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পার।’ [১] ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এখানে মেয়াদ বলতে দশ বছরের মেয়াদ অর্থ নিয়েছেন। কারণ, এই মেয়াদই মূসা (আঃ)-এর শ্বশুরের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল। আর মূসা (আঃ)-এর সুন্দর চরিত্র-ব্যবহার নিজ বৃদ্ধ শ্বশুরের ইচ্ছার বিপরীত করতে পছন্দ করল না। [২] এখান থেকে প্রমাণিত হল যে, স্বামী নিজ স্ত্রীকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারে।

نَتْلُو عَلَيْكَ مِنْ نَبَإِ مُوسَىٰ وَفِرْعَوْنَ بِالْحَقِّ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

📘 আমি তোমার নিকট বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে মূসা ও ফিরআউনের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে বিবৃত করছি। [১] [১] মূসা (আঃ)-এর বৃত্তান্ত-বিবরণ এই কথারই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন আল্লাহর সত্য রসূল। কারণ, আল্লাহর অহী ছাড়া বহু শতাব্দী পূর্বের ঘটনা হুবহু যেরূপ ঘটেছিল সেরূপ বর্ণনা করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও এর দ্বারা উপকার ঈমানদার ব্যক্তিদেরই হবে। কারণ, তারাই নবী (সাঃ)-এর কথা বিশ্বাস করবে।

فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يَا مُوسَىٰ إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

📘 যখন মূসা আগুনের নিকট পৌঁছল, তখন উপত্যকার ডান পাশে পবিত্র ভূমির এক বৃক্ষ হতে[১] তাকে আহবান করে বলা হল, ‘হে মূসা! নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক। [২] [১] অর্থাৎ, আওয়াজ উপত্যকার এক প্রান্ত থেকে এল; যা পশ্চিম দিক হতে পাহাড়ের ডান দিক ছিল। এখানে গাছ হতে আগুনের শিখা বের হচ্ছিল, যা আসলে মহান আল্লাহর নূর (জ্যোতি) ছিল। [২] অর্থাৎ, হে মূসা! এখন তোমার সঙ্গে যে কথা বলছে সে, আমিই আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক।

وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ ۖ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّىٰ مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ ۚ يَا مُوسَىٰ أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ ۖ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ

📘 তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।’ অতঃপর যখন সে একে সাপের মত ছুটাছুটি করতে দেখল, তখন পিছনে না তাকিয়ে সে বিপরীত দিকে ছুটতে লাগল। (তাকে বলা হল,) ‘হে মূসা! অগ্রসর হও, ভয় করো না; নিশ্চয়ই তুমি নিরাপদে রয়েছ। [১] [১] এটি সেই মু'জিযা যা মূসা (আঃ) নবুওত প্রাপ্তির পর প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু মু'জিযা অস্বাভাবিক জিনিসকে বলা হয়, যা স্বাভাবিকতার বিপরীত ও কর্মকারণশূন্য। আর যেহেতু এসব জিনিস (মু'জিযা) কেবল আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশক্রমেই প্রকাশ পায়; কোন মানুষের এখতিয়ারভুক্ত নয় -- যদিও হোক সে কোন মহান পয়গম্বর ও নৈকট্যপ্রাপ্ত নবী -- সেহেতু মূসা (আঃ)-এর হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর একটি জীবন্ত সাপ হয়ে গেল তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। আবার যখন আল্লাহ তার প্রকৃতত্বের কথা জানিয়ে অভয় দান করলেন, তখন তাঁর ভয় দূর হল এবং তাঁর নিকট এ কথা স্পষ্ট হল যে, মহান আল্লাহ তাঁর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ এই মু'জিযা দান করেছেন।

اسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ وَاضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ ۖ فَذَانِكَ بُرْهَانَانِ مِنْ رَبِّكَ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ

📘 তোমার হাত নিজ জামার বুকের উন্মুক্ত অংশে প্রবেশ করাও, তা নির্মল উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে।[১] ভয় দূর করবার জন্য তোমার হাতকে বুকের উপর চেপে ধর।[২] এ দুটি ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য তোমার প্রতিপালক-প্রদত্ত প্রমাণ। ওরা অবশ্যই সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।’ [৩] [১] يَدٌ بَيضَاء (উজ্জ্বল হাত) এটি ছিল দ্বিতীয় মু'জিযা, যা তাঁকে দান করা হয়েছিল। [২] লাঠি সাপ হয়ে যাওয়ার ফলে মূসা (আঃ)-এর মনে যে ভয় সঞ্চারিত হয়েছিল তা দূর করার এক পদ্ধতি বলে দেওয়া হল। নিজের বাজু (হাত) শরীরে রেখে নাও, তাতে ভয় দূর হয়ে যাবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এটি সকল মানুষ ও সকল প্রকার ভয় দূর করার জন্য প্রযোজ্য। যখনই কেউ কোন কিছু হতে ভয় পাবে তখনই এ রকম করলে তার ভয় দূর হয়ে যাবে। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, যে কোন ব্যক্তি মূসা (আঃ)-এর অনুকরণে ভয়ের সময় নিজ হাত হৃদয়ের উপর রাখলে তার হৃদয় হতে ভয় বিলকুল দূর হয়ে যাবে, নতুবা কমসে কম সে ভয় কিছু হাল্কা হবে -- ইন শাআল্লাহ। [৩] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার জাতির সামনে এই দুই মু'জিযা নিজের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ পেশ কর। এরা আল্লাহর আনুগত্য হতে দূরে সরে গেছে এবং এরা আল্লাহর দ্বীন-বিরোধী।

قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونِ

📘 মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো ওদের একজনকে হত্যা করেছি, ফলে আমি আশংকা করছি যে, ওরা আমাকে হত্যা করবে। [১] [১] এ ছিল সেই আশঙ্কা যা বাস্তবে মূসা (আঃ)-এর প্রাণে ছিল। কারণ, তাঁর হাতে এক কিবত্বী খুন হয়ে গিয়েছিল।

وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي ۖ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ

📘 আমার ভাই হারূন আমার থেকে বাগ্মী; অতএব তাকে আমার সহযোগীরূপে প্রেরণ কর,[১] সে আমাকে সমর্থন করবে। নিশ্চয় আমি আশংকা করি যে, ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।’ [১] ইস্রাঈলী বর্ণনা মতে মূসা (আঃ) ছিলেন তোতলা। যার কারণ এই বলা হয়ে থাকে যে, শিশু মূসার সামনে আগুনের আঙ্গার ও খেজুর অথবা মুক্তা রাখা হয়েছিল। তিনি আগুনের আঙ্গার তুলে মুখে পুরে নিয়েছিলেন, যার জন্য তাঁর জিহ্বা পুড়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা বা যুক্তি ঠিক হোক অথবা ভুল, কুরআনের এই আয়াত হতে প্রমাণিত হয় যে, মূসা (আঃ)-এর তুলনায় হারূন (আঃ) বেশি বাকপটু ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। আর মূসা (আঃ)-এর মুখে ছিল আড়ষ্টতা ও জড়তা। যা দূর করার জন্য তিনি নবুঅত প্রাপ্তির পর দু'আ করেছিলেন। رِدء এর অর্থ সহায়ক, সহযোগী, সমর্থক। অর্থাৎ, হারূন নিজ বাকপটুতায় আমার সাহায্য ও সহযোগিতা করবে।

قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا فَلَا يَصِلُونَ إِلَيْكُمَا ۚ بِآيَاتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغَالِبُونَ

📘 আল্লাহ বললেন, ‘আমি তোমার ভাই দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করব[১] এবং তোমাদের উভয়কে আধিপত্য দান করব। ওরা তোমাদের নিকট পৌঁছতে পারবে না।[২] তোমরা এবং তোমাদের অনুসারীরা আমার নিদর্শন বলেই ওদের উপর বিজয়ী হবে।’ [৩] [১] মূসা (আঃ)-এর দু'আ মঞ্জুর করা হল আর তার আশানুরূপ হারূন (আঃ)-কেও নবুঅত প্রদান করে তাঁর সঙ্গী ও সহযোগী বানানো হল।[২] অর্থাৎ, আমি তোমাদের সুরক্ষা করব। ফিরআউন ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।[৩] এটা সেই বিষয় যা কুরআনে বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, সূরা মায়িদাহ ৫:৬৭ নং, আহযাব ৩৩:৩৯ নং, মুজাদিলাহ ৫৮:২১ নং, মু'মিন ৪০:৫১-৫২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।

فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَىٰ بِآيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُفْتَرًى وَمَا سَمِعْنَا بِهَٰذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ

📘 সুতরাং মূসা যখন ওদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সহ উপস্থিত হল, তখন ওরা বলল, ‘এ তো অলীক যাদু মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষকালে কখনও এরূপ ঘটতে শুনিনি।’ [১] [১] অর্থাৎ, এই দাওয়াত যে, বিশ্ব-জাহানে একমাত্র আল্লাহই ইবাদতের যোগ্য এটি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কথা। এ কথা না আমরা শুনেছি আর না আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই তাওহীদ সম্পর্কে অবহিত ছিল। মক্কার মুশরিকরাও নবী (সাঃ) সম্পর্কে বলেছিল,{أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ} অর্থাৎ, সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? এ তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। (সূরা সা'দ ৩৮:৫ আয়াত)

وَقَالَ مُوسَىٰ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَنْ جَاءَ بِالْهُدَىٰ مِنْ عِنْدِهِ وَمَنْ تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

