🕋 تفسير سورة غافر
(Ghafir) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ حم
📘 হা, মীম।
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنَادَوْنَ لَمَقْتُ اللَّهِ أَكْبَرُ مِنْ مَقْتِكُمْ أَنْفُسَكُمْ إِذْ تُدْعَوْنَ إِلَى الْإِيمَانِ فَتَكْفُرُونَ
📘 অবিশ্বাসীদেরকে উচ্চকণ্ঠে বলা হবে, ‘তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের ক্ষোভ অপেক্ষা আল্লাহর ক্ষোভ ছিল অধিক; যখন তোমাদেরকে বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছিল এবং তোমরা তা অস্বীকার করেছিলে।’ [১]
[১] مَقْتٌ চরম অসন্তুষ্টিকে বলা হয়। কাফেররা যখন নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে দেখবে, তখন তারা নিজেদের উপর চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষোভিত হবে। তখন তাদেরকে বলা হবে যে, দুনিয়াতে যখন তোমাদেরকে ঈমানের প্রতি দাওয়াত দেওয়া হত এবং তোমরা তা অস্বীকার করতে, তখন মহান আল্লাহ এর থেকেও অনেক বেশী তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট হতেন, যেমন আজ তোমরা নিজেদের উপর হচ্ছ। আর তোমাদের আজ জাহান্নামে যাওয়াও আল্লাহর সেই অসন্তুষ্টির ফল।
قَالُوا رَبَّنَا أَمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَىٰ خُرُوجٍ مِنْ سَبِيلٍ
📘 ওরা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের দু’বার মৃত্যু দিয়েছ এবং দু’বার আমাদেরকে জীবিত করেছ।[১] আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করলাম।[২] এখন নিষ্কৃতির কোন পথ মিলবে কি?’ [৩]
[১] অধিকাংশ মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথম মৃত্যু হল সেই বীর্য, যা পিতার পৃষ্ঠদেশে থাকে। অর্থাৎ, অস্তিত্বের পূর্বে তার অস্তিত্বহীনতাকে মৃত্যু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় মৃত্যু হল ঐ মৃত্যু, যা মানুষ তার জীবন অতিবাহিত করার পর বরণ করে এবং যার পর সে কবরে দাফন হয়। আর দু'টি জীবন বলতে, একটি হল এই পার্থিব জীবন, যার আরম্ভ হয় জন্ম থেকে এবং শেষ হয় মৃত্যুর উপর। আর দ্বিতীয় জীবন হল, সেই জীবন, যা কিয়ামতের দিন কবর থেকে ওঠার পর লাভ করবে। এই দু'টি মৃত্যু ও দু'টি জীবনের উল্লেখ সূরা বাক্বারার ২:২৮ ﴿ وَكُنْتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ﴾ আয়াতেও করা হয়েছে।[২] অর্থাৎ, জাহান্নামে স্বীকার করবে, যেখানে স্বীকার করার কোন ফল হবে না এবং সেখানে অনুতপ্ত হবে, যেখানে অনুতপ্ত হওয়ার কোনই মূল্য থাকবে না।[৩] এটা তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা, যা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হল এই আশা যে, আমাদেরকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠানো হোক, যাতে আমরা বহু নেকী অর্জন করে নিয়ে আসি।
ذَٰلِكُمْ بِأَنَّهُ إِذَا دُعِيَ اللَّهُ وَحْدَهُ كَفَرْتُمْ ۖ وَإِنْ يُشْرَكْ بِهِ تُؤْمِنُوا ۚ فَالْحُكْمُ لِلَّهِ الْعَلِيِّ الْكَبِيرِ
📘 ওদেরকে বলা হবে, ‘তোমাদের এ শাস্তি তো এ জন্যে যে, যখন এককভাবে আল্লাহকে আহবান করা হত, তখন তোমরা (তাঁকে) অস্বীকার করতে। আর তাঁর শরীক স্থির করা হলে তোমরা বিশ্বাস করতে।[১] সুতরাং সুউচ্চ, মহান আল্লাহরই সমস্ত কর্তৃত্ব।’[২]
[১] এখানে তাদের জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি না পাওয়ার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমরা দুনিয়াতে আল্লাহর তাওহীদের অস্বীকারকারী ছিলে এবং শিরক ছিল তোমাদের বাঞ্ছনীয় জিনিস। কাজেই এখন জাহান্নামের চিরন্তন শাস্তি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কিছুই নেই।
[২] সেই এক আল্লাহরই নির্দেশ যে, এখন তোমাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আযাব এবং তা থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই।
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمْ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ رِزْقًا ۚ وَمَا يَتَذَكَّرُ إِلَّا مَنْ يُنِيبُ
📘 তিনিই তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখান এবং আকাশ হতে তোমাদের জন্য রুযী প্রেরণ করেন;[১] আর (আল্লাহর) [২] অভিমুখী ব্যক্তিই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।
[১] অর্থাৎ, পানি; যা তোমাদের রুযীর উপকরণ। এখানে মহান আল্লাহ একত্রে নিদর্শনাবলীর প্রকাশ ও রুযী অবতরণের কথা পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। কেননা, মহাশক্তির নিদর্শনাবলীর প্রকাশে রয়েছে দ্বীনের বুনিয়াদ এবং রুযী হল দেহের বুনিয়াদ। এইভাবে এখানে উভয় বুনিয়াদকেই একত্রিত করে দেওয়া হয়েছে।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
[২] আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি অভিমুখী, যার দ্বারা তাদের অন্তরে আখেরাতের ভয় সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর বিধি-বিধান ও তাঁর ফরয কার্যাদি পালনে যত্নবান হয়।
فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
📘 সুতরাং আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁকে ডাক, যদিও অবিশ্বাসীগণ এ অপছন্দ করে।[১]
[১] অর্থাৎ, যখন সবকিছু এক আল্লাহই করেন, তখন কাফেরদের নিকট যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন, কেবলমাত্র সেই এক আল্লাহকেই ডাক তাঁর জন্য ইবাদত ও আনুগত্যকে নিষ্ঠাপূর্ণ করে।
رَفِيعُ الدَّرَجَاتِ ذُو الْعَرْشِ يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَىٰ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ
📘 তিনি সুউচ্চ মর্যাদাসমূহের অধিকারী, আরশের অধিপতি, তিনি তাঁর দাসদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় আদেশসহ অহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করেন,[১] যাতে সে সাক্ষাতের দিন (কিয়ামত) সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে।
[১] رُوْحٌ থেকে 'অহী' বুঝানো হয়েছে; যা বান্দার মধ্য থেকে কাউকে রিসালাতের জন্য নির্বাচন করে মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করেন। অহীকে 'রূহ' বলে এই জন্য আখ্যায়িত করেছেন যে, যেভাবে মানব জীবনের বিদ্যমানতা ও সুস্থতার মূল রহস্য এই রূহের মধ্যে নিহিত, অনুরূপ অহীর মাধ্যমে মানুষের অন্তঃকরণে জীবন-প্রবাহ সৃষ্টি হয়; যা কুফরী ও শিরকের কারণে মৃত হয়ে থাকে।
يَوْمَ هُمْ بَارِزُونَ ۖ لَا يَخْفَىٰ عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ ۚ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ۖ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
📘 যেদিন মানুষ বের হয়ে পড়বে[১] সেদিন আল্লাহর নিকট ওদের কিছুই গোপন থাকবে না। (বলা হবে,) আজ কর্তৃত্ব কার?[২] এক, পরাক্রমশালী আল্লাহরই। [৩]
[১] অর্থাৎ, জীবিত হয়ে কবরসমূহ থেকে বের হয়ে দন্ডায়মান হবে।
[২] এ কথা কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, যখন সমস্ত মানুষ হাশরের ময়দানে তাঁর সামনে একত্রিত হবে। "আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে তাঁর মুষ্ঠির মধ্যে এবং আকাশমন্ডলীকে তাঁর ডান হাতে গুটিয়ে নিয়ে বলবেন, 'আমিই বাদশাহ। পৃথিবীর বাদশাহরা আজ কোথায়?"
(সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা যুমার)
[৩] যখন কেউ কিছুই বলবে না, তখন এই উত্তর আল্লাহ তাআলা নিজেই দেবেন। কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তাআলার নির্দেশে একজন ফিরিশতা ঘোষণা দেবেন এবং তাঁর সাথে সাথে সমস্ত কাফের ও মুসলিম সম্মিলিত কণ্ঠে এই উত্তরই দেবে।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
الْيَوْمَ تُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ ۚ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
📘 আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেওয়া হবে; আজ কারও প্রতি যুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর। [১]
[১] এই জন্য যে, বান্দাদের মত তাঁর চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন নেই।
وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْآزِفَةِ إِذِ الْقُلُوبُ لَدَى الْحَنَاجِرِ كَاظِمِينَ ۚ مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ
📘 ওদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও,[১] যখন দুঃখে-কষ্টে ওদের হৃদয় কণ্ঠাগত হবে।[২] সীমালংঘনকারীদের জন্য অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু নেই এবং এমন কোন সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য করা হবে।
[১] آزِفَةٌ শব্দের অর্থ হল অতি নিকটে (সত্বর) আগমনকারী। এটা কিয়ামতের একটি নাম। কারণ, কিয়ামতেরও অতি নিকটে (সত্বর) আগমন ঘটবে।
[২] অর্থাৎ, সেই দিন ভয়ে অন্তর তার নিজ স্থান থেকে সরে যাবে! كَاظِمِيْنَ দুঃখ-কষ্টে অথবা কাঁদতে কাঁদতে কিংবা নীরব অবস্থায়। এর তিনটি অর্থই করা হয়েছে।
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
📘 চক্ষুর চোরা চাহনি ও অন্তরে যা গোপন আছে, সে সম্বন্ধে তিনি অবহিত। [১]
[১] এতে মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ জ্ঞানের বর্ণনা রয়েছে। তিনি সকল বস্তুরই জ্ঞান রাখেন; তাতে তা ছোট হোক বা বড়, সূক্ষ্ম হোক বা স্থুল, উচ্চ মানের হোক কিংবা তুচ্ছ। এই জন্য যখন আল্লাহর জ্ঞানের ও তাঁর (সবকিছুকে) পরিবেষ্টন করে রাখার অবস্থা হল এই, তখন মানুষের উচিত তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা এবং নিজেদের অন্তরে প্রকৃতার্থে তাঁর ভয় সৃষ্টি করা। চোখের খিয়ানত হল, আড়চোখে দেখা। পথ চলার সময় কোন সুন্দরী মহিলাকে চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখা। সেই কল্পনা ও চিন্তা ইত্যাদিও 'বুকে যা গোপন আছে' তার আওতাভুক্ত, যা মানুষের অন্তরে জন্ম নেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো কল্পনাই থাকে অর্থাৎ, মুহূর্তে আসে আবার চলে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য কোন ধরপাকড় হবে না। কিন্তু যখন তা দৃঢ় পরিকল্পনার আকার ধারণ করবে, তখন তার ধরপাকড় হতে পারে, যদিও মানুষ সে অনুযায়ী আমল করার সুযোগ না-ও পায় (তবুও)।
تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
📘 এ গ্রন্থ পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ[১] আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ হয়েছে--[২]
[১] তিনি পরাক্রমশালীঃ তাঁর শক্তি ও প্রতাপের সামনে কেউ লেজ হিলাতে পারে না। তিনি সর্বজ্ঞঃ তাঁর নিকটে অণুপরিমাণ কোন বস্তুও গুপ্ত নয়; যদিও তা অতি মোটা কোন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
[২] تَنْزِيْلٌ হল مُنَزِّلٌ এর অর্থে। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে মিথ্যার কোন অবকাশ নেই।
وَاللَّهُ يَقْضِي بِالْحَقِّ ۖ وَالَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ لَا يَقْضُونَ بِشَيْءٍ ۗ إِنَّ اللَّهَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
📘 আল্লাহ সঠিকভাবে ফায়সালা করেন, আল্লাহর পরিবর্তে ওরা যাদেরকে আহবান করে, তারা কিছুরই ফায়সালা করে না।[১] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
[১] কারণ, তারা না কোন কিছুর জ্ঞান রাখে, আর না কোন কিছুর উপর ক্ষমতা। তারা বেখবর ও এখতিয়ারহীনও। অথচ ফায়সালার জন্য জ্ঞান ও এখতিয়ার উভয় জিনিসই অত্যাবশ্যক। আর উভয় গুণের একমাত্র অধিকারী হলেন মহান আল্লাহ। ফলে ফায়সালা করার অধিকার কেবল তাঁরই এবং তিনি অবশ্যই ন্যায় বিচার করবেন। কেননা, তিনি না কাউকে ভয় করেন, আর না আছে তাঁর কোন লোভ-লালসা।
