🕋 تفسير سورة الشعراء
(Ash-Shuara) • المصدر: BN-TAFSIR-AHSANUL-BAYAAN
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ طسم
📘 ত্ব-সীম-মীম।
وَإِذْ نَادَىٰ رَبُّكَ مُوسَىٰ أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
📘 স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক মূসাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের নিকট যাও; [১]
[১] এটা প্রভুর ঐ সময়কার আহবান যখন মূসা (আঃ) মাদয়্যান হতে নিজ পরিবারসহ ফিরছিলেন। রাস্তায় তাপ গ্রহণের জন্য আগুনের প্রয়োজন বোধ হলে আগুনের খোঁজে তূর পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে এক অদৃশ্য আহবান তাঁকে অভ্যর্থনা জানায় এবং নবুঅত দানে ধন্য করা হয়। আর অত্যাচারীদের প্রতি আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
فَمَا لَنَا مِنْ شَافِعِينَ
📘 পরিণামে আমাদের কোন সুপারিশকারী নেই।
وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ
📘 এবং কোন সহৃদয় বন্ধুও নেই! [১]
[১] ঈমানদারদের মধ্যে যারা পাপী তাদের সুপারিশ আল্লাহর অনুমতিক্রমে আম্বিয়া ও স্বালেহীনগণ -- বিশেষ করে শেষ নবী (সাঃ) করবেন। কিন্তু কাফের ও মুশরিকদের জন্য সুপারিশ করার না কারো সাহস হবে এবং না তাতে অনুমতি হবে। আর না সেখানে কোন বন্ধুত্ব কাজে আসবে।
فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
📘 হায়! যদি আমাদের একবার প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা বিশ্বাসী হয়ে যেতাম!’[১]
[১] কাফের ও মুশরিকরা পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করবে, যাতে তারা আল্লাহর আনুগত্য করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে নিতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেছেন যে, যদি তাদেরকে পুনর্বার পৃথিবীতে পাঠিয়েও দেওয়া হয়, তাহলেও তারা তাই করবে, যা তারা পূর্বে করেছিল।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 এতে অবশ্যই এক নিদর্শন রয়েছে, [১] কিন্তু ওদের অধিকাংশ বিশ্বাসী নয়। [২]
[১] অর্থাৎ, ইবরাহীমের মূর্তিদের ব্যাপারে নিজ জাতির সাথে তর্ক-বিবাদ ও আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণাদি এই কথারই স্পষ্ট নিদর্শন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা'বূদ নেই।
[২] কেউ কেউ এর সম্পর্ক মক্কার মুশরিকদের তথা কুরাইশদের সাথে বলেছেন। অর্থাৎ, তাদের বেশির ভাগ লোক ঈমান আনবে না।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 আর নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ
📘 নূহের সম্প্রদায় রসূলগণকে মিথ্যা মনে করেছিল। [১]
[১] নূহ (আঃ)-এর জাতি যদিও শুধুমাত্র নূহ (আঃ)-কেই মিথ্যাবাদী মনে করেছিল, কিন্তু একজন নবীকে মিথ্যা ভাবা সকল নবীকে মিথ্যা ভাবার সমান। সেই জন্যই বলা হয়েছে নূহের সম্প্রদায় রসূলগণকে মিথ্যা মনে করেছিল।
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ
📘 যখন ওদের ভাই[১] নূহ ওদেরকে বলল, ‘তোমরা কি সাবধান হবে না?
[১] ভাই এই জন্যই বলা হয়েছে যে, যেহেতু নূহ ছিলেন ঐ জাতিরই একজন।
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ
📘 নিঃসন্দেহে আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল। [১]
[১] অর্থাৎ, আল্লাহ যে বাণী দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছেন, তা আমি তোমাদেরকে কম-বেশি না করে হুবহু পৌঁছে দেব।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। [১]
[১] অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর উপর ঈমান আনার ও শিরক না করার প্রতি আহবান জানাচ্ছি, এ ব্যাপারে তোমরা আমার আনুগত্য কর।
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না; আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে। [১]
[১] আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিচ্ছি, তার জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি না; বরং তার পারিশ্রমিক মহান আল্লাহর নিকট, যা কিয়ামত দিবসে তিনি আমাকে দান করবেন।
قَوْمَ فِرْعَوْنَ ۚ أَلَا يَتَّقُونَ
📘 ফিরআউনের সম্প্রদায়ের নিকট। ওরা কি ভয় করে না?’
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। [১]
[১] এ বাক্যটির পুনরাবৃত্তি তাকীদের জন্য অথবা পৃথক কারণেও হতে পারে। প্রথম আনুগত্যের আহবান আমানতদারীর ফলস্বরূপ ছিল। আর এখন এ আনুগত্যের দাওয়াত পার্থিব লোভ না থাকার ফলস্বরূপ।
۞ قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ
📘 ওরা বলল, ‘আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, যখন দেখছি ইতর লোকেরা তোমার অনুসরণ করছে?’ [১]
[১] أَرذَلُون শব্দটি أَرذَل এর বহুবচন। অর্থঃ ইতর লোক, যাদের সম্মান ও সম্পদ নেই এবং যার কারণে সমাজে তাদেরকে হীন, নীচ ও তুচ্ছ মনে করা হয়। আর সেই সঙ্গে ঐসব লোকও এর মধ্যে শামিল যারা হীন পেশার সঙ্গে জড়িত; এদের সকলকেই বুঝানো হয়েছে।
قَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
📘 নূহ বলল, ‘ওরা কি করত, তা আমি জানি না। [১]
[১] আমাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি যে, আমি মানুষের বংশ পরিচয়, ধনী, গরীব ও তাদের পেশা সম্পর্কে খোঁজ নেব, বরং আমার দায়িত্ব শুধুমাত্র এই যে, আমি ঈমানের প্রতি আহবান করব এবং যারা এই আহবানে সাড়া দেবে তাদেরকে নিজের দলভুক্ত করব, তাতে সে যেমনই হোক না কেন।
إِنْ حِسَابُهُمْ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّي ۖ لَوْ تَشْعُرُونَ
📘 ওদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাজ; [১] যদি তোমরা বুঝতে।
[১] অর্থাৎ, তাদের অন্তর ও আমলসমূহের খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহর।
وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الْمُؤْمِنِينَ
📘 বিশ্বাসীদের তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। [১]
[১] তুমি তোমার নিকট হতে হীন লোকদেরকে তাড়িয়ে দাও, তাহলে আমরা তোমার দলভুক্ত হব। এখানে এই ইচ্ছার উত্তর দেওয়া হয়েছে।
إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُبِينٌ
📘 আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।’ [১]
[১] অতএব যে আল্লাহর ভয়ে আমার আনুগত্য করবে, সে আমার ও আমি তার। দুনিয়ার চোখে সে উচ্চ হোক অথবা নীচ, সম্মানিত হোক বা অসম্মানিত।
قَالُوا لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ يَا نُوحُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمَرْجُومِينَ
📘 ওরা বলল, ‘হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও, তবে তোমাকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে নিহত করা হবে।’
قَالَ رَبِّ إِنَّ قَوْمِي كَذَّبُونِ
📘 নূহ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে।
فَافْتَحْ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَتْحًا وَنَجِّنِي وَمَنْ مَعِيَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
📘 সুতরাং আমার ও ওদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথে যেসব বিশ্বাসী আছে তাদেরকে রক্ষা কর।’
فَأَنْجَيْنَاهُ وَمَنْ مَعَهُ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ
📘 অতঃপর আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা ছিল, তাদেরকে বোঝাই নৌকায় (তুলে) রক্ষা করলাম।
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ
📘 তখন সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি আশংকা করি যে, ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।
ثُمَّ أَغْرَقْنَا بَعْدُ الْبَاقِينَ
📘 তারপর অবশিষ্ট সকলকে ডুবিয়ে দিলাম।[১]
[১] এর বিস্তারিত আলোচনা কিছু পার হয়ে গেছে, আর কিছু পরবর্তীতে আসবে। নূহ (আঃ) ৯৫০ বছর দাওয়াতের কাজ করা সত্ত্বেও তাঁর জাতির লোক অসৎ ব্যবহার ও বিমুখতার উপরেই কায়েম থাকল। পরিশেষে নূহ (আঃ) অভিশাপ করলেন। আল্লাহ কিশ্তী তৈরী করার ও তাতে ঈমানদার মানুষ, জীব-জন্তু ও প্রয়োজনীয় মালপত্র তুলে নেওয়ার আদেশ দিলেন। আর এভাবে ঈমানদারদের বাঁচিয়ে নিয়ে অন্যদেরকে -- এমন কি তার স্ত্রী-পুত্রকেও, যারা ঈমান আনেনি -- ডুবিয়ে মেরে ফেলা হল।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 আর নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
كَذَّبَتْ عَادٌ الْمُرْسَلِينَ
📘 আ’দ সম্প্রদায় রসূলগণকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল। [১]
[১] আ'দ তাদের প্রপিতামহের নাম। যার নামেই জাতির নাম পড়ে গেছে। এখানে আ'দকে قَبِيلَة কল্পনা করে كَذَّبَت স্ত্রীলিঙ্গ ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে।
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ هُودٌ أَلَا تَتَّقُونَ
📘 যখন ওদের ভাই হূদ[১] ওদেরকে বলল, ‘তোমরা কি সাবধান হবে না?
[১] হূদ (আঃ)-কেও আ'দ জাতির ভাই বলা হয়েছে। কারণ, প্রত্যেক নবী সেই জাতির একজন সদস্য হয়ে থাকেন, যাদের নিকট তাঁকে নবী হিসাবে পাঠানো হয়। আর সেই কারণেই তাঁকে তাদের ভাই বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন পরে আসবে; পরন্তু নবী ও রসূলদের মানুষ হওয়াটাই তাঁদের জাতির ঈমান আনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ধারণা মতে নবী মানুষ নয় বরং মানুষের ঊর্ধ্বে অন্য কিছু হওয়া দরকার। আজও এই স্বস্বীকৃত সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞ লোকেরা ইসলামের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-কেও মানুষের ঊর্ধ্বে অন্য কিছু বুঝানোর অপচেষ্টায় ব্যস্ত। যদিও তিনি কুরাইশ বংশের একজন ছিলেন, যাদের নিকট তাঁকে প্রথম নবী করে পাঠানো হয়েছিল।
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ
📘 আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 অতএব আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আছে।
أَتَبْنُونَ بِكُلِّ رِيعٍ آيَةً تَعْبَثُونَ
📘 তোমরা তো প্রতিটি উচ্চস্থানে অযথা ইমারত (স্তম্ভ) নির্মাণ করছ (পথিকের সাথে হাসি-তামাশা করার জন্য);[১]
[১] رِيع শব্দটি رِيعَة এর বহুবচন। যার অর্থ উঁচু ভূমি, উঁচু ঢিবি, পাহাড়, উপত্যকা বা রাস্তা। রাস্তার উপর অযথা এমন ইমারত (বা স্তম্ভ) তৈরী করত যা উচ্চতায় একটি নিদর্শন হত। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য তাতে বাস করা নয় বরং শুধু খেল-তামাশা করা হত। হূদ (আঃ) তাদেরকে এই বলে নিষেধ করলেন যে, তোমরা এমন কাজ করছ, যাতে সময় ও সম্পদ উভয়ই নষ্ট হচ্ছে। আর তার পশ্চাতে উদ্দেশ্যও এমন, যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার কোনই উপকার নেই। বরং তার বেকার ও অনর্থক হওয়াতে কোন সন্দেহ নেই।
وَتَتَّخِذُونَ مَصَانِعَ لَعَلَّكُمْ تَخْلُدُونَ
📘 তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছ এ মনে করে যে, তোমরা (পৃথিবীতে) চিরস্থায়ী হবে। [১]
[১] অনুরূপ তারা বিশাল বিশাল মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করত, যেন তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে।
وَيَضِيقُ صَدْرِي وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إِلَىٰ هَارُونَ
📘 এবং আমার হৃদয় সংকুচিত হয়ে পড়ছে,[১] আমার জিহ্বা অচল হয়ে যাচ্ছে।[২] সুতরাং হারূনের প্রতিও (প্রত্যাদেশ) পাঠাও। [৩]
[১] এই ভয়ে যে, ওরা বড় উদ্ধত, ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করবে। এখান হতে বোঝা গেল যে, নবীগণও প্রকৃতিগত ভয়ে ভীত হতে পারেন।
[২] এখানে এই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মূসা (আঃ) বাকপটু ছিলেন না। অথবা এই যে, মুখে আগুনের আঙ্গার ভরে নেওয়ার জন্য তিনি তোতলা হয়ে গিয়েছিলেন; যেমন মুফাসসিরগণ বর্ণনা করে থাকেন।
[৩] অর্থাৎ, জিবরীল (আঃ)-কে তার নিকট অহী দিয়ে পাঠান এবং তাকেও অহী ও নবুঅত দিয়ে আমার সহকারী বানান।
وَإِذَا بَطَشْتُمْ بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ
📘 আর যখন তোমরা আঘাত হানো, তখন নিষ্ঠুরভাবে আঘাত হেনে থাক। [১]
[১] এখানে তাদের অত্যাচার, কঠোরতা ও শক্তিমত্তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। [১]
[১] হূদ (আঃ) যখন তাদের সেই মন্দ গুণগুলো বর্ণনা করলেন, যা তাদের দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকা এবং অত্যাচার ও অবাধ্যতার ইঙ্গিত বহন করে, তখন তিনি পুনরায় তাদেরকে আল্লাহ-ভীরুতা ও নিজ আনুগত্যের দাওয়াত দিলেন।
وَاتَّقُوا الَّذِي أَمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُونَ
📘 ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন সে সকল সম্পদ দিয়ে, যা তোমরা জান;
أَمَدَّكُمْ بِأَنْعَامٍ وَبَنِينَ
📘 তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু ও সন্তান-সন্ততি,
وَجَنَّاتٍ وَعُيُونٍ
📘 উদ্যানরাজি ও বহু প্রস্রবণ;
إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
📘 নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করি।’ [১]
[১] অর্থাৎ, যদি তোমরা কুফরীর উপর অটল থাক এবং মহান আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেছেন, সে সবের কৃতজ্ঞতা স্বীকার না কর, তাহলে তোমরা আল্লাহর আযাবের উপযুক্ত হবে। আর এ আযাব দুনিয়াতেও আসতে পারে। আর আখেরাত তো শান্তি ও শাস্তির জন্যই নির্ধারিত। সেখানে আযাব হতে বাঁচার কোন উপায় থাকবে না।
قَالُوا سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَوَعَظْتَ أَمْ لَمْ تَكُنْ مِنَ الْوَاعِظِينَ
📘 ওরা বলল, ‘তুমি উপদেশ দাও অথবা না-ই দাও উভয়ই আমাদের নিকট সমান।
إِنْ هَٰذَا إِلَّا خُلُقُ الْأَوَّلِينَ
📘 এ তো পূর্বপুরুষদেরই রীতিনীতি মাত্র। [১]
[১] অর্থাৎ, এ তো ঐ কথাই যা পূর্বের লোকেরাও বলত। অথবা এর অর্থ এই যে, আমরা যে ধর্মরীতি-নীতির উপর কায়েম আছি, তাতে আমাদের পূর্ব পুরুষরাও কায়েম ছিল। উভয় অর্থেই উদ্দেশ্য এই যে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ছাড়তে রাজী নই।
وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ
📘 আর আমাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে না!’ [১]
[১] যখন তারা এ কথা প্রকাশ করল যে, আমরা বাপ-দাদার ধর্ম ছাড়ব না; যার মধ্যে পরকালের অস্বীকৃতিও শামিল। সেই জন্য তারা আযাবে গ্রেফতার হওয়ার কথাও অস্বীকার করল। কারণ, আল্লাহর আযাবের ভয় তাদের থাকে, যারা আল্লাহকে মান্য করে ও পরকালের জীবনকে স্বীকার ও বিশ্বাস করে।
فَكَذَّبُوهُ فَأَهْلَكْنَاهُمْ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 সুতরাং ওরা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করল, ফলে আমি ওদেরকে ধ্বংস করলাম। [১] এতে অবশ্যই আছে নিদর্শন; কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
[১] আ'দ জাতি ছিল পৃথিবীর শক্তিশালী জাতিদের অন্যতম। যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,{الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ} অর্থাৎ, এ রকম জাতি পৃথিবীতে সৃষ্টিই হয়নি।
(সূরা ফাজর ৮৯:৮ আয়াত)
অর্থাৎ, এমন জাতি যারা শক্তি, ক্ষমতা ও প্রতাপের দিক দিয়ে তাদের মত। সেই জন্য তারা বলত,{مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً} আমাদের থেকে শক্তিশালী আর কে আছে?
(সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:১৫ আয়াত)
কিন্তু যখন ঐ জাতি কুফরীর রাস্তা ত্যাগ করে ঈমানের রাস্তা অবলম্বন করল না, তখন মহান আল্লাহ আযাব স্বরূপ এক কঠিন ঝড় তাদের উপর প্রেরণ করলেন, যা অবিরত সাত রাত আট দিন তাদের উপর বয়েছিল। ঝড় এক একটি মানুষকে উপরে তুলে মাটির উপর আছড়ে দিয়েছিল, যার কারণে তাদের মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের লাশগুলি বিনা মাথায় এমনভাবে মাটির উপর পড়ে ছিল, যেন তা খেজুরের সারশূন্য কান্ড। তারা পাহাড় কেটে, পাহাড়ের গুহায় বিশাল বিশাল প্রাসাদ তৈরী করেছিল, পানির জন্য গভীর কূপ খনন করেছিল এবং বহু বাগানের মালিক ছিল তারা। কিন্তু যখন আল্লাহর আযাব এসে পৌঁছল, তখন এ সমস্ত জিনিস তাদের কোনই কাজে এল না। আর তা তাদেরকে পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ল।
وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونِ
📘 আমার বিরুদ্ধে ওদের এক অভিযোগ আছে, আমি আশংকা করি, ওরা আমাকে হত্যা করবে।’[১]
[১] এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে ঐ হত্যার প্রতি, যা মূসা (আঃ) কর্তৃক অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে গিয়েছিল। যাকে হত্যা করা হয়েছিল সে ছিল কিবতী; ফিরআউনের দলের লোক। সেই কারণে ফিরআউন মূসা (আঃ)-কে তার প্রতিশোধে হত্যা করতে চাচ্ছিল। যার সংবাদ পেয়ে মূসা (আঃ) মিসর ছেড়ে মাদয়্যান চলে যান। যদিও উক্ত ঘটনার পর বেশ কয়েক বছর কেটে গিয়েছিল। তবুও এ আশঙ্কা ছিল যে, ফিরআউন সেই অপরাধে তাঁকে ধরে হত্যার শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করবে। সেই কারণে এই ভয়ও অযথা ছিল না।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 আর নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
كَذَّبَتْ ثَمُودُ الْمُرْسَلِينَ
📘 সামূদ সম্প্রদায়[১] রসূলগণকে মিথ্যাজ্ঞান করেছিল।
[১] সামূদ জাতির বাসস্থান ছিল হিজর, যা হিজাযের উত্তরে অবস্থিত। আজ-কাল যা মাদায়েন সালেহ নামে পরিচিত।
(আইসারুত তাফাসীর)
এরা ছিল আরবী। নবী (সাঃ) তাবুক যাওয়ার সময় তাদের এলাকার উপর দিয়ে পার হয়েছিলেন। যেমন, এর পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُونَ
📘 যখন ওদের ভ্রাতা সালেহ ওদেরকে বলল, ‘তোমরা কি সাবধান হবে না?
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ
📘 নিঃসন্দেহে আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 অতএব আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর।
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে।
أَتُتْرَكُونَ فِي مَا هَاهُنَا آمِنِينَ
📘 তোমাদেরকে কি পার্থিব ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিরাপদে ছেড়ে দেওয়া হবে; [১]
[১] অর্থাৎ, এসব নিয়ামত তোমরা কি চিরস্থায়ী ভোগ করবে? তোমাদের উপর কি মৃত্যুও আসবে না এবং আযাবও আসবে না? এখানে জিজ্ঞাসা অস্বীকৃতি ও সতর্কতামূলক। অর্থাৎ, এ রকম নয়; বরং আযাব বা মৃত্যুর মাধ্যমে যখন আল্লাহ চাইবেন তখনই তোমাদেরকে এ সব নিয়ামত হতে বঞ্চিত করবেন। এই আয়াতে একদিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় কর। অন্যদিকে ভয়ও দেখানো হয়েছে যে, যদি ঈমান ও কৃতজ্ঞতার রাস্তা অবলম্বন না কর, তাহলে ধ্বংসই হবে তোমাদের শেষ পরিণতি।
فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ
📘 উদ্যানরাজি ও প্রস্রবণসমূহে,
وَزُرُوعٍ وَنَخْلٍ طَلْعُهَا هَضِيمٌ
📘 শস্যক্ষেত্র এবং খেজুর বাগানে; যার মোছা নরম? [১]
[১] এখানে ঐ সমস্ত নিয়ামতের বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে, যা তারা প্রাপ্ত হয়েছিল। طَلع খেজুরের মোছাকে বলা হয়, যা প্রথম প্রথম বের হয়। তারপর খেজুরের ফলকে بَلح তারপর بُسر তারপর رُطَب তারপর تَمْر বলা হয়।
(আইসারুত তাফাসীর)
বাগানের কথা বললে খেজুরের গাছও ওর মধ্যে এসে যায় কিন্তু যেহেতু আরবদের নিকট খেজুরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে বলে তাকে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। هَضِيم শব্দের আরো কয়েকটি অর্থ বলা হয়েছে, যেমন নরম, স্পর্শকাতর, থাকথাক ইত্যাদি।
وَتَنْحِتُونَ مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا فَارِهِينَ
📘 তোমরা তো নৈপুণ্যের সাথে পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করছ। [১]
[১] فَارِهِين অর্থাৎ, প্রয়োজনের অধিক শিল্পকলা, কারুকার্য, নৈপুণ্য ও দক্ষতা প্রদর্শন করে বা অহংকার ও গর্ব করে। যেমন, আজকাল লোকদের অবস্থা। আজও অট্টালিকায় অনাবশ্যক শিল্পকলার ও অপ্রয়োজনীয় কারুকার্যের খুব বেশি প্রকাশ হচ্ছে। আর এ সবের মাধ্যমে আপোসের মাঝে গর্ব ও অহংকার প্রদর্শনও হচ্ছে।
قَالَ كَلَّا ۖ فَاذْهَبَا بِآيَاتِنَا ۖ إِنَّا مَعَكُمْ مُسْتَمِعُونَ
📘 আল্লাহ বললেন, ‘না, কিছুতেই পারবে না। অতএব তোমরা উভয়ে আমার নিদর্শনসহ যাও;[১] নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সঙ্গে শ্রবণকারী থাকব। [২]
[১] মহান আল্লাহ সান্ত্বনা দিচ্ছেন যে, তোমরা উভয়ে যাও এবং আমার বাণী পৌঁছে দাও। তোমরা যার আশংকা করছ, তা হতে আমি তোমাদেরকে হিফাযত করব। 'নিদর্শন' বলতে ঐসব দলীল-প্রমাণাদি, যার দ্বারা প্রত্যেক নবীকে সমৃদ্ধ করা হয়। বা ঐসব মু'জিযা (অলৌকিক বস্তু) যা মূসা (আঃ)-কে দান করা হয়েছিল; যেমন শুভ্র হাত ও লাঠি ইত্যাদি।
[২] অর্থাৎ, তোমরা যা কিছু বলবে ও সে প্রত্যুত্তরে যা কিছু বলবে, আমি সব শুনব। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমাদেরকে রিসালাতের দায়িতত্ত্ব দেওয়ার পর তোমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন হব না। বরং আমার সাহায্য তোমাদের সঙ্গে থাকবে। এখানে 'সঙ্গ' বলতে সহায়তা ও সমর্থন বুঝানো হয়েছে।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।
وَلَا تُطِيعُوا أَمْرَ الْمُسْرِفِينَ
📘 এবং সীমালংঘনকারীদের[১] আদেশ মান্য করো না;
[১] مُسْرِفِين (সীমালংঘনকারী) বলতে এমন সর্দার ও নেতাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা কুফর ও শিরকের আহবায়ক ও সত্যের বিরোধিতায় অগ্রগামী ছিল।
الَّذِينَ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ
📘 এরা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না।’
قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَّرِينَ
📘 ওরা বলল, ‘তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
مَا أَنْتَ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا فَأْتِ بِآيَةٍ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ
📘 তুমি তো আমাদেরই মত একজন মানুষ, কাজেই তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে কোন একটি নিদর্শন উপস্থিত কর।’
قَالَ هَٰذِهِ نَاقَةٌ لَهَا شِرْبٌ وَلَكُمْ شِرْبُ يَوْمٍ مَعْلُومٍ
📘 সালেহ বলল, ‘এ যে উটনী, এর জন্য রয়েছে পানি পানের পালা এবং তোমাদের জন্য রয়েছে নির্ধারিত দিনে পানি পানের পালা।[১]
[১] এই সেই উটনী, যা তাদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ের এক পাথর হতে মু'জিযাস্বরূপ বের হয়েছিল। এক দিন এই উটনীর জন্য এবং পরদিন তাদের উটের পানি পান করার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। আর তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিল, যেদিন তোমাদের পালা সেদিন ঐ উটনী ঘাটে আসবে না। আর যেদিন উটনীর পানি পান করার পালা সেদিন তোমাদের ঘাটে আসার অনুমতি নেই।
وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَظِيمٍ
📘 একে কোন কষ্ট দিয়ো না; দিলে মহাদিনের শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হবে।’ [১]
[১] দ্বিতীয় কথা তাদের এই বলা হয়েছিল যে, কোন ব্যক্তি ঐ উটনীকে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করবে না এবং তার কোন ক্ষতি করবে না। অতএব ঐ উটনী তাদের মাঝে এইভাবেই থাকল। ঘাটে গিয়ে পানি পান করত ও ঘাস খেয়ে দিন কাটাত। কথিত আছে সামূদ জাতি তার দুধ দোহন করত ও তার থেকে উপকৃত হত। কিন্তু কিছু দিন পার হলে তারা তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করল।
فَعَقَرُوهَا فَأَصْبَحُوا نَادِمِينَ
📘 কিন্তু ওরা ওকে হত্যা করল, [১] পরিণামে ওরা অনুতপ্ত হল। [২]
[১] অর্থাৎ, এই উটনী মহান আল্লাহর ক্ষমতার এক বিশাল নিদর্শন এবং নবীর সত্যতার প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও সামূদ জাতি ঈমান আনল না এবং কুফর ও শিরকের রাস্তায় অটল থাকল। আর তাদের অবাধ্যতা এত বেশি বৃদ্ধি পেল যে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কুদরতের জলজ্যান্ত নিদর্শন উটনীর পা কেটে ফেলল, যার কারণে সে বসে পড়ল ও পরে তারা তাকে হত্যা করল!