📘 মূসা বলল, আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত, কে তাঁর নিকট থেকে পথনির্দেশ এনেছে[১] এবং (পরকালে) কার পরিণাম শুভ হবে।[২] নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হবে না। [৩] [১] অর্থাৎ, তোমার ও আমার চেয়ে আল্লাহই হিদায়াতের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। অতএব যে কথা আল্লাহর পক্ষ হতে আসবে সে কথা সত্য হবে, নাকি তোমাদের ও তোমাদের বাপ-দাদাদের কথা? [২] শুভ-পরিণাম বলতে পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দয়া এবং ক্ষমার যোগ্য হওয়া। আর এ যোগ্যতা একমাত্র তওহীদপন্থীদেরই লাভ হবে। [৩] ظَالِم (সীমালংঘনকারী) বলতে কাফের ও মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। কারণ আরবীতে ظلم এর অর্থ وضع الشيء في غير محله কোন জিনিসকে তার নিজের জায়গায় না রেখে অন্য জায়গায় রাখা। মুশরিক যেহেতু আল্লাহর জায়গায় এমন কিছুকে মাবূদ বানিয়ে দেয় যারা ইবাদতের যোগ্য নয়। অনুরূপ কাফেররাও প্রতিপালকের আসল স্থান সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ থাকে। সেই জন্য এরাই সব থেকে বড় সীমালংঘনকারী, অনাচারী ও অত্যাচারী। আর এরা পরকালে সফলতা হতে; অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমা হতে বঞ্চিত হবে। এই আয়াত থেকেও জানা গেল যে, সব চেয়ে বড় সফলতা পরকালের সফলতা। পৃথিবীর সুখ-শান্তি, ধন-সম্পদের আধিক্য সত্যিকার সফলতা নয়। কারণ, এ সাময়িক সফলতা পৃথিবীতে মুশরিক-কাফের সকলের ভাগ্যেই জোটে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের সফলতার কথা খন্ডন করেছেন, যাতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, সত্যিকার সফলতা পরকালের চিরস্থায়ী সফলতা; পৃথিবীর কয়েক দিনের অস্থায়ী সুখ-শান্তি এবং ধন-সম্পদ প্রকৃত সফলতা নয়।

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ

📘 ফিরআউন বলল, ‘হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে জানি না! হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও[১] এবং এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর; হয়তো আমি এতে মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি।[২] তবে আমি অবশ্যই মনে করি, সে মিথ্যাবাদী।’ [৩] [১] অর্থাৎ, মাটিকে পুড়িয়ে ইট তৈরী কর। হামান ছিল ফিরআউনের মন্ত্রী, পরামর্শদাতা ও তার রাজকার্যের দায়িত্বশীল ব্যক্তি। [২] অর্থাৎ, একটি উঁচু ও সুদৃঢ় প্রাসাদ তৈরী কর। যার উপর চড়ে আকাশে গিয়ে আমি দেখতে পারি যে, সেখানে আমি ছাড়া অন্য কোন রব (প্রতিপালক) আছে কি না? [৩] অর্থাৎ, মূসার দাবী যে, আসমানে একজন রব রয়েছে, যে সারা বিশ্বের পালনকর্তা, আমি তাকে এ দাবীতে মিথ্যাবাদী মনে করি।

وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ

📘 ফিরআউন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে অহংকার করেছিল[১] এবং ওরা মনে করেছিল যে, ওরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না । [১] এখানে পৃথিবী, যমীন বা দেশ বলতে 'মিসর'কে বুঝানো হয়েছে, যেখানে ফিরআউন রাজত্ব করত। অহংকার অর্থ, অকারণে নাহক নিজেকে বড় মনে করা। অর্থাৎ তার নিকট কোন প্রমাণ ছিল না যার দ্বারা মূসা (আঃ)-এর প্রমাণ ও মু'জিযাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারত। কিন্তু সে অহংকার ও শত্রুতাবশতঃ অস্বীকার করার রাস্তা অবলম্বন করল।

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ

📘 ফিরআউন আপন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল[১] এবং সেখানকার অধিবাসীবৃন্দকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে[২] ওদের একটি শ্রেণীকে সে হীনবল করেছিল;[৩] সে ওদের পুত্রদেরকে হত্যা করত[৪] এবং নারীদেরকে জীবিত রাখত। নিঃসন্দেহে সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। [১] যুলুম ও অত্যাচারের বাজার গরম করে রেখেছিল, আর সে নিজেকে বড় উপাস্য বলে ঘোষণা করেছিল। [২] যাদের উপর ভিন্ন ভিন্ন কাজ ও কর্তব্য ন্যস্ত ছিল। [৩] এ থেকে বানী ইস্রাঈলদেরকে বুঝানো হয়েছে; যারা ছিল সে কালের সর্বোত্তম জাতি। কিন্তু আল্লাহর পরীক্ষা স্বরূপ তারা ফিরআউনের দাসে ও তার অত্যাচারের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। [৪] যার কারণ হল, কিছু জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, বানী ইস্রাঈলদের মধ্যে এমন এক সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে, যার হাতে ফিরআউন ও তার রাজত্ব ধ্বংস হবে। যার প্রতিকার ছিল তার নিকট এই যে, তাদের মধ্যে প্রতিটি নবজাত পুত্র-সন্তানকে হত্যা করে দেওয়া হবে। অথচ সে নির্বোধ এ চিন্তা করেনি যে, যদি জ্যোতিষী সত্যবাদী হয়, তাহলে তা হবেই; যদিও সে সন্তানদের হত্যা করতে থাকে। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে সন্তান হত্যার আদেশের কোনই প্রয়োজন ছিল না। (ফাতহুল কাদীর) কেউ কেউ বলেন, ইবরাহীম (আঃ) হতে এ সুসংবাদ প্রচার হয়ে আসছিল যে, তাঁরই বংশে এক সন্তান জন্ম-গ্রহণ করবে, যার হাতে মিসর রাজ্য ধ্বংস হবে। কিবত্বীরা এ সংবাদ বানী ইস্রাঈলদের নিকট হতে শোনার পর তা ফিরআউনের নিকট পৌঁছে দেয়। যার জন্য সে বানী ইস্রাঈলদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করতে শুরু করে। (ইবনে কাসীর)

فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ ۖ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ

📘 অতএব আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম।[১] সুতরাং দেখ, সীমালংঘনকারীদের পরিণাম কি ছিল! [১] যখন তার অবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্য সীমা অতিক্রম করল এবং কোনক্রমেই ঈমান আনতে প্রস্তুত হল না, তখন শেষ পর্যন্ত এক সকালে আমি তার সলিল সমাধি ঘটালাম। (যার বিস্তারিত আলোচনা সূরা শুআরায় ২৬:১০-৬৮ আয়াতে উল্লেখ হয়েছে।)

وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنْصَرُونَ

📘 ওদেরকে আমি নেতা করেছিলাম; ওরা লোকদেরকে জাহান্নামের দিকে আহবান করত।[১] কিয়ামতের দিন ওরা কিছু মাত্র সাহায্য পাবে না। [১] অর্থাৎ, তাদের পরে যে কোন ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদ বা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করবে, ফিরআউনীরা তার পথিকৃৎ নেতা ও অগ্রগামী গণ্য হবে, যারা ছিল জাহান্নামের দিকে আহবানকারী।

وَأَتْبَعْنَاهُمْ فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ هُمْ مِنَ الْمَقْبُوحِينَ

📘 এ পৃথিবীতে আমি তাদেরকে অভিশপ্ত করেছিলাম এবং কিয়ামতের দিন ওরা হবে ঘৃণিত! [১] [১] অর্থাৎ, ইহকালে তারা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে, আর পরকালেও তারা ঘৃণিত ও কুৎসিত হবে। অর্থাৎ, মুখ হবে কালো আর চোখ হবে নীল; যেমন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বর্ণনায় এসেছে।

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَىٰ بَصَائِرَ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

📘 আমি অবশ্যই পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর মূসাকে গ্রন্থ দিয়েছিলাম[১] মানব-জাতির জন্য আলোক-বর্তিকা, পথনিদের্শ ও করুণাস্বরূপ;[২] যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। [৩] [১] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার জাতি অথবা নূহ জাতি, আদ ও সামূদ জাতির ধ্বংসের পর মূসা (আঃ)-কে (তাওরাত) কিতাব দান করা হয়েছে। [২] যাতে মানুষ সত্য চিনতে ও গ্রহণ করতে পারে এবং আল্লাহর কৃপার উপযুক্ত হয়। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা করে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং তাঁর প্রেরিত নবীদের আনুগত্য করে, যাঁরা তাদেরকে মঙ্গল, সুপথ ও সত্যিকার সফলতার দিকে আহবান করেন।

وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَىٰ مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ

📘 মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়েছিলাম, তখন তুমি পর্বতের পশ্চিম পাশে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। [১] [১] অর্থাৎ, যখন আমি তূর পর্বতে মূসার সাথে কথোপকথন করেছিলাম ও তাঁকে অহী ও নবুঅত দ্বারা সম্মানিত করেছিলাম। তখন (হে মুহাম্মাদ!) তুমি সেখানে উপস্থিত ও প্রত্যক্ষদর্শী ছিলে না; বরং এটি এমন অদৃশ্যের সংবাদ যা আমি অহী দ্বারা তোমাকে অবহিত করেছি, আর তা এ কথার প্রমাণ যে, তুমি সত্য নবী। কারণ, না তুমি এ কথা কারো নিকটে শুনেছ, আর না তুমি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছ। এ বিষয়টি আরো বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরা আলে-ইমরান ৩:৪৪, হূদ ১১:৪৯, ১১:১০০, ইউসুফ ১২:১০২, ত্বহা ২০:৯৯ নং আয়াত ইত্যাদি দ্রষ্টব্য।

وَلَٰكِنَّا أَنْشَأْنَا قُرُونًا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ ۚ وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَلَٰكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ

📘 বস্তুতঃ (মূসার পর) অনেক মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটিয়েছিলাম;[১] অতঃপর ওদের বহু যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে।[২] তুমি তো মাদ্‌য়্যানবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না[৩] ওদের নিকট আমার বাক্য আবৃত্তি করার জন্য । কিন্তু আমিই ছিলাম রসূলপ্রেরণকারী। [৪] [১] قُرُون শব্দটি قَرن শব্দের বহুবচন, যার অর্থ যুগ বা শতাব্দী। কিন্তু এখানে সম্প্রদায় বা জাতির অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! তোমার ও মূসার মাঝে যে সকল যুগ অতিবাহিত হয়েছে তাতে আমি বেশ কিছু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি। [২] অর্থাৎ, কালের আবর্তনে ধর্মের বিধি-বিধান পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং মানুষ ধর্ম ভুলে বসেছে। যার কারণে তারা আল্লাহর নির্দেশাবলী বর্জন করে এবং তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভুলে বসে। সুতরাং এক নতুন নবী প্রেরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। অথবা এর অর্থ এই যে, সময়ের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণে আরবের লোকেরা নবুঅত ও রিসালাত সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃত হয়। যার কারণে ওরা তোমার নবুঅতের ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করে এবং তোমাকে নবী বলে মেনে নিতে প্রস্তুত হয় না। [৩] যার ফলে তুমি নিজে এই ঘটনার বিস্তারিত সব কিছু জানতে পারতে। [৪] আর সেই নিয়মানুসারেই আমি তোমাকে রসূলরূপে প্রেরণ করেছি এবং পূর্বের অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করেছি।

وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَٰكِنْ رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

📘 মূসাকে যখন আমি আহবান করেছিলাম, তখন তুমি ত্বুর পর্বত-পার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না।[১] বস্তুতঃ এ সংবাদ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে করুণাস্বরূপ,[২] যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পার, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি;[৩] যেন ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। [১] অর্থাৎ, যদি তুমি সত্য রসূল না হতে, তাহলে মূসার এই ঘটনা তোমার জানার কথা নয়। [২] অর্থাৎ, তোমার এই জ্ঞান সরাসরি প্রত্যক্ষ ও পরিদর্শন করার ফল নয়; বরং তা তোমার প্রতিপালকের কৃপা যে, তিনি তোমাকে নবী করে প্রেরণ করেছেন এবং অহী দ্বারা সম্মানিত করেছেন। [৩] এ সম্প্রদায় বলতে মক্কা ও আরববাসীদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাদের নিকট নবী (সাঃ)-এর পূর্বে কোন নবীর আগমন ঘটেনি। কারণ, ইবরাহীম (আঃ)-এর পর নবুঅতের ধারা তাঁরই বংশেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং তাঁদেরকে বানী ইস্রাইলের দিকেই প্রেরণ করা হয়। ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে অর্থাৎ, আরবের জন্য নবী (সাঃ) ছিলেন প্রথম নবী ও নবীদের সর্বশেষ নবী ছিলেন। এদের নিকট নবী প্রেরণের প্রয়োজন এই জন্যই বোধ করা হয়নি, যেহেতু অন্যান্য নবীদের আহবান ও তাঁদের বাণী তাদের নিকট পৌঁছেছিল। নচেৎ তাদের কুফর ও শিরকের উপর অব্যাহত থাকার ওজর থাকত। অথচ আল্লাহ তাআলা এ রকম ওজর কারোও জন্য অবশিষ্ট রাখেননি।

وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُمْ مُصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

📘 রসূল না পাঠালে ওদের কৃতকর্মের জন্য ওদের কোন বিপদ হলে ওরা বলত, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট কোন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে, আমরা তোমার আয়াতসমূহ মেনে চলতাম এবং আমরা বিশ্বাসী হতাম।’ [১] [১] অর্থাৎ, তাদের উক্ত ওজর শেষ করার জন্য আমি তোমাকে তাদের নিকট নবী করে পাঠালাম। কারণ, সময়ের সুদীর্ঘ ব্যবধানের ফলে অতীত নবীদের শিক্ষা মুছে গিয়েছিল এবং তাদের আহবান মানুষ ভুলে বসেছিল। আর এই পরিস্থিতিই নতুন নবী প্রেরণের দাবিদার ছিল। এই কারণেই সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর শিক্ষা (কুরআন-হাদীস)-কে মিটে যাওয়া ও রদ্দ্বদল হওয়া থেকে সুরক্ষা দান করেছেন। আর এমন সৃষ্টিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, যাতে তাঁর দাওয়াত পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে এবং এখনও পৌঁছচ্ছে, (পৃথিবী এখন একটি শহরের মত অথবা চারিদিকে আয়না বসানো একটি রুমের মত হয়ে গেছে।) যাতে আর কোন নতুন নবী প্রেরণের প্রয়োজনই না পড়ে। সুতরাং যে ব্যক্তি সেই 'প্রয়োজনীয়তা'র দাবী করে নবুঅতের সঙ্ সাজে, সে মিথ্যুক দাজ্জাল বৈ অন্য কিছু নয়।

فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا لَوْلَا أُوتِيَ مِثْلَ مَا أُوتِيَ مُوسَىٰ ۚ أَوَلَمْ يَكْفُرُوا بِمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ مِنْ قَبْلُ ۖ قَالُوا سِحْرَانِ تَظَاهَرَا وَقَالُوا إِنَّا بِكُلٍّ كَافِرُونَ

📘 অতঃপর যখন আমার নিকট হতে ওদের নিকট সত্য আগমন করল, তখন ওরা বলতে লাগল, ‘মূসাকে যেরূপ দেওয়া হয়েছিল ও (মুহাম্মাদ)কে সেরূপ দেওয়া হল না কেন?’[১] কিন্তু পূর্বে মূসাকে যা দেওয়া হয়েছিল, তা কি ওরা অস্বীকার করেনি? [২] ওরা বলেছিল, ‘উভয়ই যাদু, একটি অপরটির সমর্থক।’ এবং বলেছিল, ‘আমরা উভয়কে প্রত্যাখ্যান করি।’[৩] [১] অর্থাৎ, মূসার মত মু'জিযা দেওয়া হল না কেন? যেমন, লাঠির সাপ হয়ে যাওয়া ও হাতের উজ্জ্বল সাদা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। [২] অর্থাৎ, তাদের চাহিদানুসারে মু'জিযা যদি দেখিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও লাভ কি? কারণ যারা ঈমান গ্রহণ করবে না, তারা বিভিন্ন ধরনের নিদর্শন দেখার পরও ঈমান হতে বঞ্চিত থাকবে। মূসার উক্ত মু'জিযা দেখে কি ফিরআউনীরা মুসলমান হয়েছিল? তারা কি কুফরে অটল থাকেনি? অথবা يكفُرُوا এর সর্বনাম দ্বারা মক্কার কুরাইশদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তারা কি নবী মুহাম্মাদের আগে মূসার সঙ্গে কুফরী করেনি? [৩] উপরোক্ত প্রথম ভাবার্থের দিক দিয়ে 'উভয়ই' বলতে মূসা ও হারূন (আলাইহিমাস সালাম)-কে বুঝানো হয়েছে। আর سِحرَان শব্দটি سَاحِرَان এর অর্থ হবে। আর দ্বিতীয় ভাবার্থে 'উভয়ই' বলতে কুরআন ও তাওরাত বুঝাবে। অর্থাৎ, উভয়ই যাদু যা এক অপরের সমর্থক। আর আমরা প্রত্যেককে অর্থাৎ, মুহাম্মাদ ও মূসাকে অস্বীকার করি। (ফাতহুল কাদীর)

قُلْ فَأْتُوا بِكِتَابٍ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ هُوَ أَهْدَىٰ مِنْهُمَا أَتَّبِعْهُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

📘 বল, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে আল্লাহর নিকট হতে এক গ্রন্থ আনয়ন কর যা পথনির্দেশে এ দু’টি হতে উৎকৃষ্ট হবে; আমি সে গ্রন্থ অনুসরণ করব।’ [১] [১] যদি তোমরা নিজেদের দাবীতে সত্যবাদী হও যে, কুরআন ও তাওরাত উভয়ই যাদু, তাহলে তোমরা অন্য এক আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থ পেশ কর; যা উক্ত উভয়ের তুলনায় বেশি সুপথ-নির্দেশক, আমি তার অনুসরণ করব। কারণ, আমি তো সুপথের অনুসন্ধানকারী ও অনুসরণকারী।

وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ

📘 সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা ও দেশের উত্তরাধিকারী করতে ইচ্ছা করলাম। [১] [১] অতঃপর এই রকমই হল। মহান আল্লাহ সেই দুর্বল ও দাস জাতিকে পূর্ব পশ্চিমের মালিক বানিয়ে দিলেন। (সূরা আ'রাফ ৭:১৩৭ আয়াত) সেই সঙ্গে তাদেরকে ধর্মীয় নেতা ও ইমাম বানিয়ে দিলেন।

فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ ۚ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

📘 অতঃপর ওরা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়,[১] তাহলে জানবে ওরা তো কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে?[২] নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না। [৩] [১] অর্থাৎ, কুরআন ও তাওরাতের চেয়ে বেশি হিদায়াতদানকারী কোন গ্রন্থ তারা পেশ করতে না পারে -- আর নিঃসন্দেহে তারা পারবেও না -- তাহলে জানবে---। [২] আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াতকে ছেড়ে দিয়ে নিজের প্রবৃত্তির পূজা করা সব থেকে বড় ভ্রষ্টতা। আর এই দিক দিয়ে মক্কার কুরাইশরা সব চেয়ে বড় বিভ্রান্ত। কারণ, ওরা এই পথেরই পথিক। [৩] এখানে আল্লাহর সেই নিয়মের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যাচারীদের জন্য তাঁর কাছে নির্ধারিত আছে; আর তা এই যে, তারা হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকে। কারণ, নবীদেরকে মিথ্যা ভাবা, আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং নিরন্তর কুফরী ও বিদ্বেষ এমন অপরাধ, যাতে সত্য গ্রহণের যোগ্যতা ও তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপর মানুষ যুলুম, পাপ, কুফর ও শিরকের অন্ধকারে হাবুডুবু খেতে থাকে। ঈমানের আলো তার ভাগ্যে আর জোটে না।