۞ أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ كَانُوا مِنْ قَبْلِهِمْ ۚ كَانُوا هُمْ أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَآثَارًا فِي الْأَرْضِ فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ بِذُنُوبِهِمْ وَمَا كَانَ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ وَاقٍ
📘 এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত এদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল। পৃথিবীতে ওরা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে এবং কীর্তিতে অধিকতর প্রবল। অতঃপর আল্লাহ ওদের অপরাধের জন্য ওদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহর শাস্তি হতে ওদেরকে রক্ষাকারী কেউ ছিল না। [১]
[১] পূর্বোক্ত আয়াতসমূহে আখেরাতের অবস্থার বর্ণনা ছিল। এখন দুনিয়ার অবস্থা উল্লেখ করে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, এরা একটু যমীনে ঘুরে-ফিরে সেই জাতিসমূহের পরিণাম দেখুক, যাদেরকে এদের পূর্বে মিথ্যা ভাবার অপরাধে ধ্বংস করা হয়েছে। এরাও সেই পাপেই জড়িত। অথচ পূর্বের জাতিরা শক্তি ও সামর্থ্যে এদের থেকেও অনেক বেশী ছিল। কিন্তু যখন তাদের উপর আল্লাহর আযাব এল, তখন তাদেরকে কেউ বাঁচাতে পারেনি। এইভাবে তোমাদের উপরও আযাব আসতে পারে। আর এ আযাব যদি এসে যায়, তবে (তা থেকে) তোমাদেরকে বাঁচানোর মত কেউ থাকবে না।
ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانَتْ تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَكَفَرُوا فَأَخَذَهُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّهُ قَوِيٌّ شَدِيدُ الْعِقَابِ
📘 এ এজন্য যে, ওদের নিকট ওদের রসূলগণ নিদর্শনাবলী সহ আসার পর ওরা (তাদেরকে) প্রত্যাখ্যান করেছিল।[১] ফলে আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দিলেন। নিশ্চয়ই তিনি শক্তিশালী, কঠোর শাস্তিদাতা।
[১] এখানে তাদের ধ্বংসের কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে। আর তা হল, আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা এবং নবীদেরকে মিথ্যা ভাবা। এখন তো নবুঅত ও রিসালাতের ধারা বন্ধ, তথাপি বিশ্বজাহানে ও মানুষের মাঝে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনাবলী (চতুর্দিকে) বিস্তৃত রয়েছে। এ ছাড়াও ওয়ায-নসীহত এবং দাওয়াত ও তবলীগের মাধ্যমে উলামা ও সত্যের প্রতি আহবানকারীগণ তার বিশ্লেষণ ও দিক নির্দেশনার জন্য বিদ্যমান রয়েছেন। কাজেই আজও যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী থেকে বিমুখ হবে এবং দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করবে, তাদের পরিণামও রিসালাতের অস্বীকারকারী ও তা মিথ্যাজ্ঞানকারীদের থেকে ভিন্ন হবে না।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَىٰ بِآيَاتِنَا وَسُلْطَانٍ مُبِينٍ
📘 আমি আমার নিদর্শনাবলী ও স্পষ্ট প্রমাণ সহ মূসাকে প্রেরণ করেছিলাম,[১]
[১] آيات (নিদর্শনাবলী) বলতে সেই নিদর্শনগুলোও হতে পারে, যার উল্লেখ পূর্বে করা হয়েছে। অথবা লাঠি ও হাতের শুভ্রতা, যা ছিল বৃহত্তম দু'টি স্পষ্ট মু'জিযা। سُلْطَانٌ مُّبِيْنٍ (স্পষ্ট প্রমাণ) অর্থ হল, এমন বলিষ্ঠ দলীল ও অকাট্য হুজ্জত, যা কেবল ঔদ্ধত্য, জিদ ও নির্লজ্জতার বশবর্তী হয়ে ছাড়া যার কোন উত্তর দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
إِلَىٰ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَقَارُونَ فَقَالُوا سَاحِرٌ كَذَّابٌ
📘 ফিরআউন, হামান ও কারূনের নিকট। কিন্তু ওরা বলেছিল, ‘এ তো এক ভন্ড যাদুকর।’[১]
[১] ফিরআউন মিসরে বসবাসকারী ক্বিবতীদের বাদশাহ ছিল। বড় অত্যাচারী ও যালেম এবং সর্বোচ্চ রব হওয়ার দাবীদার ছিল। সে মূসা (আঃ)-এর সম্প্রদায় বানী-ইস্রাঈলকে দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং তাদের উপর নানানভাবে কঠোর নির্যাতন চালাত। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এর বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। হামান ছিল ফিরআউনের মন্ত্রী ও তার প্রধান উপদেষ্টা। কারূন তার যুগের বিরাট বিত্তশালী ব্যক্তি ছিল। এরা সকলেই পূর্বের লোকদের মত মূসা (আঃ)-কে মিথ্যাজ্ঞান করল এবং তাঁকে যাদুকর ও মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করল। যেমন, অন্যত্র বলা হয়েছে, ﴿كَذَلِكَ مَا أَتَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُونٌ* أَتَوَاصَوْا بِهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ طَاغُونَ﴾) অর্থাৎ, এমনিভাবে, তাদের পূর্ববর্তীদের কাছে যখনই কোন রসূল আগমন করেছে, তখনই তারা বলেছে, যাদুকর, না হয় উন্মাদ। তারা কি একে অপরকে এই উপদেশই দিয়ে গেছে? বস্তুতঃ ওরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।" (সূরা যারিয়াত ৫১:৫২-৫৩)
فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْحَقِّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا اقْتُلُوا أَبْنَاءَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ وَاسْتَحْيُوا نِسَاءَهُمْ ۚ وَمَا كَيْدُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ
📘 অতঃপর মূসা আমার নিকট হতে সত্য নিয়ে ওদের নিকট উপস্থিত হলে ওরা বলল, ‘মূসার সাথে যারা বিশ্বাস করেছে, তাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা কর এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখ।’[১] কিন্তু অবিশ্বাসীদের ষড়যন্ত্র তো ভ্রষ্টতাপূর্ণই। [২]
[১] ফিরআউন এ কাজ পূর্বেও করেছে, যাতে সেই শিশুর যেন জন্ম না হয়, যে শিশু ছিল জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তার রাজত্বের জন্য আশঙ্কাজনক। এখানে মূসা (আঃ)-এর অবমাননা ও তাঁর লাঞ্ছনার জন্য পুনরায় একই নির্দেশ দিল। অনুরূপ এ জন্যও (এ নির্দেশ দিল) যে, যাতে বানী-ইস্রাঈল মূসা (আঃ)-এর অস্তিত্বকে নিজেদের জন্য মসীবত ও অমঙ্গলের (অশুভ) কারণ মনে করে। যেমন, সত্যিকারেই তারা বলল যে, ﴿قَالُوا أُوذِينَا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَأْتِيَنَا وَمِنْ بَعْدِ مَا جِئْتَنَا﴾ "হে মূসা! তোমার আগমনের পূর্বেও আমরা কষ্টে জর্জরিত ছিলাম এবং তোমার আগমনের পরও আমাদের সেই একই অবস্থা।"
(সূরা আরাফ ৭:১২৯)
[২] অর্থাৎ, এ থেকে তার যে উদ্দেশ্য ছিল যে, বনী-ইস্রাঈলের শক্তি যেন বৃদ্ধি না পায় এবং তার সম্মানে যেন ঘাটতি না আসে, তা কিন্তু সে অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বরং আল্লাহ ফিরআউন ও তার দলবলকে ডুবিয়ে (ধ্বংস করে) দিলেন এবং বানী-ইস্রাঈলকে বরকতময় ভূমির উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিলেন।
وَقَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَىٰ وَلْيَدْعُ رَبَّهُ ۖ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَنْ يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ
📘 ফিরআউন বলল, আমাকে ছাড়ো, আমি মূসাকে হত্যা করি[১] এবং সে তার প্রতিপালকের শরণাপন্ন হোক।[২] আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্মের পরিবর্তন সাধন করবে অথবা সে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। [৩]
[১] এ কথা সম্ভবতঃ ফিরআউন তাদেরকে বলেছিল, যারা মূসা (আঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিল।
[২] এটা ছিল ফিরআউনের বড়ই ধৃষ্টতার প্রকাশ যে, আমি দেখব, তাঁর প্রভু তাঁকে কিভাবে বাঁচায়। তাঁকে আহবান করেই দেখে নিক। অথবা প্রতিপালককেই অস্বীকার করে বলল যে, তার আবার প্রভু কে আছে, যে তাকে বাঁচাবে। যেহেতু ফিরআউন তো নিজেকেই মহান প্রভু ভাবত।
[৩] অর্থাৎ, গায়রুল্লাহর ইবাদত হতে সরিয়ে এনে আল্লাহর ইবাদতে লাগিয়ে দেবে। অথবা তাঁর কারণে ফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যাবে। তার উদ্দেশ্য ছিল, তার দাওয়াত যদি আমার জাতির কিছু লোক গ্রহণ করে নেয়, তাহলে সে তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করবে, যারা তা গ্রহণ করবে না। আর এতে তাদের আপোসে ঝগড়া সৃষ্টি হবে এবং তা ফাসাদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এইভাবে ফেরাঊন তাওহীদের দাওয়াতকে ফাসাদ ও বিপর্যয় এবং তাওহীদবাদীদেরকে ফাসাদী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী গণ্য করল। অথচ প্রকৃতপ্রস্তাবে সে নিজেই ছিল ফাসাদী এবং গায়রুল্লাহর ইবাদতই হল বিপর্যয় ও ফাসাদের মূল উৎস।
وَقَالَ مُوسَىٰ إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ مِنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ
📘 মূসা বলল, ‘যারা বিচার দিনে বিশ্বাস করে না, সে সকল উদ্ধত ব্যক্তি হতে আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের আশ্রয় প্রার্থনা করেছি।’ [১]
[১] মূসা (আঃ)-যখন এ কথা জানতে পারলেন যে, ফিরআউন তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছা রাখে, তখন তিনি আল্লাহর নিকট তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। নবী (সাঃ)-এর মধ্যে যখন শত্রুর ভয় সৃষ্টি হত, তখন তিনি এই দু'আটি পাঠ করতেন, ((اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ )) "হে আল্লাহ! আমরা তোমাকে ওদের মুখোমুখি করছি এবং ওদের অনিষ্টকারিতা থেকে তোমার নিকট পরিত্রাণ চাচ্ছি।"
(আহমাদ ৪/৪১৫)
وَقَالَ رَجُلٌ مُؤْمِنٌ مِنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ رَبِّكُمْ ۖ وَإِنْ يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ ۖ وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ
📘 ফিরআউন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি, যে বিশ্বাসী ছিল এবং নিজ বিশ্বাস গোপন রাখত, সে বলল, তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এ জন্যই হত্যা করবে যে, সে বলে, ‘আমার প্রতিপালক আল্লাহ।’ যদিও সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সুস্পষ্ট বহু প্রমাণসহ তোমাদের নিকট এসেছে?[১] সে মিথ্যাবাদী হলে তার মিথ্যাবাদিতার জন্য সে দায়ী হবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তাহলে সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে, তার কিছু তো তোমাদের ওপর আপতিত হবে।[২] নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।[৩]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর প্রতিপালকত্বের উপর সে এমনিই ঈমান রাখে না, বরং তার নিকট এই মত গ্রহণের সুস্পষ্ট অনেক দলীলও বিদ্যমান।
[২] সে কিছুটা নমনীয়তা অবলম্বন করে বলল যে, যদি তার দলীলাদি তোমাদের মনঃপুত না হয় এবং তার ও তার দাওয়াতের সত্যতা তোমাদের জন্য পরিষ্কার হয়ে না ওঠে, তবুও বিবেক-বুদ্ধি ও পূর্ব-সাবধানতার দাবী এই যে, তার সাথে ঝামেলায় না গিয়ে তাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হোক। অতঃপর সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে মহান আল্লাহ নিজেই তাকে তার মিথ্যার শাস্তি দুনিয়াতে ও আখেরাতে দেবেন। কিন্তু যদি সে সত্যবাদী হয়, আর তোমরা যদি তাকে কষ্ট দাও, তাহলে যেসব আযাব থেকে সে তোমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে, সে আযাবের কোন কিছু তোমাদের উপর অবশ্যই আসতে পারে।
