🕋 تفسير سورة التكوير
(At-Takwir) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ
📘 সূর্য যখন লেপটানো (নিষ্প্রভ) হবে, [১]
[১] অর্থাৎ, যেমন, মাথায় পাগড়ী লেপটানো হয় ঠিক তেমনি সূর্যের অস্তিত্বকে লেপটিয়ে ফেলে দেওয়া হবে। যার কারণে তার কিরণ আপনা আপনি শেষ হয়ে যাবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, সূর্য ও চন্দ্রকে কিয়ামত দিবসে গুটিয়ে নেওয়া হবে।
(সহীহ বুখারী সৃষ্টির প্রারম্ভ অধ্যায়, সূর্য ও চন্দ্র কক্ষপথে আবর্তনের পরিচ্ছেদ)
অন্যান্য বর্ণনা হতে বুঝা যায় যে, সূর্য ও চন্দ্রকে গুটিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। যাতে সেই মুশরিকরা অধিকভাবে লাঞ্ছিত হয় যারা এ সবের উপাসনা করত।
(ফতহুল বারী)
وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ
📘 যখন আমলনামাকে উন্মোচিত করা হবে।[১]
[১] মৃত্যুর সময় মানুষের আমলনামা গুটিয়ে দেওয়া হয়। পুনরায় কিয়ামতের দিন হিসাবের জন্য তা খোলা হবে। যা প্রতিটি ব্যক্তি তা প্রত্যক্ষ করবে। বরং প্রত্যেকের হাতে তা ধরিয়ে দেওয়া হবে।
وَإِذَا السَّمَاءُ كُشِطَتْ
📘 যখন আকাশের আবরণকে অপসারিত করা হবে। [১]
[১] অর্থাৎ, আকাশ ভেঙ্গে ফেলা হবে, যেমন ছাদ ভেঙ্গে ফেলা হয়।
وَإِذَا الْجَحِيمُ سُعِّرَتْ
📘 জাহান্নামের অগ্নিকে যখন প্রজ্বলিত করা হবে।
وَإِذَا الْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ
📘 এবং জান্নাতকে যখন নিকটবর্তী করা হবে।
عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ
📘 তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানবে, সে কি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।[১]
[১] এটা হল জওয়াবী বাক্য। অর্থাৎ, যখন উল্লিখিত বিষয়সমূহ প্রকাশ পাবে। তার মধ্যে ছয়টি বিষয় দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত এবং অন্য ছয়টি আখেরাতের সাথে সম্পৃক্ত। তখন প্রত্যেকের সামনে তার প্রকৃতত্ব এসে যাবে।
فَلَا أُقْسِمُ بِالْخُنَّسِ
📘 আমি প্রত্যাবর্তনকারী তারকাপুঞ্জের শপথ করছি;
الْجَوَارِ الْكُنَّسِ
📘 যা চলমান হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। [১]
[১] الخنس থেকে উদ্দেশ্য নক্ষত্রমালা। এ শব্দটির উৎপত্তি خنس থেকে হয়েছে। যার অর্থ হল পিছন ফিরে চলে যাওয়া। এই নক্ষত্রপুঞ্জ দিনের বেলায় লোকের দৃষ্টি হতে লুকিয়ে যায় এবং নজরে আসে না। আর এই নক্ষত্রগুলি হল শনি, বৃহস্পতি, শুক্র ও বুধগ্রহ। এসব নক্ষত্র বিশেষ করে সূর্যের মুখোমুখী অবস্থিত । কেউ কেউ বলেন, এখানে সমস্ত নক্ষত্রকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা, সমস্ত নক্ষত্রই নিজের অদৃশ্য হওয়ার স্থানে অদৃশ্য হয় কিংবা দিনের বেলায় গোপন থাকে। الجوار শব্দের অর্থ হল চলমান। الكنس অর্থ, লুকিয়ে যাওয়া; যেমন, হরিণ নিজের জায়গা ও ঠিকানায় লুকিয়ে যায়। (অনেকে এখান হতে 'ব্লাক হোল'-এর তথ্য প্রমাণ করে থাকেন।)
وَاللَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ
📘 শপথ রাত্রির, যখন তার অবসান হয়। [১]
[১] عسعس শব্দটি বিপরীতধর্মী অর্থবোধক শব্দ; এটি আগমন ও অবসান উভয় অর্থে ব্যবহার হয়। তবে এখানে অবসান হওয়ার অর্থেই ব্যবহার হয়েছে।
وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ
📘 আর ঊষার, যখন তার আবির্ভাব হয়। [১]
[১] অর্থাৎ, যখন সে প্রকাশ পায় ও উদয় হয় অথবা উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসে।
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
📘 নিশ্চয়ই এ (কুরআন) সম্মানিত বার্তাবহ (জিবরীলের) আনীত বাণী, [১]
[১] যেহেতু তিনি আল্লাহর নিকট থেকে তা মহানবী (সাঃ)-এর নিকট আনয়ন করেছেন। এ রসূল (বার্তাবহ) থেকে উদ্দেশ্য হল জিবরীল (আঃ)।
وَإِذَا النُّجُومُ انْكَدَرَتْ
📘 যখন নক্ষত্ররাজি দীপ্তিহীন হয়ে পড়বে, [১]
[১] এর দ্বিতীয় অর্থ হল যে, খসে পড়বে; অর্থাৎ, আসমানে তার অস্তিত্ব থাকবে না।
ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ
📘 যে মহাশক্তিধর,[১] আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাপ্রাপ্ত।
[১] অর্থাৎ, যে কাজের ভার তাঁর উপর অর্পণ করা হয় তা তিনি পূর্ণ শক্তিমত্তার সাথে সম্পাদন করেন।
مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ
📘 যে সেখানে মান্যবর এবং বিশ্বাসভাজন। [১]
[১] অর্থাৎ, ফিরিশতাবর্গের মাঝে তাঁর আনুগত্য করা হয়। তিনি হলেন ফিরিশতাবর্গের সর্দার ও মান্যবর। এ ছাড়া অহীর ব্যাপারেও তিনি আমানতদার।
وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ
📘 আর তোমাদের সাথী (মুহাম্মাদ) উন্মাদ নয়। [১]
[১] এই সম্বোধন হল মক্কাবাসীদের জন্য। আর 'সাথী' থেকে উদ্দেশ্য হল রসূল (সাঃ)। অর্থাৎ, তোমরা যে ধারণা কর, তোমাদের স্বগোত্রীয় ও স্বদেশী সাথী (মুহাম্মাদ (সাঃ)) পাগল - নাঊযুবিল্লাহ - সে এমন নয়। একটু কুরআন পড়ে তো দেখ যে, কোন পাগল কি এমন ধরনের তথ্য ও তত্ত্ব বিবৃত করতে পারে এবং পূর্ববর্তী জাতির সত্য ঘটনা বলতে পারে; যা কুরআনে উল্লেখ হয়েছে?
وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ
📘 অবশ্যই সে তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দর্শন করেছে। [১]
[১] এ কথা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে যে, রসূল (সাঃ) জিবরীল (আঃ)-কে দুই বার তাঁর আসল আকৃতিতে দর্শন করেছেন। তার মধ্যে এক বারের উল্লেখ তো এখানেই এসেছে। এটা নবুঅতের প্রথম অবস্থার ঘটনা। সেই সময় জিবরীল (আঃ)-এর ছয় শত ডানা ছিল। যা আকাশের প্রান্তকে ঘিরে ফেলেছিল। দ্বিতীয়বার দেখেছেন মি'রাজের রাত্রে। যেমন সূরা নাজম ৫৩:৬-১৮ নং আয়াতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِينٍ
📘 সে অদৃশ্য (অহী) প্রচারে কৃপণ নয়। [১]
[১] এখানে নবী (সাঃ)-এর ব্যাপারে স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, তাঁর নিকট যে খবর আসে, যে বিধি-বিধান ও ফরয অবতীর্ণ হয়, তার মধ্যে কোন বিষয়কে তিনি গোপন রাখেন না; বরং রিসালতের দায়িত্ব অনুভব করে প্রতিটি কথা ও বিধান লোকদের কাছে পৌঁছে দেন।
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَجِيمٍ
📘 এবং এ (কুরআন) বিতাড়িত শয়তানের কথা নয়। [১]
[১] যেমন, জ্যোতিষীদের নিকট শয়তান আসে এবং আসমানের কিছু চুরি করে শোনা গোপন কথা অসম্পূর্ণভাবে তাকে বলে দেয়। কুরআন কিন্তু এরূপ নয়।
فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ
📘 সুতরাং তোমরা কোথায় চলেছ? [১]
[১] অর্থাৎ, কেন তা হতে মুখ ফিরিয়ে নাও? আর কেন তাঁর আনুগত্য কর না?