۞ وَلَقَدْ وَصَّلْنَا لَهُمُ الْقَوْلَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

📘 আর আমি অবশ্যই ওদের নিকট বার বার আমার বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছি;[১] যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে। [২] [১] অর্থাৎ, রসূলের পর রসূল, কিতাবের পর কিতাব আমি প্রেরণ করেছি আর এভাবে ধারাবাহিকরূপে আমি আমার বাণী মানুষের নিকট পৌঁছাতে থেকেছি। [২]অর্থাৎ এর উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অশুভ পরিণতিকে ভয় করে এবং আমার উপদেশ গ্রহণ করে ঈমান আনবে।

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِهِ هُمْ بِهِ يُؤْمِنُونَ

📘 এর পূর্বে আমি যাদেরকে গ্রন্থ দিয়েছিলাম, তারাও এতে বিশ্বাস করে। [১] [১] এখানে ঐ সকল ইয়াহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যেমন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) ইত্যাদি। অথবা ঐ সকল খ্রিষ্টান যারা হাবশা হতে নবী (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিল এবং তাঁর পবিত্র মুখে কুরআনের বাণী শুনে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। (ইবনে কাসীর)

وَإِذَا يُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ قَالُوا آمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ

📘 যখন তাদের নিকট এ আবৃত্তি করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা এতে বিশ্বাস করি, এ আমাদের প্রতিপালক হতে আগত সত্য। অবশ্যই আমরা পূর্ব হতেই আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) ছিলাম।’[১] [১] এখানে ঐ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যা কুরআন কারীমে বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে। আর তা এই যে, যুগে যুগে আল্লাহর প্রেরিত নবীগণ যে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন তা হল ইসলাম। ঐ সব নবীদের প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে 'মুসলিম' বলা হত। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান প্রভৃতি পরিভাষা মানব-রচিত; যা পরবর্তীতে আবিষ্কার হয়েছে। এই হিসাবেই নবী (সাঃ)-এর প্রতি যেসব ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা ঈমান এনেছিল তারা বলেছিল, আমরা তো আগে হতেই মুসলিম ছিলাম। অর্থাৎ, পূর্ববর্তী নবীদের মান্যকারী ও তাঁদের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী (এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী) ছিলাম।

أُولَٰئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ

📘 ওদেরকে দু’বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা ধৈর্যশীল।[১] ওরা ভালোর দ্বারা মন্দকে দূর করে[২] এবং আমি ওদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে। [১] 'ধৈর্যশীলতা' বলতে সর্বাবস্থায় আম্বিয়া ও আল্লাহর কিতাবের উপর ঈমান আনা এবং তার উপর দৃঢ়তার সাথে অবিচলিত থাকা। যারা পূর্ববর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান এনেছেন এবং তারপর পরবর্তী নবী ও তাঁর উপর অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান আনেন, তাঁদের জন্য রয়েছে ডবল পুরস্কার। হাদীসেও তাঁদের এই মর্যাদা বর্ণনা করে নবী (সাঃ) বলেছেন, "তিন শ্রেণীর লোককে দ্বিগুণ সওয়াব দান করা হবে। ওদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হল, সেই ইয়াহুদী বা খ্রিষ্টান; যে নিজ নবীর উপর ঈমান এনেছিল, তারপর আমার উপর ঈমান আনল। (বুখারীঃ শিক্ষা অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) [২] অর্থাৎ, অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণে অন্যায় করে না (ইট খেয়ে পাটকেল ছুঁড়ে না); বরং ক্ষমা করে দেয় ও উপেক্ষা করে চলে।

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ

📘 ওরা যখন অসার বাক্য[১] শ্রবণ করে, তখন ওরা তা পরিহার করে চলে এবং বলে, আমাদের কাজের জন্য আমরা দায়ী এবং তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী; তোমাদের প্রতি সালাম।[২] আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না। [১] এখানে 'অসার বাক্য' বলতে উদ্দেশ্য সেই গাল-মন্দ ও দ্বীনের সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ যা মুশরিকরা করত। [২] এখানে 'সালাম' বলতে অভিবাদন বা সাক্ষাতের সালাম নয়; বরং বিদায় বা সঙ্গ ত্যাগ করার সালাম বুঝানো হয়েছে। যার অর্থ আমরা তোমাদের মত মূর্খদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করার লোক নই। যেমন বলা হয়, 'দুর্জনেরে পরিহারি, দূরে থেকে সালাম করি।' অর্থাৎ তার সঙ্গে কথাবার্তা না বলা, তাকে পরিহার, বর্জন ও উপেক্ষা করা।

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

📘 কাকেও প্রিয় মনে করলে তুমি তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনেন এবং তিনিই ভাল জানেন কারা সৎপথের অনুসারী। [১] [১] এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সাঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। তখন তিনি চেষ্টা করলেন যাতে চাচা একবার নিজ মুখে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাণী উচ্চারণ করুক, যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু সেখানে কুরাইশ নেতাদের উপস্থিতির কারণে আবূ তালেব ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থাকে এবং কুফরের উপরই তার মৃত্যু হয়। নবী (সাঃ) এর জন্য অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। এই সময় মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে স্পষ্ট করে দিলেন যে, তোমার কাজ কেবলমাত্র পৌঁছিয়ে দেওয়া ও আহবান করা। আর হিদায়াত দান করা আমার কাজ। হিদায়াত সেই ব্যক্তিই লাভ করে থাকে, যাকে আমি হিদায়াত দান করি। তুমি যাকে হিদায়াতের উপর দেখতে পছন্দ কর, সে হিদায়াত পায় না। (বুখারীঃ সূরা কাস্বাসের তাফসীর পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়)

وَقَالُوا إِنْ نَتَّبِعِ الْهُدَىٰ مَعَكَ نُتَخَطَّفْ مِنْ أَرْضِنَا ۚ أَوَلَمْ نُمَكِّنْ لَهُمْ حَرَمًا آمِنًا يُجْبَىٰ إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِزْقًا مِنْ لَدُنَّا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

📘 ওরা বলে, ‘আমরা যদি তোমার পথ ধরি, তবে আমাদের দেশ হতে আমাদেরকে উৎখাত করা হবে।’[১] আমি কি ওদেরকে (মক্কায়) এক নিরাপদ হারামে (পবিত্র স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করিনি;[২] যেখানে আহারের জন্য আমার নিকট থেকে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানী হয়?[৩] কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না। [১] অর্থাৎ, আমরা যেখানে বসবাস করছি সেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে দেওয়া হবে না এবং আমাদেরকে নানা দুঃখ-কষ্ট অথবা বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। এ ছিল কিছু কাফেরদের ঈমান না আনার খোঁড়া ওজর। আল্লাহ তাদের উত্তরে বললেন, "আমি কি---।" [২] অর্থাৎ, তাদের এই ওজর যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ, যে শহরে তারা বাস করে, সে শহরকে আল্লাহ নিরাপত্তা ও শান্তির শহর বানিয়েছেন। যদি এই শহর তাদের কুফরী ও শিরক সত্ত্বেও শান্তির হয়ে থাকে, তাহলে ঈমান আনার পর কি এই শহর শান্তির থাকবে না? [৩] এটি মক্কার এমন এক বৈশিষ্ট্য; যা লক্ষ লক্ষ হজ্জ ও উমরাহ আদায়কারীগণ প্রত্যক্ষ করে থাকেন। মক্কায় উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত রকমের ফলমূল ও পৃথিবীর নানান আসবাব-পত্র সেখানে পাওয়া যায়।

وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا ۖ فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِنْ بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِيلًا ۖ وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ

📘 কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা নিজেদের ভোগ-সম্পদের জন্য গর্বিত ছিল। এগুলিই তো ওদের ঘরবাড়ী; ওদের পর এগুলিতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে।[১] আর আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী! [২] [১] এখানে মক্কাবাসীদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে যারা তার কৃতজ্ঞতা করেনি, তাদের পরিণতি কি হয়েছে? আজ-কাল তাদের অধিকাংশ আবাদী ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে বা তাদের নাম শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে। এখন কোন যাত্রী তার যাত্রাপথে সেই সব জায়গায় হয়তো একটু জিরিয়ে নেয়। কিন্তু অশুভ পরিণামের কারণে সেখানে কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায় না। [২] অর্থাৎ, তাদের কেউ বেঁচে ছিল না, যে তাদের ঘর-বাড়ি ও ধন সম্পদের উত্তরাধিকারী হত।

وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَىٰ حَتَّىٰ يَبْعَثَ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا ۚ وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَىٰ إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ

📘 তোমার প্রতিপালক তাঁর বাক্য আবৃত্তি করার জন্য প্রধান জনপদে রসূল প্রেরণ না করে জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না[১] এবং তিনি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করেন যখন এর অধিবাসীরা সীমালংঘন করে। [২] [১] অর্থাৎ, প্রমাণ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে কাউকেও ধ্বংস করি না। أُمِّهَا (প্রধান) শব্দ দ্বারা জানা গেল যে, সমস্ত ছোট-বড় এলাকায় নবী আসেননি; বরং এলাকার প্রধান শহরে নবী আসতেন এবং ছোট ছোট এলাকার জনপদ তার অধীনস্থ হত।[২] নবী পাঠানোর পর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান না আনত এবং কুফরী ও শিরকের উপর অটল থাকত, তাহলে তাদেরকে ধ্বংস করা হত। এ কথা সূরা হূদের ১১:১১৭ নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।

وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُمْ مَا كَانُوا يَحْذَرُونَ