[৩] এর অর্থ হল, যদি সে মিথ্যাবাদী হত (যেমন তোমরা বুঝাতে চেষ্টা করছ), তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে দলীলাদি ও মু'জিযাসমূহ দানে ধন্য করতেন না। অথচ তার কাছে এই জিনিসগুলো বিদ্যমান রয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ হল, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে মহান আল্লাহ নিজেই তাকে লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করে দেবেন। তোমাদেরকে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজনই হবে না।
يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِينَ فِي الْأَرْضِ فَمَنْ يَنْصُرُنَا مِنْ بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءَنَا ۚ قَالَ فِرْعَوْنُ مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَىٰ وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ
📘 হে আমার সম্প্রদায়! আজ রাজত্ব তোমাদেরই, তোমরাই দেশে প্রবল;[১] কিন্তু আমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়লে কে আমাদের সাহায্য করবে?[২] ফিরআউন বলল, ‘আমি যা বুঝি আমি তোমাদেরকে তাই বলছি। আমি তোমাদেরকে কেবল সৎপথই দেখিয়ে থাকি।’ [৩]
[১] অর্থাৎ, এটা হল তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছেন। তাই তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর এবং তাঁর রসূলকে মিথ্যাজ্ঞান করে তাঁর অসন্তুষ্টির শিকার হয়ো না।
[২] এই সৈন্য-সামন্ত তোমাদের কোন উপকারে আসবে না। আল্লাহর আযাব এসে গেলে, তাও তারা দূর করতে পারবে না। এ পর্যন্ত ছিল সেই মু'মিনের কথা, যে তার ঈমানকে গোপন করে রেখেছিল।
[৩] ফিরআউন তার পার্থিব সম্মান ও গৌরবের ভিত্তিতে মিথ্যাবাদিতা অবলম্বন করে বলল, আমি যেটা ভাল মনে করছি, সেটাই তোমাদেরকে বলছি এবং আমি যে পথের কথা বলছি, সেটাই সঠিক পথ। অথচ ব্যাপারটা এ রকম ছিল না।
﴿ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ﴾ (هود:৯৭
غَافِرِ الذَّنْبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ ذِي الطَّوْلِ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
📘 যিনি পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী,[১] কঠোর শাস্তিদাতা,[২] অনুগ্রাহী।[৩] তিনি ব্যতীত (সত্যিকার) কোন উপাস্য নেই। প্রত্যাবর্তন তাঁরই নিকট।
[১] বিগত পাপসমূহ ক্ষমাকারী এবং ভবিষ্যতে হতে পারে এমন ভুল-ত্রুটির জন্য তওবা কবুলকারী। অথবা তাঁর বন্ধুদের জন্য ক্ষমাকারী এবং মুশরিক ও কাফেররা যদি তওবা করে, তবে তাদের জন্য তা কবুলকারী।[২] কঠোর শাস্তিদাতা তাদের জন্য, যারা আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ ও সীমালঙ্ঘনের পথ অবলম্বন করেছে। এটা আল্লাহর এই কথার মতই, ﴿نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ، وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ﴾ "তুমি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু, এবং এটাও যে, আমার শাস্তি কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।"
(সূরা হিজর ১৫:৪৯-৫০)
কুরআন কারীমে বেশীরভাগ স্থানে এই উভয় গুণ পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে মানুষ ভয় ও আশার মধ্যে থাকে। কেননা, শুধু ভয় মানুষকে আল্লাহর রহমত ও তাঁর ক্ষমা লাভ হতে নিরাশ করে দিতে পারে। আর কেবল আশা মানুষকে পাপকাজে উৎসাহিত করতে পারে।[৩] طَوْلٌ এর অর্থ, সচ্ছলতা, ধনবত্তা। অর্থাৎ, তিনিই সচ্ছলতা ও ধনবত্তা দানকারী। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ, পুরস্কার ও অনুগ্রহ। অর্থাৎ, তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে পুরস্কৃত ও তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন।
وَقَالَ الَّذِي آمَنَ يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ
📘 বিশ্বাসী ব্যক্তিটি বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের মত (দুর্দিনের) আশংকা করি।
مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ ۚ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ
📘 যেমন ঘটেছিল নূহ, আদ, সামূদ তাদের পরবর্তীদের ক্ষেত্রে।[১] আর আল্লাহ দাসদের প্রতি কোন যুলুম করতে চান না।[২]
[১] উক্ত মু'মিন ব্যক্তি পুনরায় এ ভয় তার জাতিকে দেখাল যে, যদি আল্লাহর রসূলকে মিথ্যা ভাবার উপর আমরা অটল থাকি, তবে আশঙ্কা আছে যে, বিগত জাতিদের ন্যায় আমরাও আল্লাহর আযাবের কবলে পড়ে যাব।
[২] অর্থাৎ, আল্লাহ যাদেরকেই ধ্বংস করেছেন, তাদেরকে তাদের পাপের ও রসূলদেরকে মিথ্যাজ্ঞান ও তাঁদের বিরোধিতা করার কারণেই করেছেন। নচেৎ তিনি তো দয়াবান ও মেহেরবান প্রভু। তিনি তাঁর বান্দার উপর যুলুম করার আদৌ ইচ্ছা করেন না। অর্থাৎ, (যালেম) জাতিকে ধ্বংস করা তাদের উপর আল্লাহর কোন যুলুম নয়, বরং তা প্রতিশোধ, প্রতিদান ও প্রতিফল দেওয়া-পাওয়া নীতির অনিবার্য এমন ফল, যা থেকে কোন জাতি ও ব্যক্তি স্বতন্ত্র নয়। ফার্সী কবি বলেন, 'প্রতিফল পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ো না; গম বীজ থেকে গম এবং যব বীজ থেকে যবই উৎপন্ন হয়ে থাকে।'
وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ
📘 হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্য ডাকাডাকির দিন (কিয়ামতের) আশংকা করি।[১]
[১] تَنَادِي এর অর্থ, একে অপরকে ডাকা। কিয়ামতকে يَوْمَ التَّنَادِ (ডাকাডাকির দিন) এই জন্য বলা হয়েছে যে, সেদিন একে অপরকে ডাকাডাকি করবে। জান্নাতীরা জাহান্নামীদেরকে এবং জাহান্নামীরা জান্নাতীদেরকে ডাকবে।
(সূরা আরাফ ৭:৪৮-৪৯)
কেউ কেউ বলেছেন, মীযানের পাশে একজন ফিরিশতা থাকবেন। যার নেকীর পাল্লা হাল্কা হয়ে যাবে, এই ফিরিশতা চিৎকার করে তার দুর্ভাগ্যের কথা ঘোষণা করবেন। কেউ কেউ বলেছেন, আমল অনুযায়ী লোকদেরকে ডাকা হবে। যেমন, জান্নাতীদেরকে 'হে জান্নাতবাসী' এবং জাহান্নামীদেরকে 'হে জাহান্নামবাসী' বলে আহবান করা হবে। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, ইমাম বাগবীর এ উক্তিই অতি সুন্দর যে, উক্ত সকল কারণেই কিয়ামতের নাম (يَوْمُ التَّنَاد) (ডাকাডাকির দিন) রাখা হয়েছে।
يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ ۗ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ
📘 যেদিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পলায়ন করতে চাইবে;[১] আল্লাহর (শাস্তি) হতে তোমাদের রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নেই।’[২]
[১] অর্থাৎ, হাশরের ময়দান থেকে জাহান্নামের দিকে যাবে অথবা হিসাবের পর সেখান থেকে পালাতে চাইবে।
[২] যে তাকে হিদায়াতের পথ বলে দিতে পারবে, অর্থাৎ, তার উপর পরিচালিত করতে পারবে।
وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَكُمْ بِهِ ۖ حَتَّىٰ إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولًا ۚ كَذَٰلِكَ يُضِلُّ اللَّهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابٌ
📘 পূর্বেও তোমাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন সহ ইউসুফ এসেছিল;[১] কিন্তু সে যা নিয়ে এসেছিল, তোমরা তাতে সন্দেহ পোষণ করতে।[২] পরিশেষে যখন তার মৃত্যু হল[৩] তখন তোমরা বলেছিলে, তার পরে আল্লাহ আর কাউকেও রসূল করে প্রেরণ করবেন না।[৪] এভাবে আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও সংশয়বাদিগণকে বিভ্রান্ত করেন। [৫]
[১] অর্থাৎ, হে মিশরবাসী! মূসার পূর্বে তোমাদের এই অঞ্চলেই যেখানে তোমরা (বর্তমানে) বসবাস করছ, ইউসুফও বহু দলীল এবং প্রমাণসমূহ নিয়ে এসেছিল। যার মাধ্যমে তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকেও ঈমানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, جَآءَكُمْ বলতে جَآءَ إِلَى آبَائِكُمْ বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, তোমাদের বাপ-দাদাদের কাছে এসেছিল।
[২] কিন্তু তোমরা তার উপরও ঈমান আননি এবং তার দাওয়াতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিলে।
[৩] অর্থাৎ, ইউসূফ (আঃ)-এর মৃত্যু হল।
[৪] অর্থাৎ, যেহেতু তোমাদের অভ্যাসই ছিল প্রত্যেক নবীকে মিথ্যা ভাবা ও তাঁর বিরোধিতা করা, তাই তোমরা মনে করতে যে, তাঁর পরে আর কোন রসূলই আসবেন না। অথবা এর অর্থ হল, রসূলের আসা ও না আসা তোমাদের জন্য সমান। কিংবা অর্থ হল, আর এত বড় মহান ব্যক্তি কোথায় সৃষ্টি হবেন, যিনি রিসালাত লাভে ধন্য হবেন। অর্থাৎ, ইউসূফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানের কথা তারা স্বীকার করেছিল। আর বহু লোকই প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মহান ব্যক্তির মৃত্যুর পর এ রকমই বলে থাকে।
[৫] অর্থাৎ, পরিষ্কার এই বিভ্রান্তির মত, যাতে তোমরা পতিত রয়েছ। মহান আল্লাহ এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করেন, যে অত্যধিক পাপ করে এবং আল্লাহর দ্বীন, তাঁর একত্ব এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি ও শাস্তির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে।
الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ ۖ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا ۚ كَذَٰلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
📘 যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতন্ডায় লিপ্ত হয়[১] --তাদের এ কাজ আল্লাহ এবং বিশ্বাসীদের নিকট অতিশয় অসন্তোষের বিষয়।[২] এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। [৩]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণকৃত কোন দলীল তাদের কাছে নেই। তা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর তাওহীদ এবং তাঁর বিধি-বিধানের ব্যাপারে অন্যায়ভাবে তর্ক করে। যেমন, প্রত্যেক যুগের বাতিলপন্থীদের এটাই হল অভ্যাস।
[২] অর্থাৎ, তাদের এই মন্দ আচরণের কারণে কেবল মহান আল্লাহই অসন্তুষ্ট হন না, বরং মু'মিনরাও তাতে চরম অসন্তুষ্ট হন।
[৩] অর্থাৎ, যেভাবে এই বিতর্ককারীদের অন্তরে মোহর এঁটে দেওয়া হয়েছে, ঐভাবেই এমন সকল ব্যক্তির অন্তরে মোহর এঁটে দেওয়া হয়, যারা আল্লাহর আয়াতের মোকাবেলায় অহংকার ও ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। যার পরে ভাল তাদের নজরে ভাল দেখায় না এবং মন্দও তাদের নজরে মন্দ দেখায় না। বরং অনেক সময় মন্দ তাদের কাছে ভাল এবং ভাল তাদের কাছে মন্দ রূপে পরিগণিত হয়।
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘হে হামান! আমার জন্য তুমি এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর;[১] যাতে আমি অবলম্বন পেতে পারি।
[১] এটা হল ফিরআউনের ঔদ্ধত্য ও তার ধৃষ্টতার বর্ণনা যে, সে তার মন্ত্রী হামানকে বলল, একটি সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ কর, যাতে তার মাধ্যমে সে আসমানের দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। أسباب মানে দরজাসমূহ বা রাস্তাসমূহ। আরো দেখুন, সূরা ক্বাসাসের ২৮:২৮ নং আয়াত।
أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا ۚ وَكَذَٰلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدَّ عَنِ السَّبِيلِ ۚ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابٍ
📘 আকাশে আরোহণের অবলম্বন এবং মূসার উপাস্যকে দেখতে পাই;[১] আর আমি তো ওকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।’[২] এভাবেই ফিরআউনের নিকট তার নিকৃষ্ট কাজকে সুশোভিত করা হয়েছিল[৩] এবং সরল পথ হতে তাকে নিবৃত্ত করা হয়েছিল।[৪] আর ফিরআউনের ষড়যন্ত্র ছিল সর্বনাশী।[৫]
[১] অর্থাৎ, দেখব যে, আকাশে সত্যিকারে কোন উপাস্য আছে কি না?