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ
📘 এ তো শুধু বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ মাত্র;
لِمَنْ شَاءَ مِنْكُمْ أَنْ يَسْتَقِيمَ
📘 তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায় তার জন্য।
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
📘 আর বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তোমরা কোনই ইচ্ছা করতে পার না। [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের ইচ্ছা আল্লাহর তওফীকের উপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ইচ্ছায় আল্লাহ ইচ্ছা এবং তাঁর তওফীক শামিল না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সরল পথ অবলম্বন করতে পারবে না। এটা সেই বিষয় যা إنك لا تهدي من أحببت অর্থাৎ, 'তুমি যাকে ইচ্ছা কর, তাকে হিদায়াত করতে পার না।'
(সূরা ক্বাস্বাস ২৮:৫৬ নং)
প্রভৃতি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ
📘 পর্বতসমূহকে যখন চালিত করা হবে, [১]
[১] অর্থাৎ, যমীনকে উপড়ে দেওয়ার পর হাওয়াতে উড়িয়ে দেওয়া হবে। আর সে ধূনিত তুলোর ন্যায় উড়তে থাকবে।
وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ
📘 যখন পূর্ণ-গর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিতা হবে, [১]
[১] عشار শব্দটি হল عشراء এর বহুবচন। অর্থাৎ, এমন গাভীন উট যার দশ মাস পূর্ণ হয়ে গেছে। এমন উট সে যুগে আরববাসীদের নিকট খুবই প্রিয় এবং মূল্যবান ছিল। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন এমন ভয়ানক দৃশ্য হবে যে, যদি কারো কাছে এ ধরনের মূল্যবান উটও থাকে তবুও সে তখন তারও পরোয়া করবে না।
وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ
📘 যখন বন্য পশুগুলিকে একত্রিত করা হবে, [১]
[১] অর্থাৎ, তাদেরকেও কিয়ামতের দিবসে সমবেত করা হবে।
وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ
📘 এবং সমুদ্রগুলিকে যখন উদ্বেলিত করা হবে;[১]
[১] অন্য অর্থে, তাতে আল্লাহর আদেশে আগুন জ্বলে উঠবে এবং তার পানি শুকিয়ে যাবে।
وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ
📘 যখন আত্মাসমূহকে (স্ব-স্ব দেহে) পুনঃসংযোজিত করা হবে,[১]
[১] এর কয়েকটি মর্মার্থ বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে সর্বাধিক বেশী যুক্তিযুক্ত অর্থ এই যে, প্রতিটি মানুষকে তার পথ ও মতানুসারীর শ্রেণীভুক্ত করা হবে; অর্থাৎ মু'মিনকে মুমিনের সাথে, পাপীকে পাপী ব্যক্তির সাথে, ইহুদীকে ইহুদীর সাথে এবং খ্রিষ্টানকে খ্রিষ্টানের সাথে মিলানো হবে।
وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ
📘 যখন জীবন্ত-প্রোথিতা কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে,
بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ
📘 কোন্ অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? [১]
[১] এইরূপে আসলে হত্যাকারীকে ভৎর্সনা করা হবে সেদিন। কেননা, আসল অপরাধী তো সেই; সে কন্যা অপরাধিনী নয় যাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়েছিল।