📘 ইচ্ছা করলাম দেশে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে[১] এবং ফিরআউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তাদের নিকট হতে ওরা আশঙ্কা করত। [২] [১] এখানে 'দেশ' বলতে শাম দেশকে বুঝানো হয়েছে; যেখানে তারা কিনআনীদের দেশের উত্তরাধিকারী হল। কারণ, বানী ইস্রাঈলদের মিসর হতে বের হবার পর পুনরায় সেখানে ফিরে যায়নি। والله أعلم [২] অর্থাৎ, তাদের যে আশংকা ছিল যে, একজন ইস্রাঈলীর হাতে ফিরআউন, তার দেশ ও তার সৈন্য-সামন্ত সব ধ্বংস হবে, আমি তাদের সেই আশংকাকে সত্যে পরিণত করলাম।

وَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا ۚ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

📘 তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও সৌন্দর্য এবং যা আল্লাহর নিকট আছে, তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না? [১] [১] অর্থাৎ, তোমাদের এই বাস্তবিকতা কি অজানা যে, এই পৃথিবী ও তার চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী ও তুচ্ছ। আর মহান আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য এমন নিয়ামত ও সুখ-শান্তি রেখেছেন যা চিরস্থায়ী ও উত্তম। হাদীসে এসেছে, "আল্লাহর শপথ! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার মূল্য এমন যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে বের করে নিয়ে দেখুক সমুদ্রের তুলনায় তার আঙ্গুলে কতটা পানি লেগেছে। (মুসলিমঃ জান্নাতের বিবরণ অধ্যায়, দুনিয়া ধ্বংস ও হাশরের বর্ণনা পরিচ্ছেদ)

أَفَمَنْ وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَنْ مَتَّعْنَاهُ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْضَرِينَ

📘 যাকে আমি উত্তম (পুরস্কারের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যা সে লাভ করবে, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগসম্ভার দিয়েছি, যাকে পরে কিয়ামতের দিন (অপরাধীরূপে) উপস্থিত করা হবে?[১] [১] অর্থাৎ, শাস্তি ও আযাবের যোগ্য হবে। ঈমানদার লোক আল্লাহর প্রতিশ্রুতি মত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে এবং অবাধ্য লোক শাস্তি ও আযাবগ্রস্ত হবে। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে?

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ

📘 এবং সেদিন ওদেরকে আহবান করে বলা হবে, ‘তোমরা যাদেরকে আমার শরীক ধারণা করতে, তারা কোথায়?’ [১] [১] অর্থাৎ, মূর্তি বা ব্যক্তি যাদেরকে পৃথিবীতে আমার ইবাদতে শরীক করা হত, যাদেরকে সাহায্যের জন্য আহবান করা হত এবং যাদের নামে নযর-নিয়ায পেশ করা হত, তারা আজ কোথায়? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে এবং আমার আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে? মহান আল্লাহ এ কথাগুলি তাদেরকে তিরস্কার ও ধমক স্বরূপ বলবেন। নচেৎ সেখানে আল্লাহর সামনে লেজ হিলাবার ক্ষমতা কার হবে? এ বিষয়টি সূরা আনআমের ৬:৯৪ নং আয়াত ছাড়াও অন্যান্য আরো আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

قَالَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ رَبَّنَا هَٰؤُلَاءِ الَّذِينَ أَغْوَيْنَا أَغْوَيْنَاهُمْ كَمَا غَوَيْنَا ۖ تَبَرَّأْنَا إِلَيْكَ ۖ مَا كَانُوا إِيَّانَا يَعْبُدُونَ

📘 যাদের জন্য শাস্তি অবধারিত হয়েছে তারা বলবে,[১] ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যাদেরকে আমরা পথভ্রান্ত করেছিলাম --এরা তারা।[২] এদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম যেমন আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম।[৩] এদের জন্য আমরা দায়ী নই।[৪] এরা আমাদের পূজা করত না।’ [৫] [১] অর্থাৎ, যারা আল্লাহর আযাবের যোগ্য বিবেচিত হবে যেমন, বড় বড় অবাধ্য শয়তান এবং কুফরী ও শিরকের দিকে আহবানকারী নেতা প্রভৃতিরা বলবে।[২] এখানে ঐ সকল মূর্খ জনসাধারণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাদেরকে শয়তান এবং কুফরী ও শিরকের দিকে আহবানকারী নেতারা পথভ্রষ্ট করেছিল।[৩] অর্থাৎ, আমরা তো পথভ্রষ্ট ছিলামই; কিন্তু তাদেরকেও নিজেদের সঙ্গে পথভ্রষ্ট করেছিলাম। উদ্দেশ্য এই যে, আমরা তাদের প্রতি কোন প্রকার জোর-জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করিনি; বরং আমাদের সামান্যতম ইশারাতেই তারা আমাদের মতই ভ্রষ্ট পথ অবলম্বন করেছিল।[৪] আমরা তাদের সাথে সম্পর্কহীন ও তাদের থেকে পৃথক। তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। মোটকথা, দুনিয়ায় অনুসারী ও অনুসৃত বা গুরু-শিষ্য কিয়ামতে এক অপরের শত্রু হয়ে যাবে।[৫] বরং বাস্তবে তারা নিজেদের প্রবৃত্তির পূজা ও দাসত্ব করত। অর্থাৎ, আজ পৃথিবীতে যাদের ইবাদত, দাসত্ব ও পূজা হচ্ছে তারা সকলে নিজেদের ইবাদত, দাসত্ব ও পূজার কথা অস্বীকার করবে। এই বিষয়টি কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। যেমনঃ সূরা বাক্বারাহ ২:১৬৬-১৬৭, সূরা আনআম ৬:৪৯, সূরা মারয়্যাম ১৯:৮১-৮২, সূরা আহক্বাফ ৪৬:৫-৬, সূরা আনকাবূত ২৯:২৫ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।

وَقِيلَ ادْعُوا شُرَكَاءَكُمْ فَدَعَوْهُمْ فَلَمْ يَسْتَجِيبُوا لَهُمْ وَرَأَوُا الْعَذَابَ ۚ لَوْ أَنَّهُمْ كَانُوا يَهْتَدُونَ

📘 ওদেরকে বলা হবে, ‘তোমাদের দেবতাগুলিকে আহবান কর।’[১] তখন ওরা ওদেরকে আহবান করবে; কিন্তু ওরা ওদের আহবানে সাড়া দেবে না। ওরা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।[২] হায়, ওরা যদি সৎপথ অনুসরণ করত (তাহলে তা প্রত্যক্ষ করত না)। [৩] [১] অর্থাৎ, তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর, যেমন পৃথিবীতে করতে। দেখ, তারা তোমাদেরকে কোন প্রকার সাহায্য করে কি না? অতঃপর তারা তাদেরকে আহবান করবে; কিন্তু সেখানে কার সাহস হবে যে, সে বলবে, আমি তোমার সাহায্য করব।[২] অর্থাৎ, নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করে নেবে যে, আমরা সকলে জাহান্নামের জ্বালানী হব।[৩] অর্থাৎ,আযাব দেখে নেওয়ার পর তারা আশা করবে, হায়! যদি পৃথিবীতে হিদায়াতের পথ ধরতাম, তাহলে আজ এই পরিণাম হতে বেঁচে যেতাম। সূরা কাহফের ১৮:৫২-৫৩ নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ

📘 সেদিন আল্লাহ ওদেরকে ডেকে বলবেন, ‘তোমরা রসূলগণকে কি জবাব দিয়েছিলে?’ [১] [১] পূর্বের আয়াতসমূহে তাওহীদ সম্বন্ধে প্রশ্ন ছিল। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন রিসালাত সম্পর্কে করা হবে। অর্থাৎ, আমি তোমাদের নিকট রসূল পাঠিয়েছিলাম, তোমরা তাঁদের সাথে কিরূপ আচরণ প্রদর্শন করেছ? তোমরা তাঁদের আহবানে সাড়া দিয়েছিলে কি না? যেমন কবরে প্রশ্ন করা হবে, তোমার নবী কে? তোমার ধর্ম কি? সুতরাং মু'মিন হলে সঠিক উত্তর দেবে। কিন্তু কাফের বলবে 'হাহ হাহ লা আদরী' হায় আফসোস! আমি তো কিছুই জানি না। অনুরূপ কিয়ামত দিবসেও উক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। সেই জন্য পরবর্তীতে বলা হয়েছে, "সেদিন তাদের সকল খবর বিলুপ্ত হয়ে যাবে।" অর্থাৎ, কোন প্রকার দলীল-প্রমাণ বুঝে আসবে না, যা তারা পেশ করতে পারে। এখানে দলীলকে 'খবর' বলে ব্যক্ত করে এই কথার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাদের বাতিল বিশ্বাসের স্বপক্ষে তাদের নিকট কোন দলীলই নেই। বরং তাদের নিকট আছে গল্প ও কাহিনী; যেমন আজ-কাল কবর পূজারীদের কাছেও কারামতির বানানো গল্পগুচ্ছ ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

فَعَمِيَتْ عَلَيْهِمُ الْأَنْبَاءُ يَوْمَئِذٍ فَهُمْ لَا يَتَسَاءَلُونَ

📘 সেদিন তাদের সকল খবর বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। [১] [১] কেননা, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, তারা সকলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

فَأَمَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَىٰ أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ

📘 তবে যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে অবশ্যই সফলকাম হবে।

وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ ۗ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ

📘 তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন এখতিয়ার নেই।[১] আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং ওরা যাকে অংশী করে তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে। [১] অর্থাৎ, সমস্ত এখতিয়ার আল্লাহ তাআলার হাতে। তাঁর এখতিয়ারের প্রতিকূলে কারো কোন এখতিয়ারই নেই; সকল এখতিয়ারের মালিক হওয়া তো বহু দূরের কথা।