[২] এ ব্যাপারে যে, আকাশে আল্লাহ আছেন, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও তার পরিচালক। অথবা এ ব্যাপারে (মিথ্যাবাদী) যে, মুসা আল্লাহর প্রেরিত রসূল।
[৩] অর্থাৎ, শয়তান এইভাবে তাকে ভ্রষ্ট করে রেখেছিল এবং তার মন্দ আমল তার কাছে ভাল মনে হত।
[৪] অর্থাৎ, সত্য ও সঠিক পথ থেকে তাকে বিরত রাখা হয় এবং ভ্রষ্টতার গোলকধাঁধায় সে ঘুরপাক খেতে থাকে।
[৫] تَبَابٌ ক্ষতি, ধ্বংস। অর্থাৎ, ফিরআউন যে ষড়যন্ত্রের পথ অবলম্বন করেছিল, তার পরিণাম তার জন্য ক্ষতিকর ও সর্বনাশীই ছিল। সুতরাং পরিশেষে তার সৈন্য-সামন্ত সহ তার সলিল-সমাধি হল।
وَقَالَ الَّذِي آمَنَ يَا قَوْمِ اتَّبِعُونِ أَهْدِكُمْ سَبِيلَ الرَّشَادِ
📘 বিশ্বাসী ব্যক্তিটি বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমার অনুসরণ কর, আমি তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করব।[১]
[১] ফিরআউনের জাতির মধ্য থেকে যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিল সে পুনরায় বলল, ফিরআউন দাবী তো করছে যে, আমি তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করছি। কিন্তু সত্য কথা এই যে, সে পথভ্রষ্ট। আর আমি যে পথের প্রতি তোমাদের দিক নির্দেশনা করছি, সেটাই হল সঠিক পথ এবং তা হল সেই পথ, যার প্রতি মূসা (আঃ) তোমাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছেন।
يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
📘 হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু।[১] আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস।[২]
[১] যে জীবন মাত্র কয়েক দিনের এবং তাও আখেরাতের তুলনায় সকাল অথবা সন্ধ্যার একটি মুহূর্তের সমান।
[২] যার ধ্বংস ও বিনাশ নেই। সেখান থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তর নেই। কেউ জান্নাতে যাক বা জাহান্নামে, উভয়ের জীবন হবে চিরন্তন জীবন। একটি জীবন হবে আরাম ও সুখের এবং অপরটি হবে দুর্দশা, আযাব ও দুঃখের। মৃত্যু না জান্নাতবাসীর আসবে, আর না জাহান্নামবাসীর।
مَا يُجَادِلُ فِي آيَاتِ اللَّهِ إِلَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَا يَغْرُرْكَ تَقَلُّبُهُمْ فِي الْبِلَادِ
📘 কেবল অবিশ্বাসীরাই আল্লাহর নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে বিতর্ক করে,[১] সুতরাং দেশে-দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।[২]
[১] এই বিতর্ক থেকে অবৈধ ও বাতিল বিতর্ক বুঝানো হয়েছে। যে বিতর্কের উদ্দেশ্য হয় সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা এবং তা খন্ডন ও ভুল প্রমাণিত করতে চেষ্টা করা। নচেৎ, যে তর্ক-বিতর্কের উদ্দেশ্য হয় সত্য স্পষ্ট করা, বাতিল খন্ডন করা এবং অস্বীকারকারী ও অভিযোগ উপস্থাপনকারীদের সংশয়-সন্দেহ নিরসন করা, সে বিতর্ক নিন্দিত নয়, বরং তা প্রশংসনীয় ও বাঞ্ছনীয় কর্ম। এমন কি উলামাগণকে এর প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। ﴿لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلا تَكْتُمُونَهُ﴾ "তোমরা তা মানুষের নিকট অবশ্যই বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।"
(সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৭ আয়াত)
আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের দলীলসমূহ ও প্রমাণাদিকে গোপন করা এত বড় অপরাধ যে, তার উপর বিশ্বজাহানের প্রতিটি জিনিস অভিসম্পাত করে।
(সূরা বাক্বারাহ ২:১৫৯ আয়াত)
তাদের সাথে সদ্ভাবে বিতর্ক কর।
(সূরা নাহল ১৬:১২৫ আয়াত)
[২] অর্থাৎ, এই কাফের ও মুশরিকরা যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তার জন্য যে তারা বিভিন্ন শহরে যাতায়াত করে প্রচুর লাভ অর্জন করে, কিন্তু এরা নিজেদের কুফরীর কারণে অতি সত্বর আল্লাহর কাছে ধরা খাবে। এদেরকে অবকাশ অবশ্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এইভাবে বৃথা ছেড়ে দেওয়া হবে না।
مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا ۖ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ
📘 কেউ মন্দ কাজ করলে সে কেবল তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে[১] এবং নারী কিংবা পুরুষের মধ্যে যারা বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করে,[২] তারা প্রবেশ করবে জান্নাতে, সেখানে তাদেরকে অপরিমিত রুযী দান করা হবে।[৩]
[১] অর্থাৎ, যতটা পাপ করেছে, ঠিক ততটাই শাস্তি পাবে, তার বেশী পাবে না। পাপের পরিমাণ অনুযায়ী প্রত্যেকে আযাব ভোগ করবে। আর সুবিচারের পূর্ণ চিত্র ফুটে উঠবে।
[২] অর্থাৎ, যারা ঈমানদারও এবং সৎকর্মসমূহের প্রতি যত্নবানও। এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আল্লাহর নিকট নেক আমল ছাড়া ঈমান অথবা ঈমান ছাড়া নেক আমলের কোনই মূল্য হবে না। বরং তাঁর নিকট সফলতা লাভ করার জন্য ঈমানের সাথে নেক আমল থাকা এবং নেক আমলের সাথে ঈমান থাকা অত্যাবশ্যক।
[৩] অর্থাৎ, অনুমান ও হিসাবের বাইরে অসংখ্য সুখসামগ্রী পাবে এবং সেগুলো শেষ হয়ে যাওয়ারও কোন আশঙ্কা থাকবে না।
۞ وَيَا قَوْمِ مَا لِي أَدْعُوكُمْ إِلَى النَّجَاةِ وَتَدْعُونَنِي إِلَى النَّارِ
📘 হে আমার সম্প্রদায়! কি আশ্চর্য ! আমি তোমাদের আহবান করছি মুক্তির দিকে;[১] আর তোমরা আমাকে আহবান করছ জাহান্নামের দিকে। [২]
[১] আর তা হল, কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত কর, যাঁর কোন শরীক নেই এবং তাঁর সেই রসূলকে সত্যজ্ঞান কর, যাঁকে তিনি তোমাদের হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেছেন।
[২] অর্থাৎ, তাওহীদের পরিবর্তে শিরকের প্রতি দাওয়াত দিচ্ছ, যা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। যেমন, পরের আয়াতে তা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
تَدْعُونَنِي لِأَكْفُرَ بِاللَّهِ وَأُشْرِكَ بِهِ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى الْعَزِيزِ الْغَفَّارِ
📘 তোমরা আমাকে আহবান করছ, যাতে আমি আল্লাহকে অস্বীকার করি এবং এমন কিছুকে তাঁর সমকক্ষ স্থির করি, যার সম্বন্ধে আমার কোন জ্ঞান নেই, পক্ষান্তরে আমি তোমাদেরকে আহবান করছি পরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল আল্লাহর দিকে।[১]
[১] عَزِيْزٌ (পরাক্রমশালী) যিনি কাফেরদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার এবং তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। غَفَّارٌ স্বীয় অনুগতদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমাকারী এবং তা গোপনকারী। পক্ষান্তরে যাদের ইবাদত করার প্রতি তোমরা আমাকে দাওয়াত দিচ্ছ, তারা তো একেবারে তুচ্ছ এবং বড়ই নিম্নমানের জিনিস। না তারা শুনতে পারে, আর না উত্তর দিতে। না কারো উপকার করার ক্ষমতা রাখে, আর না অপকার করার।
لَا جَرَمَ أَنَّمَا تَدْعُونَنِي إِلَيْهِ لَيْسَ لَهُ دَعْوَةٌ فِي الدُّنْيَا وَلَا فِي الْآخِرَةِ وَأَنَّ مَرَدَّنَا إِلَى اللَّهِ وَأَنَّ الْمُسْرِفِينَ هُمْ أَصْحَابُ النَّارِ
📘 নিশ্চয়ই[১] তোমরা আমাকে এমন একজনের প্রতি আহবান করছ, যে ইহলোকে[২] ও পরলোকে কোথাও আহবান-যোগ্য নয়।[৩] বস্তুতঃ আমাদের প্রত্যাবর্তন তো আল্লাহর দিকে[৪] এবং অবশ্যই সীমালংঘনকারীরাই জাহান্নামের অধিবাসী।[৫]
[১] لاَ جَرَمَ এর অর্থঃ এ কথা নিশ্চিত যে অথবা এ কথা মিথ্যা নয় যে।[২] অর্থাৎ, ইহকালে কারো আহবান শোনারই তো ক্ষমতা রাখে না যে, তোমাদের উপকার করতে পারে অথবা উপাস্য হওয়ার যোগ্য হতে পারে। এর অর্থ প্রায়ই ঐ অর্থই যা এই আয়াতে এবং এই ধরনের অন্যান্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে,﴿وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ﴾ অর্থাৎ, সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের ডাক সম্বন্ধে অবহিতও নয়।
(সূরা আহক্বাফ ৪৬:৫ আয়াত)
﴿إِنْ تَدْعُوهُمْ لا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ﴾ অর্থাৎ, যদি তোমরা তাদেরকে ডাক, তবে তারা তোমাদের ডাক শোনে না। আর শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না।
(সূরা ফাত্বির ৩৫:১৪ আয়াত)
[৩] অর্থাৎ, এটাও সম্ভব নয় যে, আখেরাতে তারা কারো ডাক শুনে তাকে আযাব থেকে মুক্তি দিতে পারবে অথবা সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখবে। যাদের অবস্থা এই, তারা কি উপাস্য হওয়ার যোগ্য যে, তাদের ইবাদত করা যাবে?