[২] এটি তখন ঘটল যখন সালেহ (আঃ) উটনী হত্যার পর বললেন, তোমাদেরকে মাত্র তিন দিনের অবকাশ দেওয়া হল। চতুর্থ দিন তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এরপর যখন সত্য সত্যই আযাবের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করল, তখন তাদের পক্ষ হতে অনুশোচনা প্রকাশ পেল। কিন্তু আযাবের নিদর্শন দেখে নেওয়ার পর অনুশোচনা ও তওবা কোনই কাজে আসে না।
فَأَخَذَهُمُ الْعَذَابُ ۗ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 অতঃপর শাস্তি ওদেরকে গ্রাস করল।[১] এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
[১] এই আযাব ছিল নীচ হতে ভূমিকম্প ও উপর হতে কঠিন ও বিকট শব্দ যার কারণে সকলেই মারা পড়ল।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
فَأْتِيَا فِرْعَوْنَ فَقُولَا إِنَّا رَسُولُ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 অতএব তোমরা ফিরআউনের নিকট যাও এবং বল, আমরা তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের রসূল।
كَذَّبَتْ قَوْمُ لُوطٍ الْمُرْسَلِينَ
📘 লূতের সম্প্রদায়[১] রসূলগণকে মিথ্যা মনে করেছিল।
[১] লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর ভাই হারান বিন আযরের পুত্র ছিলেন। তাঁকে ইবরাহীমের জীবিতাবস্থায় নবী করে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর জাতির লোক সাদূম ও আম্মূরাতে বাস করত। এই সব জনপদ ছিল শাম দেশের অন্তর্ভুক্ত।
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ لُوطٌ أَلَا تَتَّقُونَ
📘 যখন ওদের ভ্রাতা লূত ওদেরকে বলল, ‘তোমরা কি সাবধান হবে না?
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ
📘 আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে।
أَتَأْتُونَ الذُّكْرَانَ مِنَ الْعَالَمِينَ
📘 মানুষের মধ্যে তোমরা তো কেবল পুরুষদের সাথেই কুকর্ম কর
وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ ۚ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ عَادُونَ
📘 এবং তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন তাদেরকে তোমরা বর্জন করে থাক; [১] বরং তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।’ [২]
[১] এটি ছিল লূত জাতির সব থেকে বড় কুঅভ্যাস। পৃথিবীর ইতিহাসে যার প্রথম সূত্রপাত হয়েছিল এদেরই নিকট হতে। সেই জন্য এই কুকাজকে আরবীতে 'লূত্বিয়্যাহ' এবং উর্দুতে 'লেওয়াত্বাত' বলা হয়। অর্থাৎ, এমন পাপকর্ম যার সূত্রপাত লূত নবীর সম্প্রদায় দ্বারা হয়েছে। কিন্তু এখন এই পাপ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে। বরং ইউরোপে একে আইনতঃ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখন তাদের নিকট এটা কোন পাপ বলেই গণ্য নয়। যে জাতির নৈতিক চরিত্র এত বিগড়ে গেছে যে, নারী-পুরুষের (পরস্পর সম্মতিক্রমে) অবৈধ যৌন-মিলন তাদের নিকট অন্যায় নয়, পাপ নয়, সে জাতির নিকট দুই পুরুষের আপোসের যৌন-মিলন (সমকামিতা) কিভাবে পাপ ও অন্যায়রূপে গণ্য হতে পারে? (আল্লাহ আমাদেরকে উক্ত প্রকার নৈতিক অবক্ষয় হতে রক্ষা করুন।)
[২] عَادُون শব্দটি عَادٍ শব্দের বহুবচন। আরবীতে عَادٍ শব্দের অর্থ সীমা অতিক্রমকারী। অর্থাৎ, সত্যকে ছেড়ে অসত্য ও হালালকে ছেড়ে হারাম এখতিয়ারকারী। মহান আল্লাহ শরয়ী বিবাহ-বন্ধন দ্বারা নারীর লজ্জাস্থানকে ব্যবহার করে নিজ যৌন-বাসনা পূর্ণ করা হালাল করেছেন এবং এ কাজের জন্য পুরুষ (তথা স্ত্রীর) পায়খানা-দ্বারকে ব্যবহার করা হারাম করেছেন। লূত-সম্প্রদায় স্ত্রীর যোনিপথ বর্জন করে পুরুষদের পায়ুদ্বার ব্যবহার করত বলে তারা সীমা অতিক্রমকারীরূপে গণ্য হয়েছে।
قَالُوا لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ يَا لُوطُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمُخْرَجِينَ
📘 ওরা বলল, ‘হে লূত! যদি নিবৃত্ত না হও, তাহলে অবশ্যই তুমি নির্বাসিত হবে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, লূত (আঃ)-এর উপদেশ ও নসীহতের প্রত্যুত্তরে তারা বলল, তুমি খুব বেশী পবিত্র সাজতে চাও। মনে রেখো, যদি তুমি বিরত না হও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের গ্রামে বাস করতেই দেব না। বলা বাহুল্য, আজকালও পাপের এত বিশাল ক্ষমতা ও পাপিষ্ঠদের এত বড় আধিপত্য যে, পুণ্য ও পুণ্যবান মুখ লুকিয়ে সমাজে বাস করতে বাধ্য হয় এবং সৎকর্মশীলদের জীবন সংকীর্ণ করে তোলা হয়!
قَالَ إِنِّي لِعَمَلِكُمْ مِنَ الْقَالِينَ
📘 লূত বলল, ‘আমি তো তোমাদের এ কুকর্মকে ঘৃণা করি [১]
[১] অর্থাৎ, আমি এ কাজ পছন্দ করি না এবং আমি এ ব্যাপারে চরম নারাজ।
رَبِّ نَجِّنِي وَأَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ
📘 হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এবং আমার পরিবার পরিজনকে ওদের কুকর্ম হতে রক্ষা কর।’
أَنْ أَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ
📘 সুতরাং আমাদের সঙ্গে বনী-ইস্রাঈলকে যেতে দাও।’ [১]
[১] অর্থাৎ, একটি কথা তুমি এই বল যে, আমি তোমার কাছে নিজের ইচ্ছায় আসিনি; বরং আল্লাহর প্রতিনিধি ও রসূল হিসাবে এসেছি। আর দ্বিতীয় কথা, তুমি (চারশ' বছর ধরে) বনী-ইস্রাঈলকে দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ রেখেছ, তাদেরকে মুক্ত ও স্বাধীন করে দাও; আমি তাদেরকে শাম দেশে নিয়ে যাব। যেহেতু এ বিষয়ে আল্লাহ তাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছেন।
فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ أَجْمَعِينَ
📘 সুতরাং আমি তাকে এবং তার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করলাম;
إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَابِرِينَ
📘 এক বৃদ্ধা ব্যতীত, যে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। [১]
[১] এ বৃদ্ধা বলতে লূত (আঃ)-এর বৃদ্ধা স্ত্রীকে বুঝানো হয়েছে; যে মুসলিম ছিল না। তাকেও তাঁর জাতির সঙ্গে ধ্বংস করা হয়েছিল।
ثُمَّ دَمَّرْنَا الْآخَرِينَ
📘 অতঃপর অপর সকলকে ধ্বংস করলাম।
وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ
📘 তাদের উপর বিশেষ ধরনের বৃষ্টিবর্ষণ করলাম, যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল তাদের জন্য এ বৃষ্টি ছিল কত নিকৃষ্ট [১]
[১] অর্থাৎ, চিহ্নিত পাথর কাঁকরের বৃষ্টি দ্বারা আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছিলাম এবং তাদের গ্রামকে তাদেরই উপর উল্টে দিয়েছিলাম। যেমন সূরা হূদের ১১:৮২-৮৩ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
كَذَّبَ أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ الْمُرْسَلِينَ
📘 আইকাহবাসীরা[১] রসূলগণকে মিথ্যা মনে করেছিল;
[১] 'আইকাহ' জঙ্গলকে বলা হয়। এখানে শুআইব (আঃ)-এর জাতি ও মাদয়্যান শহরের আশপাশের বাসিন্দাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আরো বলা হয় যে, 'আইকাহ' অর্থ ঘন ডাল-পাতা বিশিষ্ট গাছ। আর এ রকমই একটি গাছ মাদয়্যানের উপকণ্ঠে ছিল, যার পূজা করা হত। শুআইব (আঃ)-এর নবুঅতের পরিধি ও দাওয়াত-তাবলীগের পরিসীমা মাদয়্যান থেকে ওর আশপাশের বসতি পর্যন্ত ছিল; যেখানে 'আইকাহ' গাছের পূজা হত। সেখানে বসবাসকারীদেরকে 'আসহাবুল আইকাহ' বলা হয়েছে। এই হিসাবে 'আসহাবুল আইকাহ' ও মাদয়্যানবাসীদের নবী ছিলেন একজন, অর্থাৎ কেবল শুআইব (আঃ)। আর এই উভয় জাতিই ছিল একই নবীর উম্মত। 'আইকাহ' যেহেতু জাতি নয়, বরং একটি গাছ সেহেতু এখানে ভাই সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যেমন, অন্যান্য জাতির নবীর ক্ষেত্রে করা হয়েছে। অবশ্য যেখানে মাদয়্যানের সঙ্গে শুআইব (আঃ)-এর উল্লেখ হয়েছে সেখানে ভাই সম্পর্ক জুড়ে বর্ণনা করা হয়েছে। যেহেতু মাদয়্যান একটি জাতির নাম।
{وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا} (৮৫) سورة الأعراف কোন কোন তফসীরকারগণ (আইকাহ ও মাদয়্যানকে) আলাদা আলাদা বসতি ধরে আসহাবুল আইকাহ ও মাদয়্যানবাসীদেরকে পৃথক পৃথক দু'টি উম্মত বলেছেন। যাদের নিকট পালাক্রমে শুআইব (আঃ)-কে পাঠানো হয়েছিল; একবার মাদয়্যানের দিকে ও আর একবার আসহাবুল আইকার দিকে। কিন্তু ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেছেন, সঠিক তথ্য হল, এরা ছিল একটিই উম্মত। কারণ ওজন ও মাপে কমবেশী করার ব্যাপারে যে উপদেশ মাদয়্যানবাসীদেরকে দেওয়া হয়েছে, সেই একই উপদেশ আসহাবুল আইকাদেরকেও দেওয়া হয়েছে। যাতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, এরা একই উম্মত, দুই নয়।
إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ أَلَا تَتَّقُونَ
📘 যখন শুআইব ওদেরকে বলল, ‘তোমরা কি সাবধান হবে না?
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ
📘 নিঃসন্দেহে আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল।
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
📘 সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর ।
قَالَ أَلَمْ نُرَبِّكَ فِينَا وَلِيدًا وَلَبِثْتَ فِينَا مِنْ عُمُرِكَ سِنِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘আমরা কি তোমাকে শিশু অবস্থায় আমাদের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করিনি[১] এবং তুমি কি তোমার জীবনের বহু বছর আমাদের মধ্যে কাটাও নি?[২]
[১] ফিরআউন মূসার (আঃ)-এর আহবান ও দাবীর কথা চিন্তা-ভাবনা না করে তাকে অপমান ও লজ্জিত করতে শুরু করল; বলল, 'তুমি কি সেই নও, যে আমার কোলে ও আমার বাড়িতে লালিত-পালিত হয়েছে; যখন আমি বনী-ইস্রাঈলের সন্তানদেরকে হত্যা করছিলাম?'
[২] কেউ কেউ বলেন, মূসা (আঃ) ফিরআউনের রাজ-প্রাসাদে ১৮ বছর, কেউ বলেন ৩০ বছর, আবার কেউ বলেন ৪০ বছর কাটিয়েছেন। অর্থাৎ, এতদিন আমার কাছে কাটানোর পর কয়েক বছর এদিক সেদিকে থেকে এসে নবুঅতের দাবী করতে শুরু করেছ?
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে।
۞ أَوْفُوا الْكَيْلَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُخْسِرِينَ
📘 মাপ পূর্ণমাত্রায় প্রদান কর এবং যারা মাপে কম দেয়, তাদের মত হয়ো না। [১]
[১] অর্থাৎ, যখন তোমরা লোকদেরকে মেপে দাও, তখন সেইরূপ পূর্ণ দাও, যেরূপ তাদের কাছ হতে নেওয়ার সময় পূর্ণ মেপে নিয়ে থাকো। আর দেওয়ার ও নেওয়ার মাপযন্ত্র আলাদা আলাদা রাখবে না, যাতে দেওয়ার সময় কম দেবে এবং নেওয়ার সময় পূর্ণ নেবে!
وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ
📘 আর সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন কর। [১]
[১] অনুরূপ ওজন করার সময় দাঁড়ি মারবে না বরং পূর্ণ ও সঠিক ওজন করো।
وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
📘 লোকদেরকে তাদের প্রাপ্যবস্তু কম দিও না[১] এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটায়ো না।[২]
[১] অর্থাৎ, অন্যদের দেওয়ার সময় মাপে বা ওজনে কম দিয়ো না।[২] অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্য হয়ো না। কারণ এর ফলে পৃথিবীতে ফাসাদ ও অশান্তি ছড়ায়। কেউ কেউ এই বিপর্যয় থেকে রাহাজানি অর্থ নিয়েছেন; যা এই জাতি করত। যেমন, অন্যত্র বলা হয়েছে{وَلاَ تَقْعُدُواْ بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعِدُونَ} অর্থাৎ, মানুষদেরকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে রাস্তায় বসো না।
(সূরা আ'রাফ ৭:৮৬ আয়াত, ইবনে কাসীর)
وَاتَّقُوا الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالْجِبِلَّةَ الْأَوَّلِينَ
📘 এবং ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহকে সৃষ্টি করেছেন।’[১]
[১] جِبِلَّة ও جِبِلٌّ শব্দ দুটির অর্থ সৃষ্টি। যেমন অন্যত্র শয়তানের ব্যাপারে বলা হয়েছে,{وَلَقَدْ أَضَلَّ مِنكُمْ جِبِلاًّ كَثِيرًا} সে তোমাদের অনেক সৃষ্টিকেই ভ্রষ্ট করেছে।
(সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬২ আয়াত)
এর ব্যবহার বড় দল ও জাতির অর্থেও হয়ে থাকে।
(ফাতহুল কাদীর)
قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَّرِينَ
📘 ওরা বলল, ‘তুমি তো যাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
وَمَا أَنْتَ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَإِنْ نَظُنُّكَ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ
📘 তুমি তো আমাদেরই মত একজন মানুষ। আমরা মনে করি, তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্যতম। [১]
[১] অর্থাৎ, তোমার যে দাবী যে, আল্লাহ তোমাকে অহী ও রিসালাত দান করেছেন, সে দাবী আমরা মিথ্যা মনে করি। কারণ তুমিও আমাদের মত একজন মানুষ। তুমি ঐ সম্মানে কিভাবে সম্মানিত হতে পার?!
فَأَسْقِطْ عَلَيْنَا كِسَفًا مِنَ السَّمَاءِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ
📘 তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে একখন্ড আকাশ আমাদের ওপর ফেলে দাও।’ [১]
[১] এটি তারা শুআইব (আঃ)-এর শাস্তির ভয় দেখানোর প্রত্যুত্তরে বলেছিল যে, যদি তুমি বাস্তবেই সত্যবাদী হও, তাহলে যাও আমরা তোমাকে মানি না। আমাদের উপর আকাশ ভেঙ্গে ফেলাও দেখি!
قَالَ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ
📘 সে বলল, ‘আমার প্রতিপালক ভাল জানেন তোমরা যা কর।’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমরা যা কিছু কুফর ও শিরক করছ, মহান আল্লাহ তা প্রত্যক্ষ করছেন। আর তিনিই তার প্রতিদান দেবেন। যদি চান তাহলে পৃথিবীতেই দিয়ে দেবেন। আযাব ও শাস্তি তারই এখতিয়ারভুক্ত।
فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمْ عَذَابُ يَوْمِ الظُّلَّةِ ۚ إِنَّهُ كَانَ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
📘 অতঃপর ওরা তাকে মিথ্যাজ্ঞান করল, পরে ওদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিনের শাস্তি গ্রাস করল।[১] নিশ্চয় তা ছিল এক ভীষণ দিনের শাস্তি।
[১] তারাও মক্কার কাফেরদের মত আকাশ হতে আযাব চেয়েছিল। সেই মত আল্লাহও তাদের উপর আযাব অবতীর্ণ করেন। আর তা ছিল এইরূপঃ এক বর্ণনা সূত্রে মহান আল্লাহ আযাবস্বরূপ তাদের উপর সাত দিন পর্যন্ত কঠিন গরম এবং রৌদ্র অব্যাহত রাখেন। তারপর একটি মেঘখন্ড ভেসে এল। আর তারা গরম রৌদ্র থেকে বাঁচার জন্য সকলেই সেই ছায়াতলে জমা হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই আকাশ হতে আগুনের বৃষ্টি শুরু হল। যমীন ভূকম্পনে কেঁপে উঠল এবং এক বিকট শব্দ এসে তাদেরকে চিরনিদ্রায় শুইয়ে দিল। এভাবে তাদের উপর তিন ধরনের আযাব আসল। আর তা সেই দিন আসল, যেদিন মেঘখন্ড তাদেরকে ছায়া দ্বারা আচ্ছাদিত করেছিল। সেই জন্য বলা হয়েছে মেঘাচ্ছন্ন বা ছায়ার দিনের আযাব তাদেরকে পাকড়াও করল।
নোটঃ
ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) বলেছেন, মহান আল্লাহ শুআইব (আঃ)-এর জাতির ধ্বংসের বিবরণ তিন জায়গায় উল্লেখ করেছেন এবং তিন জায়গাতেই ভিন্ন ভিন্ন তিন আযাবের কথার বর্ণনা করেছেন। সূরা আ'রাফের ৭:৯১ নং আয়াতে ভূমিকম্পের কথা, সূরা হূদের ১১:৯৪ নং আয়াতে বিকট শব্দের কথা আর এখানে সূরা শুআরাতেও আকাশখন্ড ফেলার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তিন ধরনের আযাব ঐ জাতির উপর এসেছিল।
وَفَعَلْتَ فَعْلَتَكَ الَّتِي فَعَلْتَ وَأَنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ
📘 তুমি তো যা অপরাধ করার তা করেছ, আর তুমি হলে অকৃতজ্ঞ।’ [১]
[১] অর্থাৎ, আমার খেয়ে আমার দলের একটি লোককে হত্যা করে আমার অকৃতজ্ঞও হয়েছ।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 এবং নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 নিঃসন্দেহে কুরআন বিশ্বজগতের প্রতিপালকের অবতীর্ণকৃত (গ্রন্থ)।
نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ
📘 বিশ্বস্ত রূহ (জিব্রাঈল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে, [১]
[১] মক্কার কাফেররা কুরআন যে আল্লাহর বাণী এবং তা আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ, সে কথা অস্বীকার করেছিল। আর তারই ভিত্তিতে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত ও তাঁর দাওয়াতকেও অস্বীকার করেছিল। মহান আল্লাহ নবীদের ঘটনাবলীকে বর্ণনা করে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কুরআন নিঃসন্দেহে আল্লাহর বাণী এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর সত্য রসূল। যদি এমন না হত, তাহলে এ নবী যিনি লিখতে-পড়তে জানতেন না, তিনি অতীত নবীদের ও তাঁদের জাতিদের ঘটনাবলী কিভাবে বর্ণনা করতে সক্ষম? অতএব এই কুরআন নিশ্চিতরূপে বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ; যা এক আমানতদার ফিরিশতা অর্থাৎ, জিবরীল (আঃ) তাঁর নিকট পৌঁছে দিয়েছেন।
عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ
📘 তোমার হৃদয়ে, [১] যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পারো। [২]
[১] বিশেষভাবে এখানে হৃদয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। কারণ ইন্দ্রীয়সমূহের মধ্যে সব থেকে হৃদয়ই অধিক অনুধাবন ও ধারণ ক্ষমতার অধিকারী।
[২] এটি হল কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণ।
بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ
📘 (অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।
وَإِنَّهُ لَفِي زُبُرِ الْأَوَّلِينَ
📘 পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে। [১]
[১] অর্থাৎ, যেমন শেষ নবীর আগমন বার্তা ও তাঁর সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলীর বর্ণনা পূর্বের ধর্মগ্রন্থসমূহে রয়েছে। অনুরূপ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সুসংবাদও পূর্বের কিতাবসমূহে দেওয়া হয়েছিল। এর অন্য একটি অর্থ হল, সমস্ত শরীয়তের অভিন্ন বিধি-বিধানের দিক দিয়ে এই কুরআন মাজীদ পূর্বের কিতাবসমূহেও মওজুদ রয়েছে।
أَوَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ آيَةً أَنْ يَعْلَمَهُ عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ
📘 বনী-ইস্রাঈলের পন্ডিতগণ এ অবগত আছে --এ কি ওদের জন্য নিদর্শন নয়? [১]
[১] কেননা, ঐ সমস্ত গ্রন্থে নবী (সাঃ) এবং কুরআনের কথা উল্লেখ রয়েছে। মক্কার কাফেররা ধর্মীয় ব্যাপারে ইয়াহুদীদের কাছে রুজু করত। এই হিসাবে বলা হয়েছে যে, তাদের এ জানা ও বলা কি এই কথার প্রমাণ নয় যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর সত্য রসূল এবং এ কুরআন আল্লাহ প্রদত্ত গ্রন্থ। তাহলে তারা ইয়াহুদীদের এই কথা শুনে নবীর উপর ঈমান আনয়ন করে না কেন?
وَلَوْ نَزَّلْنَاهُ عَلَىٰ بَعْضِ الْأَعْجَمِينَ
📘 যদি এ কোন অনারবের প্রতি আমি অবতীর্ণ করতাম,
فَقَرَأَهُ عَلَيْهِمْ مَا كَانُوا بِهِ مُؤْمِنِينَ
📘 এবং তা সে ওদের নিকট পাঠ করত, তাহলে ওরা ওতে বিশ্বাস করত না। [১]
[১] যদি আজমী (অনারবী) অর্থাৎ, আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করতেন। তাহলে তারা বলত, 'এ তো আমাদের বুঝে আসে না।' যেমন সূরা হা-মীম সাজদার ৪১:৪৪ নং আয়াতে রয়েছে।
تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ
📘 এগুলি সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত।
قَالَ فَعَلْتُهَا إِذًا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ
📘 মূসা বলল, ‘আমি সে অপরাধ করেছিলাম, যখন আমি বিভ্রান্ত ছিলাম।[১]
[১] অর্থাৎ, এই হত্যা ইচ্ছাকৃত ছিল না। বরং শুধু একটি ঘুসি মারা হয়েছিল, যাতে সে মারা যায়। তাছাড়া এ ঘটনাও ছিল নবুঅতের পূর্বের; যখন আমাকে জ্ঞানের এ আলোক-বর্তিকা দেওয়া হয়নি।
كَذَٰلِكَ سَلَكْنَاهُ فِي قُلُوبِ الْمُجْرِمِينَ
📘 এভাবেই আমি অপরাধিগণের অন্তরে তা (অবিশ্বাস) সঞ্চার করেছি। [১]
[১] سَلَكنَاه তে هُ (তা) সর্বনাম দ্বারা কুফরী, মিথ্যা, অবিশ্বাস ও বিরুদ্ধাচরণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
لَا يُؤْمِنُونَ بِهِ حَتَّىٰ يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ
📘 ওরা এতে বিশ্বাস স্থাপন করবে না; যতক্ষণ না ওরা মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ করে;
فَيَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
📘 এ ওদের নিকট আকস্মিকভাবে এসে পড়বে, ওরা কিছুই বুঝতে পারবে না।
فَيَقُولُوا هَلْ نَحْنُ مُنْظَرُونَ
📘 তখন ওরা বলবে, ‘আমাদেরকে অবকাশ দেওয়া হবে কি?’ [১]
[১] কিন্তু আযাব প্রত্যক্ষ করার পর না অবকাশ দেওয়া হয়, আর না সে সময়ের তওবাহ আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হয়। {فَلَمْ يَكُ يَنفَعُهُمْ إِيمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا} (৮৫) سورة المؤمن
أَفَبِعَذَابِنَا يَسْتَعْجِلُونَ
📘 ওরা কি তবে আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করতে চায়? [১]
[১] এখানে ঐসব দাবীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা তারা তাদের নবীর নিকট করেছিল যে, যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে আমাদের উপর আযাব নিয়ে এসো।
أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ
📘 আচ্ছা তুমি দেখ তো, যদি আমি তাদেরকে বহু বছর ভোগ-বিলাস দান করি,
ثُمَّ جَاءَهُمْ مَا كَانُوا يُوعَدُونَ
📘 অতঃপর ওদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা ওদের নিকট এসে পড়ে,
مَا أَغْنَىٰ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يُمَتَّعُونَ
📘 তখন ওদের ভোগ-বিলাসের উপকরণ ওদের কোন কাজে আসবে না। [১]
[১] যদি আমি তাদেরকে অবকাশ দিই, তারপর আযাব দ্বারা পাকড়াও করি, তাহলে তাদের পার্থিব ধনসম্পদ কোন কাজে লাগবে কি? অর্থাৎ, তাদেরকে আযাব থেকে বাঁচাতে পারবে কি? অবশ্যই না।
{وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَن يُعَمَّرَ} (৯৬) سورة البقرة {وَمَا يُغْنِي عَنْهُ مَالُهُ إِذَا تَرَدَّى} (১১) سورة الليل
وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا لَهَا مُنْذِرُونَ
📘 আমি কোন জনপদকে সতর্ককারী প্রেরণ না করে ধ্বংস করিনি।
ذِكْرَىٰ وَمَا كُنَّا ظَالِمِينَ
📘 এ উপদেশস্বরূপ, আর আমি অন্যায় করতে পারি না। [১]