وَرَبُّكَ يَعْلَمُ مَا تُكِنُّ صُدُورُهُمْ وَمَا يُعْلِنُونَ

📘 ওদের অন্তর যা গোপন করে এবং ওরা যা ব্যক্ত করে, তোমার প্রতিপালক তা জানেন।

وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ ۖ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي ۖ إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ

📘 মূসার জননীর কাছে অহী পাঠালাম,[১] শিশুটিকে স্তন্যদান কর। যখন তুমি এর সম্পর্কে কোন আশংকা করবে, তখন একে (নীল) দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না।[২] নিশ্চয় আমি একে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেব[৩] এবং একে একজন রসূল করব। [১] এখানে 'অহী' বলতে অন্তরে কোন কথার উদ্রেক করা, অন্তরে ইঙ্গিতে নির্দেশ দেওয়া বা প্রক্ষিপ্ত করা। 'অহী' বলতে সেই অহী বুঝানো হয়নি, যা জিবরীল ফিরিশতা দ্বারা নবী-রসূলদের নিকট অবতীর্ণ হয়। আর যদি ফিরিশতা দ্বারা উক্ত অহী এসেও থাকে তবুও একটি অহী দ্বারা মূসা (আঃ)-এর মায়ের নবী হওয়ার কথা সাব্যস্ত হয় না। কারণ, কখনো কখনো ফিরিশতাদের আগমন সাধারণ মানুষের কাছেও ঘটে থাকে। যেমন, হাদীসে টাক-ওয়ালা, অন্ধ ও কুষ্ঠরোগীর নিকট ফিরিশতাদের আগমন ও কথাবার্তা প্রমাণিত। (বুখারী, মুসলিম) [২] অর্থাৎ, নদীতে ডুবে অথবা মরে যাওয়ার ভয় করবে না। আর তার বিরহে দুঃখও করবে না। [৩] অর্থাৎ, এমনভাবে যে, তার পরিত্রাণ সুনিশ্চিত। কথিত আছে যে, সন্তান হত্যার এই ধারা যখন অনেক লম্বা হয়ে গেল, তখন ফিরআউন জাতির এই আশংকা বোধ হল, যদি এভাবে বানী ইস্রাঈল জাতিই নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমসাধ্য কঠিন কাজগুলি আমাদেরকেই করতে হবে। এই আশংকার কথা তারা ফিরআউনের কাছে ব্যক্ত করলে সে এক নতুন আইন জারী করল যে, এক বছর নবজাত সন্তান হত্যা করা হোক আর এক বছর বাদ দেওয়া হোক। যে বছর সন্তান হত্যা না করার কথা সে বছর হারুন (আঃ)-এর জন্ম হয়। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর জন্ম হয় হত্যার বছরে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর পরিত্রাণের ব্যবস্থা এইভাবে করলেন যে, প্রথমতঃ মূসা (আঃ)-এর মায়ের গর্ভাবস্থার লক্ষণ এমনভাবে প্রকাশ করলেন না, যাতে ফিরআউনের ছেড়ে রাখা ধাত্রীদের চোখে পড়ে। সেই জন্য গর্ভের এই মাসগুলি নিশ্চিন্তে পার হয়ে গেল এবং এই ঘটনা সরকারের পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্বশীলদেরও জানা হল না। কিন্তু জন্মের পর তাঁকে হত্যা করার আশংকা বিদ্যমান ছিল। যার সমাধান মহান আল্লাহ নিজেই ইলহামের মাধ্যমে মূসা (আঃ)-এর মাতাকে বুঝিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি তাঁকে একটি কফিনে (কাঠের বাক্সে) পুরে নীল নদে ভাসিয়ে দিলেন। (ইবনে কাসীর)

وَهُوَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُولَىٰ وَالْآخِرَةِ ۖ وَلَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

📘 তিনিই আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, ইহকাল ও পরকালে সকল প্রশংসা তাঁরই এবং বিধান তাঁরই; তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَٰهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِضِيَاءٍ ۖ أَفَلَا تَسْمَعُونَ

📘 বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি রাত্রির অন্ধকারকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া এমন কোন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের দিবালোক দান করতে পারে? তবুও কি তোমরা কর্ণপাত করবে না?’

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَٰهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ ۖ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

📘 বল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি দিনকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া এমন উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাবে; যাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার। তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?’

وَمِنْ رَحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

📘 তিনিই নিজ করুণায় তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন; যাতে রাতে তোমরা বিশ্রাম করতে পার এবং দিনে তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার [১] এবং যাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। [২] [১] দিন-রাত্রি মহান আল্লাহর দু'টি বড় নিয়ামত। রাত্রিকে অন্ধকারময় করছেন, যাতে মানুষ বিশ্রাম নিতে পারে। এই অন্ধকারের ফলে (একই এলাকাভুক্ত প্রায়) সকল জীব ঘুমাতে ও বিশ্রাম নিতে বাধ্য হয়। নচেৎ যদি ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়ার জন্য প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সময় হত, তাহলে কেউই ভালভাবে ঘুমাতে পেত না। অথচ জীবিকার খোঁজে দৌড়াদৌড়ি ও কাজ-কারবারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ঘুম ছাড়া শরীরের শক্তি বহাল থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং যদি কিছু লোক ঘুমাত ও কিছু লোক কাজ-কারবারে ব্যস্ত থাকত, তাহলে ঘুমিয়ে থাকা লোকেদের ঘুম ও আরামে ব্যাঘাত ঘটত। অনুরূপ মানুষ এক অপরের সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হত; অথচ এ সংসারের কর্ম-নীতি এক অপরের সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। সেই জন্য মহান আল্লাহ রাত্রিকে অন্ধকার বানিয়েছেন, যাতে সকল মানুষ একই সময়ে বিশ্রাম নিতে পারে এবং কারো বিশ্রামে বাধা ও ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। অনুরূপ মহান আল্লাহ দিনকে আলোময় করেছেন, যাতে মানুষ দিনের আলোয় নিজেদের কাজ-কারবার সুন্দরভাবে করতে পারে। দিনের আলো না থাকলে মানুষকে যেসব অসুবিধায় পড়তে হত তা প্রত্যেকেরই জানা। মহান আল্লাহ উক্ত সকল নিয়ামতের মাধ্যমে নিজ একত্ববাদ প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বল যদি মহান আল্লাহ দিন-রাত্রির এই ব্যবস্থা শেষ করে দিয়ে তোমাদের উপর শুধু রাত্রির অন্ধকার বহাল করে দেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কোন মাবূদ আছে কি, যে তোমাদের জন্য দিনের আলো এনে দিতে পারে? অথবা যদি তিনি কেবলমাত্র দিনের আলো তোমাদের উপর বহাল করেন, তাহলে কেউ কি তোমাদের জন্য রাতের অন্ধকার এনে দিতে সক্ষম; যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারবে? নিঃসন্দেহে কেউ নেই। এটা তো আল্লাহর পরিপূর্ণ অনুগ্রহ যে, তিনি দিন-রাত্রির এমন এক নিয়ম তৈরী করেছেন যে, রাত্রির আগমনে দিনের আলো শেষ হয়ে যায়, ফলে (নির্দিষ্ট এলাকার) সকল সৃষ্টি বিশ্রাম গ্রহণ করে। আর রাত্রি পোহালে দিনের আলো সারা এলাকাকে উদ্ভাসিত করে, ফলে মানুষ কাজ-কারবারের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকা অনুসন্ধান করে। [২] অর্থাৎ, আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা কর। (এটি মৌখিক কৃতজ্ঞতা।) আর আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ শক্তি-সামর্থ্য ও যোগ্যতা তার আদেশ ও নির্দেশ অনুসারে ব্যয় কর। (এটি হল কর্মগত কৃতজ্ঞতা।)

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ

📘 সেদিন ওদেরকে আহবান করে বলা হবে, ‘তোমরা যাদেরকে আমার অংশী মনে করতে তারা কোথায়?’

وَنَزَعْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ شَهِيدًا فَقُلْنَا هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ فَعَلِمُوا أَنَّ الْحَقَّ لِلَّهِ وَضَلَّ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ

📘 প্রত্যেক জাতি হতে আমি একজন সাক্ষী বের করব [১] এবং বলব, ‘তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর।’[২] তখন ওরা জানতে পারবে (উপাস্য হওয়ার) অধিকার আল্লাহরই [৩] এবং তারা যা উদ্ভাবন করেছিল তা তাদের নিকট হতে উধাও হয়ে যাবে। [৪] [১] এখানে সাক্ষী বলতে নবীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যেক নবীকে তার জাতি হতে আলাদা করে দাঁড় করানো হবে। [২] অর্থাৎ, পৃথিবীতে আমার নবীদের তওহীদের বাণী পৌঁছে দেওয়ার পরও তোমরা আমার শরীক স্থাপন করতে এবং আমার ইবাদতের সাথে তাদেরও ইবাদত করতে। তার প্রমাণ পেশ কর। [৩] অর্থাৎ, তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে, কোন প্রমাণ তারা দিতে পারবে না। [৪] অর্থাৎ, তাদের কোন কাজে আসবে না।

۞ إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَىٰ فَبَغَىٰ عَلَيْهِمْ ۖ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ

📘 কারূন ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি যুলুম করেছিল।[১] আমি তাকে ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল।[২] স্মরণ কর, তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, ‘দম্ভ করো না,[৩] আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পছন্দ করেন না। [৪] [১] তার নিজ সম্প্রদায় বানী ইস্রাঈলের উপর যুলুম এই ছিল যে, সে ধন-সম্পদের আধিক্য-গর্বে তাদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করত। আবার কেউ কেউ বলেন, সে ফিরআউনের পক্ষ থেকে বানী ইস্রাঈলের উপর গভর্নর নিযুক্ত ছিল এবং সে তাদের উপর অত্যাচার করত। [২] تَنُوء এর অর্থ হল تَمِيل (ঝুঁকে পড়া)। যেমন কোন মানুষ যদি কোন ভার বহন করে, তাহলে ভারের কারণে সে এদিক ওদিক ঝুঁকে পড়ে, তেমনি তার চাবির বোঝার ভারও এত বেশি ছিল যে, এক শক্তিশালী দল ঐসব চাবি বহন করতে কষ্ট অনুভব করত। [৩] অর্থাৎ, ধন-সম্পদ নিয়ে ফখর ও গর্ব করো না। আবার কেউ বলেন, কার্পণ্য করো না। [৪] অর্থাৎ, গর্বিত দাম্ভিকদেরকে অথবা কৃপণদেরকে তিনি ভালবাসেন না।

وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ

📘 আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান কর।[১] আর তুমি তোমার ইহলোকের অংশ ভুলে যেয়ো না।[২] তুমি (পরের প্রতি) অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন [৩] এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না।[৪] আল্লাহ অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।’ [১] অর্থাৎ, নিজের মাল এমন জায়গায় খরচ কর, যেখানে খরচ করা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন। [২] অর্থাৎ, পৃথিবীর বৈধ জিনিসেও মধ্যপন্থায় খরচ কর। পৃথিবীর বৈধ জিনিস বলতে কি? খাদ্য, পানি, পোশাক ও বিবাহ ইত্যাদি। এর অর্থ হল, যেমন তোমার উপর তোমার প্রভুর হক রয়েছে, তেমনি তোমার উপর তোমার নিজের, তোমার স্ত্রী-সন্তান এবং মেহমানেরও হক রয়েছে। তুমি তাদের প্রত্যেকের হক আদায় কর। [৩] অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়ে তোমার উপর অনুগ্রহ করেছেন। অতএব তুমি তা অন্যদের জন্য খরচ করে তাদের উপর অনুগ্রহ কর। [৪] অর্থাৎ, তোমার উদ্দেশ্য যেন পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা না হয়। যেমন সৃষ্টির সাথে সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অসৎ ব্যবহার করো না এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়ো না; কারণ, এ সবে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়ে থাকে।

قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَىٰ عِلْمٍ عِنْدِي ۚ أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا ۚ وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ

📘 সে বলল, ‘এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে প্রাপ্ত হয়েছি।’ [১] সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার থেকেও শক্তিতে ছিল প্রবল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশালী?[২] আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাও করা হবে না।[৩] [১] এই সব উপদেশের জবাবে সে এ কথা বলেছিল। যার অর্থ হল, উপার্জন ও ব্যবসার যে দক্ষতা আমার রয়েছে এ সম্পদ তো তারই ফসল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কি? এর দ্বিতীয় অর্থ হল, আল্লাহ আমাকে এই সম্পদ দিয়েছেন, যেহেতু তিনি জানেন যে, আমি এর উপযুক্ত। আর তিনি আমার জন্য এটি পছন্দ করেছেন। যেমন, অন্য এক জায়গায় মহান আল্লাহ মানুষের অন্য একটি কথা উল্লেখ করেছেন, "মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহবান করে; অতঃপর যখন আমি তাকে অনুগ্রহ প্রদান করি তখন সে বলে, 'আমি তো এ আমার জ্ঞানের মাধ্যমে লাভ করেছি।' বস্তুতঃ এ এক পরীক্ষা, কিন্তু ওদের অধিকাংশই জানে না।" (সূরা যুমার ৩৯:৪৯ আয়াত) অর্থাৎ, আমাকে এই অনুগ্রহ এই জন্যই দান করা হয়েছে যেহেতু আল্লাহর জ্ঞানে আমি এর উপযুক্ত ছিলাম। অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, "দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর যখন আমি তাকে অনুগ্রহের আস্বাদ দিই, তখন সে বলেই থাকে, 'এ আমার প্রাপ্য।" (সূরা হা-মী-ম সাজদাহ ৪১:৫০ আয়াত) অর্থাৎ, আমি তো এর উপযুক্ত। কেউ কেউ বলেন, কারূন 'কিমিয়া' (সোনা তৈরী করার বিদ্যা) জানত। (তার কাছে পরশমণি পাথর ছিল।) এখানে এই অর্থ বুঝানো হয়েছে। এই বিদ্যার ফলেই সে এত বিশাল ধনী হয়েছিল। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন, এই বিদ্যার কথা মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি। কারণ, কোন মানুষ কোন জিনিসের আসলত্ব পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। সেই জন্য কারূনের জন্যও এটি সম্ভব ছিল না যে, অন্য ধাতুকে সোনায় পরিণত করবে এবং এভাবে সে ধনরাশি জমা করবে।[২] অর্থাৎ, শক্তি ও ধনের আধিক্য মান-মর্যাদার মাপকাঠি হতে পারে না। যদি তাই হত তাহলে পূর্বের জাতিরা ধ্বংস হত না। সেই জন্য কারূনের নিজ সম্পদের উপর গর্ব-অহংকার করা আর এটিকে সম্মানের কারণ মনে করার কোন কিছুই নেই।[৩] অর্থাৎ, পাপ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং যার কারণে পাপী আযাবের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তখন তাকে পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় না। বরং তাকে পাকড়াও করা হয়।

فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ ۖ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ

📘 কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বের হল। [১] যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল,[২] ‘আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান।’ [১] অর্থাৎ, শোভা-সৌন্দর্য, সাজ-সজ্জা ও চাকর-বাকরসহ। [২] এ কথা কারা বলেছিল? কেউ কেউ বলেন, ঈমানদার লোকেরাই কারূনের আধিপত্য ও ধন-সম্পদে প্রভাবিত হয়ে এ কথা বলেছিল। আবার কেউ বলেন, এ কথা বলেছিল কাফেররা।

فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنًا ۗ إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ

📘 অতঃপর ফিরআউনের লোকজন মূসাকে উঠিয়ে নিল।[১] পরিণামে সে ওদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হল।[২] নিশ্চয় ফিরআউন, হামান ও ওদের বাহিনী ছিল অপরাধী। [৩] [১] সেই ব্যাক্তি ভাসতে ভাসতে ফিরআউনের প্রাসাদের নিকট পৌঁছল যা ছিল নদীর উপকূলে। ফিরআউনের কর্মচারীরা সেটি নদী থেকে তুলে নিয়ে এল। [২] لِيَكُونَ এর লামটি পরিণামবাচক। অর্থাৎ, সে তো তাঁকে নিজ সন্তান ও চক্ষুশীতলতা স্বরূপ গ্রহণ করেছিল; শত্রু মনে করে নয়। কিন্তু তার এই কাজের পরিণাম এই হল যে, সে তার শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াল। [৩] এখানে পূর্বোক্ত কথার কারণ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, মূসা (আঃ) তার শত্রু কেন প্রমাণিত হলেন? কারণ তারা ছিল সকলেই আল্লাহর অবাধ্য ও অপরাধী। আল্লাহ তাআলা শাস্তিস্বরূপ তাদের নিকট পালিত ব্যক্তিকেই তাদের ধ্বংসের কারণ বানালেন।

وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ

📘 আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ‘ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ।[১] আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।’[২] [১] অর্থাৎ, যাদের নিকট ধর্মীয় জ্ঞান ছিল এবং পৃথিবীর বাহ্যিক চাকচিক্য ও তার আসল স্বরূপ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল, তারা বলল, এটা কি? এটা তো কিছুই না। আল্লাহ ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের জন্য যে প্রতিদান ও পুণ্য রেখেছেন তা এর তুলনায় অনেকগুণ শ্রেয়। যেমন হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, "আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি এবং কারো কল্পনাতেও তা আসেনি।" (বুখারীঃ তাওহীদ অধ্যায়, মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়) [২] يَلَقَّاهَا এর هَا (তা) সর্বনাম দ্বারা পূর্বের বাক্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর এটি আল্লাহর উক্তি। অন্যথা যদি এটিকে জ্ঞানীদের কথার শেষাংশ ধরে নেওয়া যায়, তাহলে 'তা' বলতে জান্নাত বুঝানো হবে। অর্থাৎ, জান্নাতের অধিকারী ঐ সকল ধৈর্যশীলরাই হবে, যারা পৃথিবীর ভোগ-বিলাস হতে দূরে থেকে কেবলমাত্র আখেরাতের জীবনের প্রতি আগ্রহী থাকে।

فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِينَ

📘 অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটিতে ধসিয়ে দিলাম।[১] তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না। [১] অর্থাৎ, কারূনকে তার অহংকারের ফলে প্রাসাদ ও সম্পদসহ ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলাম। হাদীসে আছে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "এক ব্যক্তি তার লুঙ্গি মাটিতে ছেঁচড়ে চলছিল। (আল্লাহর নিকট তার এই অহংকার ঘৃণিত ছিল।) ফলে তিনি তাকে ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলেন; সে কিয়ামত পর্যন্ত মাটিতে ধসতেই থাকবে।" (বুখারী পোষাক অধ্যায়)

وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ ۖ لَوْلَا أَنْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا ۖ وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

📘 পূর্বদিন যারা তার (মত) মর্যাদা কামনা করেছিল তারা বলতে লাগল,[১] ‘দেখ, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রুযী বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরকেও তিনি মাটিতে ধসিয়ে দিতেন।[২] দেখ, অকৃতজ্ঞরা সফলকাম হয় না।’ [৩] [১] مَكَان বলতে পার্থিব সম্মান ও মান-মর্যাদা, যা কোন ব্যক্তিকে পৃথিবীতে সাময়িকভাবে দেওয়া হয়ে থাকে; যেমন কারূনকে দেওয়া হয়েছিল। أَمْس গতকালকে বলা হয়। কিন্তু এখানে নিকটবর্তী সময় বুঝানো হয়েছে। وَيكَأَنَّ আসলে وَيلَكَ اعلَمُ أَنَّ ছিল। অর্থাৎ, আফসোস বা আশ্চর্য! তোমার জানা উচিত ছিল। কেউ কেউ বলেন, এটি أَلَم تَرَ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। (ইবনে কাসীর) এর পূরো অর্থ হল কারূনের মত ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার অভিলাষী ব্যক্তিরা যখন কারূনের শিক্ষণীয় করুণ পরিণতি দেখল, তখন তারা বলল, ধন-দৌলত এই কথার প্রমাণ নয় যে, ধনবান ব্যক্তির উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট। তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ কাউকে মাল বেশি দেন, আবার কাউকেও কম। এর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার ও হিকমতের সাথে যা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। মালের আধিক্য তাঁর সন্তুষ্টির ও মাল না থাকা তাঁর অসন্তুষ্টির প্রমাণ বহন করে না। যেমন এসব মান-ইজ্জতের মাপকাঠিও নয়। [২] অর্থাৎ, আমাদের পরিণাম ঐরূপ হত, যেরূপ কারূনের হয়েছিল। [৩] অর্থাৎ, কারূন সম্পদ পেয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞ না হয়ে অকৃতজ্ঞতা ও পাপের পথ অবলম্বন করল। সুতরাং দেখ তার পরিণাম কি হল?