(এই জন্য উলামাগণ বলেন, সাহায্যের জন্য গায়রুল্লাহকে আহবান করা তিনটি শর্তে বৈধ; (ক) তাকে জীবিত থাকতে হবে, (খ) উপস্থিত থাকতে হবে এবং (গ) সাড়া দেওয়া বা সাহায্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। নচেৎ তাকে আহবান করা বৃথা ও শিরক। -সম্পাদক)
[৪] যেখানে সকলের হিসাব হবে এবং ভাল ও মন্দ আমল অনুযায়ী প্রতিদান ও শাস্তি দেওয়া হবে।[৫] অর্থাৎ, কাফের ও মুশরিকরা। যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় সীমাতিক্রম করে। অনুরূপ যে মুসলিম খুব বেশী পাপকারী হবে, যার অবাধ্যতা 'সীমালঙ্ঘন'এর পর্যায়ে পৌঁছে যাবে (এবং তা শিরক বা কুফরী না হয়ে কাবীরা গোনাহ হবে, আল্লাহ মাফ না করলে) তাকেও কিছুকাল জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করতে হবে। অতঃপর রসূল (সাঃ)-এর সুপারিশ অথবা আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
فَسَتَذْكُرُونَ مَا أَقُولُ لَكُمْ ۚ وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
📘 আমি তোমাদেরকে যা বলছি, তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে[১] এবং আমি আমার ব্যাপার আল্লাহকে সোপর্দ করছি।[২] নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর দাসদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।’[৩]
[১] অর্থাৎ, অতি সত্বর সে সময় এসে যাবে, যখন আমার কথার সত্যতা এবং যেসব জিনিস থেকে বাধা দিতাম, তার জঘন্যতা তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন অনুতাপ প্রকাশ করবে, কিন্তু সে সময়টা এমন হবে যে, তখন অনুতপ্ত হওয়া কোন উপকারে আসবে না।
[২] অর্থাৎ, তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তাঁরই কাছে সদা সাহায্য প্রার্থনা করি। আর তোমাদের সাথে বয়কট এবং সম্পর্ক ছিন্নতার কথা ঘোষণা করি।
[৩] তিনি তাদেরকে দেখছেন। যে হিদায়াতের যোগ্য তাকে হিদায়াত দানে ধন্য করেন এবং ভ্রষ্টতার উপযুক্তকে ভ্রষ্ট করেন। এ সব ব্যাপারে যে কি হিকমত ও কৌশল নিহিত আছে, তাও তিনি ভালভাবেই জানেন।
فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا ۖ وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ
📘 অতঃপর আল্লাহ তাকে ওদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট হতে রক্ষা করলেন[১] এবং কঠিন শাস্তি ফিরআউন সম্প্রদায়কে গ্রাস করল।[২]
[১] অর্থাৎ, তার ক্বিবত সম্প্রদায় উক্ত মু'মিনের সত্যের ঘোষণা দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্র করে রেখেছিল, সেই সমস্ত ষড়যন্ত্রকে মহান আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন এবং তাকে মূসা (আঃ)-এর সাথে পরিত্রাণ দান করেন। আর আখেরাতেও তার স্থান হবে জান্নাতে।
[২] অর্থাৎ, দুনিয়াতে তাদেরকে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হল এবং আখেরাতেও তাদের জন্য হবে জাহান্নামের কঠিনতর আযাব।
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ
📘 সকাল-সন্ধ্যায় ওদেরকে আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়[১] এবং যেদিন কিয়ামত ঘটবে (সেদিন ফিরিশতাদেরকে বলা হবে,) ‘ফিরআউন সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।’[২]
[১] এই আগুনের সম্মুখে বারযাখে অর্থাৎ, কবরে তাদেরকে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় পেশ করা হয়। এ আয়াত থেকে কবরের আযাবের কথা প্রমাণ হয়, যা অনেকে অস্বীকার করে। হাদীসমূহে তো খুবই স্পষ্টতার সাথে কবরের আযাবের কথা বলা হয়েছে। যেমন, আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহার) প্রশ্নের উত্তরে একদা নবী করীম (সাঃ) বললেন, نَعَمْ عَذَابُ الْقَبْرِ حَقٌّ "হ্যাঁ, কবরের আযাব সত্য।"
(বুখারীঃ জানাযা অধ্যায়)
অনুরূপ আর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, "যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যু বরণ করে, তখন (কবরে) সকাল ও সন্ধ্যায় তাকে তার স্থান দেখানো হয়। অর্থাৎ, সে জান্নাতী হলে জান্নাত এবং জাহান্নামী হলে জাহান্নাম তার সামনে পেশ করা হয় এবং বলা হয় যে, এটাই হল তোমার আসল ঠিকানা, যেখানে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তোমাকে পাঠাবেন।"
(বুখারী, মুসলিমঃ জান্নাত অধ্যায়)
এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, কবরের আযাবের অস্বীকারকারীরা কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বর্ণনাগুলো মেনে নেয় না।
[২] এ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সকাল-সন্ধ্যায় ওদেরকে আগুনের সম্মুখে পেশ করার ব্যাপারটা কিয়ামতের পূর্বেরই ব্যাপার। আর কিয়ামতের পূর্বে বারযাখ ও কবরেরই জীবন। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কবর থেকে বের করে কঠিনতর আযাবে অর্থাৎ, জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। آل فوعون (ফিরআউনের বংশধর) বলতে ফিরআউন, তার জাতি এবং তার সকল অনুসারী। আর এ কথা ফালতু যে, আমরা তো মৃতকে কবরে আরামে পড়ে থাকতে দেখি, যদি তার আযাব হত, তবে এ রকম দেখা যেত না। কেননা, আযাবের জন্য এটা জরুরী নয় যে, তা আমাদের নজরেও পড়বে। মহান আল্লাহ সর্বপ্রকার আযাব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আমরা কি দেখি না যে, স্বপ্নে একটি লোক ভয়ানক দৃশ্য দেখে কঠিন অস্থিরতা ও কষ্ট অনুভব করে, কিন্তু দর্শকরা সামান্যও টের পায় না যে, ঘুমন্ত এই মানুষটি কঠিন কষ্টে রয়েছে? এর পরও কবরের আযাবকে অস্বীকার করা হঠকারিতা এবং অযথা গা-জোরামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন কি জাগ্রত অবস্থায়ও মানুষের যেসব কষ্ট হয়, সেগুলোও বাহ্যতঃ দেখা যায় না, বরং কেবল মানুষের তড়পানো ও তার অস্থিরতাই প্রকাশ পায়। আর তাও সে তড়পানি ও অস্থিরতা প্রকাশ করলে তবে।
وَإِذْ يَتَحَاجُّونَ فِي النَّارِ فَيَقُولُ الضُّعَفَاءُ لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعًا فَهَلْ أَنْتُمْ مُغْنُونَ عَنَّا نَصِيبًا مِنَ النَّارِ
📘 যখন ওরা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হবে তখন দুর্বলেরা প্রবলদেরকে বলবে, ‘আমরা তো তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম, এখন কি তোমরা আমাদের থেকে জাহান্নামের আগুনের কিয়দংশ নিবারণ করবে?’
قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا إِنَّا كُلٌّ فِيهَا إِنَّ اللَّهَ قَدْ حَكَمَ بَيْنَ الْعِبَادِ
📘 প্রবলেরা বলবে, ‘আমরা সকলেই তো জাহান্নামে আছি, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর দাসদের মাঝে ফায়সালা করে দিয়েছেন।’
وَقَالَ الَّذِينَ فِي النَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِنَ الْعَذَابِ
📘 জাহান্নামীরা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতিপালককে বল, তিনি যেন আমাদের নিকট থেকে একদিনের শাস্তি লাঘব করেন।’
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَالْأَحْزَابُ مِنْ بَعْدِهِمْ ۖ وَهَمَّتْ كُلُّ أُمَّةٍ بِرَسُولِهِمْ لِيَأْخُذُوهُ ۖ وَجَادَلُوا بِالْبَاطِلِ لِيُدْحِضُوا بِهِ الْحَقَّ فَأَخَذْتُهُمْ ۖ فَكَيْفَ كَانَ عِقَابِ
📘 এদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও নবীগণকে মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং তাদের পরে অন্যান্য দলও। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ রসূলকে নিরস্ত করার অভিসন্ধি করেছিল[১] এবং ওরা সত্যকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য অসার যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয়েছিল,[২] ফলে আমি ওদেরকে পাকড়াও করলাম। সুতরাং কত কঠোর ছিল আমার শাস্তি! [৩]
[১] যাতে তাঁকে বন্দী অথবা হত্যা করে কিংবা শাস্তি দেয়।
[২] অর্থাৎ, তাদের রসূলদের সাথে তারা ঝগড়া করেছিল। যাতে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, সত্য কথার দোষ বের করা এবং তাকে দুর্বল করে দেওয়া।
[৩] সুতরাং আমি বাতিলের ঐ সমর্থকদেরকে আমার আযাব দ্বারা পাকড়াও করলাম। অতএব তোমরা দেখে নাও, তাদের উপর আমার আযাব কিভাবে এসেছিল এবং কিভাবে তাদেরকে ভুল অক্ষর মুছার মত নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল বা উপদেশের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া হল।
قَالُوا أَوَلَمْ تَكُ تَأْتِيكُمْ رُسُلُكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ ۖ قَالُوا بَلَىٰ ۚ قَالُوا فَادْعُوا ۗ وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ
📘 তারা বলবে, ‘তোমাদের নিকট কি স্পষ্ট নিদর্শনাবলী সহ তোমাদের রসূলগণ আসেনি?’ (জাহান্নামীরা) বলবে, ‘অবশ্যই এসেছিল।’ (প্রহরীরা) বলবে, ‘তবে তোমরা প্রার্থনা করতে থাক।[১] আর সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের প্রার্থনা ব্যর্থই হয়।’[২]
[১] অর্থাৎ, আমরা এ রকম লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে কি কিছু বলতে পারি, যাদের কাছে আল্লাহর নবীরা বহু দলীল এবং মু'জিযাসমূহ নিয়ে আগমন করেছিলেন, কিন্তু তারা কোন পারোয়াই করেনি? (সুতরাং তোমরা নিজেরাই প্রার্থনা অথবা আহবান কর।)
[২] পরিশেষে তারা নিজেরাই আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবে। কিন্তু সেখানে তাদের ফরিয়াদে কর্ণপাত করা হবে না। কারণ, দুনিয়াতে তাদের উপর হুজ্জত পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন আখেরাত তো ঈমান আনার এবং তওবা ও আমল করার স্থান নয়। আখেরাত তো প্রতিদান ও প্রতিফল লাভের স্থান। দুনিয়াতে যা কিছু করা হবে, তার পরিণাম সেখানে ভোগ করতে হবে।
إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
📘 নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে[১] ও সাক্ষীগণের দন্ডায়মান (কিয়ামত) দিনে সাহায্য করব--[২]
[১] অর্থাৎ, পৃথিবীতে তাদেরকে জয়যুক্ত এবং তাদের শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত করব। কোন কোন মানুষের মাথায় এই জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে যে, নবীদের কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়েছে। যেমন, ইয়াহয়্যা ও যাকারিয়া (আলাইহিমাস্ সালাম) প্রভৃতি। কাউকে কাউকে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছে। যেমন, ইবরাহীম (আঃ) এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ (রাঃ)। সাহায্যের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও এমনটি কেন হল? আসলে এ প্রতিশ্রুতির সম্পর্ক হল অধিকাংশ অবস্থা এবং বেশীরভাগ ব্যক্তিবর্গের সাথে। তাই কোন কোন অবস্থায় এবং কোন কোন ব্যক্তিবর্গের উপর কাফেরদের জয়যুক্ত হওয়া এই প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী নয়। অথবা এর (প্রতিশ্রুতির) অর্থ হল, ক্ষণস্থায়ীভাবে কখনো কখনো আল্লাহ নিজ কৌশল ও ইচ্ছায় কাফেরদেরকে বিজয় দান করেন। কিন্তু পরিশেষে ঈমানদাররাই জয়লাভ ও সফলতা অর্জন করেন। যেমন, ইয়াহয়্যা ও যাকারিয়া (আলাইহিমাস্ সালাম)-এর হত্যাকারীদের উপর পরে মহান আল্লাহ তাদের শত্রুদেরকে প্রবল করে দিয়েছিলেন। তারা তাদের রক্তে নিজেদের পিপাসা মিটিয়ে ছিল এবং তাদেরকে জঘন্যভাবে লাঞ্ছিত করেছিল। যে ইয়াহুদীরা ঈসা (আঃ)-কে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল, আল্লাহ তাআলা সেই ইয়াহুদীদের উপর রোমদেরকে এমন আধিপত্য দান করলেন যে, তারা এই ইয়াহুদীদেরকে অতীব অপমানজনকভাবে শায়েস্তা করে। নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ অবশ্যই হিজরত করতে বাধ্য হন, কিন্তু তারপর বদর, উহুদ, আহযাব ও খায়বার প্রভৃতি যুদ্ধে এবং মক্কা বিজয় ইত্যাদির মাধ্যমে মহান আল্লাহ যেভাবে মুসলিমদের সাহায্য করেন এবং তাঁর রসূল ও ঈমানদারদেরকে যেভাবে বিজয় দান করেন যে, এর পর আর আল্লাহর সাহায্য করার ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকে না।
(ইবনে কাসীর)
[২] أَشْهَادٌ হল شَهِيْدٌ (সাক্ষী)এর বহুবচন। যেমন, شريف এর বহুবচন আসে أشراف কিয়ামতের দিন ফিরিশতা ও আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)গণ সাক্ষ্য দেবেন। ফিরিশতাগণ সাক্ষ্য দেবেন যে, হে আল্লাহ! নবীগণ তোমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের উম্মত তাঁদেরকে মিথ্যা ভেবেছিল। এ ছাড়াও উম্মতে মুহাম্মাদী এবং খোদ নবী (সাঃ)ও সাক্ষ্য দেবেন। এ আলোচনা পূর্বেও (সূরা হাজ্জ ২২:৭৮ আয়াতে) করা হয়েছে। আর এই জন্য কিয়ামতকে সাক্ষীদের দন্ডায়মান হওয়ার দিন বলা হয়েছে। এ দিনে ঈমানদারদের সাহায্য করার অর্থ হল, তাঁদেরকে তাঁদের নেক কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাঁদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ الظَّالِمِينَ مَعْذِرَتُهُمْ ۖ وَلَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