[১] অর্থাৎ, রসূল প্রেরণ না করে ও সতর্ক না করে আমি যদি কোন বস্তীকে ধ্বংস করতাম, তাহলে আমি অত্যাচারী হিসাবে গণ্য হতাম। আমি এরূপ যুলুম করিনি। বরং ন্যায়-সংগতভাবে আমি প্রথমে প্রত্যেকটি বসতির (জাতির) নিকট রসূল প্রেরণ করেছি, যে তাদেরকে আল্লাহর আযাব হতে সতর্ক করেছে। অতঃপর যখন তারা রসূলের কথা অমান্য করেছে, তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি। এই বিষয়টি সূরা বনী-ইস্রাঈলের ১৭:১৫ নং ও ক্বাস্বাস্বের ২৮:৫৯ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِي رَبِّي حُكْمًا وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُرْسَلِينَ
📘 অতঃপর আমি যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন আমি তোমাদের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর আমার প্রতিপালক আমাকে প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং আমাকে রসূল করেছেন।[১]
[১] পূর্বে যা কিছু হয়েছে, তা ভুলে যাও। এখন আমি আল্লাহর প্রেরিত রসূল। যদি আমার আনুগত্য কর, তাহলে বেঁচে যাবে, অন্যথা তোমার ধ্বংস সুনিশ্চিত।
وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيَاطِينُ
📘 শয়তান তা নিয়ে অবতরণ করেনি।
وَمَا يَنْبَغِي لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيعُونَ
📘 ওরা এ কাজের যোগ্য নয় এবং এর সামর্থ্যও রাখে না।
إِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُولُونَ
📘 অবশ্যই ওদেরকে শ্রবণ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। [১]
[১] এই আয়াতসমূহে কুরআন যে শয়তানের হস্তক্ষেপ হতে সংরক্ষিত, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমতঃ শয়তানের কুরআন নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার যোগ্যতাই নেই। কারণ তার উদ্দেশ্য হল, ফিৎনা-ফাসাদ ও নোংরামী প্রচার-প্রসার করা। পক্ষান্তরে কুরআনের উদ্দেশ্য হল কল্যাণ ও পুণ্যের আদেশ ও তার প্রচার-প্রসার করা এবং পাপ ও অন্যায়ের দরজা চিরতরে বন্ধ করা। অর্থাৎ, উভয়ের উদ্দেশ্য এক অপরের বিপরীত ও পরস্পর-বিরোধী। দ্বিতীয়তঃ শয়তান এর শক্তি রাখে না। তৃতীয়তঃ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় শয়তানকে তা শোনা হতে দূরে ও বঞ্চিত রাখা হয়। আকাশে উল্কাসমূহকে তার প্রহরী হিসাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। যখনই কোন শয়তান উপরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখনই এ সব উল্কা তার উপর বজ্রের ন্যায় আচমকা আঘাত হানে এবং তাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলে। এভাবে মহান আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ فَتَكُونَ مِنَ الْمُعَذَّبِينَ
📘 অতএব তুমি অন্য কোন উপাস্যকে আল্লাহর অংশী করো না; করলে তুমি শাস্তিযোগ্যদের দলভুক্ত হবে।
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ
📘 তোমার নিকটতম স্বজনবর্গকে তুমি সতর্ক করে দাও। [১]
[১] নবীর আহবান (দাওয়াত) কেবলমাত্র আত্মীয়দের জন্য নয়; বরং তা পুরো জাতির জন্য। আর আমাদের নবী (সাঃ) তো ছিলেন পূর্ণ মানবতার পথ-প্রদর্শক ও সৎপথের দিশারী। তবে নিকট আত্মীয়দেরকে ঈমানের পথে আহবান করা সাধারণ আহবানের বিরোধী নয়। বরং তা দাওয়াতের এক অংশ এবং প্রাধান্যযোগ্য দিক। যেমন, ইবরাহীম (আঃ)ও প্রথমে পিতা আযরকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এই আদেশের পর নবী (সাঃ) স্বাফা পাহাড়ের উপর উঠলেন এবং يا صباحاه বলে ডাক দিলেন। এই শব্দ ঐ সময় তারা ব্যবহার করত, যখন হঠাৎ কোন শত্রু আক্রমণ করে বসত। এ দ্বারা জাতিকে সতর্ক করা হত। মহানবী (সাঃ)-এর এই শব্দ শুনে সবাই একত্রিত হল। তিনি কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ডাকলেন আর বললেন যে, 'বল, আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পিছনে এক শত্রুদল রয়েছে, যারা তোমাদের উপর আক্রমণ করতে চায়, তাহলে তোমরা কি আমার একথা বিশ্বাস করবে?' সকলেই বলল, 'হ্যাঁ! অবশ্যই বিশ্বাস করব। (আমাদের অভিজ্ঞতায় তোমাকে মিথ্যাবাদী পাইনি।)' তিনি বললেন, 'আল্লাহ আমাকে সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছেন। আমি তোমাদেরকে এক কঠিন আযাব হতে সতর্ক করছি।' এ কথা শুনে আবু লাহাব বলেছিল, تبًا لَكَ أَمَا دَعَوْتَنَا إِلاَّ لِهَذَا! 'তুমি ধ্বংস হও, তুমি কি আমাদেরকে এ জন্যই ডেকেছিলে?' এর উত্তরে 'সূরা লাহাব' অবতীর্ণ হয়েছিল।
(বুখারীঃ তাফসীর সূরাতুল মাসাদ)
তিনি নিজ কন্যা ফাতেমা (রাঃ) ও ফুফু স্বাফিয়্যাহ (রাঃ) -কেও বললেন যে, তোমরা নিজেদেরকে বাঁচানোর ব্যবস্থা গ্রহণ কর। আমি আল্লাহর নিকট তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না।
(মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়
أنذر
عشيرتك
الأقربين
পরিচ্ছেদ)
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
📘 এবং তোমার অনুসারী বিশ্বাসীদের প্রতি তুমি সদয় হও।
فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ
📘 ওরা যদি তোমার অবাধ্যতা করে তাহলে তুমি বল, ‘তোমরা যা কর তার জন্য আমি দায়ী নই।’
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ
📘 তুমি নির্ভর কর পরাক্রমশালী, পরম দয়ালুর উপর।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ
📘 যিনি তোমাকে দেখেন; যখন তুমি দন্ডায়মান হও (নামাযে)।
وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ
📘 এবং তোমাকে দেখেন সিজদাকারীদের সাথে উঠতে-বসতে। [১]
[১] অর্থাৎ, যখন তুমি একাকী থাক, তখনও তোমাকে আল্লাহ প্রত্যক্ষ করেন এবং যখন তুমি লোকালয়ে থাক তখনও।
وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمُنُّهَا عَلَيَّ أَنْ عَبَّدْتَ بَنِي إِسْرَائِيلَ
📘 আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছ, তা তো এ যে, তুমি বনী ইস্রাঈলকে দাসে পরিণত করেছ।’ [১]
[১] অর্থাৎ, এটি উত্তম অনুগ্রহ যা তুমি স্মরণ করাচ্ছ। তুমি অবশ্যই আমাকে দাস বানাওনি; বরং মুক্ত রেখেছ। কিন্তু আমার পুরো জাতিকেই গোলাম বানিয়ে রেখেছ। এই মহা অত্যাচারের পরিবর্তে এই সামান্য অনুগ্রহের মূল্য কোথায়?
إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
📘 নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَىٰ مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ
📘 আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়?
تَنَزَّلُ عَلَىٰ كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ
📘 ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। [১]
[১] অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে শয়তানের কোন হাত নেই। কারণ শয়তান তো মিথ্যুক এবং পাপিষ্ঠদের (জ্যোতিষী ও গণক প্রভৃতিদের) নিকট আসে যায়, নবী ও নেক লোকেদের নিকট আসে না।
يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ
📘 ওরা কান পেতে থাকে এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। [১]
[১] অর্থাৎ, জ্যোতিষীদের কানে পৌঁছে দেয়। তারা তার সাথে মিথ্যা কথা মিশিয়ে মানুষের মাঝে পরিবেশন করে। যেমন, সহীহ হাদীসে এসেছে।
(দেখুনঃ সহীহ বুখারী তাওহীদ অধ্যায় ফাজের ও মুনাফিক, ও সৃষ্টি রচনা পরিচ্ছেদ, ইবলীস ও তার সৈন্য পরিচ্ছেদ। মুসলিমঃ সালাম অধ্যায় জ্যোতিষী ও তার নিকট আসা পরিচ্ছেদ)
يُلقُونَ السَّمع এর অর্থঃ শয়তান কিছু কথা শোনার পর তা জ্যোতিষীদের কানে পৌঁছে দেয়। সেই হিসাবে السَّمع শব্দটি المَسمُوع (শ্রুত কথা) অর্থে ব্যবহার হবে। কিন্তু যদি এর অর্থ শ্রবণেন্দ্রেীয় বা কান হয়, তাহলে এর অর্থ হবে শয়তানরা আকাশে কান লাগিয়ে চুরি করে লুকিয়ে কিছু কথা শুনে ফেলে এবং তা জ্যোতিষীদের নিকট পৌঁছে দেয়।
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ
📘 আর কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা।
أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ
📘 তুমি কি দেখ না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সকল বিষয়ে কল্পনাবিহার করে থাকে?
وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ
📘 এবং তা বলে, যা করে না। [১]
[১] কবিদের মধ্যে অধিকাংশ কবিই যেহেতু এ রকম হয় যে, তারা প্রশংসা ও নিন্দায় কোন প্রকার নিয়ম-নীতির ধার ধারে না। বরং কবিতায় নিজ ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দ অনুযায়ী রায় প্রকাশ করে থাকে। তাছাড়া কবিতা রচনায় তারা অতিরঞ্জন করে, বাড়া-বাড়ি ও অতিশয়োক্তি ব্যবহার করে এবং কবিত্ব কল্পনায় কখনও এদিক কখনো ওদিক নিরুদ্দেশ ভ্রমণ করতে থাকে। সেই কারণে মহান আল্লাহ বলেছেন, তাদের অনুসরণ যারা করবে তারাও পথভ্রষ্ট। এই ধরনের কবিতার জন্য হাদীসেও বলা হয়েছে, কবিতা দ্বারা নিজের উদর পূর্ণ করার চেয়ে রক্ত-পুঁজ দিয়ে উদর পূর্ণ করাই উত্তম।
(তিরমিযীঃ আদব অধ্যায়, মুসলিম প্রভৃতি)
এখানে এ কথাটি বলার অর্থ হল, আমার নবী; না জ্যোতিষী, আর না কবি। কারণ এরা দুজনেই মিথ্যুক। সুতরাং অন্য জায়গায়ও নবী (সাঃ)-কে কবি ধারণা করার কথা দৃঢ়ভাবে খন্ডন করা হয়েছে।
(সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৯ আয়াত, সূরা হাক্কাহ ৬৯:৪০-৪৩ আয়াত)
إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا ۗ وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
📘 তবে তারা নয়, যারা বিশ্বাস করে[১] ও সৎকাজ করে, আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করে এবং অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে।[২] আর অত্যাচারীরা অচিরেই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়? [৩]
[১] এখানে ঐসব কবিদেরকে পৃথক করা হচ্ছে, যাদের কবিতা সত্য ও বাস্তবের ভিত্তিতে রচিত। আর এমন শব্দ দ্বারা ব্যতিক্রান্ত করা হয়েছে; যাতে স্পষ্ট হয় যে, ঈমানদার, সৎকর্মশীল, বেশী বেশী আল্লাহর যিকরকারী কবি মিথ্যা ও অতিশয়োক্তিমিশ্রিত অন্যায় (শরীয়ত-বিরোধী) কবিতা রচনা করতে পারে না। এ সব কবিতা রচনা করা তাদের কাজ, যারা ঈমানী গুণাবলী হতে খালি।
[২] অর্থাৎ, এই ধরনের মু'মিন কবি, কাফের কবিদের সেই কবিতার জবাব দেয়, যাতে তারা (কাফের কবিরা) মুসলিমদের সমালোচনা ও নিন্দা করে থাকে। যেমন কবি হাসসান বিন সাবেত (রাঃ) কাফেরদের সমালোচনার জবাব দিতেন। আর নবী (সাঃ) নিজেও বলতেন, তুমি ব্যঙ্গ কবিতার মাধ্যমে কাফেরদের সমালোচনা কর জিবরীল (আঃ) তোমার সঙ্গে রয়েছেন।
(বুখারীঃ সৃষ্টি রচনা অধ্যায় ফিরিশতাদের যিকর পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ সাহাবাদের ফযীলত অধ্যায় হাসসান বিন সাবেতের ফযীলত পরিচ্ছেদ)
এখান হতে বুঝা গেল যে, এ রকম কবিতা রচনা করা বৈধ যাতে মিথ্যা ও অতিশোয়ক্তির মিশ্রণ নেই, যার দ্বারা মুশরিক, কাফের, বিদআতী ও বাতিলপন্থী লোকদের উচিত জবাব দেওয়া হবে এবং যা সত্য পথ তাওহীদ ও সুন্নতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।
[৩] 'তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়?' অর্থাৎ, জাহান্নাম। এখানে পাপীদের জন্য রয়েছে কঠিন সতর্কবাণী। যেমন হাদীসের মধ্যেও বলা হয়েছে। অত্যাচার করা হতে দূরে থাকো! কারণ অত্যাচার কিয়ামত দিবসে অন্ধকারের কারণ হবে।
(মুসলিমঃ নেকী অধ্যায়, অত্যাচার হারাম পরিচ্ছেদ)
قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘বিশ্বজগতের প্রতিপালক আবার কি?’ [১]
[১] এটি সে প্রশ্ন স্বরূপ জিজ্ঞাসা করেনি বরং গর্ব ও অহংকারবশতঃ জিজ্ঞাসা করেছিল। কারণ, তার দাবী ছিল,{مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرِي} অর্থাৎ, আমি ছাড়া তোমাদের জন্য কোন মা'বূদকেই জানি না।
(সূরা কাসাস ২৮:৩৮ নং আয়াত)
قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا ۖ إِنْ كُنْتُمْ مُوقِنِينَ
📘 মূসা বলল, ‘তিনি হচ্ছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং ওদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।’
قَالَ لِمَنْ حَوْلَهُ أَلَا تَسْتَمِعُونَ
📘 ফিরআউন তার পারিষদবর্গকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা শুনছ তো!’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমরা কি তার কথায় আশ্চর্য বোধ কর না? আমি ছাড়া কি কোন উপাস্য আছে?
قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ آبَائِكُمُ الْأَوَّلِينَ
📘 মূসা বলল, ‘তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষগণেরও প্রতিপালক।’
قَالَ إِنَّ رَسُولَكُمُ الَّذِي أُرْسِلَ إِلَيْكُمْ لَمَجْنُونٌ
📘 ফিরআউন বলল, ‘তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রসূলটি তো এক বদ্ধ পাগল।’
قَالَ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَمَا بَيْنَهُمَا ۖ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ
📘 মূসা বলল, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং ওদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালক; [১] যদি তোমরা বুঝে থাক।’
[১] যিনি পূর্বকে পূর্ব বানিয়েছেন, যেদিকে নক্ষত্রমালা উদিত হয় ও পশ্চিমকে পশ্চিম বানিয়েছেন যেদিকে নক্ষত্রমালা অস্ত যায়। অনুরূপ এই দুয়ের মধ্যবর্তী যা কিছু আছে সে সমস্তর প্রভু ও তাদের ব্যবস্থাপক তিনিই।
قَالَ لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَٰهًا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্যকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে কারারুদ্ধ করব।’ [১]
[১] ফিরআউন যখন দেখল যে, মূসা (আঃ) বিভিন্নভাবে বিশ্ব-প্রভুর পূর্ণ প্রভুত্বের বর্ণনা দিচ্ছেন, যার সঠিক কোন উত্তর তার কাছে নেই, তখন সে দলীল-প্রমাণকে দৃষ্টিচ্যুত করে হুমকি দিতে শুরু করল।
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ
📘 ওরা বিশ্বাস করে না বলে তুমি হয়তো মনঃকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বে। [১]
[১] নবী (সাঃ)-এর অন্তরে মানুষের প্রতি যে মমতা এবং তাদের হিদায়াতের জন্য তাঁর অন্তরে যে ব্যাকুলতা অনুভব করতেন তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে।
قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ
📘 মূসা বলল, ‘আমি তোমার নিকট স্পষ্ট কোন (নিদর্শন) আনয়ন করলেও কি?’ [১]
[১] অর্থাৎ, এমন কোন জিনিস বা 'মু'জিযা' যার দ্বারা প্রকাশ পায় যে, আমি সত্য এবং সত্যই আমি আল্লাহর রসূল, তবুও কি আমার সত্যতা তুমি মেনে নেবে না?
قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে তা আনয়ন কর।’
فَأَلْقَىٰ عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ ثُعْبَانٌ مُبِينٌ
📘 সুতরাং মূসা তার লাঠি নিক্ষেপ করল, আর তৎক্ষণাৎ তা এক সাক্ষাৎ অজগরে পরিণত হল।[১]
[১] কোন কোন জায়গায় ثُعبان কে حَيَّة আবার কোথাও جَانّ বলা হয়েছে। ثُعبان বড় (অজগর) সাপকে বলা হয়। جَانّ ছোট সাপকে বলা হয়। আর حَيَّة ছোট-বড় উভয় ধরনের সাপকে বলা হয়।
(ফাতহুল কাদীর)
লাঠি প্রথমতঃ ছোট সাপের আকার ধারণ করে ও পরে তা অজগরে পরিণত হয়। والله أعلم
وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّاظِرِينَ
📘 এবং (মূসা) তার হাত বের করল, আর তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র-উজ্জ্বল প্রতিভাত হল। [১]
[১] অর্থাৎ, যখন জামার বুকের উন্মুক্ত অংশ হতে হাত বের করলেন, তখন তা চাঁদের টুকরার মত চমকাতে লাগল। এই দ্বিতীয় মু'জিযাটিও মূসা (আঃ) পেশ করলেন।
قَالَ لِلْمَلَإِ حَوْلَهُ إِنَّ هَٰذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ
📘 ফিরআউন তার পারিষদবর্গকে বলল, ‘এ তো এক সুদক্ষ যাদুকর। [১]
[১] ফিরআউন এই সমস্ত মু'জিযা দেখে মূসাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ও তার উপর ঈমান আনার পরিবর্তে মিথ্যাজ্ঞান ও বিদ্বেষের পথ অবলম্বন করল। আর মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে বলল, 'এ তো একজন সুদক্ষ যাদুকর।'
يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ
📘 এ দেশ হতে তার যাদুবলে তোমাদেরকে বহিষ্কৃত করতে চায়! এখন তোমরা কি করবে বল?’[১]
[১] তারপর নিজ জাতিকে আরো উত্তেজিত করার জন্য বলল যে, সে এ সব ভেল্কি ও যাদুর জোরে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে স্বয়ং নিজে তার দখলদার হতে চায়। এখন বল, তোমাদের মতামত কি? অর্থাৎ, এখন তার সাথে কি ব্যবহার করা যায়?
قَالُوا أَرْجِهْ وَأَخَاهُ وَابْعَثْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ
📘 ওরা বলল, ‘তাকে ও তার ভাইকে কিঞ্চিৎ অবকাশ দিন এবং নগরে নগরে সংগ্রাহকদেরকে পাঠান।
يَأْتُوكَ بِكُلِّ سَحَّارٍ عَلِيمٍ
📘 যেন তারা আপনার নিকট প্রতিটি সুদক্ষ যাদুকর উপস্থিত করে।’ [১]
[১] অর্থাৎ, এদের দু'জনকে এখন তাদের নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিন এবং সমস্ত শহর হতে জাদুকরদের একত্রিত করে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা-সভা অনুষ্ঠিত হোক; যাতে তাদের যাদুর জবাব দেওয়া যায় এবং আপনার সমর্থন ও জয় হয়। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে সৃষ্টিগত একটি ব্যবস্থা, যাতে লোক এক জায়গায় একত্রিত হয় এবং এ সব প্রমাণাদি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে; যা মূসা (আঃ)-কে মহান আল্লাহ দান করেছিলেন।
فَجُمِعَ السَّحَرَةُ لِمِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ
📘 অতঃপর এক নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে যাদুকরদের একত্র করা হল। [১]
[১] অতঃপর মিসর ও তার আশ-পাশ হতে যাদুকরদের একটি বিরাট দল জমা করা হল। বিভিন্ন বর্ণনামতে যাদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার বা ১৭ হাজার বা ১৯ হাজার বা ৮০ হাজার। তবে আসল সংখ্যা একমাত্র আল্লাহই জানেন। কারণ, কোন নির্দিষ্ট সংখ্যার ব্যাপারে সঠিক দলীল নেই। এর বিস্তারিত আলোচনা সূরা আ'রাফ ও সূরা ত্বহা য় করা হয়েছে। অর্থাৎ, ফিরআউনের স্বজাতি কিবতীরা আল্লাহর জ্যোতিকে ফুৎকারে নিভাতে চেয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ তা পরিপূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, কুফর ও ঈমানের এ সংঘর্ষ সর্বযুগে এ রকমই হয়ে এসেছে যে, যখনই কুফর তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে মুকাবেলার জন্য ঈমানের সামনে এসেছে, মহান আল্লাহ ঈমানকে সম্মানিত ও বিজয়ী করেছেন। {بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ } (সূরা আম্বিয়া ২১:১৮)
وَقِيلَ لِلنَّاسِ هَلْ أَنْتُمْ مُجْتَمِعُونَ
📘 এবং লোকদের বলা হল, ‘তোমরাও একত্র হও। [১]
[১] জনসাধারণকে তাকীদ করা হচ্ছে যে, তোমাদেরকেও এই যাদু-যুদ্ধ দেখার জন্য উপস্থিত থাকতে হবে।
إِنْ نَشَأْ نُنَزِّلْ عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ آيَةً فَظَلَّتْ أَعْنَاقُهُمْ لَهَا خَاضِعِينَ
📘 আমি ইচ্ছা করলে আকাশ হতে ওদের নিকট এক নিদর্শন প্রেরণ করতে পারি, ফলে তার প্রতি তাদের ঘাড় নত হয়ে পড়বে।[১]
[১] অর্থাৎ, যাকে মান্য না করে ও যার উপর ঈমান না এনে কোন উপায় থাকবে না। কিন্তু এরূপ করলে বাধ্য করার প্রশ্ন উঠত। যেহেতু আমি মানুষকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দান করেছি; যাতে তাদের পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সেই কারণে আমি এ ধরনের নিদর্শন অবতীর্ণ করা হতেও বিরত থেকেছি; যাতে আমার নিয়ম প্রভাবিত না হয়। আর শুধুমাত্র নবী-রসূল প্রেরণ ও কিতাসমূহ অবতীর্ণ করাই যথেষ্ট হয়েছে।
لَعَلَّنَا نَتَّبِعُ السَّحَرَةَ إِنْ كَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ
📘 যেন যাদুকররা বিজয়ী হলে, আমরা ওদের অনুসরণ করতে পারি।’
فَلَمَّا جَاءَ السَّحَرَةُ قَالُوا لِفِرْعَوْنَ أَئِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ
📘 যাদুকরেরা ফিরআউনের নিকট এসে বলল, ‘আমরা যদি বিজয়ী হই, তাহলে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে তো?’
قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ إِذًا لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘হ্যাঁ, তখন তোমরা আমার পারিষদবর্গের শামিল হবে।’
قَالَ لَهُمْ مُوسَىٰ أَلْقُوا مَا أَنْتُمْ مُلْقُونَ
📘 মূসা ওদেরকে বলল, ‘তোমাদের যা নিক্ষেপ করার, তা নিক্ষেপ কর।’ [১]
[১] মূসার পক্ষ হতে যাদুকরদের খেলা দেখানোর আহবান জানানোর মধ্যে এই হিকমত থাকতে পারে যে, প্রথমতঃ তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যাক, তিনি আল্লাহর পয়গম্বর। এত বিশাল সংখ্যক বিখ্যাত যাদুকরদের জমা হওয়া ও তাদের যাদু খেলায় মোটেই ভীত নয়। দ্বিতীয়তঃ এ উদ্দেশ্যও হতে পারে যে, যখন পরে আল্লাহর আদেশে এ সমস্ত যাদু এক নিমেষে শেষ হয়ে যাবে, তখন দর্শকদের উপর এর একটা বিরাট প্রভাব পড়বে আর এভাবে বেশী বেশী মানুষ আল্লাহর উপর ঈমান আনবে। অতএব সেই মতই হল; বরং যাদুকরেরাই প্রথমে ঈমান আনল, যেমন পরে বলা হয়েছে।
فَأَلْقَوْا حِبَالَهُمْ وَعِصِيَّهُمْ وَقَالُوا بِعِزَّةِ فِرْعَوْنَ إِنَّا لَنَحْنُ الْغَالِبُونَ
📘 অতঃপর ওরা ওদের রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করল এবং ওরা বলল, ‘ফিরআউনের ইজ্জতের শপথ! আমরাই বিজয়ী হব।’ [১]
[১] যেমন সূরা আ'রাফ ও ত্বহায় আলোচিত হয়েছে যে, ঐ সমস্ত যাদুকরেরা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বিরাট যাদু পেশ করল। {سَحَرُواْ أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ وَجَاءوا بِسِحْرٍ عَظِيمٍ} (সূরা আ'রাফ ৭:১১৬) এমনকি মূসা (আঃ)ও একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। {فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً مُّوسَى} (সূরা ত্বহা ২০:৬৭) বলা বাহুল্য, ঐ সব যাদুকরদের নিজেদের সাফল্যের উপর বিরাট আস্থা ছিল, যেমন এখানে এই আয়াতে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মূসা (আঃ)-কে সান্ত্বনা দিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমার লাঠিটি মাটিতে ফেল! সুতরাং লাঠি মাটিতে পড়ার সাথে সাথে এক ভয়ংকর অজগরের রূপ ধারণ করল। আর একটি একটি করে তাদের যাদুর তৈরী সমস্ত জিনিসগুলোকে গিলে ফেলল। যেমন পরের আয়াতে বলা হয়েছে।
فَأَلْقَىٰ مُوسَىٰ عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ
📘 অতঃপর মূসা তার লাঠি নিক্ষেপ করল; সহসা তা ওদের অলীক সৃষ্টিগুলিকে গ্রাস করতে লাগল।
فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ
📘 তখন যাদুকরেরা সিজদাবনত হল,
قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 এবং বলল, ‘বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম;
رَبِّ مُوسَىٰ وَهَارُونَ
📘 যিনি মূসা এবং হারূনেরও প্রতিপালক।’
قَالَ آمَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ ۖ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوْفَ تَعْلَمُونَ ۚ لَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ
📘 ফিরআউন বলল, ‘কি! আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার পূর্বেই তোমরা ওতে বিশ্বাস করলে? দেখছি এ-ই তো তোমাদের প্রধান; যে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়েছে। [১] শীঘ্রই তোমরা এর পরিণাম জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাত-পা বিপরীতভাবে কেটে নেব এবং তোমাদের সকলকে শূলবিদ্ধ করব।’ [২]
[১] ফিরআউনের জন্য এ ঘটনা বিরাট বিচিত্র ও অত্যন্ত বিস্ময়কর ছিল যে, যেসব যাদুকরদের সাহায্যে সাফল্য ও বিজয়ের আশা করেছিল, শুধু তারা আজ পরাজিতই নয় বরং ভরা সভায় তারা ঐ প্রভুর উপর ঈমান এনে বসল, যে প্রভু মূসা ও হারূন (আঃ)-কে দলীল ও মু'জিযা দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ফিরআউন চিন্তা-ভাবনা করা ও ঈমান আনার পরিবর্তে অহংকার ও বিদ্বেষের পথ অবলম্বন করল এবং যাদুকরদেরকে ভয় দেখাতে ও হুমকি দিতে শুরু করল, আর বলল যে, মনে হচ্ছে তোমরা তারই ছাত্র। আর তোমাদের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে, এই ষড়যন্ত্র দ্বারা আমাদেরকে এখান হতে বের করে দেওয়া। {إِنَّ هَذَا لَمَكْرٌ مَّكَرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُواْ مِنْهَا أَهْلَهَا} (১২৩) سورة الأعراف
[২] বিপরীতভাবে হাত-পা কাটার অর্থ হল, ডান হাত ও বাম পা আর বাম হাত ও ডান পা। এরপর শূলে চড়ানো আলাদা বিষয়। অর্থাৎ, হাত-পা কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পরও তার ক্রোধ ঠান্ডা হল না; বরং শূলবিদ্ধ করার কথাও ঘোষণা করল।
وَمَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنَ الرَّحْمَٰنِ مُحْدَثٍ إِلَّا كَانُوا عَنْهُ مُعْرِضِينَ
📘 যখনই ওদের নিকট পরম দয়াময়ের কোন নতুন উপদেশ আসে, তখনই ওরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
قَالُوا لَا ضَيْرَ ۖ إِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا مُنْقَلِبُونَ
📘 ওরা বলল, ‘কোন ক্ষতি নেই,[১] নিশ্চয় আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করব।
[১] لا ضَير কোন ক্ষতি নেই বা আমাদের কোন পরোয়া নেই। অর্থাৎ যে শাস্তিই তুমি আমাদের দিতে চাও, দাও। আমরা ঈমান আনা হতে বিরত হব না।
إِنَّا نَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَنْ كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ
📘 আমরা আশা করি যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে ক্ষমা করবেন; কারণ আমরা বিশ্বাসীদের মধ্যে অগ্রণী।’ [১]
[১] أَوَّلَ المُؤمِنِين (বিশ্বাসীদের মধ্যে অগ্রণী) এই হিসাবে বলা হয়েছে যে, ফিরআউনের জাতি মুসলমান ছিল না। তারাই ঈমান আনার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
۞ وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ
📘 আমি মূসার প্রতি এ মর্মে প্রত্যাদেশ করলাম যে, আমার দাসদের নিয়ে রজনীযোগে বের হয়ে যাও, অবশ্যই তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে। [১]
[১] যখন মূসা (আঃ) মিসরে দীর্ঘ দিন অবস্থান করলেন এবং বিভিন্নভাবে ফিরআউন তথা তার পারিষদদের নিকট দলীল প্রমাণিত হয়ে গেল, আর তা সত্ত্বেও সে ঈমান আনার জন্য তৈরী হল না, তখন এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না যে, তাকে শাস্তি দিয়ে শিক্ষার বিষয় করা হোক। অতএব মূসাকে আল্লাহ তাআলা আদেশ করলেন, তুমি রাত্রি বেলায় বনী-ইস্রাঈলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়। আর তিনি বললেন, ভয়ের কিছু নেই, ফিরআউন দলবলসহ তোমাদের পিছু পিছু আসবে।
فَأَرْسَلَ فِرْعَوْنُ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ
📘 অতঃপর ফিরআউন শহরে শহরে লোক সংগ্রহকারী পাঠিয়ে দিল
إِنَّ هَٰؤُلَاءِ لَشِرْذِمَةٌ قَلِيلُونَ
📘 এ বলে যে, বনী-ইস্রাঈল তো ক্ষুদ্র একটি দল, [১]
[১] এটি তুচ্ছ ভেবে বলা হয়েছে। যদিও তাদের সংখ্যা ছ'লাখ বলা হয়ে থাকে।
وَإِنَّهُمْ لَنَا لَغَائِظُونَ
📘 ওরা তো আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করেছে। [১]
[১] আমাদের বিনা অনুমতিতে তাদের এখান হতে পলায়ন আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করেছে।
وَإِنَّا لَجَمِيعٌ حَاذِرُونَ
📘 এবং আমরা তো একদল সদা সতর্ক। [১]
[১] এই কারণে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।
فَأَخْرَجْنَاهُمْ مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ
📘 পরিণামে আমি ফিরআউন-গোষ্ঠীকে ওদের উদ্যানরাজি ও প্রস্রবণ হতে বহিস্কৃত করলাম,
وَكُنُوزٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ
📘 এবং ধনভান্ডার ও সুরম্য সৌধমালা হতে। [১]
[১] অর্থাৎ, ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্ত বনী-ইস্রাঈলের পিছু নিল ঠিকই, কিন্তু তাদের আর নিজেদের ঘরে ফিরার সৌভাগ্য হল না। এইভাবে মহান আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় ও হিকমতে তাদেরকে সমস্ত নিয়ামত হতে বঞ্চিত করে অন্যদেরকে তার উত্তরাধিকারী করলেন।
كَذَٰلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا بَنِي إِسْرَائِيلَ
📘 এরূপই ঘটল এবং বনী-ইস্রাঈলকে এ সমুদয়ের অধিকারী করলাম। [১]
[১] অর্থাৎ, যে ক্ষমতা ও রাজত্ব ফিরআউন অর্জন করেছিল, তা তার কাছ হতে ছিনিয়ে নিয়ে বনী-ইস্রাঈলকে দিয়ে দিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ এই যে, মিসরের মত রাজ্য ও পার্থিব সুখ বনী-ইস্রাঈলকে (অন্যত্র) দান করলাম। কারণ বনী-ইস্রাঈল মিসর হতে বের হয়ে যাওয়ার পর তারা দ্বিতীয়বার মিসরে ফিরে আসেনি। তাছাড়া সূরা দুখানে (৪৪:২৮ নং আয়াতে) বলা হয়েছে, {كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا قَوْمًا آخَرِينَ} অর্থাৎ, অন্য জাতিকে আমি তার উত্তরাধিকারী বানালাম।
(আইসারুততাফসীর)
প্রথমোক্ত বিদ্বানগণ বলেন যে, قومًا آخَرين এর মধ্যে قوم শব্দটি যদিও ব্যাপক, কিন্তু এখানে সূরা শুআরাতে বনী-ইস্রাঈলকে উত্তরাধিকারী করার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অতএব মিসরের উত্তরাধিকারী বনী-ইস্রাঈল জাতিই হবে। কিন্তু খোদ কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী বুঝা যায় যে, বনী-ইস্রাঈলদের মিসর হতে বের হওয়ার পর তাদেরকে পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। আর তাদের অস্বীকার করার কারণে চল্লিশ বছর তাদেরকে তীহ ময়দানে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। তারপর তারা পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করেছিল। সুতরাং মূসা (আঃ)-এর কবর মি'রাজের হাদীস অনুসারে বায়তুল মাকদিসের নিকটই রয়েছে। এই কারণে এর সঠিক অর্থ এই যে, যেমন দুনিয়ার ভোগ-সামগ্রী মিসরে ফিরআউনদের ছিল, অনুরূপ ভোগ-সামগ্রী বনী-ইস্রাঈলকেও দান করা হয়েছিল। কিন্তু তা মিসরে নয়; বরং প্যালেস্টাইনে।
فَقَدْ كَذَّبُوا فَسَيَأْتِيهِمْ أَنْبَاءُ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
📘 ওরা অবশ্যই মিথ্যাজ্ঞান করেছে। সুতরাং ওরা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তার বার্তা শীঘ্রই এসে পড়বে। [১]
[১] অর্থাৎ, মিথ্যাজ্ঞান করার পরিণামস্বরূপ আমার শাস্তি অবশ্যই তাদেরকে পাকড়াও করবে, যাকে তারা অসম্ভব মনে করে ঠাট্টা ও উপহাস করছে। এ শাস্তি পৃথিবীতেও সম্ভব, যেমন বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে। অন্যথা আখেরাতে তা থেকে বাঁচার কোন রাস্তা নেই। ঠাট্টা-বিদ্রূপের বার্তা আসার কথা বলা হয়েছে, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়নি। কারণ প্রথমতঃ ঠাট্টা-বিদ্রূপে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও মিথ্যা ভাবা দুই শামিল। আর দ্বিতীয়তঃ ঠাট্টা-বিদ্রূপ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও মিথ্যাজ্ঞান করার চাইতে বড় অপরাধ।
(ফাতহুল কাদীর)
فَأَتْبَعُوهُمْ مُشْرِقِينَ
📘 ওরা সূর্যোদয়কালে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। [১]
[১] যখন সকাল হল এবং ফিরআউন জানতে পারল যে, বনী-ইস্রাঈল রাত্রে পলায়ন করেছে, তখন তার মর্যাদা ও ক্ষমতায় আঘাত লাগলো এবং সূর্য ওঠার সাথে সাথেই তাদের পিছু ধাওয়া করল।
فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَىٰ إِنَّا لَمُدْرَكُونَ
📘 অতঃপর যখন দু’দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা বলল, ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।’[১]
[১] অর্থাৎ, ফিরআউনের সৈন্য-সামন্ত দেখে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল, যেহেতু সামনে সমুদ্র ও পিছনে ফিরআউনের সৈন্য। এখন বাঁচার পথ কোথায়? আবার আমাদেরকে ফিরআউন ও তার দাসত্বই মেনে নিতে হবে।
قَالَ كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
📘 মূসা বলল, ‘কিছুতেই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক; তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।’ [১]
[১] মূসা (আঃ) তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন যে, তোমাদের আশঙ্কা অমূলক। দ্বিতীয়বার তোমাদেরকে ফিরআউনের কবলে পড়তে হবে না। আমার প্রভু অবশ্যই পরিত্রাণের পথ বের করে দেবেন।
فَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ ۖ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ
📘 অতঃপর মূসার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।’[১] ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতসদৃশ হয়ে গেল। [২]
[১] আল্লাহ তাআলা পথ নির্দেশনা করলেন যে, তোমার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত কর। যার ফলে ডান দিকের পানি ডান দিকে এবং বাম দিকের পানি বাম দিকে (সরে গিয়ে) স্থির হয়ে গেল, আর মধ্যে একটি রাস্তা তৈরী হল। বলা হয় যে, বারটি বংশের জন্য ১২টি রাস্তা তৈরী হয়েছিল। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
[২] فِرق সমুদ্রের ভাগ বা অংশ। طَود মানে পাহাড়। অর্থাৎ, পানির প্রতিটি অংশ বড় পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে রইল। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে এক মু'জিযা, যাতে মূসা (আঃ) ও তাঁর জাতি ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই ইলাহী সাহায্য ছাড়া ফিরআউনের কবল হতে মুক্তি সম্ভব ছিল না।
وَأَزْلَفْنَا ثَمَّ الْآخَرِينَ
📘 আমি অপর দলটিকে সেখানে উপনীত করলাম। [১]
[১] 'অপর দলটি' বলতে ফিরআউন ও তার সৈন্যদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আমি অন্য দলটিকে সমুদ্রের নিকটবর্তী করে দিলাম।
وَأَنْجَيْنَا مُوسَىٰ وَمَنْ مَعَهُ أَجْمَعِينَ
📘 এবং মূসা ও তার সঙ্গী সকলকে আমি উদ্ধার করলাম।
ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ
📘 তারপর অপর দলটিকে নিমজ্জিত করলাম। [১]
[১] মূসা (আঃ) ও তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীদেরকে আমি পরিত্রাণ দিলাম এবং ফিরআউন ও তার সৈন্যরা যখন ঐ রাস্তা পার হতে লাগল, তখন আমি সমুদ্রকে আগের মত স্বাভাবিক হতে আদেশ করলাম। যার ফলে ফিরআউন তার সৈন্যসহ ডুবে মরল।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়। [১]
[১] যদিও এই ঘটনা একটি বড় নিদর্শন, যাতে আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তবুও অধিকাংশ মানুষ তা শুনে ঈমান আনার নয়।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 আর নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيمَ
📘 ওদের নিকট ইব্রাহীমের বৃত্তান্ত বর্ণনা কর।
أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الْأَرْضِ كَمْ أَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ
📘 ওরা কি পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে না? আমি ওতে সর্বপ্রকার উৎকৃষ্ট কত উদ্ভিদ উদ্গত করেছি! [১]
[১] زَوج এর দ্বিতীয় অর্থ এখানে প্রকার বা শ্রেণী করা হয়েছে। অর্থাৎ, নানান প্রকার জিনিস উৎপন্ন করেছি যা উৎকৃষ্ট; অর্থাৎ মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী। যেমন শস্য, ফলমূল ও জীবজন্তু ইত্যাদি।
إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ
📘 সে যখন তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা কিসের উপাসনা কর?’
قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ
📘 ওরা বলল, ‘আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং আমরা নিষ্ঠার সাথে ওদের পূজায় নিরত থাকি।’[১]
[১] অর্থাৎ, দিবা-রাত্রি ওদেরই উপাসনা করি।
قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ
📘 সে বলল, ‘তোমরা আহবান করলে ওরা কি শোনে?
أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ
📘 অথবা ওরা কি তোমাদের উপকার কিংবা অপকার করতে পারে?’ [১]
[১] অর্থাৎ, যদি তোমরা ওদের ইবাদত না কর, তাহলে কি ওরা তোমাদের ক্ষতি করে?
قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا آبَاءَنَا كَذَٰلِكَ يَفْعَلُونَ
📘 ওরা বলল, ‘না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এরূপই করতে দেখেছি।’ [১]
[১] যখন তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর দিতে পারল না, তখন তারা উক্ত কথা বলে অব্যাহতি লাভ করল। যেমন আজ-কালও কুরআন-হাদীসের দলীল উপস্থাপিত করে কোন কুপ্রথা বর্জন করার কথা বললে বহু (দাদুপন্থী) লোক অনুরূপ ওজর পেশ করে বলে থাকে, আমরা বংশগতভাবে আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এইরূপ করতে দেখে আসছি। অতএব আমরা এ সব ছাড়ব না!
قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ
📘 সে বলল, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি[১] তার সম্বন্ধে যার পূজা করছ--
[১] أَفَرَأَيتُم এর অর্থ হল فَهَلْ أَبْصَرْتُمْ وَتَفَكَّرْتُمْ অর্থাৎ, তোমরা কি চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছ ?
أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ
📘 তোমরা এবং তোমাদের অতীতের পিতৃপুরুষেরা? [১]
[১] কারণ তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করছ? কেউ কেউ এর অর্থ বলেছেন যে, তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যাদের ইবাদত করছ, সেই মা'বূদরা সকলেই আমার শত্রু। অর্থাৎ, আমার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।
فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ
📘 বিশ্বজগতের প্রতিপালক ব্যতীত তারা সকলেই আমার শত্রু।[১]
[১] তিনি আমার শত্রু নন; বরং ইহকাল ও পরকালে তিনি আমার সহায়ক ও বন্ধু।
الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ
📘 যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে পথপ্রদর্শন করেন। [১]
[১] দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের দিকে।
وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ
📘 তিনিই আমাকে খাওয়ান এবং তিনিই আমাকে পান করান। [১]
[১] অর্থাৎ, নানান প্রকার ও বিভিন্ন ধরনের রুযীর সৃষ্টিকর্তা। আর যে পানি আমরা পান করি, তার সরবরাহকারীও তিনি।
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ
📘 নিশ্চয় ওতে আছে নিদর্শন, [১] কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়। [২]
[১] অর্থাৎ, যখন মহান আল্লাহ মৃত মাটি হতে এ সমস্ত জিনিস উৎপন্ন করতে পারেন, তখন তিনি কি মানুষকে পুনর্বার সৃষ্টি করতে পারবেন না?
[২] অর্থাৎ, তাঁর এ মহাশক্তি দেখার পরও বেশীর ভাগ লোক আল্লাহ তথা রসূলকে মিথ্যাজ্ঞান করে ঈমান আনে না।
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
📘 এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন; [১]
[১] রোগ দূর করে আরোগ্য দানকারীও তিনিই। অর্থাৎ ঔষধের প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় রোগ দূর করার ক্ষমতা তাঁরই নির্দেশে। তাঁর নির্দেশ ছাড়া ঔষধ কোন কাজ দেয় না। রোগও আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশেই হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইবরাহীম (আঃ) তার সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করেননি; বরং নিজের দিকে করেছেন। তিনি আল্লাহর কথা উল্লেখের সময় আদবের বড় খেয়াল রেখেছেন।
وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ
📘 এবং তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন। [১]
[১] অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে যখন সমস্ত মানব জাতিকে জীবিত করবেন, তখন তাদের সাথে আমাকেও জীবিত করবেন।
وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ
📘 এবং আশা করি, তিনি কিয়ামতের দিন আমার অপরাধসমূহ মার্জনা করে দেবেন। [১]
[১] এখানে 'আশা' নিশ্চিত বিশ্বাসের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। কারণ, কোন বড় ব্যক্তিত্বের নিকট আশা নিশ্চিত বিশ্বাসের সমতুল্য। আর আল্লাহ তাআলার সত্তা হল এ বিশ্বের সবার চেয়ে মহান। তাঁর কাছে আশা সুনিশ্চিত বিশ্বাস কেন হবে না? সেই জন্য ব্যাখ্যাকারিগণ বলেছেন যে, কুরআনে যেখানেই আল্লাহর ক্ষেত্রে عَسَى (সম্ভবতঃ, আশা করা যায়) শব্দ ব্যবহার হয়েছে, তা সুনিশ্চিত বিশ্বাসের অর্থে। خَطِيئَة একবচন শব্দ। কিন্তু এখানে خَطَايَا বহুবচনের অর্থে ব্যবহূত হয়েছে। নবীগণ যদিও পাপমুক্ত, তাঁদের দ্বারা বড় পাপ হওয়া অসম্ভব। তা সত্ত্বেও কিছু কাজে ত্রুটি ঘটেছে মনে করে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হন।
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
📘 হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রজ্ঞা[১] দান কর এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর।
[১] حُكم বলতে হিকমত, প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বুঝ, বিবেক, বিচারশক্তি, অথবা নবুঅত ও রিসালত বা আল্লাহর সীমা ও নির্দেশাবলীর জ্ঞান।
وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ
📘 পরবর্তীদের মাঝে আমার সুনাম বজায় রাখ, [১]
[১] আমার পর কিয়ামত পর্যন্ত যারা পৃথিবীতে আসবে, তারা আমাকে উৎকৃষ্ট ভাষায় স্মরণ করবে। এখান থেকে বুঝা গেল যে, নেকীর বদলা দুনিয়াতে মহান আল্লাহ প্রশংসা, সুনাম ও সুখ্যাতির মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রত্যেক জাতিই ভাল নামে স্মরণ করে থাকে। কেউ তার মহানুভবতা ও মর্যাদাকে অস্বীকার করে না।
وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
📘 এবং আমাকে সুখকর (নাঈম) জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর।
وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ
📘 আর আমার পিতাকে ক্ষমা কর, সে তো একজন পথভ্রষ্ট। [১]
[১] এই দু'আ ঐ সময়কার যখন তাঁর নিকট স্পষ্ট ছিল না যে, মুশরিক (আল্লাহর শত্রু)-দের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা বৈধ নয়। অতঃপর যখন মহান আল্লাহ একথা পরিষ্কার করে দিলেন, তখন তিনি নিজ পিতা হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথক হয়ে গেলেন।
(সূরা তাওবাহ ৯:১১৪ আয়াত)
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ
📘 এবং আমাকে পুনরুত্থান-দিবসে লাঞ্ছিত করো না। [১]
[১] অর্থাৎ, সমস্ত মানুষের সামনে আমাকে পাকড়াও করে বা শাস্তি দিয়ে। অথবা আমার পিতাকে আযাব দিয়ে বা শাস্তিযোগ্য লোকেদের দলে তার হাশর করে। হাদীসে এসেছে যে, কিয়ামত দিবসে যখন ইবরাহীম (আঃ) নিজ পিতাকে নিকৃষ্ট অবস্থায় দেখবেন, তখন তিনি আবার একবার আল্লাহর সমীপে তার জন্য ক্ষমার দরখাস্ত করবেন এবং বলবেন, 'হে আল্লাহ! এর থেকে বড় অপমান আমার আর কি হতে পারে?' মহান আল্লাহ বলবেন, 'আমি কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।' তারপর তাঁর পিতাকে একটি নোংরা-মাখা হায়েনার রূপে পায়ে ধরে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।
(বুখারী)
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ
📘 যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না;
إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
📘 সেদিন উপকৃত হবে কেবল সেই; যে আল্লাহর নিকট সুস্থ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।’ [১]
[১] বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ বা সুস্থ নীরোগ অন্তর বলতে এমন অন্তরকে বুঝানো হয়েছে, যা শিরক হতে পবিত্র। অর্থাৎ, মুমিনদের অন্তর। কারণ কাফের ও মুনাফিকের অন্তর হয় অসুস্থ রোগাক্রান্ত। কেউ কেউ বলেন, বিদআত-শূন্য সুন্নতের উপর প্রশান্ত অন্তর। আবার কারো নিকট পার্থিব ভোগ-বিলাস হতে পবিত্র, আবার কারো নিকট মূর্খতার অন্ধকার ও নৈতিক অধঃপতন হতে পবিত্র অন্তর। এ সকল অর্থই ঠিক হতে পারে। কারণ মু'মিনের অন্তর উক্ত সকল প্রকার রোগ ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকে।
وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ
📘 এবং নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। [১]
[১] অর্থাৎ, প্রত্যেক বস্তুর উপর তাঁর প্রভুতত্ত্ব ও কর্তৃতত্ত্ব রয়েছে তথা প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যাপারে তিনি সর্বতোভাবে সক্ষম; কিন্তু যেহেতু তিনি দয়াবান, সেহেতু তিনি হঠাৎ ধরে বসেন না। বরং পূর্ণ অবকাশ দেন ও তারপর পাকড়াও করেন।
وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ
📘 জান্নাত সাবধানীদের নিকটবর্তী করা হবে,
وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِلْغَاوِينَ
📘 এবং পথভ্রষ্টদের জন্য উন্মোচিত করা হবে জাহান্নাম। [১]
[১] অর্থাৎ, জান্নাত ও জাহান্নামকে প্রবেশের আগে সামনে আনা হবে। যার দরুন কাফেরদের দুঃখ ও মু'মিনদের আনন্দ আরো বৃদ্ধি পাবে।
وَقِيلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ
📘 ওদের বলা হবে, ‘তারা কোথায় যাদের তোমরা উপাসনা করতে;
مِنْ دُونِ اللَّهِ هَلْ يَنْصُرُونَكُمْ أَوْ يَنْتَصِرُونَ
📘 আল্লাহর পরিবর্তে? ওরা কি তোমাদের সাহায্য করতে আসবে? না ওরা আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?’ [১]
[১] অর্থাৎ, তোমাদের উপর হতে আযাব দূর করে দেবে অথবা তারা নিজেদেরকে তা হতে বাঁচাতে পারবে?
فَكُبْكِبُوا فِيهَا هُمْ وَالْغَاوُونَ
📘 অতঃপর ওদের এবং পথভ্রষ্টদের অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, [১]
[১] অর্থাৎ, দেবতা ও পূজারী সবাইকেই গুদামে মাল রাখার মত এককে অপরের উপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
وَجُنُودُ إِبْلِيسَ أَجْمَعُونَ
📘 এবং ইবলীসের বাহিনীর সকলকেও। [১]
[১] এখানে 'বাহিনী' বলতে তার সেই চেলা-শিষ্যরা, যারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করে।
قَالُوا وَهُمْ فِيهَا يَخْتَصِمُونَ
📘 ওরা সেখানে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বলবে,
تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
📘 ‘আল্লাহর শপথ! আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম,
إِذْ نُسَوِّيكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ
📘 যখন আমরা তোমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সমকক্ষ গণ্য করতাম। [১]
[১] পৃথিবীতে প্রত্যেক খোদাই করা পাথরের মূর্তি এবং কবরের উপর নির্মিত সুদর্শন গম্বুজ মুশরিকদের কাছে ইলাহী এখতিয়ারের অধিকারী বলে মনে হয়। কিন্তু কিয়ামত দিবসে জানতে পারবে যে, এ ছিল প্রকাশ্য ভ্রষ্টতা, যার ফলে তারা তাদেরকে আল্লাহর সমতুল ভেবে বসেছিল।
وَمَا أَضَلَّنَا إِلَّا الْمُجْرِمُونَ
📘 আমাদেরকে দুষ্কৃতকারীরাই বিভ্রান্ত করেছিল। [১]
[১] সেখানে গিয়ে অনুভব করবে যে, অন্য অপরাধীরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। পৃথিবীতে তাদেরকে সতর্ক করা হত যে, অমুক অমুক কাজ ভ্রষ্টতা, বিদআত বা শিরক। কিন্তু তখন তারা মানত না এবং চিন্তা-ভাবনাও করত না, যাতে তাদের সামনে সত্য ও অসত্য প্রকাশ পায়।