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

📘 এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। [১] [১] عُلُوّ এর অর্থ যুলুম ও ঔদ্ধত্য করা, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, গর্ব ও অহংকার করা। আর فَسَاد এর অর্থঃ অন্যায়ভাবে অন্যের মাল নিয়ে নেওয়া, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। এই দু'টি কারণে পৃথিবীতে ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আর যারা পরহেযগার ও সাবধানী তাদের কর্ম ও চরিত্র উক্ত সকল পাপ হতে পবিত্র থাকে। তাদের চরিত্র অহংকারের পরিবর্তে বিনয় ও পাপাচারের বদলে আল্লাহর আনুগত্যে পরিপূর্ণ থাকে। আর আখেরাতের ঘরঃ অর্থাৎ, জান্নাত ও শুভ পরিণাম তাদেরই ভাগ্যে জুটবে।

مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِنْهَا ۖ وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى الَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

📘 যে কেউ সৎকাজ করে, সে তার কর্ম অপেক্ষা অধিক ফল পাবে [১] আর যে মন্দ কাজ করে, সে তো কেবল তার কর্মের অনুপাতে শাস্তি পাবে। [২] [১] প্রত্যেক নেকীর বদলা কম পক্ষে দশগুণ পাওয়া যাবে। আর আল্লাহ যার জন্য চাইবেন, তাকে এর চেয়ে অনেক অনেকগুণ বেশি দান করবেন। [২] পুণ্যের বদলা বেশি দেওয়া হবে, কিন্তু পাপের বদলা পাপের সমানই দেওয়া হবে। অর্থাৎ, পুণ্যের প্রতিদানে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপা এবং পাপের প্রতিফল দানে তাঁর ন্যায় বিচারের প্রকাশ ঘটবে।

إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لَرَادُّكَ إِلَىٰ مَعَادٍ ۚ قُلْ رَبِّي أَعْلَمُ مَنْ جَاءَ بِالْهُدَىٰ وَمَنْ هُوَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

📘 যিনি তোমার জন্য কুরআন (অবতীর্ণ) অপরিহার্য করেছেন[১] তিনি তোমাকে অবশ্যই স্বদেশে ফিরিয়ে আনবেন।[২] বল, ‘আমার প্রতিপালক ভাল জানেন কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।’ [৩] [১] অথবা তার তিলাঅত ও প্রচার তোমার উপর আবশ্যিক করেছেন। [২] অর্থাৎ, তোমার জন্মস্থান মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন, যেখান হতে তুমি বের হতে বাধ্য হয়েছিলে। সহীহ বুখারীতে ইবনে আববাস (রাঃ) হতে এই ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং হিজরতের আট বছর পর আল্লাহর উক্ত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছিল। তিনি অষ্টম হিজরীতে বিজয়ীর বেশে মক্কায় দ্বিতীয়বার প্রবেশ করেন। কেউ কেউ مَعَاد এর অর্থ কিয়ামত নিয়েছেন। অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তিনি তাঁর নিকটে তোমাকে ফিরিয়ে আনবেন এবং রিসালাত ও কুরআন প্রচারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। [৩] মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে পূর্ব-পুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করার জন্য পথভ্রষ্ট মনে করত। তারই উত্তর এই বাক্যে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমার প্রভু খুব ভাল জানেন যে, পথভ্রষ্ট আমি, যে আল্লাহর নিকট হতে সুপথ নিয়ে এসেছে, নাকি তোমরা, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সুপথ গ্রহণ কর না।

وَمَا كُنْتَ تَرْجُو أَنْ يُلْقَىٰ إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ ۖ فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِلْكَافِرِينَ

📘 তুমি আশা করনি যে, তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হবে।[১] এ তো কেবল তোমার প্রতিপালকের করুণা।[২] সুতরাং তুমি কখনও অবিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষক হয়ো না। [৩] [১] অর্থাৎ, নবুঅত প্রাপ্তির আগে তোমার ধারণাও ছিল না যে, তোমাকে রিসালাতের জন্য নির্বাচিত করা হবে এবং তোমার উপর আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হবে। [২] অর্থাৎ, নবুঅত ও কিতাব দান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফল যা তোমার উপর করা হয়েছে। এখান হতে জানা গেল যে, নবুঅত কোন উপার্জন-লভ্য জিনিস নয়, যা চেষ্টা-চরিত্র ও শ্রম ব্যয়ের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। বরং এটি সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত জিনিস, আল্লাহ তাআলা নিজের বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চেয়েছেন তাকে নবুঅত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন। পরিশেষে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে উক্ত ধারার শেষ নবী ঘোষণা করে নবুয়তের দ্বার চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন। [৩] এখন এই নিয়ামত ও ইলাহী অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা এইভাবে আদায় কর যে, কাফেরদের সাহায্য করবে না এবং তাদের পক্ষ অবলম্বন করবে না।

وَلَا يَصُدُّنَّكَ عَنْ آيَاتِ اللَّهِ بَعْدَ إِذْ أُنْزِلَتْ إِلَيْكَ ۖ وَادْعُ إِلَىٰ رَبِّكَ ۖ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

📘 তোমার প্রতি আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ করার পর ওরা যেন তোমাকে কিছুতেই সেগুলি হতে বিমুখ না করে ফেলে।[১] তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে আহবান কর এবং কিছুতেই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। [১] অর্থাৎ, কাফেরদের কথা-বার্তা, তাদের অত্যাচার উৎপীড়ন, দাওয়াত ও তবলীগের রাস্তায় তাদের বাধা দান যেন তোমাকে কুরআন পাঠ ও তার বাণী প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি না করে। বরং তুমি পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে যাও।

وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

📘 তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডেকো না,[১] তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাঁর মুখমন্ডল[২] ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই [৩] এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [৪] [১] অর্থাৎ, অন্য কারো ইবাদত করো না। না দু'আর মাধ্যমে, না নযর-মানতের মাধ্যমে আর না কুরবানীর মাধ্যমে। কারণ, এগুলি ইবাদত বলে গণ্য, যা কেবলমাত্র এক আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করাকে কুরআনের ভাষায় 'আহবান করা' বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হল এ কথা স্পষ্ট করা যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যকে --যা করার তার ক্ষমতা নেই তার জন্য-- ডাকা, সাহায্য প্রার্থনা করা, তার নিকট দু'আ করা, বিনয়-নম্র হওয়া --এ সব করাই হল তার ইবাদত করা। যার কারণে মানুষ মুশরিকে পরিণত হয়।[২] وَجهَه (তাঁর মুখমন্ডল) বলতে স্বয়ং আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেক বস্তুই নশ্বর।{كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ} অর্থাৎ, ভূ-পৃষ্ঠে যা কিছু আছে সমস্তই নশ্বর। অবিনশ্বর শুধু তোমার মহিমময়, মহানুভব প্রতিপালকের মুখমন্ডল (সত্তা)। (সূরা রাহমান ৫৫:২৬-২৭ আয়াত) [৩] অর্থাৎ, তিনি যা চান সেই ফায়সালাই মান্য হয় এবং তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর আদেশ বলবৎ হয়।[৪] যাতে তিনি সৎকর্মশীলদের সৎকর্মের ও অসৎ কর্মশীলদের অসৎ কর্মের প্রতিদান দেন।

وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ ۖ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَىٰ أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

📘 ফিরআউনের স্ত্রী বলল, ‘এ শিশু আমার এবং তোমার নয়ন-প্রীতিকর। তোমরা একে হত্যা করো না।[১] সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করব।’[২] প্রকৃতপক্ষে ওরা এর পরিণাম বুঝতে পারেনি। [৩] [১] এ কথাটি তখন বলেছিল, যখন কাঠের বাক্সের ভিতর সুন্দর শিশু (মূসা)-কে দেখেছিল। আবার কারো নিকট এটি ঐ সময়ের কথা, যখন মূসা (আঃ) (শৈশবে) ফিরআউনের দাড়ি ধরে টান দিয়েছিলেন। ফলে ফিরআউন তাঁকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল। (আইসারুত তাফাসীর) "তোমরা একে হত্যা করো না" বহুবচন শব্দ ফিরআউন একা হলেও তার সম্মানার্থে ব্যবহার হয়েছে অথবা সেখানে কিছু তার পরিষদের লোকও থেকে থাকতে পারে, যার জন্য বহুবচন ব্যবহূত হয়েছে। [২] কারণ ফিরআউন সন্তান হতে বঞ্চিত ছিল। [৩] যে, এ সেই শিশু যাকে আজ সে নিজ সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেছে। যাকে মারার জন্য হাজার হাজার শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।