📘 যেদিন সীমালংঘনকারীদের ওজর-আপত্তি কোন কাজে আসবে না, ওদের জন্য রয়েছে অভিশাপ এবং ওদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।[১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহর রহমত হতে দূর এবং তিরস্কারের শিকার হবে। আর ওজর-আপত্তি কোন কাজে এই জন্য আসবে না যে, সেটা ওজর-আপত্তি পেশ করার স্থানই নয়। ফলে এ ওজর হবে বাতিল ওজর।
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْهُدَىٰ وَأَوْرَثْنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ الْكِتَابَ
📘 আমি মূসাকে অবশ্যই পথনির্দেশিকা দান করেছিলাম[১] এবং ইস্রাঈল বংশধরদেরকে দান করেছিলাম গ্রন্থ,[২]
[১] অর্থাৎ, নবুঅত এবং তাওরাত দান করেছিলাম। যেমন বলেছেন,﴿إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدىً وَنُورٌ﴾ (المائدة: ৪৪)
[২] অর্থাৎ, তাওরাত মূসা (আঃ)-এর পরেও অবশিষ্ট ছিল, বংশ পরম্পরায় যার তারা উত্তরাধিকারী হয়েছে। অথবা কিতাব বা গ্রন্থ বলতে সেই সমস্ত কিতাবকে বুঝানো হয়েছে, যেগুলো বানী-ইস্রাঈলের নবীদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। এই সমস্ত কিতাবের উত্তরাধিকারী বানী-ইস্রাঈলকে বানানো হয়েছে।
هُدًى وَذِكْرَىٰ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
📘 বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশস্বরূপ। [১]
[১] هُدًى وَذِكْرَى হল ক্রিয়াবিশেষ্য এবং 'হাল' (যা পূর্বে আলোচ্য বিষয়ের অবস্থা বর্ণনা করে)এর স্থানে ব্যবহার হয়েছে। আর এই কারণে তার উপর 'যবর' এসেছে। অর্থ, هَادٍ এবং مُذَكِّرٍ (হিদায়াত দাতা এবং নসীহতকারী)। 'বুদ্ধিমানদের' বলতে যারা সুষ্ঠু বিবেকের অধিকারী। কারণ, তারাই আসমানী কিতাব দ্বারা উপকৃত হয় এবং তা থেকে হিদায়াত ও উপদেশ গ্রহণ করে। অন্যরা তো সেই গাধার মত, যার (পিঠের) উপরে থাকে কিতাবের বোঝা, কিন্তু এ কিতাবগুলোর মধ্যে কি আছে, সে ব্যাপারে সে হয় অজ্ঞ।
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
📘 অতএব তুমি ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর তুমি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর[১] এবং সকাল-সন্ধ্যায় তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। [২]
[১] এখানে 'পাপ' বলতে এমন ছোট-খাটো ভুল-চুক যা মানবীয় দুর্বলতা অনুযায়ী ঘটে যায় এবং যেগুলোর সংশোধনও মহান আল্লাহর পক্ষ হতে করে দেওয়া হয়। অথবা ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা)ও একটি ইবাদত। নেকী ও সওয়াব বৃদ্ধির জন্য নবী (সাঃ)-কে ইস্তিগফার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিংবা উদ্দেশ্য হল উম্মতের দিক নির্দেশনা যে, তারা যেন ইস্তিগফারের অমুখাপেক্ষী না হয়।
[২] عَشِيٌّ হল দিনের শেষ এবং রাতের প্রথম অংশ। আর أَبْكَارٌ হল, রাতের শেষ এবং দিনের প্রথম অংশ।
إِنَّ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ ۙ إِنْ فِي صُدُورِهِمْ إِلَّا كِبْرٌ مَا هُمْ بِبَالِغِيهِ ۚ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
📘 যারা নিজেদের নিকট আগত কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, ওদের অন্তরে আছে কেবল অহংকার যা সফল হওয়ার নয়।[১] অতএব তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
[১] অর্থাৎ, যারা আল্লাহ-প্রদত্ত কোন দলীল ছাড়াই তর্ক-বিতর্ক ও হুজ্জত করে। এরা কেবল অহংকারবশতঃ এ রকম করে। তবে এ থেকে তাদের যে বাতিলকে সবল ও হককে দুর্বল করার উদ্দেশ্য, তা তারা অর্জন করতে পারবে না।
لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
📘 মানব সৃষ্টি অপেক্ষা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি তো কঠিনতর, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। [১]
[১] অর্থাৎ, এরা আবার এ কথা অস্বীকার করছে কেন যে, মহান আল্লাহ মৃতকে পুনরায় জীবিত করতে পারবেন না? অথচ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার তুলনায় এ কাজ অনেক সহজ।
وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَىٰ وَالْبَصِيرُ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَلَا الْمُسِيءُ ۚ قَلِيلًا مَا تَتَذَكَّرُونَ
📘 সমান নয় অন্ধ ও চক্ষুষ্মান এবং যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে এবং যারা দুষ্কৃতিপরায়ণ।[১] তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক।
[১] অর্থ হল, যেরূপ অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়, অনুরূপ মু'মিন ও কাফের এবং নেককার ও বদকারও সমান নয়। বরং কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে যে বিরাট তফাৎ হবে, তা পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যাবে।
إِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ
📘 কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করে না।
وَكَذَٰلِكَ حَقَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّهُمْ أَصْحَابُ النَّارِ
📘 এভাবে অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য হল; নিশ্চয় এরা জাহান্নামী।[১]
[১] এ থেকে উদ্দেশ্য হল এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, যেভাবে বিগত জাতির প্রতি তোমার প্রতিপালকের আযাব সুসাব্যস্ত হয়েছে এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, মক্কার এই কাফেররাও যদি তোমাকে মিথ্যাজ্ঞান করা ও তোমার বিরোধিতা করা থেকে ফিরে না আসে এবং মিথ্যা তর্ক ত্যাগ না করে, তবে এরাও তাদের মত আল্লাহর আযাব দ্বারা পাকড়াও হবে এবং এদের রক্ষাকারী কেউ থাকবে না।
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
📘 তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।[১] যারা অহংকারে আমার উপাসনায় বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’[২]
[১] (অর্থাৎ, তোমরা আমার কাছে দু'আ কর, আমি তোমাদের দু'আ কবুল করব।) পূর্বোক্ত আয়াতে যেহেতু মহান আল্লাহ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা আলোচনা করেছেন, তাই এখন এই আয়াতে এমন পথের দিশা দেওয়া হচ্ছে, যা অবলম্বন করে মানুষ পরকালের সৌভাগ্য লাভ করতে পারে। আয়াতে উল্লিখিত 'দু'আ'র অর্থ অধিকাংশ মুফাসসেরগণ ইবাদত নিয়েছেন। অর্থাৎ, কেবল এক আল্লাহরই ইবাদত কর। যেমন, হাদীসেও 'দু'আ'কেই ইবাদত বলা হয়েছে। ((الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ )) (مسند أحمد: ৪/২৭১، السنن الأربعة، مشكاة ২২৩০) এ ছাড়াও পরে উল্লিখিত يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِي থেকেও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এর অর্থ ইবাদত। কেউ কেউ বলেছেন, 'দু'আ' বলতে, দু'আ করাই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, মঙ্গল অর্জন ও অমঙ্গল দূরীভূত করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। কারণ, দু'আর (আভিধানিক অর্থঃ ডাকা এবং) শরীয়তী ও প্রকৃত অর্থ হল, চাওয়া। দ্বিতীয় অর্থে তার ব্যবহার রূপক। এ ছাড়াও দু'আর প্রকৃত অর্থের দিক দিয়ে এবং উল্লিখিত হাদীসের ভিত্তিতে তার অর্থ, ইবাদতই। কেননা, কারণ-ঘটিত নয় এমন অস্বাভাবিক কিছু কারো কাছে চাওয়া ও প্রার্থনা করাই হল তার ইবাদত করা।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হল, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে প্রয়োজন পূরণ এবং সাহায্যের জন্য ডাকা জায়েয নয়। কেননা, কারণ-ঘটিত নয় এমন অস্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণের জন্য কাউকে ডাকলে তা ইবাদত হয়। আর ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য জায়েয নয়।
[২] এটা হল আল্লাহর ইবাদতকে যারা অস্বীকার করে, তা থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় অথবা তাতে যারা অন্যদেরকেও শরীক করে তাদের পরিণাম।
اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ
📘 আল্লাহই রাতকে তোমাদের বিশ্রামের জন্য সৃষ্টি করেছেন[১] এবং দিনকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল।[২] নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। [৩]
[১] অর্থাৎ, রাতকে অন্ধকার বানিয়ে দিয়েছেন। যাতে জীবিকা অর্জনের যাবতীয় কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ নির্বিঘ্নে শান্তির সাথে ঘুমাতে পারে।
[২] অর্থাৎ, আলোক-উজ্জ্বল করে দিয়েছি। যাতে জীবিকা অর্জনের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় কোন কষ্ট না হয়।
[৩] তারা আল্লাহর নিয়ামতের না কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, আর না তা স্বীকার করে। হয়তো বা কুফরী ও অস্বীকার করার কারণে; যেমন, কাফেরদের অভ্যাস। নতুবা অনুগ্রহকারীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন যে ওয়াজিব এ ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে; যেমন, মূর্খদের আচরণ।
ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَأَنَّىٰ تُؤْفَكُونَ
📘 তিনিই তো আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক, সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, সুতরাং তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১]
[১] অর্থাৎ, এ সত্ত্বেও তোমরা আল্লাহর ইবাদতের কথা শুনে ভড়কে উঠছ কেন এবং তাঁর তাওহীদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ ও তাতে রুষ্ট হচ্ছ কেন?
كَذَٰلِكَ يُؤْفَكُ الَّذِينَ كَانُوا بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ
📘 যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে, তারা এভাবে ফিরে যায়।
اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ قَرَارًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ ۚ ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ ۖ فَتَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
📘 আল্লাহই[১] তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন[২] এবং আকাশকে করেছেন ছাদস্বরূপ[৩] এবং তিনি তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন এবং তোমাদের আকৃতি করেছেন উৎকৃষ্ট[৪] এবং তোমাদেরকে দান করেছেন উৎকৃষ্ট জীবিকা;[৫] তিনিই তো আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং কত মহান বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ!
[১] এই আয়াতে (আল্লাহর) নিয়ামতের কিছু প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটে এবং এ কথাও যেন সুসাব্যস্ত হয়ে যায় যে, তিনি শরীকবিহীন একমাত্র উপাস্য।
[২] যেখানে তোমরা বসবাস, চলাফেরা, কাজকর্ম এবং জীবনযাপন করছ। অতঃপর পরিশেষে মৃত্যুবরণ করে কিয়ামত পর্যন্ত এরই মধ্যে সমাধিস্থ থাকবে।
[৩] অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠিত ও সুদৃঢ় ছাদ। যদি এটা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত, তবে কেউ না আরামের সাথে ঘুমাতে পারত, আর না কারো জন্য জীবিকার পক্ষে কাজ-কারবার করা সম্ভব ছিল।
[৪] যমীনে যত প্রকার জীবজন্তু আছে, তার মধ্যে মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতির এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক গঠনের অবয়ব দান করেছেন।
[৫] অর্থাৎ, তোমাদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের এমন সব খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, যা সুস্বাদুও বটে এবং উপাদেয় ও পুষ্টিকরও।
هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ۗ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ব্যতীত কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই, সুতরাং তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁকে ডাক।[১] সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।
[১] অর্থাৎ, যখন সব কিছু তিনিই করেন এবং তিনিই দেন, অন্য কেউ না সৃষ্টিতে তাঁর শরীক আছে, আর না এখতিয়ারাদিতে, তাহলে ইবাদতের যোগ্যও তিনি একাই। অন্য কেউ এতে শরীক হতে পারে না। সাহায্য প্রার্থনা এবং ফরিয়াদও তাঁরই কাছে কর। তিনিই সকলের ফরিয়াদ ও দরখাস্ত শোনার ক্ষমতা রাখেন। কারণ-ঘটিত নয় এমন অস্বাভাবিক প্রার্থনা শোনার ক্ষমতা অন্য কেউ রাখে না। ব্যাপার যখন এ রকম, তখন অন্যরা বিপদ দূর এবং প্রয়োজন পূরণ কিভাবে করতে পারে?
۞ قُلْ إِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَمَّا جَاءَنِيَ الْبَيِّنَاتُ مِنْ رَبِّي وَأُمِرْتُ أَنْ أُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 বল, ‘আমার প্রতিপালকের নিকট হতে আমার নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পর তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাকে আহবান কর, তার উপাসনা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে।[১] আর আমাকে আদেশ করা হয়েছে বিশ্ব-প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করতে।’[২]
[১] চাহে তা পাথরের মূর্তি হোক, নবী, অলী বা কবরে সমাধিস্থ মৃত হোক। সাহায্যের জন্য কাউকেও ডেকো না। তাদের নামে নযর মেনো না ও নজরানা দিয়ো না। তাদের নামে ওযীফা পড়ো না। তাদেরকে ভয় করো না এবং তাদের কাছে কোন কিছুর আশা করো না। কারণ, এগুলো এক-একটি ইবাদত, যা কেবল আল্লাহরই অধিকার।
[২] এগুলো বিবেকগ্রাহ্য যুক্তি এবং স্পষ্ট উক্তি ভিত্তিক এমন প্রমাণপুঞ্জ যার দ্বারা আল্লাহর একত্ব অর্থাৎ আল্লাহরই একমাত্র উপাস্য ও প্রতিপালক হওয়ার কথা সাব্যস্ত করে। আর এ কথা কুরআনের বহু স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্য ও অনুসরণের জন্য নত হওয়া। অর্থাৎ, আমাকে আদেশ করা হয়েছে, যাতে আমি আল্লাহর বিধি-বিধানের সামনে নত হয়ে যাই এবং তা থেকে বিমুখ না হই। পরের আয়াতে আরো কিছু তাওহীদের দলীলাদি বর্ণনা করা হচ্ছে।
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخًا ۚ وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّىٰ مِنْ قَبْلُ ۖ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلًا مُسَمًّى وَلَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
📘 তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, পরে শুক্রবিন্দু হতে,[১] তারপর জমাট রক্ত হতে, তারপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করেন, তারপর তোমরা হও যৌবনপ্রাপ্ত, তারপর উপনীত হও বার্ধক্যে।[২] তোমাদের মধ্যে কারও কারও পূর্বেই মৃত্যু ঘটে[৩] এবং এ জন্য যে, যাতে তোমরা তোমাদের নির্ধারিতকাল প্রাপ্ত হও[৪] এবং যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার।[৫]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের পিতা আদম (আঃ)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তাঁর মাটি থেকে সৃষ্টি হওয়ার মানেই তাঁর সমস্ত সন্তান-সন্ততি মূলতঃ মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তারপর মানব বংশের ধারা এবং তার স্থায়িত্ব ও বিদ্যমানতার জন্য মানুষের সৃষ্টিকে বীর্যের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। এখন প্রত্যেক মানুষ সেই বীর্য বা শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়, যা বাপের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের হয়ে মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে স্থির হয়। কেবল ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারটা স্বতন্ত্র; তিনি অলৌকিকভাবে বিনা বাপেই সৃষ্টি হয়েছেন। কুরআন কারীমের বিস্তারিত বর্ণনা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে।
[২] অর্থাৎ, এই সমস্ত অবস্থার মাধ্যম দিয়ে অতিক্রম করান সেই আল্লাহই, যাঁর কোন শরীক নেই।
[৩] অর্থাৎ, মায়ের গর্ভাশয়ে বিভিন্ন দশা ও অবস্থাকে অতিক্রম করে (পেট থেকে) বের হয়ে আসার পূর্বেই মায়ের পেটে, কেউ শিশুকালে, কেউ যৌবনকালে এবং কেউ বার্ধক্যের শুরুতেই মারা যায়।
[৪] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ এটা এই জন্য করেন যে, যাতে যার যতটা বয়স আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন, সে তার নির্ধারিত বয়স পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং ততটা জীবন সে দুনিয়াতে কাটিয়ে নেয়।
[৫] অর্থাৎ, যখন তোমরা এই পর্যায়সমূহ ও স্তরগুলোর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবে যে, বীর্য থেকে জমাট রক্ত, অতঃপর তা হতে গোশতপিন্ড, তারপর শৈশব, তারপর যৌবন, তারপর বার্ধক্যের প্রারম্ভিক এবং পরে সম্পূর্ণ বার্ধক্য, তখন তোমরা জেনে নেবে যে, তোমাদের প্রতিপালক এক ও একক এবং তোমাদের উপাস্যও একক, তাঁর কোন শরীক নেই। এ ছাড়া এও জেনে নেবে যে, যে আল্লাহ এ সবকিছু করেন, তাঁর জন্য কিয়ামতের দিন মানুষদেরকে পুনরায় জীবিত করাও কোন জটিল ব্যাপার নয় এবং তিনি অবশ্যই সকলকে পুনর্জীবিত করবেন।
هُوَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ ۖ فَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
📘 তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান[১] এবং যখন তিনি কিছু করা স্থির করেন, তখন তিনি বলেন, ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়।[২]
[১] জীবিত করা ও মারা তাঁরই এখতিয়ারাধীন ব্যাপার। তিনি প্রাণহীন শুক্রবিন্দুকে বিভিন্ন স্তরের উপর দিয়ে অতিক্রম করিয়ে একজন জীবন্ত মানুষের আকৃতি দান করেন। অতঃপর নির্দিষ্ট এক সময়ে জীবন্ত এই মানুষটির প্রাণ কেড়ে নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঘুম পাড়িয়ে দেন।
[২] তাঁর মহাশক্তির অবস্থা হল এই যে, তাঁর كُنْ (হও) শব্দ দ্বারা সেই জিনিস অস্তিত্বে চলে আসে, যা (হওয়ার) তিনি ইচ্ছা করেন।
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِ اللَّهِ أَنَّىٰ يُصْرَفُونَ
📘 তুমি কি ওদের লক্ষ্য কর না, যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্ক করে?[১] ওরা কোথায় ফিরে যাচ্ছে? [২]
[১] অস্বীকার ও মিথ্যাজ্ঞান করার জন্য অথবা তা খন্ডন ও বাতিল সাব্যস্ত করার জন্য।
[২] অর্থাৎ, প্রমাণাদি এসে যাওয়া এবং সত্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ওরা কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করছে? এটা হল আশ্চর্যের প্রকাশ।
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
📘 যারা আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারিপাশ ঘিরে আছে তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা প্রশংসার সাথে ঘোষণা করে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী; অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর। [১]
[১] এখানে নিকটতম ফিরিশতাদের একটি বিশেষ দল এবং তাঁদের কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই দলটি সেই ফিরিশতাদের, যাঁরা আল্লাহর আরশ তুলে ধরে আছেন এবং তাঁদের, যাঁরা তার চারিপাশে আছেন। এঁদের একটি কাজ হল, এঁরা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং তাঁর প্রশংসা করেন। অর্থাৎ, তাঁকে সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ঘোষণা করেন, তাঁর পরিপূর্ণতা ও গুণাবলীকে তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেন এবং তাঁর সামনে অসহায়তা ও বিনয় (অর্থাৎ ঈমান) প্রকাশ করেন। এঁদের দ্বিতীয় কাজ হল, এঁরা ঈমানদারদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বলা হয় যে, আরশ বহনকারী ফিরিশতার সংখ্যা হল চার। কিন্তু কিয়ামতের দিন তাঁদের সংখ্যা হবে আট।
(ইবনে কাসীর)
الَّذِينَ كَذَّبُوا بِالْكِتَابِ وَبِمَا أَرْسَلْنَا بِهِ رُسُلَنَا ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
📘 ওরা গ্রন্থ ও আমার রসূলদেরকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছিলাম তা মিথ্যাজ্ঞান করে-সুতরাং শীঘ্রই ওরা জানতে পারবে।
إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلُ يُسْحَبُونَ
📘 যখন ওদের গলদেশে বেড়ি ও শিকল থাকবে, ওদেরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, [১]
[১] এ হল সেই চিত্র, যা জাহান্নামে মিথ্যাজ্ঞানকারীদের হবে।
فِي الْحَمِيمِ ثُمَّ فِي النَّارِ يُسْجَرُونَ
📘 ফুটন্ত পানিতে, অতঃপর ওদেরকে অগ্নিতে দগ্ধ করা হবে;[১]
[১] মুফাসসির মুজাহিদ এবং মুক্বাতিলের উক্তি হল, তাদের মাধ্যমে জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্বালিত করা হবে। অর্থাৎ, তারা তার ইন্ধন হবে।
ثُمَّ قِيلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تُشْرِكُونَ
📘 পরে ওদেরকে বলা হবে, ‘কোথায় তারা, যাদেরকে তোমরা শরীক করতে--
مِنْ دُونِ اللَّهِ ۖ قَالُوا ضَلُّوا عَنَّا بَلْ لَمْ نَكُنْ نَدْعُو مِنْ قَبْلُ شَيْئًا ۚ كَذَٰلِكَ يُضِلُّ اللَّهُ الْكَافِرِينَ
📘 আল্লাহকে ছেড়ে?’[১] ওরা বলবে, ‘ওরা তো আমাদের নিকট থেকে অদৃশ্য হয়েছে;[২] বরং পূর্বে আমরা এমন কিছুকে আহবান করিনি, যার কোন সত্তা ছিল।’[৩] এভাবে আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে বিভ্রান্ত করে থাকেন। [৪]
[১] তারা কি আজ তোমাদের সাহায্য করতে পারবে?
[২] অর্থাৎ, জানি না তারা কোথায় চলে গেছে, তারা আমাদের সাহায্য আর কি করবে?
[৩] ভুল স্বীকার করার পর তাদের ইবাদত করার কথাই অস্বীকার করবে। যেমন, অন্যত্র বলেছেন, ﴿وَاللَه رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ﴾ অর্থাৎ, (তারা বলবে) আল্লাহর শপথ! আমরা তো কাউকেও শরীক করতাম না।
(সূরা আনআম ৬:২৩ আয়াত)
বলা হয়েছে যে, এটা মূর্তিগুলোর অস্তিত্ব ও তাদের ইবাদতের অস্বীকৃতি নয়, বরং এ হল এই কথার স্বীকারোক্তি যে, তাদের ইবাদত বাতিল ছিল। কারণ, সেখানে তাদের কাছে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, তারা এমন জিনিসের ইবাদত করত, যারা না শুনতে পারে, না দেখতে পারে এবং না উপকার করতে পারে, না অপকার।
(ফাতহুল ক্বাদীর)
আর দ্বিতীয় অর্থও পরিষ্কার। আর তা হল, তারা শিরক করার কথা একেবারে অস্বীকার করবে।
[৪] অর্থাৎ, এই মিথ্যাজ্ঞানকারীদের মত মহান আল্লাহ কাফেদেরকেও বিভ্রান্ত করেন। অর্থাৎ, অব্যাহতভাবে মিথ্যা ভাবতে থাকা ও কুফরী করা এমন জিনিস যে, তার দ্বারা মানুষের অন্তর কালো হয়ে যায় এবং তাতে জং ধরে যায়। অতঃপর তারা সত্য গ্রহণ করার তাওফীক লাভ করা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যায়।
ذَٰلِكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَفْرَحُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَبِمَا كُنْتُمْ تَمْرَحُونَ
📘 এটা এ কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা আনন্দ করতে ও দম্ভ করতে। [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের এই বিভ্রান্তি এই কথার কুফল যে, তোমরা কুফরী ও অন্যায়-অনাচারে এত এগিয়ে গিয়েছিলে যে, এতে তোমরা আনন্দ ও গর্ববোধ করতে। দম্ভ ও গর্ববোধের মধ্যে অতিরিক্ত আনন্দের প্রকাশ থাকে, যাতে অহংকারের মিশ্রণ থাকে।
ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا ۖ فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ
📘 ওদেরকে বলা হবে, ‘জাহান্নামে চিরকাল বসবাসের জন্য ওতে প্রবেশ কর, কত নিকৃষ্ট উদ্ধতদের আবাসস্থল।’ [১]
[১] এ কথা জাহান্নামে নিযুক্ত ফিরিশতা জাহান্নামীদেরকে বলবেন।
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ ۚ فَإِمَّا نُرِيَنَّكَ بَعْضَ الَّذِي نَعِدُهُمْ أَوْ نَتَوَفَّيَنَّكَ فَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ
📘 সুতরাং তুমি ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।[১] আমি ওদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার কিছু যদি তোমাকে দেখিয়ে দিই[২] অথবা তার পূর্বে তোমার মৃত্যু ঘটাই- (সর্বাবস্থায়) ওদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। [৩]
[১] আর তা এই যে, আমি কাফেরদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব। আর এই প্রতিশ্রুতি সত্বরও পূরণ হতে পারে। অর্থাৎ, দুনিয়াতেই আমি তাদেরকে পাকড়াও করব অথবা আমার ইচ্ছানুযায়ী এতে বিলম্বও হতে পারে। অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে শাস্তি দেব। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, আমার পাকড়াও থেকে রেহাই পেয়ে কোথাও পালাতে পারবে না।
[২] অর্থাৎ, তোমার জীবদ্দশায় তাদেরকে আযাবে পতিত করি। আর হলও তা-ই। আল্লাহ কাফেরদের নিকট থেকে প্রতিশোধ নিয়ে মুসলিমদের চক্ষু শীতল করলেন। বদর যুদ্ধে ৭০ জন কাফের মারা গেল। হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয় হল এবং নবী করীম (সাঃ)-এর যুগেই সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ মুসলিমদের কব্জায় চলে এল।
[৩] অর্থাৎ, কাফেররা যদি পার্থিব শাস্তি থেকে বেঁচেও যায়, তবুও শেষে যাবে কোথায়? অবশেষে আমার কাছেই আসবে। আর এখানে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত আছে।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ مِنْهُمْ مَنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَنْ لَمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ ۗ وَمَا كَانَ لِرَسُولٍ أَنْ يَأْتِيَ بِآيَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ فَإِذَا جَاءَ أَمْرُ اللَّهِ قُضِيَ بِالْحَقِّ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْمُبْطِلُونَ
📘 আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রসূল প্রেরণ করেছিলাম; তাদের কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করেছি এবং কারো কারো কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি।[১] আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়।[২] আল্লাহর আদেশ এলে[৩] ন্যায়সঙ্গতভাবে ফায়সালা হয়ে যাবে।[৪] আর তখন মিথ্যাশ্রয়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
[১] যে নবীদের কথা বিবৃত হয়নি, তাঁদের সংখ্যা ওঁদের তুলনায় অনেক বেশী যাঁদের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। কারণ, কুরআন কারীমে তো কেবল ২৫ জন নবী ও রসূলদের কথা উল্লিখিত হয়েছে এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের অবস্থাসমূহ বর্ণিত হয়েছে।[২] আয়াত বা নিদর্শন বলতে এখানে মু'জিযা বা অলৌকিক ঘটনা বুঝানো হয়েছে; যা নবীদের সত্যতার কথা প্রমাণ করে। কাফেররা নবীদের কাছে দাবী করত যে, তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদেরকে এই এই জিনিস দেখাও। যেমন, মক্কার কাফেররা স্বয়ং নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে কয়েকটি জিনিস দাবী করেছিল। সূরা বানী-ইস্রাঈলের ১৭:৯০-৯৩ নং আয়াতে এর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন যে, কোন নবীর এখতিয়ারে এটা ছিল না যে, সে তার জাতির দাবী অনুযায়ী কোন মু'জিযার উদ্ভব ঘটিয়ে দেখিয়ে দেবে। এটা কেবল আমার এখতিয়ারাধীন ছিল। কোন কোন নবীকে তো প্রথম থেকেই মু'জিযা দেওয়া হয়েছিল। কোন কোন সম্প্রদায়কে তাদের দাবী অনুযায়ী মু'জিযা দেখানো হয়েছিল এবং কোন কোন সম্প্রদায়কে তাদের দাবী সত্ত্বেও মু'জিযা দেখানো হয়নি। আমার ইচ্ছা অনুসারে তার ফায়সালা হত। মোটকথা, কোন নবীর এই এখতিয়ার ছিল না যে, তিনি যখনই চাইবেন মু'জিযার উদ্ভব ঘটিয়ে দেখিয়ে দেবেন। এ থেকে পরিষ্কারভাবে এমন লোকদের কথার খন্ডন হয়ে যায়, যারা কোন কোন ওলীদের ব্যাপারে মন্তব্য করে যে, তাঁরা যখন চাইতেন এবং যেভাবে চাইতেন অস্বাভাবিক কর্ম-কান্ড (কারামত) ঘটিয়ে দেখিয়ে দিতেন; যেমন আব্দুল ক্বাদের জীলানী (রঃ) সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। এগুলো হল তাদের মস্তিস্কপ্রসূত কেচ্ছা-কাহিনী। যখন মহান আল্লাহ নবীদেরকে এই (তাঁদের ইচ্ছামত মু'জিযা দেখানোর) এখতিয়ার দেননি, অথচ তাঁদের সত্যতার প্রমাণের জন্য তার প্রয়োজনও ছিল, তাহলে কোন ওলী এ এখতিয়ার কিভাবে পেতে পারেন? বিশেষ করে যখন ওলীর তার প্রয়োজনও নেই। কেননা, নবীদের নবুঅতের উপর ঈমান আনা জরুরী। তাই তাঁদের মু'জিযার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আল্লাহর কৌশল ও ইচ্ছার এই দাবী ছিল না, তাই এ ক্ষমতা কোন নবীকে দেওয়া হয়নি। পক্ষান্তরে ওলীদের বেলায়াতের উপর ঈমান আনা জরুরী নয়। তাই তাঁদের মু'জিযা ও কারামতের কোনই প্রয়োজন নেই। অতএব বিনা প্রয়োজনে তাঁদেরকে এ এখতিয়ার মহান আল্লাহ কিভাবে দিতে পারেন?[৩] অর্থাৎ, দুনিয়াতে অথবা আখেরাতে তাদের আযাবের নির্দিষ্ট সময় এসে পৌঁছলে।[৪] অর্থাৎ, তাদের মধ্যে ন্যায়ভাবে ফায়সালা করে দেওয়া হবে; হকপন্থীদের জন্য মুক্তির ফায়সালা এবং বাতিলপন্থীদের জন্য আযাবের ফায়সালা।
اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَنْعَامَ لِتَرْكَبُوا مِنْهَا وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ
📘 আল্লাহই তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন,[১] কতক তোমাদের আরোহণ করার জন্য ও কতক আহার করার জন্য।[২]
[১] মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে কিছু নিয়ামতের কথা উল্লেখ করছেন। চতুষ্পদ জন্তু বলতে, উট, গরু, ছাগল এবং ভেঁড়া। নর-মাদী মিলিয়ে সর্বমোট আটটি। সূরা আন্আমের ৬:১৪৩-১৪৪ নং আয়াতে এর উল্লেখ হয়েছে।[২] এগুলো বাহনের কাজেও আসে (যেমন উটে সওয়ার হওয়া যায়, গরু গাড়ি টানে) এবং তাদের দুধও পান করা হয়। (যেমন, ছাগল, গাই ও উটনীর দুধ)। এগুলোর গোশত মানুষের কাছে অতি প্রিয় খাদ্য এবং বোঝা বহনের কাজও তাদের থেকে নেওয়া হয়।
رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
📘 হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ দান কর; যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদেরকে দিয়েছ (এবং তাদের) পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান সন্ততিদের মধ্যে (যারা) সৎকাজ করেছে তাদেরকেও (জান্নাত প্রবেশের অধিকার দাও)।[১] নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
[১] অর্থাৎ, এদের সকলকে জান্নাতের একই জায়গায় স্থান দাও; যাতে একে অপরকে দেখে তাদের চক্ষু শীতল হয়। এই বিষয়কে অন্যত্র আল্লাহ পাক এইভাবে বর্ণনা করেছেন, ﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ﴾ "যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তুান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করে দেব এবং তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না।"
(সূরা ত্বূর ৫২:২১)
অর্থাৎ, সকলকে জান্নাতে এমনভাবে একত্রিত করে দেবেন যে, নিম্নমানের জান্নাতীকেও উচ্চ মান দান করবেন। এ রকম করবেন না যে, উচ্চ মান কম করে নিম্নমানে নিয়ে আসবেন। বরং নিম্নমানের জান্নাতীকে উচ্চ মান দান করবেন এবং তার আমলের ঘাটতিকেও স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়া দ্বারা পূরণ করে দেবেন।
وَلَكُمْ فِيهَا مَنَافِعُ وَلِتَبْلُغُوا عَلَيْهَا حَاجَةً فِي صُدُورِكُمْ وَعَلَيْهَا وَعَلَى الْفُلْكِ تُحْمَلُونَ
📘 এতে তোমাদের জন্য প্রচুর উপকার রয়েছে।[১] তোমরা যা প্রয়োজন বোধ কর এদের দ্বারা তা পূর্ণ করে থাক। আর এদের উপর[২] ও নৌযানের উপর তোমাদেরকে বহন করা হয়।
[১] যেমন, তাদের লোম, চুল, পশম এবং তাদের চামড়া থেকেও অনেক জিনিস তৈরী করা হয়। এদের দুধ থেকে ঘি, মাখন এবং পনির ইত্যাদিও তৈরী হয়।
[২] অর্থাৎ, এদের মধ্যে উটের পিঠে এবং গরুর গাড়িতে তোমাদেরকে বহন করা হয়।
وَيُرِيكُمْ آيَاتِهِ فَأَيَّ آيَاتِ اللَّهِ تُنْكِرُونَ
📘 তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখিয়ে থাকেন।[১] সুতরাং তোমরা আল্লাহর কোন্ নিদর্শনকে অস্বীকার করবে? [২]
[১] যেগুলো তাঁর মহাশক্তি ও একত্বকে প্রমাণ করে। আর নিদর্শনগুলো কেবল বিশ্বজগতেই নেই, বরং তোমাদের দেহের মধ্যেও তা বিদ্যমান রয়েছে।
[২] এগুলো এত জাজ্বল্যমান, ব্যাপক ও এত বেশী যে, কোন অস্বীকারকারী তা অস্বীকার করার ক্ষমতা রাখে না। এখানে 'ইস্তিফহাম' (জিজ্ঞাসা) নেতিবাচক।
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ۚ كَانُوا أَكْثَرَ مِنْهُمْ وَأَشَدَّ قُوَّةً وَآثَارًا فِي الْأَرْضِ فَمَا أَغْنَىٰ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
📘 ওরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখেনি ওদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিল?[১] পৃথিবীতে তারা ছিল ওদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিকতর প্রবল।[২] তারা যা করত, তা তাদের কোন কাজে আসেনি। [৩]
[১] অর্থাৎ, যে জাতিরা আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে এবং তাঁর রসূলদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করেছে, তাদের দরকার নিজেদের অঞ্চলে বিদ্যমান বস্তিগুলোর ধ্বংসাবশেষ ঘর-বাড়ি ও পরিত্যক্ত জিনিসগুলো দেখা এবং তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যে, তাদের পরিণাম কি হয়েছে?
[২] অর্থাৎ, ঘর-বাড়ি, কারখানা এবং ক্ষেত আকারে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পড়ে থাকা জিনিসগুলো প্রমাণ করে যে, তারা কারিগরি ও শিল্পকলার ময়দানে তোমাদের থেকেও অনেক উন্নত ছিল।
[৩] فَمَا أَغْنَى তে مَا অক্ষরটি জিজ্ঞাসাসূচক হতে পারে, আবার নেতিবাচকও হতে পারে। নেতিবাচকের অর্থ তো তরজমা থেকেই পরিষ্কার। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসাসূচক হয়, তবে অর্থ হবে, তারা যা করত তা তাদের কি কাজে এসেছে? অর্থ একই যে, তাদের উপার্জন তাদের কোন উপকারে আসেনি।
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
📘 ওদের নিকট যখন স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ ওদের রসূল এসেছিল, তখন ওরা নিজেদের জ্ঞানের দম্ভ করত।[১] ওরা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তাই তাদেরকে বেষ্টন করল।
[১] ইলম বা জ্ঞান বলতে, তাদের মনগড়া বিশ্বাস, কল্পিত ধ্যান-ধারণা, সন্দেহ-সংশয় এবং ভ্রান্ত দাবী ইত্যাদি। বিদ্রূপ স্বরূপ তাকে ইলম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারণ, তারা এগুলোকে জ্ঞানভিত্তিক দলীল মনে করত। তাই তাদের ধারণা অনুযায়ী এ রকম বলা হয়েছে। অর্থ হল, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথার মোকাবেলায় তারা তাদের ঐ তথাকথিত জ্ঞান নিয়ে গর্ব ও দম্ভ প্রদর্শন করেছিল। অথবা ইলম বলতে, পার্থিব বিষয়ের ইলম। তারা আল্লাহর বিধি-বিধান ও তাঁর ফরযকৃত বিষয়াবলীর জ্ঞান ও শিক্ষার উপর পার্থিব জ্ঞানকে প্রাধান্য দিত।
فَلَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا قَالُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَحْدَهُ وَكَفَرْنَا بِمَا كُنَّا بِهِ مُشْرِكِينَ
📘 অতঃপর ওরা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন বলল, ‘আমরা এক আল্লাহতেই বিশ্বাস করলাম এবং আমরা তাঁর সঙ্গে যাদেরকে অংশী করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম।’
فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا ۖ سُنَّتَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ فِي عِبَادِهِ ۖ وَخَسِرَ هُنَالِكَ الْكَافِرُونَ
📘 কিন্তু ওরা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন ওদের বিশ্বাস ওদের কোন উপকারে এল না। আল্লাহর এ বিধান (পূর্ব হতেই) তাঁর দাসদের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে।[১] আর তখন অবিশ্বাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হল। [২]
[১] অর্থাৎ, এটাই আল্লাহর নিয়ম চলে আসছে যে, আযাব প্রত্যক্ষ করার পর ঈমান অগ্রহণযোগ্য। এ বিষয়টা কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হয়েছে।
[২] অর্থাৎ, আযাব প্রত্যক্ষ করার পর তাদের কাছে এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এখন ক্ষতি ও ধ্বংস ছাড়া আমাদের ভাগ্যে অন্য কিছু নেই।
وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ ۚ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
📘 এবং তুমি তাদেরকে শাস্তি হতে রক্ষা কর।[১] সেদিন তুমি যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবে তাকে তো দয়াই করবে। আর এটিই তো মহাসাফল্য।’ [২]
[১] سَيِّئات (পাপরাশি) বলতে এখানে তার শাস্তি বুঝানো হয়েছে। অথবা جَزَاء শব্দ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, তাদেরকে পাপরাশির (শাস্তি) থেকে, অর্থাৎ আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নাও।
[২] অর্থাৎ, আখেরাতের আযাব থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ লাভ করাই হল সবচেয়ে বড় সফলতা। কারণ, এর মত আর কোন সফলতা নেই এবং এর তুলনায় আর কোন মুক্তি নেই। এই আয়াতগুলোতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে দু'টি মহা সুসংবাদ। একটি হল, ফিরিশতাগণ তাদের জন্য তাদের অদৃশ্যে দু'আ করেন (যার বড় ফযীলতের কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।)। দ্বিতীয়টি হল, ঈমানদারদের পরিবারের লোকেরা জান্নাতে এক সাথে বাস করবে। جَعَلَنَا اللهُ مِنَ الَّذِيْنَ يُلْحِقُهُمُ اللهُ بِآبَائِهِمُ الصَّالِحِيْنَ।